ছোটবেলায় অনেক ভয় পেতাম। আলিফ লায়লা দেখে ভয়ে মূর্ছা যেতাম। গ্রামেগঞ্জে লোকমুখে নানান ভূত-প্রেতের গল্প শুনতাম, এসব শুনে রাত্রিবেলা একা একা কোথাও যাওয়ার সাহসই হতো না। এরপর হরর মুভি, বই এসবের যুগ এলো। যা দেখতাম বা পড়তাম, পরে মনে হতো আমার চারপাশেও এসব আছে।
আমি জানি এটা শুধু আমার অভিজ্ঞতা নয়, আরও অনেকের অভিজ্ঞতা। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো আমার এই চরম ভয়ের অনুভূতি রীতিমতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল ইসলামি আকিদা অধ্যয়নের সময়। এরপর প্রকাশক হয়ে আমি শাইখ উমর আল আশকারের ‘জিন ও শয়তানের জগৎ’ নামের একটা বইয়ের কাজ করি। এই বইটা আমার ভয়ের জগতটা একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল।
এটা কীভাবে হলো? আমাদের যে ভয়ের উৎস, এটা মূলত অদৃশ্য জগত নিয়ে আমাদের অজ্ঞতার কারণে। আমরা মানুষের মুখে, মুভিতে, বইয়ে যা শুনছি, দেখছি বা পড়ছি এসব অবচেতন মনে সত্য বলে ধরে নিচ্ছি। কারণ এসবকে কাউন্টার করার মতো কোনো ‘ইনফরমেশন’ আমাদের মস্তিষ্কে নেই। ফলে মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত একটা ভয়ের অনুভূতি তৈরি করে যাচ্ছে। অন্ধকার কোথাও গেলে গা ভারি হয়ে আসে, আয়নার সামনে দাঁড়ালে মনে হয় এখনই একটা ভয়ংকর চেহারা দেখা যাবে, একা থাকলে মনে হচ্ছে পাশের রুমে কেউ একজন আছে।
কিন্তু আপনি যখন জানবেন এসব নানান কিচ্ছাকাহিনীর আদতে কোনো সত্যতা নেই, আপনি যখন জানবেন অদৃশ্য জগতে কেবল একটি প্রজাতিরই অস্তিত্ব আছে, সেটা হলো জিন, আপনি যখন সেই জিন প্রজাতির সম্পর্কে সবকিছু জানবেন, তারা কী কী করতে পারে, তাদের শক্তি কী, দুর্বলতা কী, তাদের খারাবি থেকে কীভাবে বাঁচা যাবে, কী করলে তারা ধারেকাছেও আসতে পারবে না… তখন মূলত আপনি ঐ ভয়ের জগতটাতে নিজের কন্ট্রোল আনতে পারবেন। আপনার ভয়কে আপনি নিজেই দূর করতে পারবেন।
এই বইটার উদ্দেশ্য ছিল পাঠককে আমাদের সেই ভয়ের জগত সম্পর্কে “ইনফরমেশন” দেওয়া। তবে সেই ইনফরমেশন আমরা ইনফরমেশনের মতো না দিয়ে একটু ভিন্নভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বইতে দুইটা পার্ট আছে। প্রথম পর্বে আমরা কিছু প্যারানরমাল ঘটনা উল্লেখ করেছি। দ্বিতীয় পর্ব মূলত ইউকের একজন রাকী, আবু ইবরাহিম হুসনাইন এর ‘ডায়েরিজ অফ এন এক্সরসিস্ট’ এর অনুবাদ। এখানে রাকী হিসেবে তিনি তার বিভিন্ন কেস স্টাডি বর্ণনা করেছেন। রুকইয়ার নানান ঘটনা, কী কী সমস্যার মধ্য দিয়ে তিনি গিয়েছেন, এসব ঘটনা কেন ঘটেছিল ইত্যাদি। সাথে এমন পরিস্থিতি থেকে বাচার জন্য আমাদের কী করা উচিত, কী ভুলের কারণে মানুষ এমন বিপদে পড়তে পারে ইত্যাদি বিষয়ে তিনি নানান তথ্যও শেয়ার করেছেন। আর শেষে আমরা একটি ছোট্ট পরিচ্ছেদ রেখেছি, যার উদ্দেশ্য অদৃশ্য জগত নিয়ে মুসলিমদের আকিদা- বিশ্বাস কী, এটা স্পষ্ট করা। আশা করি বইটি থেকে আপনারা অনেককিছু শিখতে পারবেন, নানান বিষয়ে অনেক ইন্টারেস্টিং ঘটনা এবং ঘটনার পেছনের ঘটনা জানতে পারবেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন, ভয়ের জগতটা জয় করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।
