What do you think?


রাজা প্রজা বণিক দারোগা
135 pages, Hardcover
Published February 1, 2022
About the author
Muhit Hasan
8 booksমুহিত হাসান মূলত লেখেন গদ্য, মাঝেমধ্যে কবিতাও। রয়েছে বিচিত্র সব বিষয়ের বই-সংগ্রহ ও পঠনের নেশা। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় উত্তরাধিকার সাহিত্যপত্রে। তারপর একাধিক পত্রিকায় নিয়মিত লিখেছেন প্রবন্ধ-নিবন্ধ ও বই আলোচনা। আগ্রহের বিশেষ ক্ষেত্রে ইতিহাস ও গ্রন্থচর্চা। বিস্মৃত কথকতা তাঁর প্রথম বই।
Ratings & Reviews
Friends & Following
Create a free account to discover what your friends think of this book!
Community Reviews
Displaying 1 - 4 of 4 reviews
May 30, 2022
সন-তারিখের হাঙ্গামা আর রাজা-গজাদের উৎপাতে অনেক পাঠক ইতিহাস পড়তে চান না। কিন্তু সেই রস-কষের অভাবে শুষ্কং,কাষ্ঠং ইতিহাসকে আনন্দদায়ক ও পাঠযোগ্য করে লিখেছেন মুহিত হাসান। তার 'রাজা প্রজা বণিক দারোগা' বইতে ইতিহাসের অলি-গলি খুঁজে একুশটি অনবদ্য কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।
ঊনবিংশ ও বিশ শতকে বাংলার গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে গেছে কলেরা রোগে। সেই কলেরার সূত্রপাত হয়েছিল বাংলাদেশের যশোর থেকে। অনেকে বিশ্বাস করতেন একদল কালো জাদুকর একটি মৃতদেহের মাথা কেটে কালো জাদুর চর্চা করে এবং পালিয়ে যায়। মনে করা হয় সেইসব জাদুকর যে এলাকা অতিক্রম করবে সেখানেই আবিভূত হবে কলেরা! এমনই আগ্রহোদ্দীপক তথ্য আর ঘটনায় ভরপুর 'বাংলার কলেরাক্রান্তি'।
এখানকার মতো সেকালেও চোরের উপদ্রব ছিল। সেইসব চোরদের নিয়েই 'সেকালের চোর ও চুরিকাহিনি'।
থানা পদ্ধতির উদ্ভব সুলতানি আমলে। ব্রিটিশ আমলে তা আরও সুসংহত হয় এবং হয়ে ওঠে প্রজাপীড়নের বড়ো অস্ত্র। আজকের পুলিশ ভাইদের মতো তখনও পুলিশ ভাইয়েরা ছিলেন জনগণের বন্ধু। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৭৯৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ঢাকার একজন দারোগাকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে। সেই জনবন্ধু ডাকাতদের সাথে জোট বেঁধেছিলেন এবং তাদের কাছে পয়সা খেয়ে ডাকাতদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন! ইংরেজ আমলের এমনই কিছু জনবন্ধুর কীর্তিকলাপের ইতিবৃত্ত 'দারোগা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আসামি'।
পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুরা ছিল বাংলার মানুষদের জন্য অভিশাপ। বৃহত্তর যশোর, বরিশাল অঞ্চলের কতশত জনপদ এদের অত্যাচারে বিরানভূমিতে পরিণত হয় তার হিসাব ঐতিহাসিকদের কাছে নেই। জলদস্যুদের জুলুমের মর্মন্তুদ কাহিনি পড়তে যে-কোনো পাঠকের খারাপ লাগবে। এটি এই বইয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
' বাকেরগঞ্জ জেলার মানুষের নৈতিক চরিত্র মোটের ওপর জঘন্যতম। এবং এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না। উঁচু জাতের লোকদের মধ্যে ঠকবাজি বা গুণ্ডামির অভিযোগ নেই, এমন লোক মিলবেই না। আর নিচু জাতের লোক মাত্রেই সুযোগ পেলেই খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি করে থাকে।... ধারণা করা হয় এই জেলার প্রায় প্রত্যেকেই ডাকাত। ' বৃহত্তর বরিশালের জেলা জজ জে উইন্টল সাহেব এভাবেই এই এলাকার মানুষের চরিত্র বর্ণনা করেছেন। বাকেরগঞ্জ কাহিনি অন্য অঞ্চলের পাঠকের মনোরঞ্জন করলেও বরিশালের পাঠকগণকে করতে পারে ব্যাপক ক্ষুদ্ধ!
