সুপ্রিয় চৌধুরীর জন্ম উত্তর কলকাতার সাবেকি পাড়ায়। কৈশোরের অনেকটাই কেটেছে রেললাইন আর উদ্বাস্তু কলোনি ঘেঁষা শহরতলিতে। যৌবন, প্রৌঢ়ত্বের ঠিকানা মধ্য ও দক্ষিণ কলকাতার সীমান্তবর্তী সংখ্যালঘু মহল্লা। পুঁথিগত শিক্ষার গণ্ডি পেরোলেও নানাধরনের পাঠে প্রবল আগ্রহ। শখ: ফুটবল, ফিল্ম আর পশুপাখি পোষা।
বাংলার অন্ধকার জগৎ সম্পর্কে এমন তথ্যসমৃদ্ধ বই, এর আগে কোনোদিন বাংলা ভাষায় ছাপা হয়েছে বলে জানা নেই। স্রেফ দু'টি ব্যাপার একটু চোখে লেগেছে : ১) সুষ্ঠ সম্পাদনার অভাবে বইয়ের বেশ কিছু জায়গায় একই ঘটনাবলীর পুনরাবৃত্তি হয়েছে, ২) নকশালদের বলপূর্বক নায়কোচিত রোম্যান্সের আদলে গড়ে তোলার প্রয়াস বিরক্তির উদ্রেক করে।
কিন্তু তবুও এই বই বাংলার ইতিহাসের এক স্বল্পালোচিত আঙ্গিককে যেভাবে তুলে ধরেছে তা প্রশংসনীয়। পড়ে ফেলুন সংগ্রহ করে।
সুপ্রিয় চৌধুরী একজন অসাধারণ লেখক। তার গল্পের প্রতি পাতার মধ্যে থাকে টানটান উত্তেজনার একটা ছাপ। এই বইটি বাংলার আন্ডারওয়ার্ল্ড এর একটি বিবরণ হিসেবে অতুলনীয়। আমরা মহারাষ্ট্রে বা দিল্লি উত্তরপ্রদেশে মাফিয়া ডনদের নিয়ে ক্রাইমস্টোরির কথা শুনেছি বা পড়েছি,তবে বাংলায় সে ধরনের লেখা একেবারে হাতে গোনা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কলকাতার বাহুবলীদের কথা থেকে শুরু করে হালের আমলের সমাজবিরোধী প্রত্যেকের বিবরণই দুর্দান্ত উপস্থাপন করতে পেরেছেন সুপ্রিয় বাবু। এবং কোনক্ষেত্রেই মনে হয়নি যে লেখার মধ্যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আছে, এক্ষেত্রে একেবারে নিউট্রাল থেকে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন লেখক। সমাজের মধ্যে থেকেই যে কারণে সমাজবিরোধী তৈরী হয় তাও লেখার মধ্য দিয়ে ফুটে উঠেছে, এছাড়াও ফুটে উঠেছে রাজনৈতিক দলের নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ যার কুফল ভোগ করছে বাংলা এবং সাধারণ মানুষ। তবে লেখাটি কিছুক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট হয়েছে সম্ভবতঃ নকশাল আন্দোলন নিয়ে লেখকের দুর্বলতার জন্য। একারণেই যতবারই বইয়ে নকশালদের কথা উল্লিখিত হয়েছে ততবারই যেন তাদের আদর দেওয়া অভিভাবক হিসেবে যেন দেখতে পেয়েছি লেখককে,তারা কোন ভুল করতেই পারে না এরকম একটা হাবভাব। কোথাও কোথাও আবার তারা সমাজের মসীহা হিসেবেও তুলে গ্লোরিফাই করেছেন লেখক। আরেকটা বিষয় হলো লেখার মধ্যে সাড়ে পনেরো আনা শুধু কলকাতা কলকাতা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন লেখক,দু একটি প্রসঙ্গে আসানসোল,খড়গপুর,মালদা এবং নদিয়ার উল্লেখ পেয়েছি,অথচ কলকাতার বাইরে যে একটা অন্ধকার সাম্রাজ্য আছে সে সম্পর্কে লেখকের ধারণা পোক্ত নয় বলেই বোধ হয়েছে। বিশেষ করে রেলশহর আসানসোল বা তার পার্শ্ববর্তী কোলিয়ারী এলাকাগুলি অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য সেসব জায়গায় কোন উল্লেখ নেই। উল্লেখ নেই স্মাগলিং এর আরেক টপ এলাকা শিলিগুড়ির, বর্ধমান শহরের কোন উল্লেখ পাই নি,ভাটপাড়া-জগদ্দল অঞ্চল অপরাধীদের মুক্তাঞ্চল সেও অনুপস্থিত। এছাড়াও বিশেষ ভাবে পশ্চিমবঙ্গের অনেক অপরাধপ্রবণ অঞ্চকের কথাও অনুপস্থিত বইয়ে। সম্ভবত লেখকের এই বই সংবাদপত্র এবং লোকাল পরিচিতদের থেকে আহরণ করা তথ্য তাই হয়তো অন্যান্য অঞ্চলের গোপন খবর বা ক্রাইমগুলি অনেকাংশে অনুপস্থিত থেকেছে। তবে ত্রুটিমুক্ত না হলেও বইটি নিঃসন্দেহে বাংলা অন্ধকার জগতের একটি অন্যতম সেরা দলিল বলাই যায়।