বইয়ের নাম “হালাল হরর স্টোরিজ” নিয়ে দুএকজন আপত্তি জানিয়েছিলেন। আসলে এই টপিকে এরকম বই আগে কখনও হয়নি, আমরা নামটাকে ইন্টারেস্টিং করতে চেয়েছিলাম। নামটা নিয়ে আমরা নিজেরাও পুরোপুরি স্বস্তি পেয়েছি এরকম না। কিন্তু শুরু থেকেই এই নামেই বইটার প্রচার হয়েছে, তাই শেষ মুহূর্তে আর নাম চেঞ্জ করার চিন্তা করিনি। আশা করি এটা খুব বড় কোনো বিষয় নয়।
বইটি পড়ে বেশ ভালো লেগেছে। রুকইয়া, ঝাঁড়ফুক, শয়তানী চক্রান্ত, জ্বিনদের বিষয়ে অনেক অজানা বিষয় জানা হলো। সবচেয়ে ভালো লেগেছে যে, এসব রুকইয়া করতে উনি কুরআন-সুন্নাহকে গুরুত্ব দিয়েছেন। ভন্ড রাক্বীদের চেনারও উপায় বলে দিয়েছেন। তাওহীদ, শিরক প্রভৃতি বিষয়গুলোও তুলে ধরেছেন।
সত্যি বলতে নাম দেখে অনেকটা ঠাট্টা-তামাশার ছলেই বইটি কিনেছিলাম। কিন্তু পড়া শেষ করে বুঝতে পারলাম, কতটা দারুন এই বইটা। মূলত, ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাজানো ও জিন বিষয়ক অনেক সমস্যা ও তার সমাধান নিয়ে বইটি সাজানো।
হরর আমাদের অনেকেরই প্রিয় জনরা, (আমার না)। সাধারণত হরর বইগুলো আমাদের কাউকে ভয় পাইয়ে দেয় আবার কাউকে অ্যাডভেঞ্চারাস ফিল করায়। তবে এই বইটা সেইসব দিক থেকে সম্পুর্ণই আলাদা। আমার হরর জনরা বা ভুত প্রেতের প্রতি আগ্রহ না থাকলেও জ্বীনের প্রতি প্রবল আগ্রহ রয়েছে। সেই আগ্রহের থেকেই বইটি পড়া। বইটি আর ৫টি সাধারণ হরর বই থেকে আলাদা! আর সব হরর বই যেখানে পাঠককে ভয় পাওয়ায় মস্তিস্কে ডোপামিনের প্রবাহ বাড়ায়, সেখানে এই বইটি জ্বীন সম্পর্কে বলে। বইটি ২টি ভাগে বিভক্ত।
১ম ভাগে জ্বীন ঘটিত কিছু সত্যিকারের কেস রয়েছে।
আর ২য় ভাগে রয়েছে কীভাবে জ্বীনদের হাত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা যায়, জ্বীনে ধরলে কী করণীয় এইসব।
এবার আসি বইটির লেখনী সম্পর্কে। আসলে লেখক ১ম খন্ডে যেই গল্পগুলো বলেছেন সেগুলো তিনি ইন্টারনেট থেকে নিয়ে অনুবাদ করেছেন। আর ২য় খন্ডের পুরোটাই অন্য ১টি বইইয়ের অনুবাদ। সেদিক থেকে চিন্তা করলে এটা ১টা অনুবাদ বইও বলা যায়। অনুবাদ যথেষ্ঠ ভালো ছিলো। যদিও আমার পার্সনালি আম খন্ডের চাইতে ২য় খন্ড বেশি ভালো লেগেছে কারণ এখানে জ্বীনে ধরলে বা বদ নজরে কী করণীয় তার অনেক কিছুই বলা আছে।
তাই যাদের এইসব জ্বীন বা বদনজর ঘটিত সমস্যা আছে তাদের বইটি অবশ্যই পড়া উচিত।