মফস্বলের এক মেলায় শুরু হল রোমাঞ্চকর 'মরণকূপ' খেলা— যেখানে ছোট্ট একফালি ঘাসজমিকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে, প্রায় উলম্বভাবে ঘুরতে শুরু করল তিনটি গাড়ি। হঠাৎই ঘটে গেল এক দুর্ঘটনা। উল্লাসে মুখরিত অঙ্গনে নেমে এল মৃত্যুর হাহাকার। কিন্তু কেন? এই মৃত্যু কি শুধুই এক সর্বনাশের আশায় বসে থাকা মানুষের খেয়াল? নাকি এর পেছনে আছে আরও বড়ো, আরও অন্ধকার কোনো পরিকল্পনা? শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী'র এই বহুল-প্রশংসিত উপন্যাসটি পড়তে বসলে সময়ের হুঁশ থাকে না। মনে হয় যেন আমরাই দাঁড়িয়ে আছি একফালি জমিতে, আর চারপাশে ঘুরপাক খেয়ে চলেছে মৃত্যু। সেই মৃত্যু ভয়ংকর সুন্দর। সেজন্যই এই উপন্যাসের প্রতিটি অধ্যায়ের নামকরণ হয় ভরতনাট্যম-এর মুদ্রা অনুযায়ী। কাহিনির মধ্যে মিশে যায় ভরতনাট্যমের ইতিহাস আর এক গোপন সম্প্রদায়ের কার্যকলাপ। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের নামকরণ হয় নৃত্যের বিভঙ্গ না নাম অনুযায়ী। আর সেই গ্রুপেরই একের পর এক সদস্যকে কেড়ে নিতে থাকে মৃত্যু! এ নিছক কোনো রহস্য উপন্যাস নয়। বরং সৃষ্টি ও ধ্বংসের এক ক্ষুরধার খেলা হিসেবেই চিহ্নিত করা চলে এটিকে। কাব্য, দর্শন, চিত্রকলা, আলো, অন্ধকার— এরাও চরিত্র হয়ে উঠেছে এই খেলায়, যার একদিকে আছে অদৃশ্য কোনো সূত্রধর, অন্যদিকে আছেন রহস্যভেদী। এই উপন্যাসে কথক নিছকই এক পার্শ্বচরিত্র হয়ে থাকেননি। বরং তিনি ভীষণভাবে মিশে গেছেন কাহিনির আবর্তে। তাঁর অপ্রাপ্তি, আশা, উদ্বেগ, যন্ত্রণা, আনন্দ— এই অনুভূতিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কাহিনির গতি ও পর্যায়ক্রম নির্ধারণে। রহস্যভেদীও যান্ত্রিক নৈর্ব্যক্তিকতার বদলে একান্ত ব্যক্তিগত এক প্রকল্প হিসেবে বেছে নিয়েছেন একে। আর এভাবেই শেষ অবধি মরণকূপ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে অন্তত কয়েকজন। আবারও বলি, এ এক অত্যন্ত উঁচু মানের লেখা। কিন্তু রহস্য উপন্যাস হিসেবে এটির মধ্যে বিস্তর ফাঁক আছে। সবচেয়ে বড়ো ফাঁক আছে অপরাধী চরিত্রটি গঠনেই। যেমন~ ১) মৃত্যুমিছিল শুরু করানোর পেছনে নাটের গুরু'র মোটিভ আদৌ স্পষ্ট ছিল না। ২) বুদ্ধিমান, রীতিমতো শৈল্পিক এক 'নাট্যকার' হিসেবে সে যে নাটকটি নির্মাণ করেছে, তার মধ্যে রহস্যভেদী ও কথককে যেচে ঢোকানোর কোনো কারণই ছিল না। ৩) বেশ ক'টি মৃত্যু, যদি পরিকল্পিত হত্যাও হয়ে থাকে, ছিল একেবারেই অকারণ। এছাড়াও আমরা দেখি যে~ ৪) অনেক চরিত্রের কার্যকলাপের কোনো কারণ বোঝা যায়নি, অকারণ রহস্য (ও শয্যাদৃশ্য) নির্মাণ ছাড়া। ৫) হ্যাকিঙের নামে যে-সব কথা এখানে বলা হয়েছে, তা অসম্ভাব্য। ৬) উপন্যাসের শেষটা হাস্যকর-রকমের মেলোড্রামাটিক। এই বইটি থেকে আমার সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি হল ভরতনাট্যম নিয়ে কৌতূহল। সুধী পাঠকেরা চাইলে ভারত সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রকের সাইটে এই নৃত্যশৈলীর ইতিহাসটি পড়ে নিতে পারেন। এ এক জানার মতো, গর্ব করার মতো ইতিহাস। লেখক তাঁর কাব্যময় ভাষা ও শিল্পচেতনা নিয়ে আরও লিখুন— এই শুভেচ্ছা জানাই। তবে রহস্যকাহিনি... থাক।
