তানজিনা হোসেনের ১০টি গল্পের সংকলন ‘এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত’। এই না-হয়ে-ওঠা প্রেমের গল্পগুলোও কিন্তু প্রেমের গল্পই। আমাদের জীবন তো আসলে রেহনুমার রাজশাহীগামী ধূমকেতু এক্সপ্রেসের মতো, ছুটে চলে তীব্র বেগে অন্ধকার মহাশূন্যের মধ্য দিয়ে, আর প্রতিদিনের না ফুরানো প্রেমের গল্পগুলো বহু দূরে সরে যেতে যেতে অবশেষে আসন নেয় পাঠকের মনের গভীরে।
তানজিনা হোসেনের জন্ম ১৯৭৫ সালে। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ঢাকায়। গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বিজ্ঞান কল্পগল্প ও ফিকশন দিয়ে লেখালেখির শুরু। পাশাপাশি নিয়মিত ছোটগল্প লিখে আসছেন। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘অগ্নিপায়ী’ (২০০৬)। তানজিনা হোসেন পেশায় চিকিৎসক। শিক্ষকতা করেন ঢাকার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজে।
বাংলাসাহিত্যে সিরিজ গল্প লেখার চল নেই বললেই চলে। জানামতে এক মঈনুল আহসান সাবেরই নিষ্ঠার সাথে এ ধরনের গল্প লেখেন- সীমাবদ্ধ, সবচেয়ে সুন্দর, রেলস্টেশনে শোনা গল্প, অবসাদ ও আড়মোড়ার গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি।"এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত" বইয়ের নাম থেকে আমরা জানতে পারি যে গল্পগুলো প্রেমের নয়,কিন্তু হতে পারতো।হয়নি, হওয়া সম্ভব হয়নি।বাঁধা দিয়েছে আমাদের দ্বিধা, সংস্কার, ভীরুতা, সংকোচ, আশেপাশের মানুষ বা অন্যকিছু। যেমনটা ঘটে আর কি প্রায় সবার ক্ষেত্রে!গল্পগুলো প্রেমের না হয়ে হয়ে উঠেছে যাপিত জীবনের। সুধীন্দ্রনাথের লেখা "একটি কথার দ্বিধা থরথর চূড়ে/ ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী " এখানে সত্য নয়।নীরবতা এখানে হিরন্ময় নয়। সিরিজ গল্প লিখলে একঘেয়েমি এসে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। দুয়েকটা গল্প পড়েই আমরা বুঝে ফেলি পরবর্তী গল্পগুলার পরিণতি কী হতে যাচ্ছে।জানার পরেও যে এ বইয়ের সব গল্প দারুণভাবে উপভোগ করা গেলো সে কৃতিত্ব সম্পূর্ণ লেখিকার।প্রতিটা গল্প আলাদাভাবে ভালো না লাগলেও সামষ্টিকভাবে আমাদের জীবনের সার্থক প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে আর আমরা ভাবতে বাধ্য হই,"আমারও তো এমন একটা গল্প আছে! নিজের একটুকু দ্বিধার জন্য হারিয়ে গেলো সব।" আচ্ছা,কেমন হোতো অযাপিত সেই জীবন?
