বাংলা সাহিত্যে গোয়েন্দা গল্পের ব্যাপ্তি ও পরিসর সত্যিই এক মহাবিশ্ব সম। প্রতি বছরই একগুচ্ছ আনকোরা টিকটিকির আগমন ঘটে বইমহলে। তারা কেউ কেউ আবার হারকিউলিইয়ান মাইন্ডসেটের অধিকারী, আবার কেউ বাঙালিদের বহুল পরিচিত ঘরোয়া দাদা, কাকা বা মাসী সমগোত্রীয়। একটু খুঁজে দেখলে আবার ডার্ক চকোলেটপ্রেমী দুএকজন আর্মচেয়ার ডিটেকটিভও পেলে পেয়ে যেতেই পারেন। তাই বলছি, মার্কেট যাকে বলে হাইলি স্যাচুরেটেড। সমাদর ও তিরস্কারের মাঝে, to each their own.
এইখানে আপনি জিজ্ঞেস করবেন, এতো ভিড়ের মাঝে সুব্রত শর্মার গপ্পো আমি পড়ব কেন? তার বৈশিষ্ট্য কি? আমি বলবো, কিস্যু না। আপনি যাবেন চমকে। বলবেন, সেকি? গোয়েন্দার কোনো ইউ-এস-পি থাকবে না? নেহাত সাড়ে ছ-ফুট উচ্চতা, একটা ঝা চকচকে বন্দুক, একটা দারুন সিনেমাটিক প্রেমিকা, দুটো নির্ভেজাল কিশোর স্যাটেলাইট? কিছুই না? আমি বলবো, না স্যার। সুব্রত শর্মা, এই আমার আপনার মতই একজন ভীষণ অগোছালো মধ্যবিত্ত মানুষ। গোয়েন্দাগীরি তার নেশা নয়। পেটের দায়ে এলিয়ট রোডের এক সস্তা ঘুপচি গোয়েন্দা এজেন্সিতে, সে ড্যানি ব্যানার্জীর কর্মাধীন মাত্র। যেখানকার বিশেষত্ব, কালেভদ্রে মক্কেল এবং আরও দেরিতে মাস মাইনে।
উনচল্লিশের ব্যাচেলর সুব্রত-র একঘেঁয়ে ডিমের কারি ও সস্তার রাম সিক্ত জীবন আচমকাই বদলে যায়, তার জ্ঞানপাপী নিয়োগকর্তার আকস্মিক মৃত্যুতে। নিটফল, তার এই নোংরা, অন্ধকার জগতের মাঝে ক্রমশই কুক্ষিগত হওয়া, এবং সত্যের প্রতি তৈরি হওয়া এক তীব্র আসক্তি। তার চোখের জল, তার অদ্ভুত সহমর্মিতা, সুন্দরী নারীদের প্রতি খানিক দুর্বলতা, আবার তার ভীষণ ড্রাই হিউমার। কোথাও গিয়ে সুব্রতকে করে তোলে ভীষণ স্বতন্ত্র।
মানছি, টেমপ্লেটটা চেনা। মার্কিন গোয়েন্দারা ষাট বছর আগেই এই ধূসর পৃথিবীর হদিস আমাদের দিয়ে গেছে। কলমের কালিতে, সিনেমার সাদা-কালো প্রতারণায়, স্যাম স্পেড, ফিলিপ মারলো, ডিক ট্রেসিরা আমাদের অনেকেরই চেনা এবং পছন্দের। কিন্তু সুব্রত শর্মার কাছে এরা সবাই এক জায়গায় পরাজিত। এবং সেটা, বাঙালিয়ানায়। ঠিকই পড়েছেন। ঠিক মাছে ভাতে না হলেও, একজন বাঙালি সংস্থার টিকটিকি হয়েও যে কলকাতা শহরের এমন নরম একটি রূপ মনে ধরা যায়, সুব্রত তারই জাজ্বল্যমান নিদর্শন। ডাক্তার লেনের ঘিঞ্জি ফ্ল্যাট, সস্তার রামের পুরনো বোতল, প্রতিবেশী স্যামুয়েলের ট্রাম্পেটের করুনতা, বিকেলের আজানের নৈস্বর্গিক কলতান। সুব্রত শর্মার অনুভূতিগুলো প্রতিনিয়ত আঁকড়ে ধরে তার চেনা পারিপার্শ্বিককে। এবং তাই এই নোংরা পাকের ঠিক মধ্যিখানে দাড়িয়েও সে নিজেকে হারিয়ে ফেলে না।
