Introduction to economic concepts for children written by the professor of Presidency College, Calcutta. Dr. Sarkar was also famous student activist against British Colonial rule in India.
বইয়ের নাম "ছোটদের অর্থনীতি", যে কেউ নামটা পড়লেই মনে করবে নিশ্চয়ই অর্থনীতির ABC শেখার জন্য বইটা লেখা হয়েছে। কিন্তু এমন মনে করলে সম্পূর্ণ ভুল হবে। পুরো বইয়ের বিষয়বস্তু হচ্ছে ক্যাপিটালিস্ট অর্থনীতি কীভাবে পৃথিবীর সর্বনাশ করছে, ক্যাপিটালিজমে পৃথিবীর ভবিষ্যত কেন অন্ধকার ইত্যাদি। সমাজতন্ত্রের আশার প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন যে ইতোমধ্যে ভেঙে খানখান হয়ে গেছে, তাই মনে হয় বইখানা এমন চরম নৈরাশ্য উদ্রেককারী।
পুঁজিবাদী অর্থনীতির নানাবিধ ক্ষতিকারক দিক নিয়ে লেখক আলোচনা করেছেন। বইটাকে যতই নেতিবাচক ও একতরফা ন্যারেটিভের বলি, কিছু বিষয়ের সাথে একমত হতেই হবে। যেমন শিল্পকারখানার মালিক ও শ্রমিকদের সম্পর্কে। শ্রমিকদের এতই কম মজুরি দেওয়া হয় যে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ হয় না; পুষ্টিকর খাদ্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, চিকিৎসাসেবা, স্বাস্থ্যকর বাসস্থান, শিক্ষা কোনকিছুই তারা ঠিকমতো পায় না। লাভের প্রায় সবটাই শিল্পের মালিকরা ভোগ করে। আবার দেখা যায়, একটা বড় করপোরেশন ছোট ছোট ব্যবসাকে কিনে নিচ্ছে অথবা নিঃশেষ করে দিচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়ন্ত্রণ করছে কোটি কোটি মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা। তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যাংকব্যবস্থা। এই ব্যবসায়ীরা প্রভাব বিস্তার করছে দেশের নীতিনির্ধারণে, দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতিমালা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সব নীতিমালায় মানবাধিকার উপেক্ষা করে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই আগে রক্ষা করা হচ্ছে। একটা বড় দেশ ছোট দেশে যুদ্ধ বাধাচ্ছে অর্থনৈতিক প্রভাববিস্তার করার উদ্দেশ্যে। সাম্রাজ্যবাদী বড় দেশগুলো ছোট দেশগুলোতে একটা বুর্জোয়া শ্রেণী তৈরি করছে, সেই বুর্জোয়া শ্রেণী ব্যক্তিগত লাভের বিনিময়ে নিজ দেশের শ্রমসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে সাহায্য করছে। এই ব্যাপারগুলি সত্যিই ঘটেছে এবং ঘটছে।
অধ্যাপক নীহারকুমার সরকার ভারতের নাগরিক। তিনি ভারত সরকারের অর্থনৈতিক পদক্ষেপের কড়া সমালোচনা করে অনেক কথা লিখেছেন। অধ্যায়টা ১৯৯০ দশকের একটা সময়ে লেখা যখন নরসিমা রাও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং মনমোহন সিং ছিলেন অর্থমন্ত্রী। খোলাবাজার নীতি গ্রহণ করার জন্য লেখক প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করেন। খোলাবাজার নীতি গ্রহণের ফলে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে, কিন্তু এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে ভারতের সামনে অপেক্ষা করছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়- এমনটাই আশঙ্কা করেছিলেন লেখক। তবে মুক্তির উপায় আছে একটা, তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণীর পার্টিগুলোর ঐক্য। তারা যদি একজোট হয়ে স্বাধীনতার পক্ষে, সমাজবাদের পক্ষে আন্দোলন করে সফল হতে পারে, তবেই আসবে আসবে সুখ-শান্তি-সাফল্য।
প্রায় তিরিশ বছর আগের লেখা, গত তিরিশ বছরে ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতি-অবনতির আদ্যোপান্ত আমার জানা নেই। তবে ভালোমন্দ মিশিয়ে ভারত বোধহয় উন্নতিই করেছে। লেখক যে অর্থনৈতিক বিপর্যয় আশঙ্কা করেছিলেন, ভারতবর্ষে সেসব ঘটেছে বলে তো মনে হয় না।
পুরো বই জুড়ে পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সর্বনাশা দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতির যে কিছু ভালো দিকও আছে, তার কোনকিছুই লেখকের চোখে পড়েনি। মুদ্রার একপিঠ দেখানো বই ছোটদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর হয়, যে দোষটা লেখক করেছেন। আবার বড়মুখ করে সমাজবাদের প্রশংসার বাণীও লেখক "ছোটদের অর্থনীতি"তে যুক্ত করেননি (লেখকের ছোটদের রাজনীতি অংশে অবশ্য প্রশংসা আছে, হতাশাও আছে)।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে তিরিশ বছরের বেশি হলো। পুঁজিবাদকে হঠিয়ে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নের স্বপ্ন দেখা মানুষ এখন আর নেই বললেই চলে। যারা এখন সমাজতান্ত্রিক রাজনীতি করেন তারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মধ্যেই কিছু সংস্কার দেখতে চান। তাই নীহারকুমার সরকারের এই বইটা বর্তমানের সাথে আর প্রাসঙ্গিক নেই বলা যায়। আন্তর্জাতিক ব্যবসার নীতিমালাতেও অনেক সংস্কার এসেছে, ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি আইনের ক্ষেত্রে সংস্কার এসেছে, অনুন্নত দেশগুলোকে কিছু ছাড় "পুঁজিবাদী" দেশগুলো দিয়েছে, যেসব কথা এই বইতে উল্লেখ নেই।
সবকথার এক কথা, বইটা মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এ বই আর ছোটদের নেই। অতীতে সমাজবাদীদের চিন্তাধারা কেমন ছিল জানতে চাইলে বইটা কেউ পড়তে পারেন।
মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষামন্ত্রালয়ের অধীনে একটা প্রকল্প আছে SEQAEP (Secondary Education Quality and Access Enhancement Project). এই প্রকল্পের একটা কাজ মাধ্যমিক পড়ুয়াদের পাঠাভ্যাস তৈরি করা, তাদেরকে বিনামূল্যে বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়া। UNDP, UKaid এর মত NGO/IGO এই প্রজেক্টে অর্থায়ন করে। SEQAEP এর ছাপানো বইগুলোর মধ্যে নীহারকুমার সরকারের "ছোটদের অর্থনীতি" বইটাও অন্তর্ভুক্ত আছে। ভারতকেন্দ্রীক এই বইয়ের সমাদর বর্তমানে ভারতে আছে কিনা জানিনা, বাংলাদেশে এখনও বইখানার মার্কেট আছে। 17-02-2023