একের পর এক অঘটন ঘটছে অ্যাকশন সিনেমার শুটিং ইউনিটে। এগুলো কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি ধুরন্ধর কারও নীলনকশা? কেউ কি ফাঁদে ফেলতে চাইছে নামি স্টান্টম্যান ভিনসেন্ট ডিজেলকে? শুটিং দেখতে গিয়ে রহস্যটার সঙ্গে জড়িয়ে গেল আদনান, মুকিত, দীপ্র আর পাভেল। তদন্তে নেমেই দিশেহারা অবস্থা হলো ওদের। সন্দেহভাজন যে একজন নয়, একাধিক! এদিকে শুধু বিপদ নয়, মৃত্যুও ছোবল হানতে পারে যখন-তখন! এ অবস্থায় চার বন্ধু কি পারবে কেসটার কিনারা করতে?
ডিউক জনের জন্ম ৩১ জানুয়ারি, ১৯৮৪ সালে। সেবা প্রকাশনীতে প্রথম শুরু হয় ২০১৪ সালে ওয়েস্টার্ন 'সুবর্ণ সমাধি' দিয়ে। এর পর জুল ভার্নের 'দক্ষীনের যাত্রী' আসে ২০১৫ সালে। এর পর তার কাছ থেকে আমরা পেয়েছি উইলিয়াম হাওয়ার্ড, এমিলিও সালগ্যারি, পার্ল এস. বাক, পি. জি ওডহাউস, মিশেল মোরান, মেরাল ওকায়, রবার্ট ই. হাওয়ার্ড সহ অনেক দুর্দান্ত ও বিক্ষাত লেখকদের বইগিুলো। ওয়েস্টার্ন সিরিজের বই ’সূবর্ণ সমাধি’, তিনটি পিশাচ কাহিনী ও হরর কাহিনীর বই, এবং সব শেষে প্রকাশিত হয়েছে মাসুদ রানা সিরিজের সর্বশেষ বই (৪৬৭ তম) ‘শকওয়েভ’, বইটিটে কাজীদার পাশাপাশি সহযোগী লেখক হিসেবে তিনি আছেন।
‘পাগলা দাশু’ দিয়ে গল্পের বই পড়ার হাতে খড়ি হলেও যারা আমাকে পুরোদস্তুর পাঠক বানিয়েছেন, তাদের নাম নিতে গেলে সর্বপ্রথম আসবে সেবা প্রকাশনীর কথা। আমার বয়সী যে ক'জন পাঠক আছেন তাদের সবারই মনে হয় একজন পাঠক হয়ে ওঠার পেছনে কোথাও না কোথাও সেবা প্রকাশনীর সুলেখক রকিব হাসানের বিখ্যাত ‘তিন গোয়েন্দা’ সিরিজের অবদান আছে। বছর শেষে বার্ষিক পরীক্ষা যখন শেষ, তখন মায়ের কাছ থেকে ঘ্যান ঘ্যান করে ১০০ টাকা দিয়ে দুই তিনটা তিন গোয়েন্দা কিনে বসে যেতাম সক্কাল সক্কাল। কিশোর, মুসা, রবিন, জরজিনা পার্কার, ফারিহা, শুটকি টেরি, ফগর্যাম্পারকটদের সাথে কেটেছে বহু না ঘুমানো দুপুর। অসংখ্য আড্ডার টপিক হিসেবে আমাদের পাশের বেঞ্চেই যেন বসে ছিলো এরা। আস্তে আস্তে বড় হলাম, রকিব