পা ছড়িয়ে খাটের সাথে হেলান দিয়ে মেঝেতে বসে আছে হৈমন্তী। ডান হাতটা তার উরুর উপরে হলেও বাম হাতটা মেঝেতে ঝুল অবস্থায়। বাম হাতের কব্জির উপর অংশ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেড়িয়ে মেঝেতে ঝড়ে পড়ছে। সাদা টাইলসের মেঝে ইতোমধ্যেই বেশ বিস্তৃত স্থান জুড়ে রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। এত রক্ত ঝড়ার কারণ, বাম হাতের নার্ভ দ্বিখণ্ডিত। চোখের জল গাল বেয়ে গড়িয়ে এসে চিবুকে মিশে যাচ্ছে।
নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে শূন্যে। যেন অন্য রাজ্যে হারিয়ে গেছে। কিছু স্মৃতি হয়তো চোখের কোণে ধরা দিয়েছে। হয়তো প্রিয় বাবা-মা, বোনের সাথে কাটানো অতীতের সুখময় স্মৃতিগুলো ভাসছে।
পৃথিবী ভয়ানক সুন্দর! অথচ কেউ বুঝতে পারে না। পারে না বলেই হয়তো ছেড়ে চলে যেতে চায়। যদি জানত, কোন উপায়ে সুখী থাকা যায়! তবে কি কেউ নিজ থেকে চলে যেতে চাইত? সময় ফুরিয়ে গেলেও তো আফসোস থেকে যেত!
হৈমন্তীকে কোনোভাবে তার প্রিয় মানুষ ধোঁকা দিয়ে তবে খুন করল? নাকি সে আত্মহত্যা করল? আত্মহত্যা হলেই-বা কেন করল? জানতে হলে পড়তে হবে রক্তাক্ত খাম বইটি!
প্রতিশোধের গল্প কখনও তৃপ্তিদায়ক হয় না। আত্মতুষ্টি এনে দিতে পারে না। যেখানে লোভ, কাম এবং ক্রোধ-এর বিপরীতে জাগ্রত হয় জিঘাংসা’র অনুভূতি। প্রতিহিংসা দূরের কোনো মানুষ থেকে নেওয়া হয় না; কাছের মানুষটি যখন এমন কোনো কাজ করে বসে—তখন আর নিজের সত্তাকে থামিয়ে রাখা যায় না। তবে কি এইভাবে প্রতিশোধের বিরুদ্ধে পালটা খেলা অক্লেশে খেলে যেতে হবে? সব সমস্যার সমাধান রয়েছে, তবে প্রতিশোধের কেন নেই?
‘ফাঁদ’ শব্দটি প্রতিশোধের সূচনার অংশ। যখন কাউকে জাগতিক মোহ দ্বারা ভুলিয়ে, প্রতিপত্তির লোভ দেখিয়ে উদ্দেশ্য হাসিলের প্রয়াস করতে—ফাঁদ সবচেয়ে আকর্ষণীয় টোপ হয়। এই নিয়ে সাহিত্য কম লেখালিখি হয়নি, বর্তমানেও এই ধারা চলমান। প্রতিশোধের গল্পগুলো দুঃখের হয়, শেষটা সুন্দর হলেও তাতে মলিনতা বিরাজমান থাকে। চেয়েও সেই গ্নানি অতি সহজে মোছা যায় না। প্রতিশোধের পরিশেষে বেছে নিতে হয়; জীবন ধ্বংসের সহজ ব্যাখা।
❛রক্তাক্ত খাম❜ তেমনই এক প্রতিশোধের প্রলেপ মাখা, সুখপাঠ্য একটি উপন্যাসিকা। সাধারণ প্লট কিন্তু দারুণ উপস্থাপনা। চরিত্রদের সাথে মিশে যাওয়ার মতো লিখনপদ্ধতি, আর বর্ণনা শৈলীর সাবলীল ব্যবহার।
গল্পটির হৈমন্তী চরিত্রের উত্থান-পতনের। পঙ্গু বাবা, গৃহিণী মা এবং ছোট বোনকে নিয়ে যার ছোট্ট একটি সংসার। চাকরির সুবাদে পরিচয় ঘটে সায়রের সাথে। হৈমন্তীর রূপে সে মগ্ন। ভালোবেসে ফেলে তাকে। অতঃপর বিয়ের প্রস্তাব। আচমকা হৈমন্তীর বাবা মারা যাওয়াতে তাদের পরিবারে নেমে আসে দুঃখ। কীভাবে কাটিয়ে উঠবে হৈমন্তী? সায়র কি তার পাশে এখনও দাঁড়াবে? বাড়িয়ে দিব ভালোবাসার হাত?
