বীজের অঙ্কুরোদ্গম হতে কৃষির সূচনার ফলে যাযাবর মানুষ একদিন থিতু হয়েছিল। ইতিবৃত্ত বলে, কৃষির সেই প্রাথমিক সূচনা হয়েছিল নারীর হাতে। পরবর্তীতে মানুষ যখন সমাজ গঠন করল, নারীই ছিল প্রধান। কাল পরিক্রমায় সে স্থান ক্রমেই পুরুষের অধিকারে এসেছে। নারী পড়ে গেছে পাদপ্রদীপের অন্ধকারে। কেবল পিছিয়ে যাওয়াই নয়, কালে কালে হয়েছে নিগৃহীত।
এই পশ্চাদপদতা, নিপীড়নের বিরুদ্ধে নানা সময়ে নারীরা প্রতিবাদ মুখর হয়েছেন কিন্তু তাতে দৃশ্যপট খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি। একুশ শতকে এসে নারীরা এই নিপীড়ন এবং তাদের অধিকার সম্বন্ধে তুলনামূলক অধিক সোচ্চার। তাই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমার হঠাৎ চোখ পড়ে দ্রৌপদীর উপর। পৃথিবীর প্রধান চারটি মহাকাব্যের মধ্যে বোধ করি দ্রৌপদীই সর্বাধিক সোচ্চার, সক্রিয় এবং প্রতিবাদী নারী চরিত্র। বহুকাল ধরে নানা জনে তাঁকে নানা দৃষ্টিতে বিচার করেছেন—কখনও তিনি মহাকাব্যের নায়িকা, কখনও নারীবাদের প্রতীক। কিন্তু দ্রৌপদী আমার চোখে খানিক ভিন্নরূপে ধরা দেয়। তাই তিনি ভিন্ন আঙ্গিকেই উপস্থাপিত।
মহাভারতের মিথ, অলৌকিকতাকে পাশে রেখে এই উপন্যাসে রক্তমাংসের দ্রৌপদীর ছবিটি আঁকতে চেয়েছি। এই দ্রৌপদী কন্যা, জায়া, জননী, রাজ্ঞী। একজন পূর্নাঙ্গ নারী যিনি জীবনের চূড়ান্ত অভিষ্ট লাভ করেছিলেন, তার বাহ্যিক পরিচিতির সঙ্গে সঙ্গে মনোজগতের সন্ধান করতে গিয়ে ভারতবর্ষের অতীত, বর্তমান, পৌরাণিক এমনকি অনাগত নারীদের নিভৃত মানসের আখ্যান হতে চায় ‘দ্রৌপদী’।
"অগ্নি হইতে জাত, অগ্নির ন্যায় পবিত্র সর্বগুণসম্পন্না এই কন্যাকে কোনোরূপ অশুচিতা কভু স্পর্শ করবে না কিন্তু কুরুকূল ধ্বংসের নিমিত্ত হবেন মহারাজ দ্রুপদের এই কন্যা।"
উজ্জয়ীনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের সভা, নবরত্ন উপস্থিত। রাজ্যের এক নারীর বিচার চেয়েছেন- মদ্যপ ও ঋণগ্রস্থ স্বামীর দেনা শোধ করার নিমিত্ত তাঁকে অন্যের অঙ্কশায়িনী হতে বাধ্য করছেন স্বামী নাগদত্ত ও শ্বশুরবাড়ির সকলে। প্রতিবিধানে সবার মৃত্যুদন্ড এবং নারীটির ভরণপোষণ নিশ্চিত করেন রাজা। কিন্তু তাতে করে কি সুবিচার লব্ধ হলো? নারীটি কেবল মহারাজ অব্দি অভিযোগ পৌঁছাতে পেরেছেন বলে প্রতিবিধান সম্ভব হয়েছে, কিন্তু রাজ্যে এমন অজানা অবিচার কি সংঘটিত হয়ে চলেছে না আর? ইতিহাসেও কি এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়? সভাকবি কালিদাস চিন্তামগ্ন হলেন, তাঁর মাথায় তখন মহাভারত ঘিরে প্রশ্ন জাগছে... ব্যাসদেবের আখ্যানের মাঝে, জ্ঞানের নিরিখে ভেবে নেওয়ার কোনো পথ কি রয়ে গেছে তাঁর জন্য? মহাভারত কি সক্ষম ছিল, একজন নারী, দ্রৌপদীর অন্তর্ভাব সঠিক চিত্রায়নে? অথবা রাজন্যবর্গের শোনার আগ্রহে রচিত হওয়া যুগ-যুগের কাব্যে সাধারণ মানুষের কথা, অনুভূতি, কতটা পরিস্ফূট হয়েছে আজ অব্দি?
