যে দেশের অস্তিত্ব আদৌ নেই, এ গল্প সেই আশ্চর্য সুন্দর ভার্চুয়াল ভূখণ্ডের গল্প। গেমিং ওয়ার্ল্ডের কাহিনী। ‘খেলাঘর’ সেই মায়া দুনিয়ার আখ্যান যেখানে রূপকথার চরিত্রে অভিনয় করেন আমাদের মতন অতি সাধারন রক্ত মাংসের গদ্যময় মানুষেরা। দল বাঁধেন, লড়াই করেন, ভালোবাসেন, উদযাপনে ভাসেন। বাঁচেন আবার মরেনও। সবকিছুই তাঁদের কাছে- ‘খেলা’- অথচ এমন খেলার উত্তেজনার মধ্যেও লুকিয়ে থাকে অন্য এক ভিন্নধর্মী সমান্তরাল গল্পগুচ্ছ। বাংলার প্রথম ভিডিয়ো গেম ভিত্তিক সুবৃহৎ ফ্যান্টাসি উপন্যাস ‘খেলাঘর’।
"তুমি আর আমি শুধু, জীবনের খেলাঘর, হাসি আর কান্নায় দুলব, যত ব্যথা জীবনের, ভুলব!" এমন স্বপ্ন বোধহয় আমরা প্রত্যেকেই দেখি, তাই না? সঙ্গে থাকুক স্বজন, ব্যস! জীবনের খেলাঘর তাই দিয়েই সাজিয়ে তুলব আমরা। এই স্বপ্ন আর চারপাশের বাস্তব কিন্তু মেলে না। গরমিলে অস্থির আমরা তাই গড়ে নিতে চাই একান্ত নিজস্ব খেলাঘর। আমরা ডুব দিই গেমের দুনিয়ায়! এই উপন্যাসের প্রায় সবটুকুই গেমের ভেতরে ঘটেছে৷ সেখানেই জন্মেছে আর মরেছে অনেক স্বপ্ন, অনেক আশা। উজ্জ্বল হয়েও জ্বলেপুড়ে খাক হয়েছে রঙ। ভেঙে চুরমার হয়েছে পৃথিবী। নিঃশেষিত হয়েছে 'জীবন'। তখন, মুহূর্তের জন্য বেরিয়ে এসেছি আমরা গেম থেকে। শুধু গল্পের নায়ক নয়, আমাদের সবার হাতেই এক অপ্রত্যাশিত লাইফলাইন গুঁজে দিয়েছেন স্রষ্টা। শুরু হয়েছে এক নতুন খেলা... নাকি জীবন? রনিনের 'আলোহান' থেকে একেবারেই অন্যরকম, বেশ কিছুটা অসরলরৈখিক ফ্যান্টাসি হিসেবেই পরিবেশিত হয়েছে এই উপন্যাসটি। এর তিনটি বিষয় বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেগুলো হল~ ১) এর ভাষা, কিছু সমকালীন রুক্ষতা নিয়েও, অত্যন্ত সুললিত— প্রায় কাব্যিক, বা গীতিময়। ২) সুমিত বর্ধন 'নক্ষত্রপথিক' উপন্যাসে রাবীন্দ্রিক সৃষ্টি একেবারে মন্থন করে নামকরণ করেছিলেন নানা ব্যক্তি, বস্তু ও ঘটনার। প্রায় সেভাবেই এই উপন্যাস আদ্যন্ত জারিত হয়েছে রবীন্দ্র-রচনায়। তার কারণটিও জানিয়েছেন রনিন। তিনি স্বপ্ন দেখেন, কোনো একদিন এমনই বিশুদ্ধ বাঙালি ভাব ও ভাষা নিয়ে গড়ে উঠবে গেমিঙের কোনো এক খেলাঘর। ৩) শুধুমাত্র নিয়মের নিগড়ে আবদ্ধ ঝুঁকি আর জীবনের খেলা নয়, এই উপন্যাসের ছত্রে-ছত্রে আছে দর্শন আর জীবনবোধ। খেলা আর জীবনকে বারবার মিশিয়ে দিয়েছে তারা। মনে হয়েছে, যেন বইয়ের বাইরে আমাদের জীবনের খেলাঘরেও চলছে কান্নাহাসির দোলদোলানি। ভারি চমৎকার, ভারি ব্যতিক্রমী লেখা। যদি কল্পগল্প তথা ফ্যান্টাসির অনুরাগী হন, তাহলে এই বইটি আপনার ভালো লাগবে বলেই আমার ধারণা। বইটির ছাপা ও বাঁধাই অসাধারণ। সঙ্গে আছে একটি আস্ত গেম খেলার আয়ুধও। এমন করে কি বাংলায় আগে কোনো বই হয়েছে? মনে তো পড়ে না। আসুন। খেলাঘর আপনাকে স্বাগত জানায়।