এদিকে সায়রের বাড়ির দারোয়ানের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। একটি ছায়াকে তার বাড়িতে ঘুরতে দেখা যায়! সায়র নিজে দেখেছে। একদিন পর মারা যায় কাজের বুয়া; বাদ যায়নি দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত ড্রাইভারও। কারা করছে তাদের খুন? সেই ছায়া কার? অশরীরী নয় তো? এক দিকে ভালোবাসা অন্য দিকে হতাশা। সায়রের এই পরিস্থিতিতে হাত বাড়িয়ে দেয় তারই বন্ধু মিজান। খুনের রহস্য তদন্ত করতে মাঠে নামে পুলিশ অফিসার সিফাত। কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাপ! এখন?
❛রক্তাক্ত খাম❜ উপন্যাসিকাটি সামাজিক ও থ্রিলারের সংমিশ্রণে লেখা। তাই এটিকে সামাজিক থ্রিলারও বলা যায়। সাধারণ কিছু খুন আর তার পেছনে লুকানো রহস্য। উক্ত উপন্যাসে থ্রিল ‘আউট অব দ্য টাউন’ না হলেও গল্প অনুযায়ী যা বেশ মিশমিশে লেগেছে। লিখনপদ্ধতিতে আকর্ষণীয় এক টোন সেট করার কারণে। যেখানে গল্প ও চরিত্রদের কর্মপ্রবাহ মুখ্য। কোনো অংশে কাহিনি গড়পড়তা লাগেনি। সংলাপও মানানসই। এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো। সমাজের একটি নিষিদ্ধ দিক নিয়ে ভালো গল্প ফাঁদা হয়েছে। যারা লাইট থ্রিলার বা হালকা ধাঁচের গল্প পড়তে পছন্দ করেন তারা বইটি লুফে নিতে পারেন। ভারী কিছুর আশা এই উপন্যাস থেকে না করা ভালো।
লেখিকা গল্প বলিয়ে, ভালোভাবে সেটা করেছেন। সেক্ষেত্রে ওনার কার্য সফল বলা যায়। আশা করি আগামীতে আরও ভালো ভালো কাজ পাঠকদের উপহার দিবেন। কাহিনির শুরুটা যেমন মেদ-হীন তেমনই সুন্দর সমাপ্তি।
বইয়ের সম্পাদনা দুয়েকটা জায়গা বাদ দিয়ে ভালোই হয়েছে তবে বানানে ভুগিয়েছে। প্রচলিত বানানের দুইটা প্যাটার্ন-সহ সহজ অনেক বানান ভুলের দেখার পেয়েছি। টাইপোর কারণে বাক্যের অর্থ ও নামের সামান্য গড়মিল হয়েছে। সমাপিকা ও অসমাপিকা ক্রিয়ার (উঠে, ওঠে) ভুল রয়েছে। এ-ছাড়া ‘রক্তাক্ত খাম’ বইয়ের নামকরণের সাথে কাহিনির তেমন মিল পেলাম না। চিঠির কথা বলা হলেও রক্তাক্ত কোনো খামের দেখা মিলেনি। রূপক অর্থে চিন্তা করলেও সেটাও অমূলক মনে হয়।
বর্ণলিপি প্রকাশনীর প্রোডাকশন বেশ ভালো। দাম ও মান অনুযায়ী। ভেতরে আফটার লেখকের কাজ; আরেকটু বেটার হলে দারুণ হবে। ৩০ জানুয়ারি, ২০২২ সালে প্রকাশিত হওয়া বইটির মূল্য ২৫০ টাকা এবং পৃষ্ঠা সংখ্যা ১২৭। ফন্ট সাইজ সামান্য বড়ো (.৫) করা যেত বলে মনে করছি।