কালিদাসের কল্পনায় নতুন করে রচনা চলে দ্রৌপদীর গল্পের। কালিদাস সে গল্পের সূচনা করেন দ্রৌপদীর শৈশব থেকে। যজ্ঞের আগ অব্দি তার বেড়ে ওঠা, এবং বাদবাকি। মাঝে কখনো অংশ নেন কবির স্ত্রী ইন্দুমতী, যাঁর ভাষ্যে দ্রৌপদীর মনোভাব অঙ্কিত হয় আরো নারীসুলভ উপায়ে। দুই সময়কালের সমান্তরাল বয়ান এগিয়ে চলে ঘর থেকে রাজসভা মিলে। তাঁর সময়ের সমাজবাস্তবতার নিরিখে কালিদাস যাচাই করেন মহাভারতকে, আর কালিদাসের বয়ানে যে বাস্তবতার প্রশ্ন তোলেন লেখক, সে আমাদেরও অভিজ্ঞতালব্ধ।
মহাভারতের নায়ক কে? অর্জুন, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণ, অথবা যুধিষ্ঠির? সে প্রশ্নে ভিন্ন মত থাকলেও, মহাভারতের অন্যতম নিয়ামক যে দ্রৌপদী, আখ্যানের প্রধান নায়িকা, তা একবাক্যে স্বীকার্য। কোনো এক চরিত্রকে সামনে রেখে মহাভারতের আখ্যান আমাদের পরিচিত, এই যেমন হরিশংকর জলদাসের 'একলব্য'। মাহমুদুর রহমানেরই 'রাধেয়' আর 'শকুনি উবাচ'-ও আছে। মহাভারতের বয়ানের ফাঁকে যৌক্তিক ব্যাখ্যা খোঁজা? তাও পড়তে পারেন প্রতিভা বসু'র 'মহাভারতের মহারণ্যে' অথবা হরপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের 'কৃষ্ণকাহিনী মহাভারত'। তবে নতুন করে দ্রৌপদী কেন?
এর একটা জবাব লেখক নিজে দিয়েছেন : "মহাভারত সম্বন্ধে আমার কিছু স্পষ্ট মত (opinion) রয়েছে। সেসব মূলত মহাভারতের নানা ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণের পাশাপাশি মহাভারতের পাশে নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, দর্শন রেখে তুলনা করে করে আমার নিজের মধ্যেই তৈরী হয়েছে। মহাভারতকে আমি সেই দৃষ্টি থেকেই দেখি এবং প্রকাশ করি। মহাভারতের উচ্চ সাহিত্য-মূল্যের পাশাপাশি এসব দিকও গুরুত্বপূর্ণ। উপন্যাসে এই সকল অনুষঙ্গ স্পষ্ট করে প্রকাশ করা যায় না কিন্তু এই উপন্যাসের ভাষা, বক্তব্য, চরিত্রদের পরিচয়; ওই মতই প্রকাশ করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মনে হতে পারে, 'এই লেখকের বলা অমুক কথাটি মহাভারতে নেই। তিনি নিশ্চয়ই জানেন না।' কিন্তু আদতে হতে পারে সেটি ওই নির্দিষ্ট বিষয় সম্বন্ধে লেখকের মত প্রকাশিত হয়েছে।
কেননা, তৈরি হওয়া সেই মত থেকেই ঘটনা নতুন করে ব্যাখ্যা, চরিত্রদের নিকট থেকে দেখা, আরও নতুন ব্যাখ্যা এবং দৃষ্টিকোণ সৃষ্টির চেষ্টায় এই আয়োজন। সেখানে পাঠকের প্রশ্ন হতে পারে, ‘আলোচ্য উপন্যাসে যে দ্রৌপদীকে পাওয়া যাচ্ছে তিনি মহাভারতের দ্রৌপদী, না লেখকের নিজস্ব সৃষ্টি?' এক্ষেত্রে বলা বাহুল্য, লেখকের সৃষ্টি তো কখনই নয় এমনকি লেখকের opinion প্রকাশ করা হলেও তা চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। একটি নতুন চিত্র তৈরি করা হয়েছে। মহাকাব্যে দ্রৌপদীর ক্ষেত্রে আরও কী কী বিষয়, ব্যাখ্যা, মত, বৈশিষ্ট্য যুক্ত হতে পারত; তা সন্ধান করে দ্রৌপদীর একটি চিত্র অঙ্কনের চেষ্টা করা হয়েছে। পৃথিবীর সব মহাকাব্যই সম্ভবত তাদের পরবর্তী সময়কে এই সুযোগ দেয়।"