“এরা সুখের লাগি চাহে প্রেম, প্রেম মেলে না, শুধু সুখ চলে যায়”
রবি ঠাকুর বলেছিলেন কথাগুলো। প্রেমের মতো এতো রহস্যজনক বিষয় যেমন নাই, তেমন ভয়ংকর সুন্দর বিষয়ও নাই। বাস্তবিক ক্ষেত্রে প্রেমের দুটো অংশ সবচাইতে সুন্দর। প্রেমে পড়ার সময়টা, প্রেম শুরু হবার সময়টা। আবার গল্পের ক্ষেত্রে কিন্তু সবচাইতে জমে প্রেমের ট্র্যাজেডি, আর না হওয়া প্রেমের গল্প। তাই প্রেম সংক্রান্ত যত লেখা, তার মাঝে একটা বিশাল অংশ ঘিরে আছে এই না হওয়া প্রেমের গল্প। লেখা হয়েছে অসংখ্য বই। এই বইটিই কেন তুলে নিলাম? মূল কারণ ছিলো আমার মনে হয়েছিলো এখানে অনেক বিষয়বস্তু এক্সপ্লোর করেছেন লেখিকা। সাধারণত দেখা যায় আমি যেসব বই কিনবো কি কিনবোনা এই দ্বিধাদ্বন্দে ভুগি, সেসব বই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভালো হয়। এই বইটিও সেই দলের।
এখানে কোনো গল্পের নাম নেই। গল্পগুলো লেখা হয়েছে যাপিত জীবনের অসমতা, দ্বিধাবোধ, সংকোচ, সামাজিক বাঁধা আর দূর্ভাগ্যকে কেন্দ্র করে। আবার শেক্সপিয়ারের হ্যামলেটে, স্বামীর খুনীর প্রেমে পড়া নিয়ে কিংবা বেহুলার সেই শৈশব থেকে নির্ধারিত প্রেমের কথা নিয়েও এখানে চিন্তাভাবনা হয়েছে। বিষয়বস্তুগুলো চমৎকার। সহজ সাবলীল। মনে হয় আরে এরকম গল্প তো আমিও জানি। হচ্ছে এসব, যাচ্ছে কোথায়?
সেসব পরিচিত ঘটনা নিয়েই ভিষণ সুন্দর একটা বই এই বইটি। প্রায় সবগুলো গল্পই ভালো লেগেছে। বইটি পড়তে পড়তে যতটা এগিয়েছি, বইটা ততটা জমেছে। ফাইন ওয়াইনের মতো। তৃতীয় গল্পটা বেশ ইউনিক। কি যে সুন্দর আগ্রহ জাগানিয়া গল্পটা। থিমটা হয়তো একেবারে নতুন নয়। এক্সিকিউশনটা নতুন। গল্পটা পড়েছিলাম এসি বাসে আরাম করে বসে। গল্পটা শেষ হবার পর হঠাৎ খেয়াল হলো, পড়ার সময় আমার পাশে বসা বয়স্ক লোকটিকেই এতক্ষণ মূল চরিত্রে বসিয়ে কল্পণা করছিলাম আমি। এই ভদ্রলোক জানেনও না তিনি এইমাত্র একটি কাল্পনিক চরিত্র হয়ে আমার মাথায় ঘুরছিলেন। কি দারুণ অনুভূতি এই মজে যাওয়ায়। সপ্তম গল্পটা একজন ব্যার্থ, একাকী মানুষের। ৮ম গল্পটা বেহুলা লখিন্দর এর। এরকম নানা বিষয়বস্তু নিয়ে সমসাময়িক সব গল্প সৃষ্টি করেছেন লেখিকা।
সুন্দর এই বইটির জন্য লেখিকাকে ধন্যবাদ। সর্বসাকুল্যে এই বইটি যে একটা আক্ষেপ আর শূন্যতার সাথে দেখা করিয়ে দিলেন, তার জন্য ধন্যবাদ।
কয়েকদিন আগে চট্টগ্রাম বাতিঘরে এক সন্ধ্যা পরবর্তি সময়ে কফি কর্ণারে দাড়িয়ে ছিলাম। বাতিঘরের সত্তাধিকারি দিপঙ্কর দাশ আমাকে বইটির কথা বললেন। তানজিনা হোসেনের কোন লেখার সাথে পরিচিত ছিলাম না। এই সিরিজ গল্পগ্রন্থের মাধ্যমে দেখা পেলাম তাঁর সুলেখনির।
দশটি গল্পের নাম উক্ত গ্রন্থের নাম ধরে পড়া যায়। প্রেমের গল্প হতে পারত, কিন্তু হয় নি। আসলেই কি হয় নি?
