কাজল ভট্টাচার্যের জন্ম কলকাতায়, ১৯৭১ সালে। পড়াশোনা কলকাতায়। আধুনিক ইতিহাসে এম. এ.। সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। লেখালেখির সূচনা কৈশোরে। প্রথম মুদ্রিত রচনা ১৯৮৪-তে একটি বিজ্ঞান পত্রিকায়, এ ছাড়া লিখেছেন আনন্দবাজার, বর্তমান, যুগান্তর, দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা এবং বহু সাময়িকপত্রে। সংবাদপত্রে চাকরি দিয়ে পেশাপ্রবেশ, বর্তমানে রাজ্য সরকারের আধিকারিক। বই পড়তে, গান শুনতে এবং বেড়াতে ভালোবাসেন৷
বাংলায় 'জ্যাক দ্য রিপার'-কে নিয়ে লেখা... নাহ্, নেই! কালেভদ্রে কোনো অনুবাদকের হাতে রবার্ট ব্লক বা বেসিল কপার ওই কুখ্যাত চরিত্রটিকে কেন্দ্রে রেখে যে-সব গল্প লিখেছেন, সেগুলো অনূদিত হয়েছে। কিন্তু ইতিহাসের সবচেয়ে নামকরা সিরিয়াল কিলারের কীর্তি তথা তার সম্ভাব্য পরিচয় নিয়ে বাংলায় গবেষণা এযাবৎ হয়নি। এবার হল। সুলেখক এবং প্রাবন্ধিক কাজল ভট্টাচার্য তথ্য, তত্ত্ব, পর্যবেক্ষণ এবং অনুমানের সমন্বয়ে পরিবেশন করলেন এই সহজপাঠ্য অথচ দুষ্পাচ্য বইটিকে। এমন চমৎকার, ছবি, ম্যাপ এবং স্কেচে সমৃদ্ধ বইয়ে কোনো সূচিপত্র নেই দেখে হতাশ হতে হয়। তবে ডক্টর সুজিত সরখেলের 'মুখবন্ধ'-র পর এই বইয়ে থ্রিলারকে হার-মানানো আলোচনা যে-সব অধ্যায়ে বিন্যস্ত হয়েছে তারা হল~ ১) এমা এলিজাবেথ স্মিথ; ২) হোয়াইটচ্যাপেল; ৩) মার্থা ট্যাব্রাম (টার্নার); ৪) মেরি অ্যান নিকোলস; ৫) স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড; ৬) অ্যানি চ্যাপমান; ৭) ভিজিল্যান্স কমিটি; ৮) জ্যাক দ্য রিপার; ৯) ডাবল ইভেন্ট; ১০) এলিজাবেথ স্ট্রাইড; ১১) ক্যাথরিন এডোস; ১২) অক্টোবর, ১৮৮৮; ১৩) মেরি জেন কেলি; ১৪) স্যার চার্লস ওয়ারেন; ১৫) ক্রিমিনাল প্রোফাইল; ১৬) অ্যারন কসমিনস্কি; ১৭) রিপার-সাসপেক্ট ইনভেস্টিগেশন; ১৮) ডিএনএ ফিঙ্গারপ্রিন্ট; ১৯) পরিশিষ্ট (এবং সহায়ক পাঠ-নির্দেশিকা)।
এই বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক কী? প্রথমত, রিপারকে নিয়ে যেকোনো লেখায় স্পেকুলেশন বা জল্পনা-কল্পনা একটা মস্ত বড়ো অংশ হয়ে ওঠে। এই "কী হলে কী হত" জাতীয় প্রশ্ন এড়িয়ে লেখক শুধুমাত্র পাথুরে প্রমাণ এবং একাধিক সাক্ষীর দ্বারা সমর্থিত পর্যবেক্ষণের সাহায্যেই নিজের সিদ্ধান্তে আসতে চেষ্টা করেছেন। ফলে তাঁর লেখাটি যেমন যৌক্তিক হয়েছে, তেমনই হয়ে উঠেছে আমাদের পক্ষে আর্মচেয়ার ইনভেস্টিগেশনের আদর্শ মাধ্যম। দ্বিতীয়ত, এই বইয়ের ভাষা শুধু সহজ অথচ টানটান বললে কমই বলা হবে। নিহতদের জন্য সমবেদনা, অপদার্থ তথা রাজনৈতিক দলদাসত্বে বন্দি পুলিশ ও প্রশাসনের উদ্দেশে ক্রোধ, আর নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও রহস্যভেদীদের চেষ্টাকে সম্মান— এর সবক'টিই সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে এর ছত্রে-ছত্রে। তৃতীয়ত, লেখক দেখিয়ে দিয়েছেন, কেন জ্যাক দ্য রিপার কাগজে-কলমে ধরা পড়েনি। চার্লস ওয়ারেনের পদত্যাগের সঙ্গে-সঙ্গে এই হত্যালীলার অবসানের কথাটি বলে তিনি একটি অন্য জিনিসও বুঝিয়ে দিয়েছেন। একশো বছর পরের কলকাতায় স্টোনম্যান হত্যাকাণ্ডেরও কেন আনুষ্ঠানিক কিনারা হয়নি, আর তার আসল মোটিভই বা কী ছিল— তা এই লেখা থেকে বুঝে নিতে অসুবিধে হয় না।