হাসান লেখা কমাতে কমাতে একদম ছেড়েই দিলেন। ওদিকে আমিও তিন গোয়েন্দা পড়া কমিয়ে দিলাম, কারণ তদ্দিনে পাঠকমনে জায়গা করে নিয়েছে শার্লক হোমস, মাসুদ রানা, মিসির আলি, হিমু আরো অনেকে। তীব্র ভালোলাগার সেই তিন গোয়েন্দা আস্তে আস্তে চলে গেল মনের একদম গহীন কোন কুঠুরিতে।
এরপর অনেক বইয়ের সান্নিধ্যে আসা হয়েছে। তিন গোয়েন্দার চেয়ে অনেক অনেক কাহিনীর বই পড়া হয়েছে। কিন্তু বলতে দ্বিধা নেই তিন গোয়েন্দার গল্পগুলো আমারও আজো মনে আছে, যেখানে এরপরের অনেক অনেক ভালো বইয়ের কাহিনী মনে নেই। তিন গোয়েন্দা মনে আছে, পরে পড়া অন্য ভালো বই মন নেই; এই যে ব্যাপারটা আমাকে ২০২০ সালে করোনার অবসরে ভাবালো। ভাবতে গিয়ে বুঝলাম, তিন গোয়েন্দাকে আমি আসলে ধারণ করেছিলাম। এ প্রসঙ্গে শ্রদ্ধেয় প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের একটা কথা না বললেই নয়। তিনি বলেছিলেন, ‘বই পড়ার কাজটি অইলো অন্য রকম। আপনে যখন মনে করলেন কোনো বই পইড়্যা ফেলাইলেন, নিজেরে জিগাইবেন, যে বইটা পড়ছেন, নিজের ভাষায় বইটা আবার লিখতে পারবেন কি না। আপনের ভাষার জোর লেখকের মতো শক্তিশালী না অইতে পারে, আপনার শব্দভান্ডার সামান্য অইতে পারে, তথাপি যদি মনে মনে আসল জিনিসটা রিপ্রোডিউস না করবার পারেন, ধইরা নিবেন, আপনের পড়া অয় নাই।’ তিন গোয়েন্দার ক্ষেত্রে আমার এটাই মনে হয়। আমাকে তিন গোয়েন্দা এতটাই আপন করে নিয়েছিলো, হয়তো চেষ্টা করলে একটা তিন গোয়েন্দা ফ্যান ফিকশন আমি নিজেও লিখে ফেলতে পারবো।
এতসব কথা বলার হেতু কি? হেতু একটাই। ১৯৮৪ সালে জন্মে নেয়া সেবার সুলেখক ডিউক জনও সম্ভবত আমার মতই কৈশোর কাটিয়েছেন। তিন গোয়েন্দাকে নিয়ে তার অনুভূতি হয়তো আমার মতোই। তার জের ধরে তিনি যখন ঘোষণা দিলেন, কিশোরদের পড়ার উপযোগী করে তিন গোয়েন্দার আদলে একটা মৌলিক সিরিজ করবেন, তখন আমি একই সাথে আনন্দিত হলাম আবার ভয়ও পেলাম। ঠিক ঠাক মতো লিখতে পারবেন তো তিনি? রকিব হাসান যে পথ দেখিয়েছিলেন সে পথে হাঁটতে পারবেন তো তিনি?