ইউরেনিয়ার জগতে আকাশপ্রদীপের মঞ্চে ছয়টি সংঘ। এরমধ্যে ঘোরতর প্রতিদ্বন্দ্বী সিংহনাদ আর ছায়াপথ। সব রকম খেলাতেই পর্যুদস্ত ছায়াপথ একদিন পায় নতুন এক খেলোয়াড়কে, বিহান। বিহানের সাথে জড়িয়ে পড়ে আলফা, কার্ক, দারক, নিনা, দিয়া, নিকি, ব্লেজ ছায়াপথের সঙ্গীরা। শুরু হয় তার জয়যাত্রা। তবে শুধু খেলা নয়, নিজের পরিচিতি নয়, এই খেলাঘর আসর কখন যেনো বাস্তব জীবনের থেকে অনেক বড় হয়ে ওঠে বিহানের কাছে, ছায়াপথ এর বাকি সভ্যদের কাছেও।
অবশেষে জয়ী হয় ছায়াপথ, কিন্তু হারিয়ে যায় বিহান।
বিহান ফিরে আসে গল্পে, তবে অন্যভাবে।
ফ্যান্টাসি নিয়ে লেখা পড়লেও, খেলাঘর গেম ফ্যান্টাসি সম্বন্ধে প্রথম ভার্চুয়াল জগতের এক সুদীর্ঘ সাহিত্য আমার কাছে। লেখার ধরন খুবই ওপরের স্তরের। ফ্যান্টাসি লেখাতে অনেকসময় সাহিত্য বাদ পড়ে যায়, এই বইটি সম্পূর্ণ বিপরীত।
Multiplayer Role Playing Game র আনাচে কানাচে ঘুরে আসতে চাইলে বইটি সুখপাঠ্য।
এ এক অদ্ভুত বই। সত্যি বলতে রনিনের লেখা সম্ভবত সেরা বইগুলোর একটা। একটা আস্ত গেমিং ইউনিভার্সের ওপর নির্ভর করে এরকম কিছু একটা তৈরি করা যেতে পারে, সেটা খেলাঘর না পড়লে বোঝা যাবে না। শুরুটা একটু মন্থর হলেও গল্পের মধ্যভাগ অসম্ভব গতিপূর্ন। আর ক্লাইম্যাক্স? কাঁদিয়ে দেবে! এই রূপকথার রাজ্যের বাসিন্দাদের আসল সত্যিটা বুকে একটা ধাক্কা দেবেই। ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং যে কী কঠিন কাজ সেটা আমি নিজে ফ্যান্টাসি গল্প একটু আধটু লিখি বলেই জানি। এখানে রনিন দা সেটা খুব ভালোভাবেই করেছেন। যদিও একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এরপরের এডিশনে আমি বলব ইউরেনিয়ার একটা ম্যাপ দিতে। আর বেশ কিছু ইলাস্ট্রেশন। আমি না হয় কল্পনা করে নিলাম কিন্তু বাকিরা সেটা কতটা পারবে আমার সন্দেহ আছে। যাই হোক, এই বই যারা ফ্যান্টাসি পছন্দ করে, তাদের ভালো লাগতে বাধ্য, এটা আমি বলতেই পারি। ব্যস এটুকুই বলা।
যে জগতে বাঁচি, তার থেকে পালাতে ইচ্ছে করে না কখনো কখনো? আমার তো করে। খুব করে। আর আমি জানি শুধু আমার নয়, সবারই করে… সেই ইচ্ছে থেকেই লোকে ডুব দেয় বইয়ের পাতায়, সিনেমা আর সিরিজের দৃশ্যপটে, গেমিং-এর আঙিনায়। এক অন্য ভুবনের মায়ায় মজে থাকার মধ্যে তো শুধুই উদ্দেশ্যহীন আনন্দ নেই, নিরাময়ও আছে। জীবন দফায় দফায় যে প্রহারগুলো করে থাকে, মনের সেই আঘাতগুলোর উপর শুশ্রূষা আছে। সেই শুশ্রূষার খোঁজেই এ গল্পের নায়ক, গল্পে যার নাম ‘বিহান’, পালিয়ে গেছিল এক কল্পজগতে যার নাম ‘ইউরেনিয়া’। সেই আশ্চর্য জগতে সে নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে হাতে পায় নতুন নতুন অস্ত্র, মুখোমুখি হয় নিত্যনতুন বিপদের। এ এক নব্য রূপকথা, যা কিছুদূর পড়ার পর এ যুগের মাল্টিপ্লেয়ার গেমিং সম্বন্ধে অবগত লোকে বুঝে যাবে তারা কোন জগতের গল্প শুনছে। যারা অবগত নয় তাদের জন্য সুন্দর করে টিপ্পনী দেওয়া আছে বইয়ের শেষে, কিন্তু বলি কী, ওসব পরে দেখলেও চলবে। শুরু থেকেই ইউরেনিয়ায় উত্তেজনার পর উত্তেজনা ঘটছে, লড়াই চলছে রক্তক্ষয়ী, অ্যাডভেঞ্চারের শিহরন কাঁপিয়ে