রজত পালের ঊনবিংশতি মিথ: বীরভূম পর্ব মূলত বীরভূম জেলার লোককথা, কিংবদন্তি ও প্রাচীন ঐতিহ্যকে নথির মতো সযত্নে সাজিয়ে তোলা এক সুবিশাল সাংস্কৃতিক মানচিত্র। বইটি হাতে নিলে প্রথমেই ধরা দেয় বীরভূমের ইতিহাসচর্চার গভীরতা ও ঐশ্বর্য—যার সূত্রপাত ব্রিটিশ আমলের রেভিনিউ সার্ভেয়ার জেমস শেরউইলের নথি থেকে শুরু করে হান্টার, ও’ম্যালি, ড্রেক-ব্রকম্যানের লেখনী পর্যন্ত বিস্তৃত।
স্বাধীনোত্তর কালে সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছেন অশোক মিত্র, দেবকুমার চক্রবর্তী ও রঞ্জনকুমার গুপ্ত প্রমুখ। তাঁদের গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের প্রতিধ্বনি এই গ্রন্থের পটভূমিতে ধ্বনিত হয়ে চলেছে, যেন অতীত ও বর্তমানের মধ্যে এক অবিচ্ছিন্ন সংলাপ গড়ে উঠেছে।
এই বইয়ে রজত পাল বেছে নিয়েছেন উনিশটি নির্দিষ্ট মিথ, কিন্তু সেগুলো তিনি কেবল গল্পের আকারে পরিবেশন করেননি—বরং প্রতিটি কাহিনিকে যাচাই করেছেন বহুমুখী উৎসের আলোকে। প্রাচীন শিলালিপি, পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন, মৌখিক সাক্ষ্য, এমনকি বৌদ্ধ ও জৈন সাহিত্যের উল্লেখ পর্যন্ত এনে তিনি মিথগুলোর পেছনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট উন্মোচন করেছেন। V.E. Schwab-এর ভাষায়, “Myths do not happen all at once. They do not spring forth whole into the world. They form slowly, rolled between the hands of time until their edges smooth… But all stories start somewhere…”—রজত পালের এই কাজ যেন ঠিক সেই ধীর, মন্থর গড়নের সাক্ষ্য, যেখানে সময়ের হাতে গড়ানো গল্পগুলোকে তিনি নতুন প্রাণ দিয়েছেন।
সংস্কৃত ভাষায় যেমন বলা হয়েছে—
“यथा चित्तं तथा वाचो यथा वाचस्तथा क्रियाः। चित्ते वाचि क्रियायां च साधूनां एकरूपता॥”
(যেমন মন, তেমন বাক্য; যেমন বাক্য, তেমনই কর্ম। মন, বাক্য ও কর্মে সাধুরা একরূপ থাকেন।)
এই শ্লোকের অর্থ যেন তাঁর কাজের প্রতিটি পাতায় প্রতিফলিত—মননে সত্য, বর্ণনায় সত্য, আর অনুসন্ধানে সত্য। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো, তাঁর অনুসন্ধানে বিন্দুমাত্র কল্পনাপ্রসূত অলঙ্কার নেই; প্রতিটি তথ্যের ভিত্তি কঠোর ফিল্ডওয়ার্ক ও নির্ভরযোগ্য উৎস, যা গবেষকসুলভ সততা ও নিষ্ঠার উজ্জ্বল পরিচয় বহন করে।
বইয়ের ভাষা একেবারেই সহজ ও সরল—না আছে অতিরিক্ত আঞ্চলিকতার চাপ, না আছে জটিল পাণ্ডিত্যের জট। ফলে পাঠক যে-ই হোন না কেন—ইতিহাসের পেশাদার গবেষক হোক বা বইমেলায় হঠাৎ দেখে কৌতূহলী হয়ে কিনে নেওয়া কেউ—সবার কাছেই পাঠটি সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। তাছাড়া ছবির ব্যবহার বইটিকে দিয়েছে এক অনন্য মাত্রা; পাঠক কেবল পড়েন না, যেন চোখের সামনে দেখতে পান—মন্দিরের সূক্ষ্ম কারুকাজ, শিলালিপির খোদাই, মাজারের শান্ত পরিবেশ, কিংবা মেলার কোলাহল—সবই জীবন্ত হয়ে ওঠে পৃষ্ঠা থেকে।
এখানে শুধু বীরভূমের অতীত নিয়ে নস্টালজিয়া নেই, বরং আছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সতর্কবার্তা—নিজেদের ইতিহাস না জানলে, না মনে রাখলে, পরিচয় মুছে যায়। "जातिर्ह्यन्या संस्कृत्या व्यतिकरवशाद्भ्रश्यति स्वैर्यभावात्"—অর্থাৎ, এক জাতি নিজের সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা হারালে ধীরে ধীরে অস্তিত্বও লোপ পায়। ইতিহাস, তাই, কেবল অতীতের নথি নয়, বর্তমানেরও প্রহরী। এই দিক থেকে বইটি যেমন এক বিপুল তথ্যভান্ডার, তেমনই এক স্মৃতি উদ্ধার অভিযান—যা রবীন্দ্রনাথের সেই সতর্ক বাণীকে মনে করিয়ে দেয়, “যে জাতি নিজের ইতিহাস রচনা করে না, অন্যেরা তার ইতিহাস রচনা করে।”
সব মিলিয়ে, এই বই কেবল আঞ্চলিক ইতিহাসপ্রেমীদের সম্পদ নয়—যে যে পাঠক নিজের শিকড়ের গল্প খুঁজতে চাইবেন , তাঁর জন্যও এক অমূল্য পথপ্রদর্শক।
বীরভূমের ধুলো মাখা পথ, নিস্তব্ধ জঙ্গল, শ্যাওলা ধরা মন্দির কিংবা চিরকাল প্রার্থনার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন মাজার—সবকিছুতেই এখানে লুকিয়ে আছে গল্প, স্মৃতি আর পরিচয়ের গোপন সুতোগুলো। রজত পাল সেগুলো তুলে এনেছেন নিখুঁত পর্যবেক্ষণ, অক্লান্ত পরিশ্রম, আর অগাধ মমতার সঙ্গে—যেন পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন অতীতের এক সজীব মানচিত্র।