মূলভাব: সাধারণত থ্রিলার হিসেবে গল্পটা একদম সিম্পল। বলা যায় সাদামাটা। কিন্তু এই সাদামাটার মাঝেই লুকিয়ে আছে করুণ এক ঘটনা এবং ভয়ানক প্রতিশোধ। গল্পটাকে কখন কোথায় কীভাবে লেখক গড়িয়েছে তা আপনি না পড়া অবধি বুঝতে পারবেন না। গল্পটা শুরু হয় এক ঝলক চমক দিয়ে। যেখানে দেখতে পাবেন, বিছানায় একটা ছেলে পড়ে আছে। কিন্তু রক্তাক্ত বিছানা। তার পাশে একটা মেয়ের হাতের কব্জি কাটা। রক্তে মেঝে লাল হয়ে আছে। অপরদিকে বাহির থেকে পুলিশ দরজা খোলার জন্য প্রতিনিয়ত ডেকে যাচ্ছে। উপায় না পেয়ে দরজা ভাঙতে বাধ্য হয়। এখন আপনার মনে নিশ্চয়ই প্রশ্ন জাগবে, কেন এই ছেলে-মেয়ে দুটো রুমে এভাবে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে? কেউ কি তাদের মেরে ফেলে রেখে গেছে? নাকি তাদের দুজনের মাঝে লড়াইতে দুজনেই মারা পড়েছে? পুলিশ এসে কী করবে? এরকম অসংখ্য প্রশ্ন আপনার মস্তিষ্কে ভরিয়ে ফেলবে বা ফেলতে পারে। এই প্রশ্নগুলোর জবাব পাবেন, যখন আপনি সম্পূর্ণ গল্পটা এক ধারায় পড়ে যাবেন। আপনার সাথে রীতিমতো মাইন্ড গেম খেলার চেষ্টা চালাবেন লেখক। আপনি যদি বুঝে যান, কে করছে এমন বা কী হতে যাচ্ছেন। তবুও কৌতূহলী হয়ে বাধ্য হবেন পড়তে। সত্যি বলতে গল্পটা সাদামাটা হলেও লেখনী এবং সাজানো গল্পটাকে প্রচণ্ড পরিমাণে সুন্দর করে তুলেছে। যা না পড়া অবধি অনুধাবন করা অসম্ভব বলা যায়।
প্রচ্ছদ: আমরা যতই বলি না কেন, ডোন্ট জাজ এ বু বাই ইটস কভার। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে একটা বইয়ের মূল এবং প্রধান আকর্ষণীয় বিষয়বস্তুই হলো কভার। গল্পের ঘটনা, কাল-ক্রম বিভিন্ন বিষয় মাথায় রেখে একটা বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি করা হয়। সাধারণত বলা যায়, প্রতিটি প্রচ্ছদেরই নিজস্ব একটা গল্প আছে। আর এই নিজস্ব গল্পটাও তৈরি হয় গল্প থেকেই। রক্তাক্ত খামের প্রচ্ছদটি আসলেও অনেক সুন্দর হয়েছে। বইয়ে থাকা গল্পটি পড়ার পর বুঝতে পারলাম, গল্প থেকে প্রচ্ছদ যেন নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এরজন্য প্রচ্ছদ প্রস্তুতকারকেও একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। গল্পটার বেশ কিছু দৃশ্য প্রতিফলিত হয়েছে প্রচ্ছদে। যা একটি সফল প্রচ্ছদ হিসেবে অভিহিত করা যায়।
উৎসর্গ: বইয়ের উৎসর্গটা লেখক তার হাসবেন্ড এবং পাঠককে করেছেন। প্রিয় মানুষকে উৎসর্গে রাখা কিংবা থাকার সৌভাগ্য খুব কম মানুষের ভাগ্যে হয়। আর যাদের ভাগ্যে হয়, তারা প্রিয় থেকেও প্রিয়তম।
চরিত্র: বইয়ের চরিত্রগুলোর ব্যাপারে বলতে গেলে একপক্ষীয় হয়ে যাবে। কেননা একটি রেখে আরেকটির প্রশংসা করা যাবে না। সাধারণার্থে বলতে হয়, গল্পের প্রতিটি চরিত্রই যেন যার যার নিজের অবস্থানে চিরঞ্জীব। প্রত���টি চরিত্রই সময় নিয়ে বিল্ডাপ করেছেন লেখক। পাশাপাশি প্রতিটি চরিত্রকেই বাহ্যিক এবং ভেতরের রূপ বিশ্লেষণ করেছেন। কিছু চরিত্রকে নিয়ে লেখক একটু দ্রুতই শেষ করে দিয়েছেন। আমার মতে তাদেরকে গল্পে আরেকটু প্রয়োজন মনে হয়েছে। আবার একদিক থেকে বলতে গেলে, লেখক তার দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিকই লিখেছেন। যে চরিত্রগুলোর অবদান দ্রুত শেষ হয়ে গেছে, তাদেরকে এর পর আর প্রয়োজন ছিল না বা তাদেরকে বিস্তার করলে তখন বিরক্তি ভাব আসার খুব একটা প্রবণতা ছিল। এদিক থেকে হিসেব করলে লেখক তার তার অভিজ্ঞতা মোতাবেক ঠিক আছেন।