আলেকজান্ডার ক্যানিংহামের পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ, ঐতিহাসিকদের চোখে মির জাফর এবং আলিবর্দি খানের উত্থান নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো অত্যন্ত সুখপাঠ্য।
এই বইয়ের সবচাইতে দুর্বল লেখা রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কিম উপন্যাসটি নিয়ে লেখা। ঠিক কোন যুক্তিতে এই লেখাটি সংকলনে স্থান পেয়েছে তা বোধগম্য নয়। কেরানিকূল আর মেট্রোপলিস নিয়ে লেখাটিও বিশেষ কল্কে পাবে না।
মুহিত হাসান পড়াশোনা করেন এবং তারপর কলম ধরেন৷ তাই তার লেখা তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বেশ কিছু ভালো বইয়ের কথা মুহিত হাসানের কল্যাণে জানতে পেরেছি। সেগুলো পড়ার ইচ্ছে রাখি।
ছোট্ট বই কিন্তু পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়। ইতিহাসের ভেতরকার কিছু তথ্যবহুল প্রবন্ধ পড়তে চাইলে বইটি ধরতে পারেন।
ঊনবিংশ ও বিশ শতকে বাংলার গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে গেছে কলেরা রোগে। সেই কলেরার সূত্রপাত হয়েছিল বাংলাদেশের যশোর থেকে। অনেকে বিশ্বাস করতেন একদল কালো জাদুকর একটি মৃতদেহের মাথা কেটে কালো জাদুর চর্চা করে এবং পালিয়ে যায়। মনে করা হয় সেইসব জাদুকর যে এলাকা অতিক্রম করবে সেখানেই আবিভূত হবে কলেরা! এমনই আগ্রহোদ্দীপক তথ্য আর ঘটনায় ভরপুর 'বাংলার কলেরাক্রান্তি'।
এখানকার মতো সেকালেও চোরের উপদ্রব ছিল। সেইসব চোরদের নিয়েই 'সেকালের চোর ও চুরিকাহিনি'।
থানা পদ্ধতির উদ্ভব সুলতানি আমলে। ব্রিটিশ আমলে তা আরও সুসংহত হয় এবং হয়ে ওঠে প্রজাপীড়নের বড়ো অস্ত্র। আজকের পুলিশ ভাইদের মতো তখনও পুলিশ ভাইয়েরা ছিলেন জনগণের বন্ধু। এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৭৯৩ সালে ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক ঢাকার একজন দারোগাকে বরখাস্ত করার মধ্য দিয়ে। সেই জনবন্ধু ডাকাতদের সাথে জোট বেঁধেছিলেন এবং তাদের কাছে পয়সা খেয়ে ডাকাতদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছিলেন! ইংরেজ আমলের এমনই কিছু জনবন্ধুর কীর্তিকলাপের ইতিবৃত্ত 'দারোগা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আসামি'।
পর্তুগিজ আর মগ জলদস্যুরা ছিল বাংলার মানুষদের জন্য অভিশাপ। বৃহত্তর যশোর, বরিশাল অঞ্চলের কতশত জনপদ এদের অত্যাচারে বিরানভূমিতে পরিণত হয় তার হিসাব ঐতিহাসিকদের কাছে নেই। জলদস্যুদের জুলুমের মর্মন্তুদ কাহিনি পড়তে যে-কোনো পাঠকের খারাপ লাগবে। এটি এই বইয়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
' বাকেরগঞ্জ জেলার মানুষের নৈতিক চরিত্র মোটের ওপর জঘন্যতম। এবং এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখতে পাওয়া যায় না। উঁচু জাতের লোকদের মধ্যে ঠকবাজি বা গুণ্ডামির অভিযোগ নেই, এমন লোক মিলবেই না। আর নিচু জাতের লোক মাত্রেই সুযোগ পেলেই খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি করে থাকে।... ধারণা করা হয় এই জেলার প্রায় প্রত্যেকেই ডাকাত। ' বৃহত্তর বরিশালের জেলা জজ জে উইন্টল সাহেব এভাবেই এই এলাকার মানুষের চরিত্র বর্ণনা করেছেন। বাকেরগঞ্জ কাহিনি অন্য অঞ্চলের পাঠকের মনোরঞ্জন করলেও বরিশালের পাঠকগণকে করতে পারে ব্যাপক ক্ষুদ্ধ!