দ্রৌপদী লেখক : মাহমুদুর রহমান জনরা : ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রকাশক : নালন্দা পৃষ্ঠাসংখ্যা : ২৮০ মুদ্রিত মূল্য : ৫০০ টাকা
দ্রৌপদীকে নিয়ে এক ধরনের ফ্যাসিনেশন কাজ করে। সে টিভির জমজমাট কাহিনির মাহাত্ম্যে হোক বা রাজশেখর বসুর কল্যাণে। অবশ্য টিভিতে যখন দেখতাম তখন কাহিনীর বিপুল বিস্তৃতির দিকে খেয়াল না করে দ্রৌপদীকে নায়িকা আর অর্জুনকে মহাভারতের নায়ক ধরে তাদের কাহিনী দেখতাম। পরে যখন রাজশেখর বসুর করা অনুবাদ ধরি, সুনীলের ছোটদের জন্য লেখা মহাভারত পড়ি আর বোধহয় কলেজে কাশীদাসেরটাও পড়তে নিয়েছিলাম। তবে সে কাশীদাসের নাকি মহাভারত নিয়েই অন্য কারো বই ঠিক মনে নেই।এই বইগুলো থেকে ধীরে ধীরে মহাভারতের গভীরতা, বিভিন্ন কেনো, রাগ, অভিমান, কারণ ইত্যাদির জাল বুনতে শিখি। বিভিন্ন কেনোর মাঝে ছিলো মহাভারতের যুদ্ধ কেনো হলো? ভীষ্মের ধর্ম নামের অধর্মগুলোর কারণে? পঞ্চ-পাণ্ডবগণ তাদের অধিকার না পাওয়ার কারণে? নাকি দ্রৌপদীর অপমানের প্রতিশোধ নিতে। আর আমরা যে দ্রৌপদীকে চিনি,তা যজ্ঞ থেকে উঠে আসার পর থেকেই।তাও দ্রুপদ কন্যা হিসেবে।
কিন্তু লেখক এর একটি ভিন্ন রূপ উপস্থাপন করেছেন। দ্রৌপদীকে কেবল দ্রুপদ কন্যা নয়,তারও আলাদা এক পরিচয় আছে,মহাভারতের যে তিনিও একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ চরিত্র তা দেখিয়েছেন। লেখক বলেছেন " মহাভারতের মিথ, অলৌকিকতাকে পাশে রেখে এই উপন্যাসে রক্তমাংসের দ্রৌপদীর ছবি আঁকতে চেয়েছেন"। আমার মতে লেখক সে বিষয়ে সার্থক। দ্রৌপদীকে নিয়ে পড়ছিলাম আর নিজের থাকা মিথ বা অলৌকিকতাকে কাটিয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক পাচ্ছিলাম।এই যেমন দ্রৌপদীর জন্মকাহিনী নিয়ে,লেখকের মতোন করে ভাববার চিন্তাও আসেনি মোটেও। অথচ আমি মহাভারত দুবার পড়েছি, যজ্ঞ থেকে উঠে এসেছে,এই-ই মেনে নিয়েছি। এই গল্পের কথক অনেক বিধায় হয়তো একটু সমস্যা হয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু বিষয়টি প্রাককথনে উল্লেখ থাকাতে মাথায় ছিলো,ফলে সাথে সাথে সে সমস্যার সমাধানও করে ফেলেছি।তাই লেখক হোক,কালিদাস হোক বা দ্রৌপদী নিজে-খুব বেশি মাথা খারাপ হওয়ার মতোন গুলিয়ে ফেলিনি। শেষ করে মাথায় আসতে পারে এই-ই কী দ্রৌপদী? নাকি এ শুধু লেখকের কল্পনা? এর উত্তর জানা নেই। তবে লেখক পাঠকদের দ্রৌপদীকে নারী হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন,মহাভারতের দ্রুপদ কন্যা ও পঞ্চপাণ্ডবের পত্নী ছাড়াও আলাদা চিত্র অংকন করেছেন।সাধারণ মানুষের মতোনই দ্রৌপদীর আশা আকাঙ্খা, ভালোবাসা, রাগ, ক্ষোভ ইত্যাদির রূপ দিয়েছেন লেখক নতুন করে,তার শব্দ দিয়ে।
