পাঁচশো বছর পরেও এত ধোঁয়াশা কেন এবং বিপদ কেন? এটাই তো সবচেয়ে বড়ো রহস্য। পাঁচশো বছর অতিক্রান্ত তাই এখন আর কোনো ভয় কিংবা বিপত্তিকে মাথায় না রেখে আগামী প্রজন্মকে মহাপ্রভুর অন্তর্ধান বিষয়ে সঠিক পথে অগ্রসর হওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়াস এই গ্রন্থ। সেইহেতু চৈতন্য মহাপ্রভুর অন্তর্ধানের কারণগুলিকেই যুক্তিনিষ্ঠভাবে প্রবন্ধ আকারে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এখানে।
১৯৮২ সালের ৯ এপ্রিল জন্ম। লেখিকা গবেষনাধর্মী লেখা লিখতে ভালোবাসেন। লেখালেখির পাশাপাশি নাট্য পরিচালনা এবং অনু-চলচ্চিত্র তৈরি করেন। লেখিকার নিজস্ব একটি নাটকের দল আছে, যার নাম 'অরাম নাটুয়া'। তিনি দীর্ঘদিন ধরে পথ শিশুদের নিয়ে কাজ করেছেন। লেখিকার বিভিন্ন গ্রন্থের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় গ্রন্থ 'লাল চিনার পাতা', 'সেথায় চরণ পড়ে তোমার', 'বিস্মৃতির দর্পনে বিশ্বরূপ', '১৯৩৭ নানকিং', 'মীরা', '১৯৮৪ সর্দার গদ্দার হে', 'ভাঙা শিকারা', 'ধর্ষণের সেকাল ও একাল'।
শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান নিয়ে সম্প্রতি বাংলায় যে পরিমাণে লেখালেখি হয়েছে, তাঁর জীবন ও আদর্শ নিয়ে তার শতাংশও হয়নি। আলোচ্য বইটিও চৈতন্যের অন্তর্ধান নিয়ে লেখা সেই তালিকায় নবতম সংযোজন। একটি সংক্ষিপ্ত 'ভূমিকা'-র পর এই বইয়ে আলোচনা বিন্যস্ত হয়েছে নিম্নলিখিত ক'টি অধ্যায়ে~ ১. খুঁজি তোমার চরণ চিহ্ন; ২. গেরুয়া বসনধারী সেই রহস্যময় বাবাজি; ৩. যাঁরা তাঁকে ঈশ্বরের আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন; ৪. 'টাইমস অফ ইন্ডিয়া'-র রিপোর্ট; ৫. ভ্রান্ত ধারণা; ৬. রাধাতন্ত্র এবং রঘুরাজপুর রহস্য; ৭. দুটি চক্র একটি বৃত্ত; ৮. কে এই জগন্নাথ? ৯. চক্রব্যূহ; ১০. অন্তর্ধানের পরও তাঁকে বিভিন্ন স্থানে দেখা গেছে; ১১. জালালপুর গ্রামের সেই রহস্যময় মন্দির; ১২. তিনি কি উড়িষ্যা ত্যাগ করতে পেরেছিলেন? ১৩. মাধবের 'বৈষ্ণব লীলামৃত' ও 'চৈতন্য বিলাস'— তাঁর শেষ পরিণতি; ১৪. উৎকল থেকে বঙ্গদেশ; ১৫. ব্রহ্ম পদার্থ। লেখাটি একসময় ধারাবাহিক আকারে প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল, কিন্তু নানা কারণে সেই পরিকল্পনা স্থগিত করে বই আকারেই সবটা প্রকাশ করেন লেখক। মুশকিল হল, বইটা পড়তে গিয়ে বোঝা যায়, এই বিষয়ের ৯৯.৯৯% বইয়ের মতো এটিরও মূল লক্ষ্য আসলে সত্যের সন্ধান নয়; বরং 'সত্য' বা 'একমাত্র সত্য' হিসেবে নিজের আবেগকে স্বীকৃতির বেদিতে প্রতিষ্ঠাই এই বইয়ের উদ্দেশ্য। একেবারে শুরুতেই ধরে নেওয়া হয়েছে যে শ্রীচৈতন্য নিহত হয়েছিলেন। তারপর শুরু হয়েছে তাঁর সম্ভাব্য খুনিদের ও হত্যার স্থান অনুসন্ধানের প্রকল্প। তার জন্য বাছাই কিছু কথাকে তুলে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন সূত্র থেকে। বলা হয়েছে, অতীতে নাকি বিভিন্ন সূত্রকে বিকৃত করা হয়েছে সত্য গোপনের উদ্দেশ্যে; অথচ সেই সূত্রগুলোকেই ব্যবহার করা হয়েছে 'হত্যা'-তত্ত্বের পক্ষে যুক্তি হিসেবে! আবার, এই বইয়েরই একেবারে শেষ অধ্যায়ে এমন একখানা ফ্যান্টাসি ফাঁদা হয়েছে যা বইটির সম্পূর্ণ বক্তব্যকেই নস্যাৎ করে দিয়েছে! লেখক গবেষণায় কোনো কমতি রাখেননি; শুধু সিদ্ধান্তগুলো নেওয়ার সময় বস্তুনিষ্ঠার বদলে আবেগকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন— যেমনটি প্রায় সবাই করে থাকেন আজকাল। বাংলা সাহিত্যে শ্রীচৈতন্যের অন্তর্ধান (বা গুপ্তহত্যা-রহস্য) একটি কুটির শিল্পের জায়গা নিয়েছে। এই নিয়ে কাসুন্দি আর না ঘেঁটে, বরং মানুষটির বৃহৎ ও অতুলনীয় বিপ্লবটি কেন ব্যর্থ হল এবং কীভাবে তাঁর সেই সমাজভাবনাটিকে পুনরুজ্জীবিত করা যায়— সেই নিয়ে কাজ হওয়াটাই বোধহয় এখন বেশি জরুরি। ভরসা রাখি, আগামী দিনে নবীন গবেষকেরা সেই লক্ষ্যে নিবেদিত হবেন।