আলেকজান্ডার ক্যানিংহামের পূর্ববঙ্গ ভ্রমণ, ঐতিহাসিকদের চোখে মির জাফর এবং আলিবর্দি খানের উত্থান নিয়ে লেখা প্রবন্ধগুলো অত্যন্ত সুখপাঠ্য।
এই বইয়ের সবচাইতে দুর্বল লেখা রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কিম উপন্যাসটি নিয়ে লেখা। ঠিক কোন যুক্তিতে এই লেখাটি সংকলনে স্থান পেয়েছে তা বোধগম্য নয়। কেরানিকূল আর মেট্রোপলিস নিয়ে লেখাটিও বিশেষ কল্কে পাবে না।
মুহিত হাসান পড়াশোনা করেন এবং তারপর কলম ধরেন৷ তাই তার লেখা তথ্যসমৃদ্ধ হয়ে থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বেশ কিছু ভালো বইয়ের কথা মুহিত হাসানের কল্যাণে জানতে পেরেছি। সেগুলো পড়ার ইচ্ছে রাখি।
ছোট্ট বই কিন্তু পড়ে আনন্দ পাওয়া যায়। ইতিহাসের ভেতরকার কিছু তথ্যবহুল প্রবন্ধ পড়তে চাইলে বইটি ধরতে পারেন।
August 25, 2023
১.
রাজা, প্রজা, বণিক ও দারোগা। মোটা দাগে ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-পূর্ব বাংলার সমাজব্যবস্থাকে বোধহয় এরচে বেশি ভাগ-বাঁটোয়ারা করা যাবে না। লতাপাতায় এইসব ভদ্র মহাশয়গণ বাংলার ইতিহাসের নাটের গুরু হিসাবে প্রতীয়মান, সেটা শাসক হোক কিংবা শোষিত হিসাবে। সেকাল বাংলার সমাজব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষদের চালচিত্র নিয়ে দুর্বার উৎসাহের নিরিখে বইটার হদিস মেলা মাত্রই হস্তগত করতে দের সইলো না। বলা বাহুল্য, পুরোপুরি নয় অবশ্যই, তবে খণ্ড খণ্ড কয়েকটি আখ্যানের মাধ্যমে মুহিত হাসান এখানে সেকাল বাংলার একটি চিত্রাঙ্কণ করেছেন।
১.১
মলাট উল্টে ভেতরে ঢুকলে প্রথম রচনা — বাংলায় কলেরাক্রান্তি। নাম শুনলেই রচনার প্রকৃতি আঁচ করা যায়। উনিশ শতকের গোড়াতে কালান্তক মহামারী কলেরার উৎপত্তিস্থল ভাবা হয় যশোর জেলাকে (যদিও বৈজ্ঞানিক/তথ্যভিত্তিক সত্যতা নেই)৷ তবে যশোরেই কলেরা মহামারী সবচেয়ে ভয়ংকর রুপ নিয়েছে সেটা দ্বিমত বহির্ভূত। সম্প্রতি করোনা মহামারী সময়কালে অদ্ভুত সব গুজব নিয়ে জনমনে চরম উত্তেজনার মতই কলেরা নিয়ে গুজব চাউর হয়েছিল যে, একদল কালো জাদুকর যশোর থেকে একটি মানবদেহের কাটা মুণ্ড্রসমেত পালিয়েছে। সেই কালো জাদুকরের দল কাটা মুর হাতে যতদূর যাবে, ততদূরই শিবের অভিশাপ বা কলেরা ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তাঁদের পাকড়াও করে যদি কাটা মুণ্ডুটি মাটিতে ফেলানো গেলে সেখানেই কলেরা 'অক্কা পাবে'। এমনসব বিষয়পাতি এবং কলেরার মোরটালিটি রেট নিয়ে তথ্যমূলক লেখা৷ এইটা ছাড়াও যশোর নিয়ে অন্য আরেকটি আলোচনায় উঠে এসছে বাংলায় ম্যালারিয়ার ভয়াল থাবা এবং যশোরের অর্থনৈতিক চালচিত্র।