অবশেষে সব জল্পনা কল্পনা এড়িয়ে অবসর প্রকাশনা সংস্থা থেকে ২০২২ এর ২৫ শে ফেব্রুয়ারীপ্রকাশিত হলো ডিউক জনের কিশোরদের জন্য লেখা মৌলিক চার গোয়েন্দা সিরিজের ১ম বই ‘চার মূর্তি’। আজ সে বই নিয়েই লিখবো।
প্লট : আদনানদের পুরনো বাতিল মালের স্যালভেজ ইয়ার্ডে একটা সিনেমার স্টান্ট দৃশ্যের শুটিং করতে চায় এক হলিউড পরিচালক। সে জন্য মোটা অংকের টাকা গুনতেও সমস্যা নেই তার। কিন্তু শুটিং শুরু হতেই দেখা যায় একের পর এক বিপত্তি। কেউ কি ফাঁদে ফেলতে চাইছে বিখ্যাত স্টান্টম্যান ভিনসেন্ট ডিজেলকে? শুটিং দেখতে গিয়ে রহস্যটার সঙ্গে জড়িয়ে গেল আদনান, মুকিত, দীপ্র আর পাভেল। তদন্তে নেমেই দিশেহারা অবস্থা হলো ওদের। সন্দেহভাজন যে একজন নয়, একাধিক! এদিকে শুধু বিপদ নয়, মৃত্যুও ছোবল হানতে পারে যখন-তখন! এ অবস্থায় চার বন্ধু কি পারবে কেসটার কিনারা করতে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া : ৮০ পৃষ্ঠার এই বইটা পড়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি, তিন গোয়েন্দার সোনালী দিনে ফিরে গেছি এমনটা বললে বেশি বলা হয়ে যাবে। ডিউক জন চেষ্টা করেছেন কিশোরদের জন্য একটা বই লিখতে এবং শুরুটা ধামাকাদার না করতেও পারলেও একদম খারাপ করেননি। তিন গোয়েন্দার সেরা গল্পগুলোর মত না হলেও এরকম গল্পও আমি তিন গোয়েন্দায় পড়েছি এবং একটা সিরিজের শুরু হিসেবে লেখাটা মোটামুটি ভালোই হয়েছে। তবে না পাওয়ার লিস্টি করলে শুরুতেই বলবো, তিন গোয়েন্দার যে কোন বই পড়লেই যেমন আলাদা করে কিশোর, মুসা, রবিনকে চেনা যায় এখানে সে জিনিসটা মিসিং ছিলো। মানে চার চরিত্রের কাউকে আলাদা করে চেনা যায়নি। আরেকটা জিনিস, যেটা আমার ভালো লাগেনি তা হলো, এই বইটা এক্সাক্ট তিন গোয়েন্দাকে বেস করেই গড়ে উঠেছে। মানে পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ডের মতো এখানেও একটা স্যালভিজ ইয়ার্ড আছে, মেরি চাচীর আদলে আছেন শারমিন রেজা যিনি কিনা মেরি চাচীর মতই দারুণ দারুণ খাবার রান্না করেন, চীফ ইয়ান ফ্লেচারের মত এখানেও আছেন গোয়েন্দাদের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন একজন পুলিশ চীফ। এগুলো আমাকে অবশ্যই তিন গোয়েন্দাদের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিলো কিন্তু একই সাথে এই বইটাকে মৌলিক ভাবতে কষ্ট হচ্ছিলো।
তবে এটা তো কেবল বিশাল এক জার্নির শুরু। এখনও অনেক পথ পাড়ি দেয়া বাকি আছে। আর ডিউক জন সেটা করতে পারবেন বলেই আমার পূর্ণ বিশ্বাস আছে। কারণ ওনার লেখায় দারুণ সাবলীলতা আছে। সেই সাথে আছে পুরনো সেই তিন গোয়েন্দার লেখার ফ্লেভার। তো সব মিলিয়ে আমি খুবই আশাবাদী এই সিরিজ নিয়ে। সেই সাথে ডিউক জন আমার কাছ থেকে একটা আন্তরিক ধন্যবাদ পাবেন কিশোরদের টার্গেট করে এই সিরিজটা লেখার উদ্যোগ নেয়াতে। কিশোরদের নিয়ে বাজারে খুব বেশী সিরিজ আছে কিনা আমার জানে নেই, তবে আপনার এগিয়ে আসার মাধ্যমে হয়তো আরো অনেকেই এগিয়ে আসবে এটা ভেবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটু হলেও আশাবাদী হচ্ছি। তবে যেখানে পাঠক হচ্ছে কিশোররা, সেখানে ৮০ পৃষ্ঠার বইয়ের মুদ্রিত মূল্য ১৮০ থেকে আরো একটু কমিয়ে রাখা যায় কিনা সেটা ভেবে দেখার অনুরোধ রইলো।
গাল ফুলিয়ে বসে আছে জিনা পারকার। সেটা তিন গোয়েন্দার নজর এড়াল না৷ কিশোর শীতল দৃষ্টিতে জিনাকে পরখ করছে৷ এমন সময় রবিন নিচু স্বরে বলে উঠল, 'মেয়েটার কিছু একটা হয়েছে। আজ সকাল থেকে তার মাঝে একধরনের অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করছি।'
'খাইছে! ভূত-প্রেতেে ধরেনি তো?' আতঙ্কিত কণ্ঠে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল মুসা৷ ভয়ে তার পেট চো-চো করছে। খিদে লাগার আর সময় পেল না।
জিনার ব্যাপারে এবার দলনেতা কিশোরের মন্তব্য শোনার অপেক্ষায় রইল রবিন আর মুসা। কিন্তু সে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে আছে। দীর্ঘ নীরবতা কাটিয়ে জিনার কাছে এগিয়ে গেল কিশোর৷
'অভিমানের কারণটা জানতে পারি?'