আমি যখন মহাভারত কিংবা এই বিষয়ক বই পড়েছি, তখন এই পাঞ্চালীকে সম্পূর্ণ মানুষ না, বরং অর্জুনের পত্নী, কিংবা পঞ্চপাণ্ডরের পত্নী, কিংবা যুধিষ্ঠির যাকে জুয়ার সামগ্রী হিসেবে পাশাখেলায় বাজি রেখেছে, কিংবা দ্রুপদের মেয়ে হিসেবেই দেখাতে দেখেছি। হ্যাঁ, সে যে মহাভারতের নায়িকা, সেটা অবশ্য উঠে এসেছে সবগুলোতেই। কিন্তু নারীসত্ত্বার এক আলাদা রূপ থাকে, মাধুর্য থাকে, সেসব যেনো নাই হয়ে যাচ্ছিলো। বউ, কন্যা বাদ দিয়েও তার আলাদা সত্ত্বার জানান দিতেই যেনো এই বই। কালীদাস পত্নী ইন্দুমতীর বর্ণনা যেনো নারীর দৃষ্টিকোণের এক দিক। তবে সেটা সম্পূর্ণ লেখকের দৃষ্টিকোণ, কিন্তু এটাই যেনো খাপ খেয়ে গেছে।
মহাভারতের নায়ক কে? অর্জুন, যুধিষ্ঠির, শ্রীকৃষ্ণ? এ নিয়ে নানা মত থাকলেও মহাভারতের নায়িকা যে দ্রৌপদী, এই মর্মে সকলেই একমত। অগ্নি থেকে জাত, অগ্নির ন্যায় পবিত্র দ্রৌপদী, যাকে অশুচিতা কখনো স্পর্শ করবে না। কারও মতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের কারণ ছিলেন দ্রৌপদী, কুরুকুল ধ্বংসের কারণ তিনিই। তবুও সেই নারীকে নিয়ে সাহিত্য খুব বেশি আলোচনা কী হয়েছে? লেখক এই বইতে দ্রৌপদীকে চিনিয়েছেন নতুন করে, রক্তমাংসের সাধারণ মানুষ হিসাবে।
পাঞ্চালী, কৃষ্ণা, যাজ্ঞসেনী - পরিচয়ের বাইরে দ্রৌপদী ছিলেন একজন স্ত্রী, যাকে একাধিক পুরুষের অঙ্কশায়িনী হতে হয়েছে। যাকে সয়ম্বর সভায় মালা পরিয়েছিলেন, তাঁকে এককভাবে ভালোবাসার অনুমতি তিনি পাননি, পাচজনকে ভালোবাসতে হয়েছে সমানভাবে। তিনি ছিলেন একজন মা, নিয়তির নির্মম পরিহাসে আদরের সন্তানদের ছেড়ে বনবাসে কাটাতে হয়েছে তেরো বছর, সবশেষে কুরুযুদ্ধে হারাতেও হয়েছে তাদের। তিনি ছিলেন পাঞ্চালের রাজকন্যা, পরবর্তীতে সমগ্র আর্যাবর্তের সম্রাজ্ঞী, অথচ রাজপ্রাসাদের সুখ আহ্লাদ ত্যাগ করে দিনযাপন করতে হয়েছে কুঁড়েঘরে, ঘরের সব কাজ সামলাতে হয়েছে নিজেরই। এতোকিছুর পরও দ্রৌপদী ছিলেন সচেতন ও দৃঢ়চেতা। ভরা মজলিশে যেখানে বৃকোদর ভীম, গান্ডীবধারী অর্জুন, কুরুকূলের অভিভাবকরা চুপ ছিলেন, নিজ সম্মান ও অধিকার রক্ষার্থে বারবার প্রতিবাদ করে গেছেন তিনি। বারবার সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নিজ দায়িত্ব কর্তব্য।
এই বইয়ের সবথেকে উপভোগ্য বিষয় ছিলো গল্প বলার ধরণ। মহারাজ বিক্রমাদিত্যের দরবারে কথাপ্রসঙ্গে উঠে আসে দ্রৌপদীর আখ্যান। এরপর মহাকবি কালিদাসের জবানিতে চলতে থাকে দ্রৌপদীর গল্প। সভা চলছে, কবি গল্প বলছেন, দরবারের বাকি মহিষীরা আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন, নিজ মত প্রকাশ করছেন, এভাবেই উপন্যাসের ধারা প্রবাহিত হয়েছে। কখনওবা পরদিন রাজদরবারে মহাভারতের কোন অংশ শোনাবেন তাই নিয়ে রাতের বেলা নিজ গৃহে স্ত্রী ইন্দুমতির সাথে আলাপ করছেন কালিদাস। একজন নারীর সহায়তায় আরেক নারীর আখ্যানকে আরো গভীররূপে উপলব্ধি করছেন কবি, আরো সুচারুরূপে বর্ণনা করতে পারছেন। কখনওবা ইন্দুমতির মাধ্যমে দ্রৌপদী নিজেই এসে ব্যাক্ত করছেন তাঁর মনের কথা।