১.২
দারোগা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আসামি। কিছু খন্ডচিত্র মারফত অতীত ইতিহাসে বাংলার আইনব্যবস্থা/অপরাধাজগৎ নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়। এইটা বাঙালির আদি-অভ্যাস ঘুষ ব্যবস্থা, কুচক্র, আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে জালিয়াতি নিয়ে লেখা দলিল।
১.৩
বাকেরগঞ্জ বা বর্তমান বরিশাল নিয়ে লেখাটা আমোদ দিবে। সেকালের বরিশাল শাসকের দৃষ্টিতে 'কুখ্যাত' ছিল অপরাধ প্রবণতার কারণে। বলা যায় ডাকাতের খনি! জেলা জজ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যে উইন্টল এর মতে, “বাকেরগঞ্জ জেলার মানুষের নৈতিক চরিত্র মোটের ওপর জঘন্যতম। এবং এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখতে পাওয়া যায়ই না। উঁচু জাতের লোকেদের মধ্যে ঠকবাজি বা গুণ্ডামির অভিযোগ নেই, এমন লোক মিলবেই না। আর নিচু জাতের লোক মাত্রেই সুযোগ পেলেই খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি করে থাকে...."। তখনকার একটি ডাকাতির ঘটনার বিবরণ পড়লে এই বক্তব্যকে সামান্য পরিমাণেও অতিরঞ্জিত মনে হয়না।
১.৪
ইংরেজ আমলাদের কুমিল্লাবাস৷ এইটা আগ্রহজাগানিয়া লেখা৷ কারণ, সেকালে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের চোখে কুমিল্লাবাসে ইতিবাচক মনোভাব দেখলে প্রশ্ন জাগে তাহলে বাঙলার অন্যান্য অঞ্চল নিয়ে তাহলে সিভিলিয়ানদের মনোভাব কেমন ছিল? ভাবতাম বাঙালকে তারা অতিশয় নীচ এবং বসবাসের অযোগ্য জায়গা হিসাবে নাক-ছিঁটকায়। এখন লেখাটা পড়ে পারস্পেক্টিভ পরিবর্তনে এই ব্যাপারটা নিয়ে অধিকতর পড়াশোনার ইচ্ছা জাগে।
২.
সব কয়টা নিবন্ধের সারসংক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করলাম না৷ উপরে আলোচ্য বিষয় ছাড়াও অন্যান্য রচনায় উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগরে মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের রাহাজানি, মধ্যযুগের গ্রাম-বাঙলার সরল জীবনযাপন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ডাকবাংলো নিয়ে বিচিত্র বিবরণ, আলেকজান্ডার কানিংহামের মত কিংবদন্তিতুল্য প্রাত্নতাত্ত্বিকের কথা, আসাল-বেঙল রেলওয়ে দিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের বাণিজ্য বিস্তারের ভাবনা ইত্যাদি।
৩.