তানজিনা হোসেনের লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তর, স্থান এবং তথাকথিত অসম সম্পর্কের মনস্তত্ত্বের দেখা পাওয়া যায়। হোক তা করোনাকালের ক্যাওসের, মৃত্যুপথযাত্রি স্বামীকে ছেড়ে যাওয়া স্ত্রীর কর্মকান্ডে, দুজন সিনিয়র সিটিজেনের এক ধরণের অদ্ভুত সম্পর্কের কিংবা পার্টিতে মদ্যপ অবস্থায় সিন ক্রিয়েট পরবর্তি ঘটনাপরম্পরায়।
আইসিউতে মৃত্যুপথযাত্রি নিকটজনের জন্য অপেক্ষারত দুজনের কথোপথনও প্রেমের মত কিছুর সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে সপ্তম গল্পটি। বিয়েতে রাজী নন এরকম দুজনের পারিবারিক চাপে সৃষ্ট ডেটের কান্ডকারখানায় কল্পনার যে দুয়ারটা খুলে বিষণ্নতাকে পাঠকের মনে জায়গা করে দেন তা মনে রাখার মত।
গল্পগুলির প্লট একেবারে গ্রাউন্ডব্রেকিং কিছু নয়। আমাদের আশপাশেই এসব কিছু ঘটে চলেছে। তানজিনা হোসেনের লেখনিতে যেরকম প্রাঞ্জলতার সাথে ও পরিমিত ডিটেইলিং এর ব্যবহারে স্ববিরোধি মানবমনের ছায়া বইয়ের অক্ষরের পুকুরে মন খারাপ করে দেওয়া সৌন্দর্যের সাথে পড়েছে তার প্রশংসা করতে হয়।
পরস্পরকে পেয়ে যাওয়াতেই কি প্রেম পূর্ণাঙ্গ হয়? আমার কেন জানি বারবার মনে হয়েছে এটা একটা প্রেমের গল্প-ই হয়ে উঠেছে।
প্রেম খুব সুন্দর ব্যাপার। একই সাথে প্যারাডক্সে ভর্তি অসহ্য সুন্দর বিষয়ও।
বইটির প্রায় সব গল্পের সাথেই অনেকে নিজেকে হয়তো রিলেট করতে পারবেন। কারণ প্রেম কখনো অপ্রাসঙ্গিক হয় না বোধহয়।
বই রিভিউ
নাম : এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত লেখক : তানজিনা হোসেন প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২২ প্রকাশক : বাতিঘর প্রচ্ছদ : সব্যসাচী মিস্ত্রী জনরা : সিরিজ গল্প রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
বইয়ে এগারোটা গল্প আছে, এগারোটা গল্পই প্রেমের হতে পারত কিন্তু হয়নি। শেষ হয়েছে কোনো না কোনো ট্র্যাজেডিতে। শেক্সপিয়রীয় ট্র্যাজেডি না তাই বলে। যাইহোক গল্পগুলোর পরিণতি সম্পর্কে জানেন, জানেন এখানকার পাত্র-পাত্রীর শেষে গিয়ে মিল হবে না। কিন্তু গল্পগুলো পড়তে হবে আপনাকে, লেখার মধ্যে একধরনের আকর্ষণ আছে যা আপনাকে টেনে নেবে। প্রথম গল্পটা একেবারে অর্ডিনারি ছিল,মানে গোড়াতেই গলদ আরকি। কিন্তু পরের গল্প থেকেই বদলে যেতে থাকল চিন্তাধারা। প্রত্যেকটা গল্পেই রয়েছে একটা ধাক্কা দেয়ার মত বিষয়, যা কখনো কখনো হৃদয়কে মোচড়ও দেবে। সেইসাথে আরেকটা জিনিস ভালো লেগেছে, সেটা হল লেখিকার বিভিন্ন রেফারেন্স ও মেটাফোরের ব্যবহার। প্রথমটা বাদে সব গল্পই ভালো। তবে চতুর্থ আর ষষ্ঠ গল্পটা বেশি ভালো। যারা একটু ভিন্ন রকমের গল্প পড়তে চান, তাদের জন্য এই বই।
নামটাই বলে দিচ্ছে। যে গল্পগুলো প্রেমের গল্প হতে পারত, কিন্তু হয়নি, সেই গল্পগুলোই স্থান পেয়েছে বইয়ে। অনেকটা মুরাকামির মেন উইদাউট উইমেন গল্পগ্রন্থে যেরকম সব নারী বিবর্জিত পুরুষদের দেখা পাই আমরা, সেরকম। কোন গল্পেরই আলাদা করে নাম নেই৷ প্রথম গল্প...দ্বিতীয় গল্প...তৃতীয় গল্প...এভাবে করে এগিয়েছে। সবগুলো গল্পই দিনশেষে আক্ষেপের, দীর্ঘশ্বাসের৷ তারপরেও ভালো লাগে যখন দেখি আশপাশর আটপৌরে জীবনের সাথে মিলে যাচ্ছে গল্পের অনেক কিছু৷ ফলে অনেক পাঠকই হয়তো বলে উঠবেন, আরে এট তো আমার গল্প হতে পারত!