কাহিনি: গল্পের কাহিনি মূলভাবেই বিশ্লেষণ করেছি। তবুও পুনোরায় আরেকটু করার চেষ্টা করি। কাহিনিটা একটা মেয়েকে ঘিরে। যার সাহারায় সৃষ্ট হয়েছে একাধিক চরিত্র। মূল চরিত্রটাকে ঘিরে একাধিক চরিত্রগুলো শক্তিশালী গঠনে ভূমিকা রেখেছে। এমনকি মূল চরিত্রকে বিল্ডাপের ক্ষেত্রেও বাকি চরিত্রগুলোর অবদান রয়েছে। প্রধান চরিত্রটির সুন্দর একটি জীবন থেকে মুহূর্তেই ধ্বসে পড়ার চিত্র পাওয়া যায়। পরমুহূর্তেই প্রধান চরিত্রটির স্থান ধরে রাখার জন্য লেখক আরেকটা সাইট চরিত্র বিল্ডাপ করেন। আচমকা সকল পাঠককে চমকে দিয়ে ধ্বসে পড়া সেই প্রধান চরিত্রকে খুঁজে পাবে পাঠক। প্রধান চরিত্র আবার তার স্থান দখল করে গল্পের শেষ অবধি প্রতিশোধপরায়ণা হতে বাধ্য করা হয়। কাহিনি প্রকাশ করতে গেলে স্পয়লার হয়ে যাবে। কেননা গল্পের প্রত্যেকটা ঘটনা এবং দৃশ্যপট একটি আরেকটির সাথে সংযুক্ত। একটি ঘটনা, দৃশ্যপট ছাড়া অন্য একটি ঘটনা সম্পূর্ণ অচল। লেখক তার অভিজ্ঞ হাতের ছোঁয়ায় একটা সাধারণ গল্পকেও অসাধারণে পরিণত করেছেন। যেটা সত্যিই মন মুগ্ধকর করার মতো বিষয়। কেননা আপনি গল্পের যদি কোথায় ধরে ফেলেন বা সাসপেন্স খুঁজেও পান, তবুও আপনার পড়ে যেতে হবে। এমনটা নয় যে, আপনি সাসপেন্স ধরে ফেলেছেন বলে বিরক্তির কারণ হয়ে উঠবে। লেখক কোনোভাবেই আপনাকে বিরক্ত হবার সুযোগ দেবে না এতটুকু নিশ্চিত থাকতে পারেন। আমাকে একজন পাঠক হিসেবে কাহিনি সম্পর্কে বলতে বলব, লেখনী এবং সমস্তকিছুর উপর ভিত্তি করে ফার্স্টক্লাস।
শিক্ষা: এই গল্পে শিক্ষা হিসেবে রয়েছে, আমাদের বিশ্বাস। আমরা যাদের বা যাকে বিশ্বাস করি বা করব তাদেরকে ভালো করে চিনে নেওয়া প্রয়োজন। যাকে-তাকে বিশ্বাস করা কোনো ভালো ফেল উপহার দিতে পারে না। তাছাড়া অতিভক্তির বিষয়টাও গল্পে পরিলক্ষিত হয়েছে। আমরা সাধারণত মানুষের উপর বিশ্বাসের বশে অতিভক্তি করি। যা আদতে ভালো কোনো ফল বয়ে আনে না বা আনবে না। বিশ্বাস থাকবে কিংবা রাখতে হবে। তবে তা তার মাত্রা অনুযায়ী। মাত্রাতিরিক্ত কোনোকিছুই ভালো ফল আনবে না।