'আমি কি তোমাদের দলের কেউ না?' প্রশ্নের জবাবে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল জিনা৷
'অবশ্যই। আমরা তো একই দল।'
'তাহলে কেন আমরা চার গোয়েন্দা নই?'
জিনার এবারের প্রশ্নে কিশোরের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। বুকের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো৷ আরেকটু কাছে গিয়ে জিনার কাঁধে হাত রাখল কিশোর। কাঁপা গলায় বলল, 'চার গোয়েন্দা হবার চান্স নাই। ইতোমধ্যে লেখক ডিউক জন এই নামে সিরিজ শুরু করেছেন। চার গোয়েন্দা সিরিজের প্রথম বই চার মূর্তি এখন সর্বত্র এভেইলেবল। সময় করে পড়তে পারো।'
জিনা পারকার পরবর্তীতে 'চার মূর্তি' পড়েছে কী না জানি না। কিন্তু আমি পড়েছি৷ বইটি নিয়ে পাঠ প্রতিক্রিয়া জানানোর পূর্বে মনে হলো তিন গোয়েন্দাকে একটু রি-ক্রিয়েট করে স্মরণ করা যাক৷ কেননা বইটি মূলত তিন গোয়েন্দা সিরিজের আদলেই তৈরি করা হয়েছে। যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, আনন্দের।
তিন গোয়েন্দার সাদৃশ্যে এ বইতেও স্থান-কাল, চরিত্র, কাহিনি বিন্যাসে ব্যাপক মিল রয়েছে৷ তবে মৌলিকত্ব যে একেবারেই নেই তা নয়৷ লেখকের লিখনশৈলী, উপস্থাপনে নতুনত্ব আছে৷ সমকালীন নানান বিষয়, ঘটনাকে উপজীব্য করে গল্প-সংলাপ তৈরি করা হয়েছে যা বেশ উপভোগ্য ছিল৷ দৃশ্যের নিখুঁত বর্ণনায় প্রতিটি ঘটনা যেন চোখের সামনে ঘটতে দেখা যায়। যা আপনাকে বইয়ের প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা অবধি আটকে রাখবে৷
তবে বইটির একমাত্র দুর্বল দিক- চরিত্র গঠনে৷ এমনিতেও পড়ার সময় তিন গোয়েন্দার চরিত্রগুলো বারবার মনে পড়ছিল৷ কিন্তু স্বভাব বৈশিষ্ট্যে তাদেরকে যেমন পৃথকভাবে সনাক্ত করা যায়, চার মূর্তিতে আদনান, মুকিত, দীপ্র ও পাভেলকে আলাদাভাবে সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি৷ বরং মাঝে মধ্যে খুব কনফিউশান তৈরি হতো কে কী বলছে বা করছে! আশা করি সিরিজের পরবর্তী বইয়ে এই জটিলতার সমাধান মিলবে।
১৮ অধ্যায়ে বিভক্ত ৮০ পৃষ্ঠার বইটি এক বসাতেই পড়ে ফেলা সম্ভব। কিশোর উপযোগী অ্যাডভেঞ্চার-থ্রিলার উপন্যাস হিসেবে নিঃসন্দেহে সুখপাঠ্য। বইয়ের নজরকাড়া প্রচ্ছদ আর প্রোডাকশন বেশ চমৎকার।
কাহিনি সংক্ষেপ- সুদূর ক্যালিফোর্নিয়ায় বাঙালি কমিউনিটিতে চার গোয়েন্দার বসবাস। আদনানদের স্যালভেজ ইয়ার্ডে সিনেমার শ্যুটিং করার চুক্তি করেন হলিউডের অন্যতম প্রযোজক-পরিচালক ড্যানি পেপ। কিন্তু শ্যুটিং শুরুর পর থেকেই একের পর এক অঘটন ঘটছে সিনেমার সেটে। এগুলো কি নিছকই দুর্ঘটনা, নাকি ধুরন্ধর কারও নীলনকশা? কেউ কি ফাঁদে ফেলতে চাইছে নামি স্টান্টম্যান ভিনসেন্ট ডিজেলকে?