আমি হচ্ছি এক নম্বরের হোপলেস রোম্যান্টিক। তবে বাস্তবে যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোম্যান্টিক ভালোবাসা ভালো কিছু না সেটাও বিশ্বাস করি। প্রেমের গল্প পড়তে তাই খুব ভালো লাগে। এই বইয়ে নানারকম প্রেমের গল্প আছে। সেখান থেকে আমার সবচেয়ে ভালো লেখেছে তৃতীয় গল্প। বাকিগুলো ভালো লেগেছে কিন্তু তৃতীয় গল্পটার কথাই প্রতিদিন ভাবছি। এই 'হতে পারত' গল্পগুলোয় সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো, স্মৃতিটুকু সুন্দর থেকে যায়।
"কারা যেন ভালোবেসে আলো জ্বেলেছিল, সূর্যের আলো তাই নিভে গিয়েছিল, নিজের ছায়ার পিছে ঘুরে ঘুরে মরি মিছে- একদিন চেয়ে দেখি আমি তুমি হারা, আমি তুমি হারা"।
রিভিউটা যখন লিখছি মোবাইলে ব্যাকগ্রাউন্ডে গান চলছে। মাঝে মাঝে শেষটা কষ্টের হলেও সুন্দর হয়। মানুষ বোধহয় প্রেমের জন্যই বাচেঁ। কত কত ভাবেই না মানুষের জীবনে এই প্রেম আসে। আধারে-আলোতে, বেলায়-অবেলায়, কারো কষ্টে আবার কারো সুখ দ্বিগুন করে এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত, গল্পগুলো ঠিক ঠিক নামটির স্বার্থকতা রেখেছে।
পড়তে পড়তে মনে হয় গল্পগুলো এত সাধারন তবু অদ্ভুত লাগে কেন? আমরা এমন প্রেমে পড়ি না কেন? দ্বিধায় রয়ে যায়।
এই বইয়ের লেখিকা তানজিনা হোসেন; যে বিউটি বোর্ডিং রহস্য বইয়ের লেখিকা তা বই শুরু করার পর জানতে পারলাম। তার প্রত্যেক বইয়ের নাম গুলা আমায় বেশ টানে।
আমি খুব-ই আশাবাদী মানুষ। সব কিছু তে হ্যাপি এন্ডিং পছন্দ করি। তাই আমার শীর্ষেন্দু খুব প্রিয়। প্রেম বিষয় টা আমার কাছে খুব স্পেশাল। আমার নিজের জীবনে কি হবে জানি না। তবে আমি সব সময় চাই,সবার প্রেম চিরন্তন হোক। তারা ভালো থাকুক। অর্থ্যা, প্রেম কে আমার পজিটিভলি নিতে ভালো লাগে;ভালোবাসি।
কিন্তু যে বইয়ের কথা আমি বলতে যাচ্ছি, সেটার নামের মধ্যে-ই কেমন একটা বিষাদ উঁকি দিচ্ছে। সে জানান দিচ্ছে,বইয়ের ভেতরকার গল্পগুলো কি হতে পারে। জানি পড়ে মন খারাপ হবে,তাও সাহস করে পড়লাম। প্রথম দুইটা গল্প পড়েই বইটা রেখে দিয়েছি,কারণ মন প্রচন্ড খারাপ হয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে দ্বিতীয় গল্পটা পড়ে। তারপর আবার দুপুরের দিকে পড়া শুরু করলাম,রাতে এসে শেষ হলো।
এটা একটা সিরিজ গল্পের সংকলন। এক নামে দশটা গল্প। স্বাভাবিক মনে হতে পারে খুব বোরিং। কিন্তু আমার ততোটা খারাপ লাগে নি। বরং বেশ উপভোগ করেছি। তার কারণ লেখিকার গল্প বলার ভঙ্গিমা আর দারুণ লেখনী।
নাম দেখেই বুঝা যায় এগুলা অসম্পূর্ণ গল্প, যা প্রেম হয়েও হয়নি। গল্পের থিম বা মূলভিত্তি জানার পরও লেখিকা দারুণভাবে পাঠকদের আটকিয়ে রেখেছে। গল্পের লেখনশৈলী দারুণ ছিলো। কিছু সাধারণ গল্পের মাঝখানে ছিল কিছু অস্বাভাবিক অসাধারণ গল্প। দারুণ সময় কেটেছে গল্পগুলোর সাথে।