এইখানে বলে রাখা ভালো, পুরো বইটাই প্রথম পুরুষে বর্ণিত। পাঠক হিসেবে সুব্রত শর্মার মনের ভেতরে তাই আমাদের অবারিত দ্বার। বইটি তাই কোথাও গিয়ে হয়ে যায় একজন আনকোরা গোয়েন্দার অভিনব ক্যারেকটার স্টাডি। খুব কাছ থেকে আমরা পাই সুব্রতকে, অনুভব করি তার দুঃখ ও চাহিদাদের। সে ভয় পায়, তার ব্যথা লাগে। সেই ব্যথার রঙ অনেক। সেই ব্যথাতেও কবিতার পরশ। না চাইতেও বারেবারে পাঠক মন, সুব্রতর জবানির ভেতরে খুজে পায় আরেক অভিমানী গীতিকারকে। একটি তথাকথিত গোয়েন্দা গল্পে যেই মানুষটা লিখতে পারেন "মালাদি চলে গেলেন। রেখে গেলেন একটা ক্লান্ত ছাদ যেখানে ঘুড়ি ওড়াতে ইচ্ছে করে না।..."
ছোট ছোট সংলাপ, গতিময় গদ্য। লেখক অঞ্জন দত্তের লেখনীশৈলী সিনেমাটিক, এবং এক কথায় মনোরম। তার গোয়েন্দার জন্য এই জগৎটিকে তিনি বেশ মনোযোগ এবং কিঞ্চিৎ আবেগ দিয়ে তৈরি করেছেন। ভালো লাগে তার এই সচেতন প্রচেষ্টা। ভালো লাগে এই অন্যরকম গোয়েন্দাটিকে, এবং তার এই অপরিচিত জগৎ। বইতে তিনটে গল্পের, প্রথম 'সামসিং থেকে এক কিলোমিটার' ক্লিক ওটিটির দৌলতে আগেই দেখা। বইয়ের পাতায় বৃহৎ পরিসরে গল্পটি ডানা মেলে উড়তে পেরেছে ঠিকই, তবে হয়তো বা পূর্বপরিচয়ের জেরেই হোক, বা উত্তেজনার অভাবে, সংকলনের সবচেয়ে দুর্বল গল্প আমার মতে এটাই। অবশ্য উলটোটা ঠিক এরপরেই ঘটছে, কারণ বইয়ের দ্বিতীয় গল্প 'শিলং পাহাড়ের একটা রাত', আদতেই দারুণ এবং ভীষণ বহুমাত্রিক। তৃতীয় গপ্পো, 'পুরীর সমুদ্রের কালো জল' সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। এতোটা ভালো লেগে যাবে নিজেও হয়তো ভাবি নি।
গানের প্যাভিলিয়ন থেকে সচেতন ভাবে কলম ধরেছেন আগেও অনেকে। মাথায় আসে নচিকেতা চক্রবর্তী, রুপম ইসলাম বা অনুপম রায়দের নাম। তুলনা করছি না, সেই ভিড়ে ড্যানি ডিটেকটিভ আই এন সি, কোথায় নাম লেখাবে সেটা সময় বলবে। তারকার কলমের niche প্রচেষ্টা না হয়ে থেকে, সুব্রত শর্মা সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা পাক, তাই চাইব। চাইব উঠে আসুক আরো অনেক অন্যধারার রহস্যসন্ধানীরা। তাতে আখেরে আমাদের মতো পাঠকদেরই লাভ। আর লাভ সুব্রত শর্মার। যদিও বা ঘোচে তার একাকীত্বের আফসোস। যদিও বা আসমুদ্র পাঁকে গা ভাসিয়ে, বেচে থাকে সত্যের সঙ্গে তার অসামাজিক সংসার। Jazz সঙ্গীতের তালে যা ক্রমাগত দুলছে। এবং আমার মন বলছে, ভবিষ্যতেও দুলবে।