এই উপন্যাসটি দুঃশীল দুর্যোধনকে নতুন চোখে দেখার বৃত্তান্ত। আজীবন আমরা জেনে এসেছি, মহাভারত-এর দুর্যোধন কূটকৌশলী, স্বার্থান্ধ। ন্যায়ও সত্যের বিপরীতে তার অবস্থান। এ জানাটা কি সত্য? না এ জানায় বর্ণবাদিতার মিশেল আছে? যুধিষ্ঠিররা কি কুরু বংশের কেউ, না বহিরাগত? হস্তিনাপুরের আসল দাবিদার কারা? পাণ্ডবরা, নাকুরুরা? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ কি সত্যিই ধর্মযুদ্ধ? ধর্মের পক্ষে কারা? এই যুদ্ধে যত অনীতি-দুর্নীতি হয়েছে, তার সিংহ ভাগই করেছে পাণ্ডবরা। উসকানি দাতা কে? মহাভারত-এর প্রকৃত নায়ক কে? অর্জুন? যুধিষ্ঠির? কৃষ্ণ? না দুর্যোধন? হস্তিনা পুরের নৃপতি ছিল দুর্যোধন। যুদ্ধ বাধলে মিথ্যা, জোচ্চোরি আর অধর্মের আশ্রয় নিয়ে কুরু পক্ষকে ধ্বংস করল পাণ্ডবরা। পরাজিত হলো দুর্যোধন। অন্যায় যুদ্ধে দুর্যোধনের ঊরু চুরমার করল ভীম। পাণ্ডবরা জয়ী হলো বটে কিন্তু প্রকৃত জয়ের স্বাদ কি পেল তারা? শেষ পর্যন্ত দুর্যোধন জিতে গেল নাকি? দুর্যোধন-এ হরিশংকরের ভাষাতীক্ষ্ণ, যুক্তিপূর্ণ। উপন্যাসটি পাঠককে ভীষণ রকম নাড়া দেবে।
Harishankar is a promising Bangladeshi author. The most significant point to notice is that all the four novels produced from Harishankar's pen sketch the life of the downtrodden, some of whom are from among fisherfolks, some from among prostitutes and some others are the 'harijons' or 'methors'.
মহাভারতের কথা এতোদিন যেভাবে জেনে এসেছি,হরিশংকর জলদাসের এই বই সেইসব জানা তথ্যকে ভেঙেচুড়ে গুড়িয়ে দিল। এমন সব প্রশ্ন উঠতে লাগলো যা সচরাচর বলা হয়না। মহাভারতের এমন সব ব্যাপারে আলোকপাত করা হয়েছে যা সচরাচর মিথ্যাভাষণে ঢেকে রাখা হয়। দুর্যোধন শেষ করার পর নতুন করে মহাভারত নিয়ে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি।
যে দুর্যোধনকে ভিলেনরুপে আখ্যায়িত করা হয়,আসলেই সে কী একজন ভিলেন মাত্র? যে কৃষ্ণকে আজ দেবতারুপে দেখা যায়, সে কৃষ্ণ কী আসলেই কোনো দেবতা নাকি মহাভারতের অন্যতম এক খলনায়ক? যে পাণ্ডবদের ন্যায়ের ধ্বজাধারী বলা হয়, তারা কী আসলেই তাই? সর্বোপরি,মহাভারতের যুদ্ধের জন্য দায়ী কে? এমন অনেক প্রশ্ন এবং প্রশ্নের উত্তর 'দুর্যোধন'-এ খোঁজার চেষ্টা করেছেন লেখক। মহাভারত নিয়ে সামান্যতম আগ্রহও থাকলে, এই বই অবশ্যপাঠ্য।
অত্যন্ত দুর্বল ও একপেশে লেখা। মনে হয়েছে যেন কেউ রেডিওতে খবর পড়ছে, কিছু অংশের কথোপকথন অনেকটা যাত্রাপালার মতো। দূর্যোধনের দিক থেকে দেখার বদলে পুরো মহাভারতকে তুলে এনেছেন লেখক।