বাংলার অন্ধকার জগৎ নিয়ে এরকম লেখা আগে পড়েছি বলে আমার মনে হয় না। এই লেখা অ্যাটেম্পট করার জন্যে লেখককে সাধুবাদ জানাই।
ভালোঃ ১. লেখার হাত বেশ ভালো। লেখকের এই প্রথম কোনো বই আমি পড়লাম। ২. কিছুকিছু শব্দচয়ন বেশ বেশ সাবলীল আর নতুন। এরকম আমি আগে পড়িনি। এটা খুব ভালো লাগল। ৩. পড়তে ভালো লাগছিল।
কমভালোঃ
খারাপ বলার বিপক্ষে আমি। তাই কম ভালো লিখলাম। ১. বেশ অনেক ঘটনা খুবই রিপিটেটিভ। বার বার একই ঘটনা ঘুরে ফিরে আসে। এটা নন ফিকশন বলেই হয়ত সেটা অতটা নেগেটিভ পয়েন্ট না কিন্তু কিঞ্চিৎ বিরক্তি আসে। ২. নকশালদের মহান প্রমানের একটা সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা চোখে পড়ে, সেটা আমার মতে ঠিক না। লেখা নিরপেক্ষ হওয়াটা কাম্য। ৩. লেখা শুধু কলকাতা কেন্দ্রিক। সেটা আপত্তি নেই, কিন্তু লেখাটা কলকাতা থেকে বাইরের দিকে ছড়ালে ভালো হতো বেশি। হয়ত পরের দিকে ভালো লেখা আসবে আরো। ৪. লেখার গতি একবার কলকাতা থাকে তারপর আবার আসান্সোল যায়, আবার যাদবপুরে ফিরে আসে। এভাবেই ঘুরতে থাকে। তাই তাল মেলাতে সমস্যা হয়। সম্পাদনার সমস্যা বলে মনে হয় এটা। ৫. শুধু মাত্র রিপিটেটিভ বাহুবলিদের কথা না বলে কোনো গল্পের মধ্যে দিয়ে সেগুলো পরিবেশন করলে আরো বেটার লাগত পড়তে। শুরুর দিকে সেটা চোখে পড়লেও পরের দিকে সেটা টান হারাতে থাকে আর একই ছকে পড়ে যায়। তাই ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটে। ৬. 'প্রিয় পাঠক' কথাটা কেমন চোখে লাগতে থাকে।
সর্বোপরি দোষগুণ মিলিয়ে এই বই বাংলার অন্ধকার জগতের একটা এন্সাইল্কোপিডিয়া। তার মধ্যে মাঝে মাঝে হারাতে হলেও কিছুটা উপভোগ্য তো বটেই। এই প্রয়াসের জন্য সাধুবাদ জানালাম।
বাংলার অন্ধকার জগতের নাড়িনক্ষত্র নিয়ে ঠিক কতগুলো বই লেখা হয়েছে সংখ্যাটা আমার ঠিক জানা নেই। তবে এত বিস্তারিত তথ্য যে একত্রিত করা হয়নি, তা হলফ করে বলতে পারি। সুপ্রিয় চৌধুরীর লেখা এই 'পাতালপুরাণ' বইটি যেন অন্ধকার জগতের রোজনামচা। এই বইটির সময়কাল হিসাবে উঠে এসেছে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বাংলা থেকে হাল আমলের পশ্চিমবঙ্গ। আর সেখানে ঘটে চলা নানারকম ঘটনা ও ঘটনার পেছনে থাকা বাহুবলী বা সমাজের ত্রাসের কথাও উঠে এসেছে। তবে লেখক সুপ্রিয় চৌধুরী কিন্তু বাংলার অপরাধ জগতের এই মাথাদের শুধু অন্ধকার দিকটা দেখিয়েই কলম বন্ধ করে দেননি, ভালো খারাপ মেশানো মানুষটাকেও যথাসম্ভব তুলে আনার চেষ্টা করেছেন পাঠকদের সামনে। কিন্তু শুধু অপরাধ আর অপরাধীর সময়কালই নয়, এই লেখায় উঠে এসেছে বদলে যাওয়া সমাজ আর পালটে যাওয়া অস্ত্রের কথাও। এককথায় বলতে গেলে লেখক সুপ্রিয় চৌধুরীর লেখা এই 'পাতালপুরাণ' বইটি অপরাধ জগতের এক এনসাইক্লোপিডিয়া।