তানজিনা হোসেনের সায়েন্স ফিকশন আগে পড়া হয়েছে। কিছুটা ভিন্ন ধাঁচের সায়েন্স ফিকশন লেখার কারণে উনার লেখার বেশ ভক্তও আমি। এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত গল্প সংকলনের বইটা মূলত কিনেছিলাম উনার ভিন্ন জনরার বইয়ের স্বাদ নিতে এবং বইটা শেষ করে মনে হচ্ছে মিশন সাকসেসফুল। একটি প্রেমের গল্প হতে গিয়েও যে হতে পারলো না এই পুরো ব্যাপারটাই অন্য রকম ভাবে কলমে এনেছেন ভিন্ন ভিন্ন দশ গল্পে। এমন স্বাদের গল্প পড়ে হুমায়ূন আহমেদের ছোট গল্পগুলোর পর আর কোথাও তৃপ্তি পাইনি বহু বছর।
কতভাবেই না মানুষের জীবনে প্রেম আসে! প্রেম আসে ক্ষনিকের আলাপে, বয়স কাল ভুলে, মনে হয় যেন সোলম্যাট। প্রেম আসে ভীষণ ভেঙে পড়া ক্লান্ত সময়ে, প্রেম আসে একবারে কিশোর বয়সে পাশের বাসার মিষ্টি মেয়েকে নিয়ে, যে প্রেমে থাকে দেশ বিদেশ ঘুরার স্বপ্ন। প্রেম আসে অচেনা যুবকের সাথে ভুল সাক্ষাতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ফাঁদে। কিন্তু সমাজ, ধর্ম, বয়স, বাস্তবতা, 'কঠিন কঠোর নির্দয় ডেসটিনি'র আঘাতে হারিয়ে যায় কিছু প্রেম, আবার কেউ প্রেম হাত পাতলেও তাকে সরিয়ে রাখে!
এমন ১০টি না হওয়া প্রেমের গল্প নিয়ে ‘এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারত’ বইটি। ছোট ছোট গল্প নিয়ে ছোট্ট বই। আমার কাছে সব গল্পই ভালো লেগেছে। তবে নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে ৩য় ও ৮ম গল্প ভীষণ ভালো লেগেছে। খুব করে মন চাইছিলো এ প্রেম গুলো সত্যি হোক। মজার ব্যাপার হলো গল্প গুলোর কোন নাম নেই। ১ম গল্প, ২য় গল্প এভাবে সাজানো। আসলে গল্পগুলো খুবই সাধারণ। প্রতিটি মানুষের জীবনে হয়তো এমন দু একটা ‘প্রেম হলেও হতে পারতো’ গল্প আছে। তাই গল্পগুলোর নাম না থাকাটাই বেশি ভালো লাগছে।
"Maybe I was destined to forever fall in love with people I couldn't have."
কোথায় জানি এই লাইনটা দেখেছিলাম। হয়তো প্রেম এমনই! অপূর্ণ, জটিল কিন্তু সুন্দর।
তানজিনা হোসেনের "এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো" এটা মূলত একটা ছোটগল্পের বই, কিছু কিছু গল্প শোনায় কীভাবে যেখানে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠা অবান্তর বা সমাজের কাছে হেয় সেখানেই প্রেম হয় আবার কিছু কিছু গল্প জানান দেয়, অতি স্বল্প সময়ের মাঝে বিশাল সম্পর্ক ভেঙ্গে তছনছ হয়ে যাওয়া।
আমার কাছে মনে হয়েছে কয়েকটা গল্প আমি আগেও পড়েছি। কিন্তু সে গল্পগুলো ভালো এক্সিকিউশনের অভাবে নিছক গল্পই লে���েছে। এমনটাও বাস্তবে হয়? হয় না তো! কি দরকার প্রেমের গল্প এমন আজগুবী, বানোয়াট বানানোর? তবে এ বইয়ের সবগুলো গল্প ভালো না লাগলেও আদিখ্যেতা ছাড়াও যে সমসাময়িক ভালো প্রেমের গল্প লেখা সম্ভব সেটা বুঝিয়েছে। ১০ টা গল্পের মাঝে প্রথম দু'টো, মোটামুটি। তৃতীয় গল্পটা বেশ ভালো। আর ৭ম আর ৯ম গল্প দু'টোও বেশ ভালো ছিলো। বিশেষ করে লাস্টের টুইস্ট!