মহাভারত নিয়ে ছোটবেলা থেকেই অনেক আগ্রহ থাকার কারনে, এ সংক্রান্ত যা পাই- তাই পড়ার চেষ্টা করি। কেউ যদি মহাভারতের গভীরে না যেয়ে শুধুমাত্র হরিশংকর জলদাসের লেখাগুলো পড়ে মহাভারত নিয়ে মন্তব্য করেন, তাহলে তা যথেষ্ট মিস লিডিং হবে- ইদানিং অনেকেই এ কাজ করে থাকেন লক্ষ্য করেছি।
মহাভারতের সবচেয়ে খ্যাতিম্যান খলচরিত্রটির নাম দুর্যোধন। কর্ণ ট্রাজিক হিরো, চিরকাল অধর্মের প্রতি নিজের অস্ত্রধারণ করলেও কর্ণের লয়ালটি প্রশংসার দাবি রাখে। সেই তুলনায় দুর্যোধনের কোনো খ্যাতি নেই বলেই সবাই জানে। একটা মাত্র পয়েন্টও বের করা যাবে না যেটা দিয়ে দুর্যোধনকে ডিফেন্ড করা যায়।
আসলেই কি তাই? দুর্যোধন সম্পর্কে যতটা কুখ্যাতি পাওয়া যায় সে কি আসলেই এসবের দায়ে অপরাধী?এসব প্রশ্নের উত্তর খোজার জন্যই পড়তে নিসিলাম হরিশংকর জলদাসের "দুর্যোধন"।
রাজ্যপিপাসু, ক্ষমতালোভী, শঠ,নিষ্ঠুর দুর্যোধনকেই প্রকারন্তরে পোট্রে করলেন হরিবাবু। রাজ্যশাসন, সৈন্য চালনা, প্রজাদের প্রতি আচরণ কিংবা রাজপুরুষ হিসেবে তার যৌনজীবন; কোনোটা নিয়েই আলাপ নেই বিস্তারিত। এক জায়গায় এক লাইনে লেখা, "প্রজারা তাকে ভালোবাসে।" আরেক জায়গায় আরেক লাইনে লেখা "একমাত্র স্ত্রী ভানুমতীর প্রতি অনুগত সে।" এইটুকুই।
খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে হরিবাবুর একলব্য পড়ে যতটা ভালো লেগেছিল, দুর্যোধন পড়ে সেটা লাগেনি। শুরুর কয়েক অধ্যায়ে দুর্যোধন ও পাণ্ডবপক্ষের কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস হৃদের তীরে কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালিয়ে, হরিবাবু ফিরে গেলেন মহাভারতের একদম শুরুর আলাপে। বাকিটা মহাভারতের সংক্ষিপ্ত রূপ। দুর্যোধনের জীবনী বিশ্লেষণমূলক আলোচনা খুবই কম।
তবে হরিশংকর জলদাস সম্ভবত নিজের অজান্তেই একটা ইনফরমেশন দিয়ে গেছেন, যার দ্বারা আমি নিশ্চিত হলাম, হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উপরে পাণ্ডবদের যতটা অধিকার, সমান অধিকার কৌরবদের তথা দুর্যোধনেরও আছে। তবে সেটা অন্য আলাপ। এই বইটা নিয়ে এরচে বেশি লিখতে ইচ্ছা হচ্ছে না।
যাদের আগে থেকেই মহাভারত, প্রতিভা বসুর মহাভারতের মহারণ্যে, বাণী বসুর মহাভারতের সিরিজ আর নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর মহাভারত বিষয়ক বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ পড়া থাকবে, তারা এই বই থেকে নতুন কিছুই পাবে না। বইয়ের ভাষা এবং লেখনরীতিও আমার মনঃপুত হয়নি। নিরপেক্ষতার অভাব রয়েছে। সব মিলিয়ে বইটা আমার আশা পূর্ণ করতে আসলে ব্যর্থই হয়েছে।