এই বইয়ের খারাপ দিক কী? জ্যাক দ্য রিপার তথা তার হত্যাকাণ্ড সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে, জনমানসে কীরকম প্রভাব-বিস্তার করেছিল, সেই নিয়ে অন্তত একটি অধ্যায়ের আশা করেছিলাম। অবশ্য লেখকের বস্তুনিষ্ঠ প্রয়াসটি তার ফলে কিঞ্চিৎ লঘু হয়ে যেতে পারত, এও স্বীকার্য। তবু, পোর্টসমাউথ-এ প্রায় ফাঁকা ক্লিনিকে বসে 'মিকা ক্লার্ক' শেষ করে 'দ্য হোয়াইট কোম্পানি' নিয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু করা ডাক্তারটি ভবিষ্যতে তাঁর অমর সৃষ্টিকে একটি বারের জন্যও কেন জ্যাক দ্য রিপারের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দিলেন না— সেই নিয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা হলে লেখাটা সমৃদ্ধতর হত বলেই আমার ধারণা।
বাজারচলতি নানা গাঁজাখুরি লেখা (ফেসবুকের এক ইভেন্টে এও পড়ার দুর্ভাগ্য হয়েছিল যে জ্যাক দ্য রিপার নাকি নিহতদের পাশে 'জেটিআর' লেখা রুমাল ফেলে যেত) আর তান্ত্রিক হররের ভিড়ে এমন একটি গবেষণালব্ধ বই ক'জন পড়বেন, জানি না। তবে পড়লে তাঁরা সত্যি-সত্যিই পৌঁছে যাবেন হোয়াইটচ্যাপেলের সেই নোংরা আর কুয়াশাচ্ছন্ন গলিগুলোতে, যেখানে অপেক্ষা করছে অজস্র হতভাগ্য দেহপসারিণী, অপরাধী, অন্ধকার,... আর রিপার!
জ্যাক দ্য রিপার। পৃথিবীর সবচেয়ে কুখ্যাত কিংবা বিখ্যাত অপরাধী। প্রায় দেড় শতাব্দী পরও যাকে নিয়ে মানুষের কৌতুহল কমেনি এতটুকু। এখনো তাকে নিয়ে হয় গবেষণা, লেখা হয় বই, তৈরি হয় ডকুমেন্টরি। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেল এলাকায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে একের পর এক খুন করে যাওয়া সেই জ্যাক দ্য রিপারকে নিয়ে বাংলা ভাষায় এত বিস্তৃত পরিসরে লেখা হয়নি এর আগে। অনেক ছবি, প্রয়োজনীয় ম্যাপ, বিভিন্ন ব্যক্তির সাক্ষ্য, তদন্তকারী অফিসারদের বয়ান, সব প্রাইম সাসপেক্ট ব্যক্তির সত্যিই জ্যাক দ্য রিপার হওয়ার সম্ভবনা বিশ্লেষণ, আধুনিক গবেষণার তথ্য ইত্যাদি সম্বলিত বিস্তারিত ও সুলিখিত একটা বই বাংলা ভাষায় পড়তে পারাটা আমি একটা সৌভাগ্য হিসেবে ধরে নিলাম।