অনুভূতি বা সাসপেন্স: গল্পটা শুরু থেকেই প্রতিটা পাঠকের মনে সৃষ্টি করবে প্রশ্নের। শুরু থেকে শেষ অবধি পড়ে শেষ না করা অবধি প্রতিটি পাঠকের মস্তিষ্কে যন্ত্রণার সৃষ্টি করবে। বারবার অনুভব হবে, বইটা পড়তে হবে। পড়ে শেষ করতে হবে। নয়তো শান্তি মিলবে না। গল্পটা সাদামাটা হলেও এই সাদামাটার মাঝেই অসাধারণ কিছু সাজিয়ে দিয়েছেন লেখক। যা পাঠকদের অনুভূতি নিয়ে খেলবে। কখনো চরিত্রর হাসিতে হাসবে। আবার কখনো চরিত্রের কান্নায় কাঁদবে। কিংবা কখনো চরিত্রের উপর অন্যায়ের কারণে রাগান্বিত হবে। যেটা একটা সফল গল্প বা বইয়ের প্রতিচ্ছবি বলা যায়। সাসপেন্স হিসেবে যদিও পুরো গল্পটাকেই বলা যায়। কেননা প্রতিটি স্থানে লুকিয়ে আছে সাসপেন্স। তবে আমার কাছে সবচেয়ে বেশি সাসপেন্স মনে হয়েছে, যখন একটা অচেনা ব্যক্তি একজন মেয়ে মানুষকে একের পর এক সাহায্য করে যাচ্ছে বিনা ফায়দায়। তখন কিঞ্চিৎ সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কেনই-বা একটা মানুষ এত সাহায্য করবে? তার ফায়দা কী? কিন্তু এই সন্দেহ কিংবা মস্তিষ্কের দোটানার মাঝে লেখক সবে শেষে বিশাল এক চমক প্রদান করেন। চমকটা সত্যিই বেশ ভালো লেগেছে।
মতামত: সত্যিই বলতে থ্রিলার বই হিসেবে আহামরি না হলেও একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো না। দক্ষ লেখনী এবং চরিত্র বিল্ডাপ ইত্যাদি সকল কিছু মিলিয়ে বলা যায়, মধ্য পর্যায়ের উপরে বইটির স্থান। আমার মতে যে-সকল পাঠকগণ প্রতিশোধপরায়ণা থ্রিলার পছন্দ করেন। তাদের জন্য এটি একটি আদর্শ বই। থ্রিলার হিসেবে থ্রিল এবং সাসপেন্স উপহার দিয়েছে বেশ ভালোই। আমার মতো যারা যারা থ্রিলার পাঠক আছেন। তারা চাইলে সংগ্রহ করে পড়ে দেখতে পারেন। এতে করে আপনারও ভালো লাগবে।
সংগ্রহ: বইটির আপাতত প্রি-অর্ডার চলছে। তবে সেক্ষেত্রে বর্ণলিপি প্রকাশনীসহ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে অর্ডার করা সম্ভব। রকমারি, বই নগর, বুক ওয়ার্ল্ড, অনুস্বরসহ আরও অন্যান্য থ্রিলার বুকশপ থেকে বইটি সংগ্রহ করা যাবে। এবং সরাসরি সংগ্রহ করতে চাইলে বর্ণলিপির বই হিসেবে ৩৮ বাংলাবাজারে মসজিদ গলির পাশে এন আলি টাওয়ারে পুঁথি পুরাণ থেকে সংগ্রহ করা যাবে।
সমালোচনা: বইটির সমালোচনা করার জন্য দুই একটি বিষয় ছাড়া সবই ঠিক আছে। যদিও এই দুই একটি বিষয় কেবলই কঠিন বিচক্ষণকারী পাঠকদের জন্যই। তবুও লেখকের লেখার ভাষা এবং ধারা সব যে আমার পছন্দ হতে হবে এমন কোনো বার্ধক্যতা নেই। কাজেই একজন নবীন লেখক হিসেবে থ্রিলারে তার প্রথম যাত্রা হিসেবে অসম্ভব সুন্দর একটি বই উপহার দিয়েছেন। আমার মতে এরকম একজন নবীন লেখককে হতাশ করা ঠিক হবে না। তাছাড়া লেখককে যদি পাঠকপ্রিয়তার মাধ্যমে সুযোগ দেওয়া হয়। তবে সত্যিই লেখকের থেকে আগামীতে ভালোকিছু আশা করা যায়। কাজেই সকল থ্রিলার পাঠকদের কাছে আবদার থাকবে। সাহস করে নবীন থ্রিলার লেখককে আপনারা হারিয়ে যেতে দিয়েন না। একটু সহযোগীতার মাধ্যমে আমাদেরকে ভালো কিছু উপহার দিতে পারবেন তিনি।
রহস্যময় জগতে রহস্যের সংখ্যা তো নেহাৎ কম নয়। কিন্তু সবচেয়ে রহস্যময় কী...