এ এক সুখপাঠ্য বই। বই শেষ হয়েছে গতকাল, কিন্তু এর রেশ কাটছে না এখনও। মানে মেদহীন সাবলীল কাব্যময় ভাষায় এত টানটান উত্তেজনাপূর্ণ রহস্যকাহিনী (সিরিয়াল কিলিং সম্পর্কিত) যে এত হালকা চলে এবং এত সুখপাঠ্য ভাবে লেখা যায় তার একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন লেখক শুদ্ধেন্দু চক্রবর্তী মহাশয়। কাহিনীর নাম অনুসারেই বেশ কিছু আপাত যোগসাজশ সম্পর্কিত হত্যাকে মঞ্চ করে ভারতনাট্যম, ভারতীয় মিথলজি, একটা অদ্ভুত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং তার অন্তরালে মেঘনাদের ন্যায় লুকিয়ে থাকা একজন দুষ্কৃতী, নাশকতা, চক্রান্ত এবং মানব মনস্তত্ত্বের আনাচে কানাচের বিভিন্ন আঙ্গিকের সজ্জায় লেখক এক মরণকূপ গড়ে তুলেছেন। এই গড়ে তলায় লেখক একশো শতাংশ সফল। এই মরণকূপ আসলে মানব মনের বিভিন্ন জটিল তত্ত্বের সমন্নয়। হালকা চালে (অর্থাৎ অপ্রয়োজনীয় নৃশংসতা কিংবা রগরগে যৌনতার ব্যবহার) লেখাটা চললেও এটা শেষ পর্যন্ত পাঠককে একইভাবে বেঁধে রাখতে সক্ষম। এটাও লেখার একটা অন্যতম সুন্দর দিক। আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হলো, লেখাটার মূলত ফিকশনাল হলেও এর মধ্যে বেশ কিছু গুরত্বপূর্ণ মিথলজির বা ভারতনাট্যমের উপর জ্ঞান রয়েছে, যেগুলো কখনোই চর্বিতচর্বন লাগেনি এবং গল্পের গতিকে শ্লথ করেনি। বরঞ্চ এই ছোট ছোট জ্ঞানগুলো পরবর্তীতে কী হতে পারে তার একটা কৌতুহল উদ্রেক করেছে। তার সাথে সবথেকে বড় যে পাওনা তা হলো চরিত্রায়ন এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। প্রতিটি পার্শ্ব চরিত্র খুব যত্ন নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষত, আশুদার সহকারীরূপে কথকের চরিত্র কেবল গল্পপাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রায় নায়কোচিত চরিত্রে পরিণত হয়েছে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে মনস্তত্ত্ববিদ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের দুর্দান্ত মনের ব্যবচ্ছেদ।
আলাদা করে বলতে হবে উপরি পাওনা হিসেবে পাওয়া কবিতাগুলোর কথা। লেখকের ভাষা এবং তার কাহিনী সৃষ্টি থেকে আন্দাজ করা যায় তাঁর অসাধারণ সাহিত্যজ্ঞান সম্পর্কে।
এগুলো তো বইটার ভালো লাগার দিক। এবার বলি সামান্য কিছু খারাপ লাগা: ১. বারে বারে মনে হয়েছে যেনো ডিডাকশন যেনো বড় তাড়াতাড়ি ঘটেছে, সব প্রশ্নই যেনো বেশ কমন এবং সহজেই তার উত্তর করা গেছে। ২. আর এরকম সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারের শেষে অপরাধী এবং তদন্তকারীর মধ্যে যে সরাসরি একটা মানসিক দ্বন্দ্ব আশা করেছিলাম, সেটার আভাস থেকেও সম্পূর্ণ না হওয়ায় সামান্য দুঃখ পেলাম।
বইটির প্রচ্ছদ বেশ আকর্ষণীয়। বানান ভুল এবং মুদ্রণের প্রমাদও চোখে পড়েনি। আর বরাবরের মতোই অভিযানের বইয়ের প্রোডাকশনও যথাযথ।
মোটের উপর এটা একটা দুর্মূল্য বই। বাংলা সাহিত্যে বর্তমানে থ্রিলার ধারায় যে সকল বই লেখা হচ্ছে, তার মধ্যে একটা ব্যতিক্রমী থ্রিলার।
এই বই পড়ে অনেকক্ষণ একটা রেশ থেকে যায়। হতাশা আর ক্ষোভের রেশ। এমনিতেই অনেক সময় নষ্ট হয়েছে বইটা পড়তে গিয়ে, রিভিউ লেখার জন্য এর চেয়ে বেশী লাইন ও সময় নষ্ট করা সমীচীন হবে না। ঋজু গাঙ্গুলী দাদার পোষ্ট দেখে নিন বিষদে জানার জন্য। একদম যথাযথ।