ইতিহাসের কুখ্যাততম সিরিয়াল কিলারের তকমা যদি কারো গায়ে লেগেই থাকে সে হলো "জ্যাক দ্যা রিপার"। " রিপ" অর্থ হলো "ছিয়ে নিয়ে যাওয়া"। খুব সম্ভবত খুনের পর ভিক্টিমের শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বীভৎস ভাবে ব্যবচ্ছেদ করার কারণেই হয়ত এই নাম " জ্যাক দ্যা রিপার"। কেউ কেউ দাবী করেন নাম টি খুনীর দেয়া আবার কেউ দাবী করেন নাম টি খুনীর দেয়া নয়।শুধু মাত্র বীভৎস রকম খুনের প্যাটার্নের জন্যই যে রিপার এত আলোচিত তা কিন্তু নয় তার সাথে আরো আছে অনেক অমীমাংসিত রহস্য। বীভৎসতা আর রহস্যের ঘেরাজালে ঘিরে থাকা আনসলভড কেইস গুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্যাক দ্যা রিপার।উনিশ শতকের এই কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার কে নিয়ে এখন পর্যন্ত আলোচনা,গবেষণার শেষ নেই।ইংরেজি সাহিত্যে,মুভি,জার্নাল,আর্টিকেল অনেক অনেক জায়গায় ঠাই মেলেছে এই খুনীর।কিন্তু বাংলা সাহিত্যে? বাংলা সাহিত্যে সচরাচর আনসলভড কেইসেস, সিরিয়াল কিলিং,মিস্ট্রি এসব ব্যাপারে গবেষণা ধর্মী বই খুবই কম।ফিকশনে অহরহ রহস্য,গোয়েন্দা,অপরাধ ধর্মী কাহিনী পাওয়াই যায়।কিন্তু বাংলা নন-ফিকশনে এর আনা গোনা নেই বললেই চলে।সেই আক্ষেপ দূর করলেন সুলেখক "কাজল ভট্টাচার্য"।বাংলায় লিখে ফেললেন বিশ্বের রহস্যময় সিরিয়াল কিলার "জ্যাক দ্যা রিপার" কে নিয়ে গবেষণা ধর্মী লেখা।এবং আমার মতে লেখক একদম উতরে গিয়েছেন। বাংলা তথ্যবহুল,প্রচুর গবেষণা করে লেখা নন ফিকশন লাস্ট কবে পড়েছি মনেই পরছে না।ম্যাপ,চার্ট,ছবি,রিপোর্ট সমৃদ্ধ বইটি এতটাই সুপাঠ্য আর টান টান উত্তেজনা পূর্ণ যে মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়েছে কোনো থ্রিলার পড়ছি।বইটির সবচেয়ে ভালো দিক হচ্ছে প্রতিটা ভিক্টিম, সাসপেক্ট দের বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে।প্রতিটা চ্যাপ্টার এমন ভাবে কানেক্টেড যে খেই হারাতে হয় না বা বিরক্তিও আসে না।থিওরি,রিপোর্ট এসবের পাশাপাশি আরেকটি ব্যাপার যা বইটিকে অনেক বেশী সমৃদ্ধ করে তা হলো লেখকের নিজস্ব লজিক।লেখক শুধু বিভিন্ন উপাত্তের কথাই তুলে ধরেন নি বরং ওইসব উপাত্ত গুলো ব্যবহার করে নিজের একটা লজিক্যাল অপিনিয়ন দেয়ার চেষ্টা করেছেন।কেনো সেইসময় এই কুখ্যাত খুনী কে আইডেন্টিফাই করা সম্ভব হয় নাই তার বিস্তারিত যৌক্তিক আলোচনাও বইটি তে পাওয়া যাবে। তবে দীর্ঘযুগ ব্রিটিশ শাসনের উপনিবেশ থাকার কারণে ব্রিটিশ সৈন্য / পুলিশ দের নিয়ে এই উপমহাদেশের লোকদের মনে যে বিদ্বেষ তার কিঞ্চিৎ ছাপ চলে আসে লেখকের লেখায়।তবে এটি কে খুব সহজেই ওভারলুকও করা যায় লেখকের লেখার মাধ্যমেই।��লা হয় " Truth is stranger than fiction" এই প্রবাদ টির সঠিক ব্যবহার করেছেন লেখক।একটি গবেষণা ধর্মী লেখা কে পরিণত করেছেন একটি থ্রিলার মার্ডার মিস্ট্রি ফিকশনের মতনই।সিরিয়াল কিলিং, ক্রাইম,সাসপেন্স, মার্ডার মিস্ট্রি এসব যাদের পছন্দ তাদের জন্য বইটি অবশ্যই অবশ্যই অবশ্যই পাঠ্য।আর যারা এই জনরার প্রেমী না কিন্তু ইতিহাসের কুখ্যাত এই সিরিয়াল কিলার সম্পর্কে জানতে চান তারাও চাইলে বইটি পড়তে পারেন।আশাকরি নিরাশ হবেন না।