প্রেমের গল্প হয়েও যেটা হয়না সেটাই বোধহয় প্রেম। হয়ে গেলে তা আর সুন্দর থাকে না, হয়ে যায় অন্যকিছু আর তাতে থাকে নিয়ম, অভ্যাস। সম্পর্কে তিক্ততা আসে, সম্পর্কের নিশ্চয়তা দোদুল্যমান হয়ে পড়ে। হাজা���ো রকম কঠিন কঠিন সব ইক্যুয়েশন। এত সব অদ্ভুৎ নিয়মের বাইরে যে প্রেম, দূর থেকে ফুল না ছিড়ে তার সুবাস নেওয়ার যে আকুতি তাইই বোধহয় শ্রেয়! "এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো" না হয়ে বোধহয় আরো ভালো হলো।
এই বইতে আছে দশটা গল্প, যেগুলোর প্রত্যেকটাই প্রেমের হইতে পারত, কিন্তু জীবনের প্রয়োজনে হইতে পারে নাই। লেখিকা সুন্দর করে অনেকগুলা ডাইমেনশন নিয়ে আসছেন আমাদের সাধারণ মানুষের জীবনের, এবং কোনোটাই অতিপ্রাকৃত কিছু না, একদম ন্যাচারাল, নরমাল। এমনকি কয়েকটা আপনার নিজের সাথেও হইতে পারে হালকা পাতলা। সমাজের এলিট শ্রেণী থেকে শুরু করে নিচু স্তরের মানুষ, কর্মজীবী মানুষ থেকে অকর্মণ্য মানুষ, ভালো মানুষ, খারাপ মানুষ, বাচ্চা, তরুণ, বুড়ো, সব ধরনের মানুষের গল্প আসছে এখানে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, জীবনের প্রতি অনিশ্চয়তায় কিংবা রিপুর তাড়নায়, আত্মকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব কিংবা পারিপার্শ্বিক চাপে আমরা যেসব সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, এবং তাদের কারণে যে অল্পের জন্য আমাদের জীবন থেকে একেকটা কাব্যিক প্রেম হতে হতেও হয় না, সেইসব কথাই সুন্দর গুছিয়ে লিখে ফেলেছেন লেখক। তানজিনা হোসেনের 3য় বই এইটা আমার। নিজে ডাক্তার হওয়ায় উনি ডাক্তারি টার্ম গুলা গল্পের ফাঁকে সুন্দর করে ঢুকায় দিতে পারেন, এই ব্যাপার টা লক্ষ্য করলাম।
এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো ১০ টি প্রেমে না-হয়ে-ওঠা ছোটগল্পের সংকলন। যদিও বইটির প্রতিটি গল্পই প্রেমের গল্পই। প্রেম বলতে আমরা কী বুঝি? একটি সার্থক প্রেমের সংজ্ঞা আসলে কি? প্রেমের কি আদো কোনো গন্তব্য রয়েছে? নাকি পরিণতির পথে এগিয়ে যেতে যেতে সেই পথে হারিয়ে যাওয়াটাই প্রেম? আমার তো এটাই মনে হয়। পরিণতি প্রেমের সার্থকতা পরিভাষিত করে না, বরং প্রত্যাশাবিমুখ ঘনিষ্ঠ জীবনবোধই আমার কাছে প্রকৃত প্রেম। সব প্রত্যাশা ফেলে দেয়ার পরও যে টান থেকে যায়, যা