সত্যের খোঁজে রহস্যটার সঙ্গে জড়িয়ে গেল আদনান, মুকিত, দীপ্র আর পাভেল। তদন্তে নেমেই দিশেহারা অবস্থা হলো ওদের। সন্দেহভাজন যে একজন নয়, একাধিক! এদিকে শুধু বিপদ নয়, মৃত্যুও ছোবল হানতে পারে যখন-তখন! এ অবস্থায় চার বন্ধু কি পারবে কেসটার কিনারা করতে?
বই: চার মূর্তি লেখক: ডিউক জন প্রচ্ছদ: সাদাতউদ্দিন আহমেদ এমিল প্রকাশনী: অবসর প্রকাশনা সংস্থা পৃষ্ঠা: ৮০ মলাট মূল্য: ১৮০ টাকা .
প্রথম বই হিসেবে খারাপ বলা যাবে না৷ সামনে আশা করি আরও ভালো কিছু হবে৷ তবে চরিত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য ছিল না খুব একটা৷ নিজস্বতা ছিলো না তেমন কারোরই। কিশোর গোয়েন্দাদের নাম চয়ন আরেকটু ভাল কিছু হতে পারতো। আর এত ছোট্ট কলেবরের বই পেপারব্যাকে হলে ভীষণভাবে মানিয়ে যেতো। প্রচ্ছদটাও মানানসই। ডিউক জনের বর্ণনাশৈলী সুন্দর, সেবার ভিন্টেজ ফ্লেভার আছে। কিশোর গোয়েন্দা, পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড, মেরি চাচী, চীফ ইয়ান ফ্লেচারের আদলে গড়া মঞ্চটা সামান্য হলেও মনে করিয়ে দিচ্ছিল সোনালী যুগের তিন গোয়েন্দাকে৷
চার মূর্তি শুনলেই কি টেনিদা-র কথা মনে পড়ে? দাঁড়ান দাঁড়ান! আমাদের এই চার মূর্তির সাথে আসলে টেনিদার সেভাবে সংযোগ নেই। বরং “তিন গোয়েন্দা”-কে প্রচন্ড মনে পড়বে। যেমন, চার মূর্তির প্রধান আদনান রেজার চোখের বুদ্ধির ঝিলিক, এক মাথা কোঁকড়া চুল আর ঠোঁটে চিমটি কাটা কিশোরের কথা মনে করিয়ে দিলেও মুসার “খাইছেরে!মারছেরে!”- বলার ধাঁচটা এখানে বগলদাবা করেছে সে। ওদিকে মুসার মতো সুঠাম দেহের অধিকারী হলেও খাবারের জন্য পাগলামি নেই পাভেল রোজারিও-র। বরং শারমিন আন্টির চেরি পাইয়ের কথা শুনলেই ঝকঝকা সাদা দাঁত সবক’টা বের করে, সবার আগে ছুট লাগায় মুকিত ইকবাল। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে “শুঁটকি টেরি”-ও বাদ যায়নি। শুধু এখানে তার নাম হয়েছে দীপ্র চৌধুরী আর গোয়েন্দাদের শত্রু না হয়ে বরং সে চার মূর্তির-ই একজন! এভাবেই “তিন গোয়েন্দা”-র আশ্রয়ে ডিউক জন গড়েছেন তাঁর “চার মূর্তি”-কে। শারমিন আন্টি যেন মেরি চাচীর-ই হারিয়ে যাওয়া বোন- মোটাসোটা গড়ন এবং জায়গামতো মেজাজ চড়ে যাওয়ার স্বভাব ছাড়াও তাদের দু’জনের মূল মিলের জায়গা হচ্ছে দু’জনের রান্নাতেই যেন জাদু মাখা! আর পাশা