তবে মহাভারতের পুরোটা উঠে আসেনি এই বইতে, শুধুমাত্র দ্রৌপদী যেই অংশে প্রাসঙ্গিক সেই অংশগুলোই লেখক নতুন করে এঁকেছেন নিজের রংতুলিতে। সেক্ষেত্রে মহাভারতের নতুন পাঠকরা কিছুটা হোঁচট খেতে পারেন পড়তে গিয়ে। অন্যথায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করবেন।
বিশাল বিস্তৃত কাহিনি নিয়ে মহাভারত, যার রয়েছে অসংখ্য চরিত্র। কিছু মুখ্য চরিত্র যার মধ্যে দ্রৌপদী অন্যতম। দ্রৌপদীর জন্ম তারপর ধারাবাহিক ভাবে জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে অসংখ্য ঘটনা আস্তে ধীরে প্রবাহিত হয়েছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে।
লেখক মাহমুদুর রহমান মহাভারতের সেই গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র নিয়ে লিখেছেন এই উপন্যাস "দ্রৌপদী"। এখানে এক নতুন দ্রৌপদীকে তিনি দেখিয়েছেন। মাতা কুন্তীর সহাবস্থানে থেকেছেন।। দ্রৌপদীকে সাধারণ ভাবে দেখা হয় পঞ্চপাণ্ডবদের নিরিখে, এখানে লেখক ব্যক্তি দ্রৌপদীকে একেঁছেন নিজের আদলে। এই উপন্যাসে লেখকের নিজের কথায়, কখনও উত্তম পুরুষে এবং মহাকবি কালিদাসের গল্পে "দ্রৌপদী" পূর্ণতা পেয়েছে।
এক সম্পূর্ণ অন্য চোখে দেখলাম মহাভারতের আখ্যানের কিছু অংশ। অন্য চোখে দেখলাম এ মহাকাব্যের নায়িকা দ্রৌপদীকে৷ লেখকের উদ্যেগ কে সাধুবাদ জানাই। বইটা পড়ে আমি যেমন এককথায় মুগ্ধ তেমনি এই বইটা মহাভারত ও একজন অসামান্যা নারীর দৃষ্টিভঙ্গি আমার কাছে অনেকখানি স্পষ্ট করে তুলেছে। অসাধারণ।
আমার মতে প্রধানত দুই প্রকার সাহিত্য আছে। গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য এবং পাঠকের জন্য লেখা সাহিত্য। বর্তমানে পাঠক কে কেন্দ্র করে যে পরিমাণ সাহিত্য রচনা করা হচ্ছে সে হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যের সংখ্যা অপ্রতুল। অবশ্য এর মানে এই না যে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচনা করা হচ্ছে না। হচ্ছে কিন্তু তা আড়ালেই পড়ে আছে। পাঠক সমাদৃত হচ্ছে না বা যেইটুকু স্পটলাইট পাওয়ার কথা, ওটুকু পাচ্ছে না।
আজকে যে বইটা নিয়ে কথা বলবো তা হচ্ছে, মোগলনামা খ্যাত লেখক মাহমুদুর রহমান ভাইয়ের লেখা "দ্রৌপদী"। আমরা নাম থেকেই হয়তো বুঝতে পারছি যে মহাভারতের অন্যতম প্রধান ফিমেল ক্যারেক্টার "দ্রৌপদী" কে নিয়ে রচিত এই পুরাণ আখ্যান।