● আখ্যান —
বিজনেস আইকন সায়র মাহমুদের বাসায় পাওয়া গেছে রহস্যময় লাশ! রহস্যময় কারণ মৃত্যু স্বাভাবিক নাকি খুন এনিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। ফরেনসিক রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ ❝হার্টঅ্যাটাক❞। কেস যখন অলমোস্ট ক্লোসড তখন পাওয়া যায় আরও একটি রহস্যময় লাশ! স্থান-লাশের অবস্থা একই! তাহলে কি খুন হচ্ছে একের পর এক? কে করছে? কীভাবে?
চারিদিকে অন্ধকার কিন্তু কিছু একটা অস্বাভাবিক! ধড়ফড় করে উঠে বসে সায়র। চোখ চলে যায় বারান্দার দিকে। পর্দায় ফুটে উঠেছে নারী অবয়ব, প্রতিশোধের স্পৃহায় জ্বলজ্বল করছে চোখ জোড়া! সময়ের ব্যবধানে উধাও হয়ে যায় অবয়বটি... সায়রের মনে পড়ে যায় জুলেখা বানুর কথা। বাসায় প্রায়শই ছায়া দেখা যেতো বলতেন কিন্তু সে পাত্তা দেয়নি। কিন্তু এখন মনে উঁকি দিচ্ছে একটি প্রশ্ন, ❝ফিরে আসেনি তো হৈমন্তী?❞। সম্ভব কি মৃত্যুর পরও ফিরে আসা? হয়তোবা সম্ভব যখন মৃত্যুর কারণ ছিল প্রতারণা-অপ্রাপ্তি। খুনের রহস্য সমাধান করতে যেয়ে সিফাত পড়ে যায় গোলকধাঁধায়। খুনি কি অশরীরী কেউ নাহলে কোনো চিহ্ন ছাড়া কীভাবে করে চলেছে একের পর এক খুন!
● পর্যালোচনা ও প্রতিক্রিয়া —
❝মনস্তত্ব❞- এক বড়োই রহস্যময় বস্তু। কার মন কখন কী করে, কী চায় বলা কঠিনই বটে। বইয়ের পরতে পরতে প্রতিফলিত হয়েছে বিভিন্ন চরিত্রের মানসিক টানাপোড়েন। স্বভাবতই আমরা খলনায়কের চরিত্রে খুনি আর নায়কের চরিত্রে পুলিশ অফিসারকে দেখে থাকি। কিন্তু ব্যতিক্রম ধারায় লেখা ❝রক্তাক্ত খাম❞, খুনি এখানে নায়ক নাকি খলনায়ক এই ভাবনা দ্বিধায় ফেলে দিবে পাঠককে। তবে এখানে পুলিশ অফিসারের চরিত্রে সিফাতের ভূমিকা তেমন চোখে পড়ার মতো না। নায়ক হিসেবে যায় না আরকি। খুনি খলনায়ক হোক আর না হোক তবে আরও একটি খলনায়ক চরিত্র আছে। আর বিবাদ মূলত এই দু'চরিত্রেই। বাকি চরিত্রগুলো জড়িয়ে যায় সময়ের সাথে।
তিন সময়কার কাহিনী নিয়ে বইয়ের প্রেক্ষাপট; বর্তমান, অতীত, অতীতের অতীত। বইয়ের শেষ অংশ দিয়েই কাহিনীর শুরু। বেশ কিছু খুন-লাশের উল্লেখ আছে আর এসবের কারণ পাওয়া যাবে অতীতের অতীতে। শুরুতে দেখানো হয়েছে খুন-সুইসাইডের দৃশ্য তারপর পাঠককে নিয়ে যাওয়া হবে অতীতে। তারপর আবির্ভাব ঘটে হৈমন্তীর। মূল কাহিনীর শুরু তারপর থেকেই। একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকে আর পড়ে যায় পরপর লাশ। সিফাতের ব্যক্তিগত জীবন আর অনুভূতি নিয়ে যে পরিমাণে লেখা হয়েছে তার অর্ধেকও তার পুলিশি প্রসিডিউর নিয়ে নেই। অ্যাকশন সিনও নেই বললেই চলে। হতাশ করেছে। তবে শেষ অংশ তৃপ্তিদায়ক। জিঘাংসা যে ব্যক্তিকে কতটা মারাত্মক রূপ দিতে পারে বিষয়টা যথার্থই ফুটে উঠেছে। লোভ-কাম-ভালোবাসা-ক্রোধ-প্রতিশোধ সবই বাঁধা পড়েছে একসূত্রে। মাস্টারমাইন্ড খুনি সামনে থেকেও ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাকি চরিত্রদের মাইন্ড নিয়ে খেলতে ওস্তাদ। বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্রই খুনি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লাইম লাইটেই ছিল।