অপ্রতিরোধ্য, সেটাই সার্থক প্রেম। Louis Ginzberg যেমন বলে গিয়েছেন, "Love is the irresistible desire to be desired irresistibly." কি অদ্ভুত মুগ্ধতাময় ছিলো গল্পগুলো! সব চরিত্র যেন আমার শহরতলীর চেনা মানুষগুলোরই মতন। যেন প্রায় সবাইকেই হাতে আঙুল দিয়ে চিনিয়ে দেয়ার মত করে খুঁজে পেয়েছি অন্য কোনো নামে, অন্য কারোর ঠিকানায়। অনেকদিন এরকম ভালো কোনো বই পড়া হয়নি। গল্পগুলো পড়তে পড়তে খালি "Our life is nothing but a winter's day" কবিতাটার কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। এরকম একটা বই পড়ার জন্য দীর্ঘ দিবস প্রতীক্ষা করে বসে থাকা যায়।
এর আগে কোনো এক ঈদসংখ্যায় তানজিনা হোসেনের একটি লেখা পড়েছিলাম। লেখাটি মনে ধরেনি খুব একটা। কোনো প্রকার প্রত্যাশা ছাড়াই তাই এই বইটি হাতে নিলাম এবং বাতিঘরে বসে এক নিমিষেই পড়ে ফেললাম। বইয়ের দশটি গল্পের প্রতিটিই নামহীন। না হয়ে ওঠা কিংবা অপূর্ণ থেকে যাওয়া প্রেমের এই সবকটা গল্পই বেশ লাগলো। লেখিকার সাইফাই লেখার হাত বেশ ভালো শুনেছি। ইচ্ছে রইলো পড়ার।
বইটাতে রয়েছে ১০টি ছোটগল্প।এর আগে এই লেখিকার বিউটি বোর্ডিং রহস্য বইটা পড়েছিলাম।আগেরটা আশানুরূপ হওয়ায় এই বইটার প্রতি আমার প্রত্যাশা বেশি ছিলো।কিন্তু বইটা পড়ে কিছুটা নিরাশ হয়েছি।গল্পগুলো আমার তেমন ভালো লাগেনি।আরেকটু ভালো মানের হওয়া উচিত ছিলো।টেনেটুনে ৭ম ও ১০ম গল্প দুটো একটু ভালো লেগেছে।
এইযে ভালোবাসা,প্রেম হতে যেয়েও না হওয়ার এই গল্পগুলো কি অদ্ভুত বিষন্নতার! কখনো তারা ভালোবাসার সম্পর্কে জড়াতে চায় তো পরিস্থিতি,সমাজ তাদের চারপাশের মানুষজন সকলে যেন বিদ্রোহ করে বসে! আবার যখন সব ঠিক থাকে তখন হুট করে বদলে যেতে শুরু করে সেই নিদির্ষ্ট দুজনের একজন! আহা ভালোবাসা এমনও হয়!
মোট ১০ টি গল্প নিয়ে সংকলিত "এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো"। তানজিনা হোসেনের লেখনীর সাথে এই প্রথম পরিচয়। লেখিকার লেখনশৈলী ও বর্ণনার বচনভঙ্গি বেশ সুন্দর! সবগুলো গল্পই যে ভালো লেগেছে তা বলবোনা। সব মিলিয়ে ভালো-মন্দের মিশ্র অনুভূতি। বইয়ের গল্পগুলোর আলাদা করে কোনো নাম দেওয়া হয়নি। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে-দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গল্প দুটি!