বইটা গুরুত্বপূর্ণ। এর গুরুত্বের সংজ্ঞাটা অনেক আঙ্গিকেই তুলে ধরা যায়। তবে এর প্রধান গুরুত্ব আমার কাছে লেগেছে যে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা। আমার প্রায়শই মনে হয় বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার খরাকাল চলছে। সবকিছু ধর্মীয় গোড়ামী কিংবা মৌলবাদের চাদরে তুমুলভাবে এটে আছে। এমন সময়ে একজন মুসলিম লেখক, যে কিনা বহুবছর ধরে একের পর এক ইতিহাস গ্রন্থ লিখে যাচ্ছে, তার গ্রন্থসমূহ কে গুরুত্বপূর্ণ বলতেই হয়।
এর অন্যতম একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, পুরুষ হয়ে পুরানের এক নারীকে নিয়ে এত গভীর পর্যালোচনা। যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
কাহিনি কেমন, ঘটনা কী এসব সাধারণত আমি রিভিউতে বলতে অপছন্দ করি। আমার মতে পাঠক নিজ দায়িত্ব নিয়ে বইটা পড়েই সেসব আবিষ্কার করবেন। তবে এইটুকু বলতে পারি, "দ্রৌপদী" এবং লেখকের রচিত অন্যান্য ইতিহাস এবং পুরাণভিত্তিক গ্রন্থসমূহ আরো বেশি পাঠ এবং একে নিয়ে পর্যালোচনা জরুরি এবং এই ভিত্তিতে জরুরি যে তিনি যেন সুদূর ভবিষ্যতে আমাদের এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য উপহার দেন। আমাদের সত্যিই এখন এই প্রকার সাহিত্যকর্মের বড় দরকার!
ইতিহাসের বিখ্যাত রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ্যসভায় বিচার চলছে এক নারীর প্রতি তার স্বামীর অনাচারের।বিচার হলো, শাস্তি ও হলো। কিন্তু সভায় উপস্থিত নবরত্নের বিশিষ্ট মহাকবি কালিদাস চিন্তিত, তার মনে তখন সমাজের সকল নারীর প্রতি হওয়া শত শত অনাচার যা লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে যায় তার যথাযোগ্য বিচার সম্ভব কিনা তা নিয়ে সংশয়। এই সংশয় থেকে চিন্তায় চিন্তায় কালিদাস চলে গেলেন সুদূর মহাভারতে, নিজের মতো রচিত করলেন মহাভারতের অন্যতম বিশেষ এক চরিত্রের এক অভিনব আখ্যান, যা কেউ আগে তেমন করে ভাবেনি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ ও রাজনীতির বাইরেও প্রধান এই চরিত্রের প্রভাব মহাভারতে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল তা এই আখ্যান এর মূল বিষয়বস্তু। কালিদাসের ব্যাখ্যায়, কখনো চরিত্রটির আত্মকথনে কিংবা কখনো লেখকের নিজের বর্ণনায় পুরো বই জুড়ে এই আখ্যান পরিপূর্ণতা পেয়েছে, যার নাম 'দ্রৌপদী'।
মহাভারতের বিশেষ বৈশিষ্টই হলো এই, যুগে যুগে এর মূল কাহিনী পরিবর্তিত না হলেও বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন ভাবে এর চরিত্র বিশ্লেষণ, নানা উপকাহিনীর ব্যাখ্যা ইত্যাদি দিয়ে একে আরো বৃহৎ আরো বৈচিত্র্যময় করে তুলেছেন। কালিদাসের কথনে দ্রৌপদীর যে বিশেষ চরিত্র এবং মনস্তত্ত্ব আমরা বইয়ে দেখতে পাই, এসব কিছুও লেখক এর নিজস্ব মতভাব এর প্রকাশমাত্র। মহাভারতের অন্যতম নিয়ামক দ্রৌপদীর দৃষ্টিকোণ থেকে পুরো ঘটনা টা কেমন হতে পারতো, তাই এই বইয়ে অত্যন্ত চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।