মূলবইয়ের পাঠ চুকিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে 'সংযোজন' অধ্যায়ে নাতিদীর্ঘ কয়েকটা লেখা। কিপলিং, কিম এবং কয়েকজন গুপ্তচর - এই বিষয়টা নিয়ে টুকটাক জানা ছিল আগে। ব্রিটিশরাজের গুপ্তচর হিসাবে রহস্য চাদরে মোড়া তিব্বত নিয়ে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্য সে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গল্প। বাকি লেখাগুলোর সাথেও বাঙলার ইতিহাসের সম্পৃক্ততা আছে, তাই মূল বই থেকে বিচ্ছিন্ন ভূখন্ড ঠেকে না৷ সবমিলিয়ে, ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশিক - পূর্ব বাঙলার ইতিহাস নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ বই।
(৩.৫/৫)
রাজা, প্রজা, বণিক ও দারোগা। মোটা দাগে ঔপনিবেশিক ও উপনিবেশ-পূর্ব বাংলার সমাজব্যবস্থাকে বোধহয় এরচে বেশি ভাগ-বাঁটোয়ারা করা যাবে না। লতাপাতায় এইসব ভদ্র মহাশয়গণ বাংলার ইতিহাসের নাটের গুরু হিসাবে প্রতীয়মান, সেটা শাসক হোক কিংবা শোষিত হিসাবে। সেকাল বাংলার সমাজব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষদের চালচিত্র নিয়ে দুর্বার উৎসাহের নিরিখে বইটার হদিস মেলা মাত্রই হস্তগত করতে দের সইলো না। বলা বাহুল্য, পুরোপুরি নয় অবশ্যই, তবে খণ্ড খণ্ড কয়েকটি আখ্যানের মাধ্যমে মুহিত হাসান এখানে সেকাল বাংলার একটি চিত্রাঙ্কণ করেছেন।
১.১
মলাট উল্টে ভেতরে ঢুকলে প্রথম রচনা — বাংলায় কলেরাক্রান্তি। নাম শুনলেই রচনার প্রকৃতি আঁচ করা যায়। উনিশ শতকের গোড়াতে কালান্তক মহামারী কলেরার উৎপত্তিস্থল ভাবা হয় যশোর জেলাকে (যদিও বৈজ্ঞানিক/তথ্যভিত্তিক সত্যতা নেই)৷ তবে যশোরেই কলেরা মহামারী সবচেয়ে ভয়ংকর রুপ নিয়েছে সেটা দ্বিমত বহির্ভূত। সম্প্রতি করোনা মহামারী সময়কালে অদ্ভুত সব গুজব নিয়ে জনমনে চরম উত্তেজনার মতই কলেরা নিয়ে গুজব চাউর হয়েছিল যে, একদল কালো জাদুকর যশোর থেকে একটি মানবদেহের কাটা মুণ্ড্রসমেত পালিয়েছে। সেই কালো জাদুকরের দল কাটা মুর হাতে যতদূর যাবে, ততদূরই শিবের অভিশাপ বা কলেরা ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু তাঁদের পাকড়াও করে যদি কাটা মুণ্ডুটি মাটিতে ফেলানো গেলে সেখানেই কলেরা 'অক্কা পাবে'। এমনসব বিষয়পাতি এবং কলেরার মোরটালিটি রেট নিয়ে তথ্যমূলক লেখা৷ এইটা ছাড়াও যশোর নিয়ে অন্য আরেকটি আলোচনায় উঠে এসছে বাংলায় ম্যালারিয়ার ভয়াল থাবা এবং যশোরের অর্থনৈতিক চালচিত্র।
১.২
দারোগা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং আসামি। কিছু খন্ডচিত্র মারফত অতীত ইতিহাসে বাংলার আইনব্যবস্থা/অপরাধাজগৎ নিয়ে ধারণা পাওয়া যায়। এইটা বাঙালির আদি-অভ্যাস ঘুষ ব্যবস্থা, কুচক্র, আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে জালিয়াতি নিয়ে লেখা দলিল।
১.৩
বাকেরগঞ্জ বা বর্তমান বরিশাল নিয়ে লেখাটা আমোদ দিবে। সেকালের বরিশাল শাসকের দৃষ্টিতে 'কুখ্যাত' ছিল অপরাধ প্রবণতার কারণে। বলা যায় ডাকাতের খনি! জেলা জজ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যে উইন্টল এর মতে, “বাকেরগঞ্জ জেলার মানুষের নৈতিক চরিত্র মোটের ওপর জঘন্যতম। এবং এর ব্যতিক্রম প্রায় দেখতে পাওয়া যায়ই না। উঁচু জাতের লোকেদের মধ্যে ঠকবাজি বা গুণ্ডামির অভিযোগ নেই, এমন লোক মিলবেই না। আর নিচু জাতের লোক মাত্রেই সুযোগ পেলেই খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি করে থাকে...."। তখনকার একটি ডাকাতির ঘটনার বিবরণ পড়লে এই বক্তব্যকে সামান্য পরিমাণেও অতিরঞ্জিত মনে হয়না।
১.৪
ইংরেজ আমলাদের কুমিল্লাবাস৷ এইটা আগ্রহজাগানিয়া লেখা৷ কারণ, সেকালে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের চোখে কুমিল্লাবাসে ইতিবাচক মনোভাব দেখলে প্রশ্ন জাগে তাহলে বাঙলার অন্যান্য অঞ্চল নিয়ে তাহলে সিভিলিয়ানদের মনোভাব কেমন ছিল? ভাবতাম বাঙালকে তারা অতিশয় নীচ এবং বসবাসের অযোগ্য জায়গা হিসাবে নাক-ছিঁটকায়। এখন লেখাটা পড়ে পারস্পেক্টিভ পরিবর্তনে এই ব্যাপারটা নিয়ে অধিকতর পড়াশোনার ইচ্ছা জাগে।
২.