স্যালভিজ ইয়ার্ড এখানে রেজা স্যালভিজ ইয়ার্ড যার কর্ণধার নাসিম রেজা, আদনানের বাবা। চার মূর্তি সিরিজের প্রথম বইটাই “চার মূর্তি”। শেষ মূহুর্তে শুটিং স্পট ফাঁকা না পাওয়ায় স্যালভিজ ইয়ার্ডটা-কে যুতসই মনে হওয়ায় নাসিম-শারমিন দম্পতির কাছে অনুরোধের পর ওখানটায় সিনেমার একটা স্টান্ট দৃশ্যের শুটিং করার অনুমতি পান পরিচালক-প্রযোজক ড্যানি পেপ। শুটিং শুরু হতে না হতেই একে একে যখন দুর্ঘটনা ঘটতে শুরু করে তখন আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে না চার গোয়েন্দা, কে বা কারা এসব দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে আর কেন-ই বা ঘটাচ্ছে- এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করে ছাড়বেই ওরা চার মূর্তি। আমাদের দেশীয় সাহিত্যে সত্যিকার অর্থে কিশোরদের জন্য লেখনীর স্বল্পতা আছে। “চার মূর্তি”- এই জায়গাটায় কিছু হলেও ভূমিকা রাখবে। তিন গোয়ন্দা পড়তে গিয়ে যেমন মাঝেমধ্যে কিশোরকে অতিপ্রাকৃত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী মনে হয়, এখানে আদনানকে তেমন মনে হবে না। বরং তার পর্যবেক্ষণ শক্তিটা হয়তো অন্য চার-পাঁচটা কিশোরের চেয়ে বেশি প্রখর। প্রথম রহস্যটাও মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মতোন জটিল নয়। আট-দশ বছর বয়সী পাঠকদের জন্য সহজেই মাথায় ঢুকে যাবে এমনভাবেই রহস্যের জাল বুনেছেন লেখক। ডিউক জনের লেখনীও খুব ঝরঝরা। চট করে কখন বই পড়া হয়ে যাবে টেরও পাওয়া যায় না। ডেথ মেটাল আর বিটিএস-এর মিউজিক নিয়ে আবহমান কাল ধরে চলে আসা বিতর্ক-কে পাভেল আর মুকিতের মাঝে জায়গা দেয়ায় চরিত্রগুলোকে আরো বেশি কাছের কাছের মনে হয়। লেখনীকে আরো প্রাণবন্ত করেছে লেখকের গল্পের সাথে মানানসই নানা বাস্তব চরিত্রকে বিভিন্নভাবে লেখায় জড়িয়ে আনার ব্যাপারটা। যেমন, ছবির নায়িকার নাম “অ্যাম্বার নিউম্যান”। আর কেন্দ্রবিন্দু, স্টান্টম্যান হচ্ছেন “ভিন্সেন্ট ডিজেল”! মনে হচ্ছে না যে সবগুলো নামই কেমন যেন চেনা চেনা? সব মিলিয়ে, মজায় মজায় সময় কাটানোর জন্য সিম্পলের মধ্যে গর্জিয়াস একটা বই হতে পারে “চার মূর্তি”। কিশোর বয়সী পাঠকদের জন্য মানানসই একটা সিরিজ লেখার উদ্যেগ নেয়ার জন্য আর আমার মত বয়স্ক পাঠকদের নস্টালজিয়ায় ভোগানোর জন্য ডিউক জন-কে ধন্যবাদ!