বিশেষ করে কালিদাস কিংবা লেখক একজন পুরুষ হয়ে আরেকজন নারীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করার যে চেষ্টা করেছেন তা খুবই প্রশংসনীয��। দ্রৌপদীর দৃষ্টিভঙ্গি শুধু নয়, তার সাথে জড়িত বিভিন্ন অলৌকিক ঘটনারও অনেকটা যৌক্তিক ব্যাখ্যা নবরত্ন এর সদস্যদের আলোচনার মাধ্যমে লেখক তুলে ধরেছেন।একজন নারী হিসেবে দ্রৌপদীর ক্ষোভ, ত্যাগ, আকাঙ্ক্ষা আর অসামান্য আত্মমর্যাদার এক বিশদ চিত্র আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই বইটির পাতায় পাতায়। বিক্রমাদিত্যের রাজ্যসভার মধ্যে যেভাবে স্বাধীনভাবে ইতিহাস ও ধর্ম নিয়ে খোলাখুলি অত্যন্ত চমৎকার সব আলোচনা হয়, তা এই বইয়ের অন্যতম সুন্দর একটি দিক। কালীদাস নিজ সমাজ ও সময়ের নিরিখে মহাভারতের তৎকালীন সমস্যাগুলোকে দ্রৌপদীর চোখ দিয়ে দেখেন, তারপর সবার সামনে তা সেভাবে উপস্থাপন করেন, বাকি সবাইকে নিয়ে এসবকিছু যাচাই করেন। এরকম স্বাধীন মতচর্চা আজকাল এতই দুর্লভ, উপন্যাসে যখন এই ব্যাপারটা পড়ি তখন সবচেয়ে বেশি ভালোলাগার কারণ হয়ে দাঁড়ায় এটা।আর ভাষার কথা বিশেষ করে না বললেই নয়, লেখক প্রায় তিনটি যুগের ভাষাশৈলী, সংলাপ ও শব্দচয়ন ভিন্নভাবে উৎকর্ষতার সহিত ফুটিয়ে তুলেছেন। সবশেষে বলা যায়, বিভিন্ন আখ্যানে প্রায় অবহেলিত কিংবা দূরে সরিয়ে রাখা দ্রৌপদী যে আসলে মহাভারতের কতটুক গুরত্বপূর্ন একজন চরিত্র, তাই এই উপন্যাসে সার্থকভাবে প্রকাশ পেয়েছে। লেখকের লেখা এত মনোমুগ্ধকর, উনার বাকি সব লেখাও আস্তে আস্তে পড়ে ফেলতে হবে। ভবিষ্যতের আরো ভালো ভালো উপন্যাস আসবে তার জন্য শুভকামনা।
মহারাজ দ্রুপদের কন্যা বলে তাকে বলা হয় 'দ্রৌপদী', পাঞ্চালের রাজকুমারী বলে সে হয়েছে 'পাঞ্চালী', যজ্ঞ থেকে সমুত্থিত হওায় 'যজ্ঞসেনী', পাণ্ডব ভ্রাতাদের বিয়ে করে পরিচয় পেয়েছিল 'কুরুকূল বধু' হিসেবে। কিন্তু এসব ছাপিয়েও তার নিজের একটা পরিচয় ছিল, যেটার উপেক্ষা মহাভারতে হয়েছে। 'দ্রৌপদী' বইতে মাহমুদুর রহমান চেষ্টা করেছেন সেই পরিচয়টাকেই তুলে ধরতে। ম্মহাভ্রত হিসেবে দ্রৌপদীর কোনো শৈশব, কৈশোর না থাকলেও লেখক চেয়েছেন দ্রৌপদীকে একজন পূর্নাঙ্গ মানুষ হিসেবে তুলে ধরতে যে বাল্যকালে হেসে খেলে বেরিয়েছে, মাতা-পিতার স্নেহ পেয়েছে, যার জীবনে কৈশোরের আমোদ এসেছে। দ্রৌপদীকে বর্নণা করেছেন মহাকবি কালিদাসের দৃষ্টি দিয়ে। আমার মতে, দ্রৌপদীকে নিয়ে লেখকের এই চিন্তাটা বেশ ভালো ছিল। কারণ, ধর্মগ্রন্থ হিসেবেই হোক কিংবা গল্প হিসেবেই হোক, দ্রৌপদীকে কেউই কখনো পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখেনি, যদিও মহাভারতের কাহিনী অনুসারে