✱✱✱ স্পয়লার এলার্ট ✱✱✱
বইয়ের দুই জায়গায় আমার অবজেকশন আছে। প্রথমত, হৈমন্তীর নতুন পরিচয় প্রাপ্তির সিনেম্যাটিক ইতিহাস। গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট হওয়া, চেহারা বদলে যাওয়া, নতুন চেহারা-পরিচয় পাওয়া। তাও আবার একদম পারফেক্ট ব্যক্তির গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট করা। দ্বিতীয়ত, রাফটাফ, দুরন্ত পুলিশ অফিসার হিসেবে প্রথমে সিফাতকে দেখানো আবার পরে দেবদাস হয়ে যাওয়া। শেষ অংশে দ্রুতই সমাপ্তি টানার প্রবনতা আছে তাই বলে এই দু'টি বিষয়কে রিলেট করা জুতসই লাগে নাই।
● লেখনশৈলী ও বর্ণনা —
সাধারণ অনুভূতির উপর রচনা করা হয়েছে অসাধারণ প্লট সাথে যুক্ত হয়েছে সাবলীল উপস্থাপনা। চরিত্রগুলোর সাইকোলজিক্যাল টার্মের বর্ণনা দারুণভাবে করা হয়েছে। বিশেষ করে খুনির ডার্ক মাইন্ড। পারিপার্শ্বিক বর্ণনাও ভালো হয়েছে। তবে কিছু শব্দ চয়ন আর বাক্য গঠন জটিল লেগেছে। সে ধ্যান দিলো না। দিতি সেদিকে ধ্যান দিল না। ❝ধ্যান❞- এর বদলে ❝মনোযোগ❞- এর ব্যবহার হলে ভালো হতো আমার মতে। আদিবাও কখনো তাকে এত সুন্দরভাবে চমকপ্রদ করেনি। ❝চমকপ্রদ❞ না হয়ে ❝সারপ্রাইজ❞ হতে পারতো। কিছু সময় কেটে গেল মতো নিশ্চুপ ভঙ্গিতে। এখানে ❝মতো❞- এর দরকার কী, না হলেই তো ভালো শোনায়। পুনরায় সর্বশক্তি দিয়ে দ্বিতীয় করে। বাক্য কেমন জানি অসম্পূর্ণ লাগে। ❝দ্বিতীয়বার আক্রমণ করে❞ হলে ঠিকঠাক লাগে।
● চরিত্রায়ন —
উল্লেখ করার মতো চরিত্র বইয়ে বেশ কিছুই আছে তবে মূল চরিত্র কিন্তু খুনি। শেষভাগেই খুনির পরিচয় পাওয়া যায়। নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের বিচার নিজেই করে এমন এক চরিত্র। আর তার জন্য একদম এক্সট্রিম লেভেলে চলে যায়। সিফাত, তুখোড় পুলিশ অফিসার কিন্তু বইয়ে কেস রিলেটেড তার তেমন কোনো ভূমিকা বা অ্যাকশন চোখে পড়ে না। সায়র, জটিল এক চরিত্র। মিজান, জুলেখা বানু, হাসমত, রাজু, অদিতি, দিতি, হৈমন্তী, আদিবা, হিমি আরও কিছু চরিত্র আছে।
● প্রোডাকশন —
বইয়ের প্রোডাকশন যথেষ্ট ভালো হয়েছে। বাঁধাই, পেজ, হার্ডকভারের মান ভালো। বইয়ের জ্যাকেটও অনেকটাই মোটা।
● বানান ও সম্পাদনা —
ছোট একটা বই কিন্তু সম্পাদনায় এত গাফিলতি। বানান ভুল আর টাইপিং মিস্টেক এত, খুবই বিরক্তিকর।
কয়েকটা শব্দ একসাথে জোড়া হয়ে গেছে। এগুলোপরিবর্তন(এগুলো পরিবর্তন)। পৃষ্ঠা- ১০
বেশ কয়েক জায়গায় ❝উ❞ এর বদলে ❝ও❞ লেখা; ওঠেছে(উঠেছে)। পৃষ্ঠা- ১৩
কিছু শব্দ আবার ভেঙে দুভাগ হয়ে গেছে। অযু হাতই(অযুহাতই), সংসার টাকে(সংসারটাকে)। পৃষ্ঠা- ১৬, ১১১