সব কয়টা নিবন্ধের সারসংক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করলাম না৷ উপরে আলোচ্য বিষয় ছাড়াও অন্যান্য রচনায় উঠে এসেছে বঙ্গোপসাগরে মগ ও ফিরিঙ্গি জলদস্যুদের রাহাজানি, মধ্যযুগের গ্রাম-বাঙলার সরল জীবনযাপন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, ডাকবাংলো নিয়ে বিচিত্র বিবরণ, আলেকজান্ডার কানিংহামের মত কিংবদন্তিতুল্য প্রাত্নতাত্ত্বিকের কথা, আসাল-বেঙল রেলওয়ে দিয়ে ঔপনিবেশিক সরকারের বাণিজ্য বিস্তারের ভাবনা ইত্যাদি।
৩.
মূলবইয়ের পাঠ চুকিয়ে সামনে এগিয়ে গেলে 'সংযোজন' অধ্যায়ে নাতিদীর্ঘ কয়েকটা লেখা। কিপলিং, কিম এবং কয়েকজন গুপ্তচর - এই বিষয়টা নিয়ে টুকটাক জানা ছিল আগে। ব্রিটিশরাজের গুপ্তচর হিসাবে রহস্য চাদরে মোড়া তিব্বত নিয়ে জ্ঞান আহরণের উদ্দেশ্য সে এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার গল্প। বাকি লেখাগুলোর সাথেও বাঙলার ইতিহাসের সম্পৃক্ততা আছে, তাই মূল বই থেকে বিচ্ছিন্ন ভূখন্ড ঠেকে না৷ সবমিলিয়ে, ঔপনিবেশিক ও ঔপনিবেশিক - পূর্ব বাঙলার ইতিহাস নিয়ে তথ্যসমৃদ্ধ বই।
(৩.৫/৫)
August 25, 2026
রিভিউ দেখে মূলতঃ বইটা পড়া। মধ্যযুগের বেশকিছু ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে বইটা লেখা।
বইটার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে ডাকবাংলো ও লখনৌ নিয়ে লেখাটা। এছাড়া সড়ক ও রেল যোগাযোগ, বাখেরগঞ্জ নিয়েও লেখাগুলো ছিল সুখপাঠ্য।
বইটায় প্রচুর রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্রিটিশদের রচিত বইপত্র রেফারেন্স হিসেবে এসেছে। এ রেফারেন্স বইগুলো ব্যক্তিগতভাবে উপরি পাওয়া বলতে হবে।
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বইটা পড়লাম। লেখকের সহজসরল বিবরণী পাঠককে আকৃষ্ট করবে।
বইটার সবচেয়ে বেশি পছন্দ হয়েছে ডাকবাংলো ও লখনৌ নিয়ে লেখাটা। এছাড়া সড়ক ও রেল যোগাযোগ, বাখেরগঞ্জ নিয়েও লেখাগুলো ছিল সুখপাঠ্য।
বইটায় প্রচুর রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্রিটিশদের রচিত বইপত্র রেফারেন্স হিসেবে এসেছে। এ রেফারেন্স বইগুলো ব্যক্তিগতভাবে উপরি পাওয়া বলতে হবে।
একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে বইটা পড়লাম। লেখকের সহজসরল বিবরণী পাঠককে আকৃষ্ট করবে।
April 14, 2024
চমৎকার বই! ভাষা আরেকটু মজাদার হলে পড়ে আরাম পেতাম।
Displaying 1 - 4 of 4 reviews