দ্রৌপদীর আবির্ভাবের পর থেকে তাকে তাকে স্বাভাবিক মানুষের মতোই বিবেচনা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন আসতে পারে, যার জীবন, মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে, তার জন্ম অস্বাভাবিক হয় কীভাবে? আর এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করতে লেখকের এই প্রচেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়। তবে কিছু দিক দিয়ে লেখক আসলে নিজের চিন্তাকে বাস্তব করতে পারেননি বলে মনে হয়েছে। যেমন, প্রথমত, লেখক দ্রৌপদীর শৈশব, কৈশোর চিন্তা করতে চেয়েছেন, কিন্তু বইতে তার তেমন আলোচনা নেই। বরং মহাভারতের যেসব অংশে দ্রৌপদী আছে, সেসব অংশেই দ্রৌপদী কীভাবে চিন্তা করেছে তার উল্লেখ হয়েছে। দ্বিতীয়ত, লেখক যদি কালিদাসের দৃষ্টিকোণ থেকে দ্রৌপদীকে না দেখে ইন্দুমতীর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাতেন তাহলে হয়তো গল্পের গভীরতা আরেকটু বাড়তো। কেননা মহাভারতে রচয়িতা নিজেই ছিলেন একজন পুরুষ, একই সাথে লেখকও একজন পুরুষ। গল্পে লেখক নিজেই কালিদাসের মাধ্যমে বলেছেন, একজন নারীকে একজন নারীই ভালো বুঝতে পারে। তৃতীয়ত, লেখক ভুমিকাতে তিনটা টাইমলাইনে লিখার ইচ্ছার কথা বললেও আমার মতে গল্প কেবল কালিদাসের টাইমলাইনেই সীমাবদ্ধ ছিল বেশিরভাগ সময়। দ্রৌপদী নিজের মুখে বয়ান করছে কেবল দু'বার। এর মাঝে আবার একবার কালিদাসের আর দ্রৌপদীর কথার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে অনেকখানি। তবে বর্তমানের প্রেক্ষাপটের সাথে লেখক যেভাবে তুলনা করেছেন শেষ দিকে, সেই ব্যাপারটা বেশ ভালো লেগেছে। সবশেষে, চমৎকার সম্ভাবনাময় একটা বই হতে পারতো 'দ্রৌপদী' যদি লেখক যা চিন্তা করেছিলেন তার পুরোপুরি প্রকাশ বইতে হতো।
মহাভারতের অন্যতম চরিত্র দ্রৌপদীর কথা কে না জানে। আর্যাবর্তের সবচেয়ে সুন্দরী যে কন্যা, যজ্ঞের আগুন থেকে যার জন্ম তার চিত্র যুগে যুগে কবি-লেখকরা এঁকেছেন ভিন্ন ভিন্ন রূপে। কখনো তিনি পরম পূজিত, কারো লেখায় পঞ্চপতি গ্রহণ করায় তিনি বেশ্যা, কেউ কেউ আবার কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের পেছনে দায়ী করেন এই দ্রৌপদীকেই।
আদতে কেমন ছিলেন দ্রৌপদী, ছাঁচের বাইরে বের হয়ে সেই দ্রৌপদীকে সামনে আনতে চেয়েছেন মাহমুদুর রহমান। কখনো দ্রৌপদীর নিজের জবানীতে, কখনো বা মহাকবি কালিদাসের জবানীতে। পাঞ্চালরাজ ধ্রুপদ যার পিতা, পঞ্চপাণ্ডব যার স্বামী; সেই দ্রৌপদী পারেন নি রাজসভায় নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করতে, যুদ্ধ শেষে হস্তিনার সম্রাজ্ঞী হওয়ার আগে হারিয়েছেন নিজের পুত্রদের। যজ্ঞসেনী হওয়া সত্ত্বেও দ্রৌপদী কারো কন্যা, স্ত্রী, মাতা যিনি ইতিহাসে প্রতিনিধিত্ব করেন সমগ্র নারী জাতির।