আমি হতাশ :3 নতুন কিছুই খুঁজে পেলাম না। মহাভারতটা পড়া থাকলে আর মহাভারতের চরিত্র বিশ্লেষণ পড়া থাকলে মনে হবে সেই চর্বিতচর্বণ গল্প ( চিন্তাগুলোও তেমন নতুন না) মহাভারতে কর্ণকে তো ট্র্যাজিক হিরো হিসেবে সবার ভালো লাগে কিন্তু আমার ভাল্লাগে দুর্যোধনরে। জলদাস সাহেবের এই বই নিয়ে আমার তাই এত প্রত্যাশা। দ্বৈপায়ন হ্রদের তলদেশ থেকে তুলে আনা নিয়ে শুরু হয় হরিশংকর জলদাসের দুর্যোধন। এরপর ধীরে ধীরে গোটা কাহিনিতে প্রবেশ করে পাঠক। লেখকের একলব্য পড়ে যেমন চমকে গিয়েছিলাম এই বইটা কিংবা শকুনিকে কেন্দ্র করে লেখা 'সেই আমি নই আমি' পড়ে তেমন চমক জাগানিয়া কিছুই পাইনি। আসলে একলব্য পড়ার পর হয়তো মহাভারত নিয়ে লেখকের উপর প্রত্যাশাটা একটু বেশিই ছিল। আর সেটা হয়নি বলেই এই হতাশা। :3
আর ইয়ে.. এতো হতাশার মধ্যে একটাই মন ভালো করার বিষয় হচ্ছে বইটা স্বয়ং :v প্রচ্ছদটা ধরলেই মন ভালো হয়ে যায়, পেজগুলাও ওয়াও টাইপ। এই ব্যাপারটা একটু ভাল্লাগসে।
যেকোনো নেগেটিভ চরিত্রের প্রতি আমাদের আপনা থেকেই আক্রোশ চলে আসে। মহাভারতের দুর্যোধনকে কে না চিনে। শকুনির পর কে সবচেয়ে বড় ভিলেন কে জিজ্ঞেস করলে হয়তো উত্তর দিতাম দুর্যোধন। কিন্তু মুদ্রার শুধু একপিঠ দেখার দিন গেছে। পান্ডবদের যুক্তিতে পড়া কিছুতে অবশ্যই তারা ঠিক হবে,এমনকি বেঠিকগুলোও ঠিক হবে,অন্যায়গুলোর অজুহাত থাকবে। চিন্তা করার ক্ষমতা একটু আধটু হওয়ার পর ভাবাতো ভীষ্মের অহমিকা আর পক্ষপাতকে সে ধর্মের দোহাই দিয়ে চালাতো না কী? আবার যুধিষ্ঠিরের পাশা খেলতেই হয়েছিলো কেনো? পাকা জুয়ার নেশাতে যখন সবকিছুর জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো-সেটাও সবাই কুরুদের শঠতার নাম দেয়। ওইটুকু বয়সে দুর্যোধনের মনে রাজা হওয়ার বাসনা!এই বাসনা তৈরি হলো কেন দুর্যোধনের মনে? আমার উত্তর আর লেখকের উত্তর মিলে যায় ধৃতরাষ্ট্র। অবশ্য ধৃতরাষ্ট্র এর সাথেও কি অন্যায় হয়নি?অন্ধ বলে তাকে অযোগ্য ধরে সিংহাসন দেয়া হলোনা। এর আক্রোশ একজনের মনে বিষ হতে সময় লাগেনা।ধরুন আপনার বাবার কিছু সম্পদ আছে,আপনারা দুজন। কোনো কারণে যদি আপনাকে ওই সম্পদের ভাগ থেকে বঞ্চিত করে আপনার ভাই,তবে তার প্রতি কেম৷ ভাব থাকবে আপনার? আপনার অধিকার নিয়ে নিলো,এমন মনে হবে না? আবার পাণ্ডুর পুত্রদের জন্ম নিয়ে এতোদিন জানতাম বরের কথা,সেটাও দেখি লেখক তার যুক্তি দিয়ে লিখেছেন। সত্যি বলতে মন মানিতে না চাইলেও ওটাই বেশি যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয়। আবা��� কুরু পাণ্ডবদের বিবাদের প্রথম উস্কানিদাতা বিদুরকে বলেছেন লেখক।