❝স্রেফ❞ শব্দকে একাধিকবার ❝গ্রেফ❞ লেখা হয়েছে। হাসমত মিয়া গ্রেফ(স্রেফ) হার্ট অ্যাটাকে মারা গিয়েছেন। পৃষ্ঠা- ২০ তার কাছে এই আধুনিক যুগে এসব গল্প গ্রেফ(স্রেফ) গাঁজাখুরি গল্প বলে মনে হয়। পৃষ্ঠা- ২৫
নামেও ভুল আছে। সিফটের(সিফাতের) সন্দেত(সন্দেহের) আঙুলটা তার দিকে আসার একটা সম্ভাবনা ছিল। পৃষ্ঠা- ৯০
একই শব্দের দুবার ব্যবহার। আমিও আমি নিজেও জানি না। পৃষ্ঠা- ৯৯ আমি এই জীবন আমি আর সহ্য করতে পারছি না। পৃষ্ঠা- ১০০ তার এই আচরণটুকু আমাকে আমাকে আরও আকর্ষিত করেছিল। পৃষ্ঠা- ১১২ আসলেই পোড়া মনের মানুষগুলো পাথরের কঠিন কঠিন হয়ে যায়। পৃষ্ঠা- ১১৪
শুরুর দিকে ফন্ট সাইজ ঠিকঠাক হলেও পরে বেশ কিছু পেজে ফন্ট সাইজ ছোট হয়ে গেছে।
● প্রচ্ছদ ও নামলিপি —
প্রথম দৃশ্যের উপর বেজড বইয়ের প্রচ্ছদ। সুন্দরই হয়েছে প্রচ্ছদ আর নামলিপি।
This entire review has been hidden because of spoilers.
কাহিনি-সংক্ষেপ: মধ্যবিত্ত একটা ফ্যামিলি। বাবা-মা এবং দুই মেয়ের সুখের সংসার। হঠাৎ একটা এক্সিডেন্টে হৈমন্তীর বাবা পঙ্গু হয়ে যায়। সংসারের দ্বায়িত্ব কাধে তুলে নেয় হৈমন্তী এবং তার বোন হিমি। দুজনের চেষ্টায় সংসার মোটামুটি চললেও খুব একটা ভালো চলে না। যার জন্য একটা চাকরির খোঁজ করতে থাকে হৈমন্তী। একটা সময় পেয়েও যায়। কিন্তু সেই চাকরি'টাই তার জন্য কাল হয়ে উঠে। সে তার পরিবারকে হারায়। অবাক করা বিষয় হচ্ছে হৈমন্তির পরিবার'কে খুন করা হলেও সে বুঝতেই পারে না। তারপর দীর্ঘদিন পর হৈমন্তী নিজ হাতে ৫টা খুন করে। হৈমন্তী এই পাঁচটা খুন কেন করে তা জানতে চান? তাহলে বইটা পড়ুন।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া: বইটা একটা স্বাভাবিক মৃত্যু দিয়ে শুরু হয়েছে। তারপর আরো একটা স্বাভাবিক মৃত্যু। কিন্তু কয়েক পাতা পড়েই আর বইটা রাখতে ইচ্ছে করছিলো না। কারণ যে দুটো স্বাভাবিক মৃত্যু ভেবেছিলাম সেগুলো আসলে পরিকল্পিত খুন। যখন বুঝতে পারলাম এই দুটো খুন ছিলো তখন আবার আরেক খুন। সি আই ডি ব্যাঞ্চের সিফাতের মত আমিও খুনি'কে খুঁজতে খুঁজতে বই শেষ করে ফেললাম। বইটা টান টান উত্তেজনা ধরে রাখায় কোথায় বিরক্ত লাগেনি। আর লেখিকা শেষে নতুন চমক দেখানোয় বইটা অসাধারণ লাগেছে।
প্রচ্ছদ: বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে আসলে কিছু বলার নেই৷ কারণ বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেই ভেতরের গল্পটা আন্দাজ করা যায়। এতো দারুণ ভাবে প্রচ্ছদ মিলে যায় কি করে কে জানে।
সমালোচনা: বইটা অবশ্যই ভালো এবং প্রশংসার যোগ্য। তবে গল্প অনুযায়ী বইয়ের নামটা একটু বেখাপ্পা লেগেছে। আমার মনে হয় বইয়ের নামটা আরো ভালো হতে পারতো। এছাড়াও বইয়ে কিছু শব্দ ভুল আছে�� তবে তা খুবই কম এবং গল্পের টান টান উত্তেজনা সে ভুল গুলো পুশিয়ে দিয়েছে।