বইটা হাতে নিয়ে প্রথম যে অনুভূতিটা আসে, সেটা একটা হালকা নিঃশ্বাস ফেলার মতো—নামটা এত সহজ, অথচ যেন একটা অসম্পূর্ণ চিঠি।“এটা একটা প্রেমের গল্প হতে পারতো”—মানে কী? তাহলে কি এটা প্রেমের গল্প না? নাকি প্রেমের গল্প হওয়ার সম্ভাবনা ছিল কিন্তু হয়নি? তানজিনা হোসেন খুব সূক্ষ্মভাবে সেই প্রশ্নটাই তৈরি করেন আর তারপর ধীরে ধীরে সেই প্রশ্নের ভেতরেই ডুবিয়ে দেন।
গল্পটা প্রেমের, কিন্তু ঠিক সেই ফর্মুলা অনুযায়ী না। এটা একরকম বিরহ, একরকম না-পাওয়ার গন্ধ মাখা গল্প। এখানে ভালোবাসা আছে, কিন্তু তা চেঁচিয়ে বলার মতো নয়—চোখের কোণে লুকানো, না বলা কিছু অনুভূতির মতো।
তানজিনার লেখার ভঙ্গি খুব নরম, অথচ চেরা সত্যের মতো ধারালো। তার শব্দগুলো যেন কফির কাপে ভেসে থাকা রোদ—সহজ অথচ গভীর। গল্পের চরিত্রগুলো ঠিক পাশের বাসার মানুষের মতো—অত্যন্ত চেনা, অথচ কখনো পুরোটা জানা হয় না।
তানজিনা হোসেনের লেখায় একটা সুন্দর নীরবতা আছে। তিনি চিৎকার করে প্রেমের গল্প বলেন না। বরং গল্পের পাতায় পাতায় এমনভাবে আবেগ ছড়িয়ে দেন, যেন আমাদের নিজের ভেতর থেকেই কথাগুলো উঠে আসে।
এই বইয়ে প্রেম আছে, কিন্তু সেটি চিরাচরিত ভালোবাসার গল্পের মতো নয়। এখানে প্রেম মানে কারো দিকে তাকিয়ে থাকা, কিন্তু কিছু না বলা। কারো চলে যাওয়া দেখে নেয়া, কিন্তু কোনো অভিযোগ না রাখা। একরকম শান্ত-নীরব ভালোবাসা, যা হয়তো গল্প হয়ে উঠতে পারত—কিন্তু ওঠেনি।
লেখার ভাষা খুব সাদামাটা, অথচ ঠিক জায়গায় গিয়ে লাগে। কখনো মনে হবে, লেখিকা আপনার নিজের কথা লিখে ফেলেছেন। তার চরিত্রগুলো বাস্তব, গল্পগুলো খুব আপন—যেন কোনো এক বিকেলে ছাদে বসে গল্প শুনছেন নিজের বন্ধুর মুখে।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে—এই বইয়ে প্রেমটা কেবল একটা সম্পর্ক নয়, বরং একটা অবস্থান, একটা উপলব্ধি। কখনও সময়ের অভাবে, কখনও সমাজের বর্ণচাপায়, কখনও নিজের ভেতরের দ্বিধায় সেই প্রেম গল্প হতে হতে থেমে যায়।
পড়ার সময় যেন একটা হালকা কুয়াশা গায়ে জড়িয়ে ছিল। সবটা স্পষ্ট না, কিন্তু অনুভব ছিল প্রবল। বইটা পড়ে শেষ করলে একটা চাপা বিষণ্ণতা ছুঁয়ে যায়, আবার সেইসঙ্গে একটা শান্তিও—যে আমরা হয়তো না-পাওয়াকেও ভালোবেসে ফেলতে শিখি।
গল্পগুলো প্রেমের। ফুল হয়ে ফোটার আগে কুঁড়ো হয়ে ঝরে যাওয়া সব প্রেম। গল্পগুলোর স্ট্রাকচার এক। একটা প্রেমের সূচনা হতে হতেও শেষ হয়ে যাওয়া। তা অবশ্য নাম থেকেই বুঝে ফেলা যায়। তবে বইটি বিশেষ তার গল্পগুলোর বৈচিত্র্য আর লেখিকার অসাধারণ লেখনশৈলীর গুণে। নগরীর পারিপার্শ্বিক লেখিকার কলমে পাঠকের চোখে ভাসতে বাধ্য। তাছাড়া কিছু গল্পের বৈচিত্র্য এতোটাই বেশি যে তা পাঠককে এর সমাপ্তি নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। সমাজ, পরিবার, আত্ম-সংকোচ কিংবা ভাগ্যের কাছে পরাজিত দশটি অপূর্ণ আবেগের গল্প এই বই।
This was a quick read. The book contains 10 short stories. All about love that never got fulfilled or unfinished love! About the stories: some of them are really nice, specialty the first one. Loved it. Loved the author’s writing style. But some of the stories seemed too rushed. The writing style felt too casual. May be I need to read more of her books to actually get a jest of the style.
গল্পগুলো নিয়তিনির্ভর। ইনেভিটেবল এর কাছে প্রতিটি চরিত্রই হার মেনেছে। প্রথম দু'টো গল্প দারুণ, বাকিগুলো প্রেডিক্টেবল, কেবল বইয়ের শিরোনাম নয়, বিষয়বস্তুর কারণেও। লাইট রীড হিসেবে রেকমেন্ডেড।