যেটা এই লেখার দিক থেকে হোক বা মহাভারতে বিদুরের বিভিন্ন কাজে প্রকাশিত হয়�� অবশ্য যেহেতু আমরা অপরপক্ষকে খল বলে ধরেই নিয়েছিলাম,বিদুরের মন্ত্রনাগুলো পাণ্ডবদের হিতেই ধরে নিয়েছিলাম। তাই এতে কোনো খারাপ বিষয় চোখে পড়েনি। অনেকটা যারে দেখতে নারি,তার চলন বাঁকা এই মনোভাব। "কোনো কালে পৃথিবীর কোনো দেশে ক্ষমতাসীন রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করার চক্রান্ত হলে সেই রাজা চক্রান্তকারীকে বুকে জড়িয়ে আদর করে না।"
ক্ষমতা,লোভ,শঠতা এসবকে ধর্ম বলে চালিয়ে এসেছে মহাভারতের হিরোরা।কিন্তু মুদ্রার ওপিঠের গল্প শুনতে পেলে দেখা যায়-ও ক্ষমতার লড়াই ছিলো।স্বার্থপরতা,লোভ আর অহং-এর লড়াই ছিলো। কেউ কাউকে একটু ছাড় দিতে রাজি ছিলোনা।পথের পাঁচালীতে অপুর মনে হতো মহাভারতে যুদ্ধ কথাটা খুব কমই আছে। কিন্তু মহাভারতের কাহিনী নিয়ে যেকোনো কিছু পড়লে দেখা যায় যেনো বেশিই আছে।
দুর্যোধনকে কেন্দ্র করে মহাভারতের বিশেষ কিছু ঘটনাবলী নিয়ে লেখা হয়েছে বইটা। আসলে বইয়ের বেশিরভাগ ঘটনা আগে জানা থাকায় বইটা পড়ার সময় খুব একটা চমকাইনি। যাদের এ ঘটনাবলী বিষয়ক জানাশোনা কম তাদের হয়তো আরো ভালো লাগতে পারে বইটা।
কখনো দুর্যোধনের পয়েন্ট অফ ভিউ পড়া হয়নি। নতুন একটা দিক পড়ে ভালোই লেগেছে। যাদের হয়ত আগে থেকে মহাভারত পড়া তাদের কাছে চর্বিতচর্বণ এই গল্প। আমার ভালো লেগেছে।
**লেখক তাঁর বইতে যা লিখেছেন তার ওপর ভিত্তি করে রিভিউ করা হয়েছে। এখানে বর্ণিত ঘটনাবলি বর্ণনার দায় রিভিউদাতার নয়। আপনার যেকোনো গঠনমূলক মন্তব্য স্বাগতম।**
দুর্যোধনকে চিত্রিত করা হয় খলনায়ক হিসেবে। এই বইয়ে আমরা একটু ভিন্নরূপে জানতে পারব দুর্যোধনকে, তার কর্মকাণ্ডের জাস্টিফিকেশন করেছেন লেখক। বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর নতুন উত্তরাধিকার দেবার জন্য ঋষি ব্যাসদেবকে অনুরোধ করেন রাজমাতা সত্যবতী। তার অনুরোধে অম্বিকা, অম্বালিকা এবং এক দাসীর গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং বিদুরের জন্ম দেন ব্যাসদেব। ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ বিধায় বড় হয়েও সিংহাসনে বসতে পারে না, বসে পাণ্ডু। অন্যদিকে পাণ্ডু সন্তান জন্মদানে অক্ষম। লেখক বলেছেন, সন্তান জন্মদানের নিমিত্তে কুন্তীকে ক্ষেত্রজ পুত্র নিতে পরামর্শ দেন পাণ্ডু। ফলে দেবর বিদুরের ঔরসে জন্ম নেয় যুধিষ্ঠির (এতদিন জানতাম দেবতার বরে); বিদুর ধর্মাত্মা হিসেবে পরিচিত বিধায় যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র নামে পরিচিতি পায়। লেখক শুধু যুধিষ্ঠিরের পিতৃপরিচয় দিলেও বাকিদের দেয় নি। পাণ্ডুর বনে বাদাড়ে ঘোরার স্বভাব থাকায় ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানরা রাজপ্রাসাদে জন্মালেও পাণ্ডুপুত্রদের জন্ম জঙ্গলে। দুর্যোধন ও তার শত ভাইয়ের জন্ম নিয়ে প্রচলিত ধারণা হল— গান্ধারী গর্ভসঞ্চারের দুইবছর পর মাংসপিণ্ড প্রসব করে এবং তা থেকে শত পুত্রের জন্ম হয়। লেখক বিকল্পভাবে বলেছেন, আদতে শতপুত্র গান্ধারীর গর্ভজাত নয়। ধৃতরাষ্ট্র কামুক স্বভাবের, শতপুত্র মূলত তার উপপত্নীদের সন্তান। পাণ্ডুর মৃত্যুর পরে পাণ্ডুপুত্ররা হস্তিনাপুরের রাজপ্রাসাদে ফিরে আসে। তো তখনও তাদের মধ্যে সিংহাসনের চিন্তা প্রকট নয়। তবে তাদের মধ্যে বৈরিতা কীভাবে শুরু হল। এর কারণ হিসেবে লেখক দায়ি করেছেন বিদুরকে। বিদুর পাণ্ডুপুত্রদের মন্ত্রণা দিতে শুরু করেন কৌরবদের বিরুদ্ধে, তাদের স্বতন্ত্রভাবে পাণ্ডব নামে পরিচিত করান। যুধিষ্ঠিরের জন্ম জঙ্গলে, তার জন্মের সময়কাল অজানা, সে দুর্যোধনের বড় না ছোট তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বিদুর নিজে প্রচার চালিয়ে যায় যুধিষ্ঠিরকে দুর্যোধনের বড় হিসেবে, এবং এটি প্রতিষ্ঠা পায়। লেখক কৌরব-পাণ্ডবদের এই দ্বন্দ্বে পাণ্ডবদের মন্ত্রণাদাতা, তাদের মনে বিষ ঢোকানোর প্রধান ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন বিদুরকে। যুধিষ্ঠির যেহেতু দুর্যোধনের বড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তাই যথাসময়ে যুধিষ্ঠির যুবরাজ হয়। কিন্তু এরপরে ধৃতরাষ্ট্রকে সরিয়ে অবিলম্বে যেন যুধিষ্ঠিরকে রাজা হিসেবে অভিষেক করানো হয় এজন্য প্রচার চালানো শুরু করে বিদুর। যা কার্যত রাষ্ট্রদ্রোহের সামিল। এটা জানার পরে বিমূঢ় হয়ে যান ধৃতরাষ্ট্র এবং দুর্যোধন। দুর্যোধনের কিছু কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দিয়েছেন লেখক। যেমন জতুগৃহে পাণ্ডবদের পুড়িয়ে মারার ষড়যন্ত্রকে বিদুরের প্ররোচনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে দেখিয়েছেন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণকে প্রতিশোধ হিসেবে দেখিয়েছেন, দ্রৌপদী তাকে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজপ্রাসাদে