দিচ্ছে পাঠককে। পাতার পর পাতা উলটে যাচ্ছে ‘তারপর কী হল’ ভাবতে ভাবতে… বিহানের সঙ্গে সঙ্গে ছায়াপথের কার্ক, দারক, ছোট্ট মেয়ে নিনা… এরকম আরো কত চরিত্র জীবন্ত হয়ে উঠছে, এমনকী ভাইপার বা লর্ডের মতো খলচরিত্ররাও…আর ততক্ষণে টের পাওয়ার আগেই পাঠক বিহানের সঙ্গে, ছায়াপথের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বসে আছে। কিন্তু দাঁড়ান। গল্পটা কিন্তু শুধুই এই টানটান দৌড়ের নয়। হিংসা যুদ্ধ কৌশল ভয় – অলৌকিক সব জীব, ভয়াল দানব আর কঠিন শক্তিপরীক্ষা – এই সব টানাপোড়েনের ভাঁজে ভাঁজে লেখক আসল গল্পটা বুনে দিয়েছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। সে গল্প … জীবনের সবচেয়ে দুর্মূল্য জিনিসের যার নাম সম্পর্ক। আসল গল্পটা বন্ধুত্বের, আসল গল্পটা হাতে হাত থাকার, আসল গল্পটা একাকিত্ব-নাশের। গল্প পাতায় পাতায় এগোয়, বিহানের চোখ দিয়ে ইউরেনিয়ার অজস্র বিস্ময় পাঠকের সামনে উন্মোচিত হয়, আর তার সঙ্গেই যেভাবে এই চরিত্রগুলির মধ্যে গড়ে ওঠে এক নিবিড় বন্ধন - তা একটি আদ্যোপান্ত নিটোল রূপকথা। যে রূপকথা শোনার অভ্যাস মানুষের সেই কোন প্রাচীন যুগ থেকে – সে রাজদরবারে চারণকবির কণ্ঠেই হোক, কি সরাইয়ের আগুন ঘিরে বসা পথিকদলের মুখে… ঘুমোনোর আগে ঠাকুরমার ঝুলির গল্পে অথবা ডিজনির পর্দায়। সে রূপকথা শোনার খিদে অভিজ্ঞতার ঝুলি ভরে বিজ্ঞজন হয়ে যাওয়া মানুষের মধ্যেও কিছুমাত্র কম না। তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ লেখার মধ্যেও সারল্যধারণের এক আশ্চর্য ক্ষমতা আছে রনিনের, যা আগেও তাঁর অন্যান্য ফ্যান্টাসি বইতে পেয়েছি- সেই সারল্��� আর যে অবিরাম সৌন্দর্য তিনি গড়ে তুলেছেন এখানে পাতায় পাতায়, বর্ণনায়, টুকরো কবিতার লাইনে… তা পাঠককে স্পর্শ করতে বাধ্য। আসলে আমরা তো জীবনের জটিলতা থেকে পালিয়ে ডুব দেওয়ার জন্য এক সহজসুন্দর জগতই খুঁজি! এটুকু বললে যদিও বইটা নিয়ে সব বলা হয় না। প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্ব পেরিয়ে যখন শেষ অধ্যায়ে যাই – ব্যক্তিগত ভাবে এই অংশটি আমার সবচেয়ে শক্তিশালী লেগেছে – তখন আচমকা, প্রস্তুত হবার সুযোগ না দিয়েই সুর বদলায়। যে বাস্তবকে ঘোর অস্বীকার করে এতক্ষণ ইউরেনিয়ায় বিচরণ করছিল পাঠক, সেই বাস্তবতার মাটিতে দাঁড়িয়ে আবারও রূপকথার খেই ধরে নিয়েছেন রনিন, অল্প সময়ে, অল্প আয়াসে। যে রূপকথার শেষ… নাহ্, স্পয়লার দেব না। কিন্তু পড়তে পড়তে আবেগে পাঠকের চোখ ভিজে উঠলে আমায় দোষ দেবেন না। জীবন তো শেষ অবধি খেলাঘর বাঁধা-ই… বইটি বৃহৎ, ৩৮০ পাতার। সুমুদ্রিত, সুন্দর কভার, চমৎকার ফন্ট সাইজ। এগুলো অবশ্য কল্পবিশ্বের বইয়ের জন্য বলা বাহুল্য, যাইহোক। শুধু মধ্যে মধ্যে একটু করে ছবি থাকলে বড়ো খুশি হতুম। নেহাত ফ্যান্টাসিবিরোধী মানুষ না হলে বইটা পড়ে ফেলুন। মনের শুশ্রূষা খুঁজে পাবেন। --- বই – খেলাঘর লেখক – রনিন প্রকাশক – কল্পবিশ্ব মুদ্রিত মূল্য - ৪৯৯