অপমান করেছিল বলে ; কোনো কামনা বাসনা থেকে নয়। দুর্যোধনের অনেক দোষ থাকতে পারে। তবে লেখক দেখিয়েছেন সে বহুগামী নয়, স্ত্রী ভানুমতীকে নিয়েই তার সংসার। অন্যদিকে ধর্মের পরাকাষ্ঠা যুধিষ্ঠিরের চরিত্রের বেশ ভালো বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। অর্জুন দ্রোপদীকে জেতার পরে, যুধিষ্ঠির কেন কুন্তীকে বলে, এক রমণীয় পদার্থ নিয়ে এসেছি। আর কুন্তীও কেন তার বলা কথা ফেরত না নিয়ে পাঁচভাইয়ের মাঝে দ্রৌপদীকে ভাগ করে দেয়। দ্রৌপদীকে পদার্থ হিসেবে উপস্থাপনের মাধ্যমে যুধিষ্ঠিরের সুপ্ত কামনা ফুটে উঠেছিল, কুন্তীও তা বুঝতে পেরেছিল। তাই কামুক যুধিষ্ঠিরের কামনা মেটাতে কুন্তী পুত্রবধুকে পাঁচ ভাইয়ের মাঝে বণ্টন করে। আর দ্রৌপদী, যার গলায় মালা দিল, তার আগে তার ভাইয়ের সাথে সংসার করতে হল। যুধিষ্ঠির চাইলে পাশাখেলার আমন্ত্রণ নাকচ করতে পারত। কিন্তু লেখক বলেছেন, যুধিষ্ঠির ছিল পাক্কা জুয়াড়ি, সে নিজেকে ভারতবর্ষের সেরা পাশা খেলোয়াড় মনে করত। তাইতো দুর্যোধনের আমন্ত্রণ সে ফেরাতে পারেনি। সমস্ত কিছু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়ার পরে ভাই এবং স্ত্রীকে বাজি রাখে। ধৃতরাষ্ট্রকে সচরাচর পুত্রস্নেহে অন্ধ রাজা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। লেখক ধৃতরাষ্ট্রের চরিত্রেরও বিশ্লেষণ করেছেন। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র অন্ধ হওয়ার কারণে রাজা হতে পারেনি সে, পাণ্ডুর মৃত্যুর পরে ভারপ্রাপ্ত রাজা হিসেবে দায়িত্ব নেয় সে। নিজের পুত্রকে রাজা হিসেবে কে না দেখতে চায়। কিন্তু বিদুরের প্রচারণায় যুধিষ্ঠির জ্যেষ্ঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। যুধিষ্ঠিরকে যুবরাজ হিসেবে ঘোষণা করে ধৃতরাষ্ট্র। বিদুরের বিভিন্ন প্ররোচনা জানা সত্ত্বেও তাকে মহামন্ত্রী হিসেবে সভায় রাখে ধৃতরাষ্ট্র৷ পাণ্ডুপুত্ররা দ্রোপদীসহ ফিরে এলে তাদের রাজ্যের অর্ধেক দিয়ে দেয় ধৃতরাষ্ট্র। যুধিষ্ঠির দ্যূতক্রীড়ায় প্রথমবার সব হারানোর পরেও সবকিছু ফেরত দিয়ে দেয় ধৃতরাষ্ট্র। এমনকি কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থামানোর জন্য সঞ্জয়ের মাধ্যমে চেষ্টা চালিয়ে যায় ধৃতরাষ্ট্র। রাজা হিসেবে ধৃতরাষ্ট্র সকলের সাথে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নিতেন, ভ্রাতুষ্পুত্র হিসেবে পাণ্ডবদের যথেষ্ট স্নেহ করতেন। কুরুক্ষেত্রের এই যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী করার পেছনে দুর্যোধন যেমন কারণ, তেমনি কৃষ্ণের ইচ্ছাকেও কারণ হিসেবে বলেছেন লেখক। কেন কৃষ্ণের এত আগ্রহ ছিল এই যুদ্ধের পেছনে। লেখক বলেছেন, ধৃতরাষ্ট্রের শাসনে সবাই সমান অধিকার ভোগ করত। দুর্যোধনও তাই করত। এই ব্যবস্থা তুলে বর্ণবাদী একটা সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের উদ্দেশ্য। কৃষ্ণকে লেখক বলেছেন খল, প্রতারক। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পরতে পরতে কৃষ্ণ প্রতারণা করেছে। মহাবীর ভীষ্মের শরশয্যা, অস্ত্রগুরু দ্রোণের হত্যা, মহাবীর কর্ণের হত্যা, দুর্যোধনের হত্যা সবকিছুতেই ছলনার আশ্রয় নেয়া হয়েছে এবং মূল ইন্ধনদাতা কৃষ্ণ। সেজন্য অস্ত্র শস্ত্র যোদ্ধায় অনেকগুণ শক্তিশালী হওয়ার পরেও পরাজিত হয় দুর্যোধন। এ কেমন ধর্মযুদ্ধ, যেখানে জেতার জন্য ক্ষণে ক্ষণে শঠতার আশ্রয় নিতে হয়। দুর্যোধন নিজে মহাবীর হয়েও, এত মহারথীরা তার পক্ষে থাকার পরেও যুদ্ধে হেরে যায়। এসব মহারথীরা তার হয়ে যুদ্ধ করলেও সুবিধা করে দিয়েছে পাণ্ডবদেরই৷ পিতামহ ভীষ্ম পাণ্ডবসেনা মারলেও কোনো পাণ্ডবের গায়ে হাত দেননি, তিনি যতদিন রণক্ষেত্রে ছিলেন কর্ণকে যুদ্ধ করতে দেননি। অস্ত্রগুরু দ্রোণও একই পথে হেঁটেছেন। প্রকৃতপক্ষে পাণ্ডবদের ছল এবং নিজ পক্ষের যোদ্ধাদের এরকম বিশ্বাসঘাতকরার কারণেই পরাজয় হয় দুর্যোধনের। লেখক একট চরিত্র নিয়ে তেমন কিছুই বলেননি, সেটি হচ্ছে শকুনি৷ শকুনি দুর্যোধনের জীবনে এক বড় প্রভাব রাখলেও এই চরিত্রকে একেবারে নিষ্প্রভ রেখেছেন লেখক। বইয়ের পেছনে লেখা ছিল, দুর্যোধন আপনাকে বিভোর করবে। মহাভারতের প্রতি আগ্রহ আমার অনেক আগের। যারা মহাভারত সম্পর্কে আগ্রহী, মহাভারতকে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে এক নতুন দ্বার খুলে দেবে দুর্যোধন। লেখকের লেখনশৈলী চমৎকার, আমার প্রিয় একজন লেখক। বইয়ের প্রোডাকশন চমৎকার, পুরাই মাখন। শুধু প্রোডাকশনের দিকেই প্রকাশনী নজর দেয়নি, সম্পাদনা ভালো। তেমন কোনো বানান ভুল নেই, যা পড়ায় স্বস্তি এনে দিয়েছে৷ ছাপার ফন্টগুলো একটু ছোট। দুর্যোধন নামটির লেটারিং সুন্দর লেগেছে।
আমার মতে হরিশংকর জলদাস এর লিখার সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো খুব কঠিন জিনিসকে সহজ,সাবলীল ও বোধগম্য ভাবে উপস্থাপন করা! এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। যারা মনে করেন মহাভারতের বিষয়বস্তু মানেই দাঁত ভাঙ্গা কিছু তাদের চিন্তাকে ভুল প্রমাণ করতেই হয়তো এই বইটির প্রকাশ! অসাধারণ!