ভূতে বিশ্বাস করেন? বিশ্বাস না করলেও ভূতের ভয়টা হয়তো তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করেন। ইদানিং যে ভূতের আনাগোনা খুব বেড়ে গেছে, তা কি বুঝতে পারছেন? এতদিন ভালো করে লক্ষ না করলেও এখন থেকে চোখ-কান খুলে রাখবেন– হতে পারে অনেক রাতে মশারি তুলে যখন মাটিতে নামেন বাথরুমে যাবেন বলে, তখন আপনার সঙ্গে আরও একজন ওই একইভাবে নামে। তার ছায়াকায়া কিছুই না থাকলেও অনুভব আছে। কিংবা কোনো একদিন লিফটে দেখা হয়ে যেতে পারে সেই অদ্ভুত অনুভবটির সাথে।
যাকে নিয়ে গল্প, তার নাম মিহির। ছোট, সুখী এক পরিবারের কর্তা। তাদের বিনোদন ছিল, স্বামী-স্ত্রীতে মিলে রাত জেগে ভূতের সিনেমা দেখা। কিন্তু সেই ভূতই তার জীবনের কাল হয়ে আবির্ভূত হলো। বউয়ের জায়গা দখল করে নিতে চাইল এক পেতনি প্রেমিকা। প্রেমিকা ... শব্দটি তো আসে প্রেম থেকেই? প্রেম...জগতের এক ব্যাখ্যাতীত উপলব্ধি। মিহিরের মতো হয়তো এতদিন জানতেন এই পৃথিবীতে প্রেমই একমাত্র উপায় সুস্থভাবে, ভালোভাবে বেঁচে থাকবার। কিন্তু সে প্রেমও যে এমন ভয়ানক ভৌতিক হয়ে উঠতে পারে, কল্পনাতেও থাকার নয়।
▫️▫️▫️
ডিসেম্বরের প্রচণ্ড শীত। হি-হি করা হিমের রাতে কম্বলমুড়ি দিয়ে ভূতের গল্প পড়ার ইচ্ছে হচ্ছিল খুব, তাই এই বইটা বেছে নেওয়া। হতাশ হইনি। প্রথমবারের মতো এই লেখকের লেখা পড়লাম—প্রাণবন্ত। মজার ব্যাপার হলো, ভূতের গন্ধের সাথে সাথে একটা মার্ডার মিস্ট্রিও হাজির। আবার কৈশোরের ত্রিভুজ প্রেমের গল্প পড়ার নস্টালজিয়াও ফিরে এলো। এক ঢিলে তিন পাখি পেয়ে গেলাম। দিনের বেলায় অবশ্য-অপাঠ্য!
ব্যস্ত মিডিয়া হাউজের এক সাধারণ, সৎ, মেহনতি কর্মী মিহির সরখেল। একদিন সে বেখেয়ালে লিফট থেকে এমন এক ফ্লোরে পা দিতে যাচ্ছিল, যেখানে কেউ যায় না। তাকে আটকেছিলেন এক সহৃদয় সিনিয়র। কিন্তু রহস্যটা তিনি খোলসা করেননি। তারপর একটু-একটু করে এক অদ্ভুত অলৌকিক রহস্যের জাল গড়ে উঠল মিহিরের চারপাশে। একের পর এক ঘটনায় বিপর্যস্ত হল সংস্থা। তারপর, ভয় পাওয়ার স্তর পার হয়ে অবশেষে আঘাত হানল মৃত্যু। কেন? কে, বা কী আছে এই রহস্যের পেছনে? তেরো নম্বর ফ্লোরে কী ঘটেছিল? মিহিরকে ঘিরেই বা কেন ঘটছে এ-সব? ভালো ভৌতিক উপন্যাস পড়তে আমরা প্রায় সবাই চাই। সেই চাহিদা মেটানোর জন্য তেমন কিছু লেখার চেষ্টাও করেন অনেকে। কিন্তু বাংলায় এই বিশেষ ফিল্ডে সম্প্রতি শিরোপা পেয়েছেন অভিষেক চট্টোপাধ্যায় তাঁর আলোচ্য উপন্যাসটির সৌজন্যেই।
ঠিক কী-কী কারণে এই বিশেষ লেখাটি পাঠকমহলে এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে? প্রথমত, এর প্লট থেকে শুরু করে আবহ, চরিত্র থেকে খলচরিত্র— সবটাই বিশ্বাসযোগ্য। আমরা এমন পরিবেশ, এমন মানুষ, তাদের এমন আচরণ— এ-সব দেখে অভ্যস্ত। তাদের নিয়েই এমন একটি টানটান কাহিনির প্রতি স্বাভাবিকভাবেই আমাদের আগ্রহ জন্মায়। দ্বিতীয়ত, একবার আগ্রহ তৈরি হওয়ার পর লেখক আর আমাদের ছাড়েননি। তিনি আমাদের রূদ্ধশ্বাসে ছুটিয়ে নিয়ে গেছেন গল্পের শেষে... যেখানেও আছে এক "শেষ নাহি যে" ধ্বনি। তৃতীয়ত, এর নানা ভয়োৎপাদক বর্ণনার সঙ্গে আগেও পড়া বা দেখা নানা জিনিসের মিল আছে। কিন্তু পরিবেশনের গুণে তাদের "অনুপ্রাণিত" বলে মনে হয় না। বরং সর্বাঙ্গে শিরশিরানির সঙ্গে সেটি উপভোগ করা যায়। চতুর্থত, এতে অলৌকিক রহস্যের সমাধান অনেকাংশে নির্ভর করেছে একটি লৌকিক রহস্যের যৌক্তিক সমাধানের ওপর। বহুদিন আগের সেই মৃত্যু ও তার প্রতিক্রিয়ার জন্য কে দায়ী— সেটা জানার চেষ্টায় তদন্ত এই উপন্যাসের অনেকটা জুড়ে আছে। সেটিও ভয়ের সঙ্গে রোমাঞ্চকে যুক্ত করে উপন্যাসটিকে আরও আনপুটডাউনেবল করে তুলেছে।
এর কী কোনো দুর্বলতা আছে? আমার যা মনে হয়েছে তা হল~ ১) "শেষ হয়ে হইল না শেষ" ব্যাপারটা ছোটোগল্পের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হলেও উপন্যাসে কাঙ্ক্ষিত নয়৷ তাও লেখক এটিকে সেইরকম অবস্থায় রেখেই থেমে গেছেন। ২) নীলাম্বর নামক চরিত্রটি ডেউস এক্স মাখিনা হয়ে এসে যাবতীয় সমস্যার চটজলদি সমাধান করেছেন। এটা উপন্যাসের মানবিক সংগ্রামের গুরুত্ব বেশ কিছুটা কমিয়ে তাকে প্রথাগত অকাল্ট নভেলের দিকেই নিয়ে গেছে। তবে এগুলো আমার ব্যক্তিগত অনুভব।
উপন্যাসের লেখা যেমন স্বচ্ছন্দ, ছাপা ও বানানও তেমনই শুদ্ধ। সব মিলিয়ে বলতে পারি, বেশ একটা গা-ছমছমে ভয়ের উপন্যাস পড়তে চাইলে এটিকে আপন করে নিতে পারেন। খুব সম্ভবত হতাশ হবেন না। অলমিতি।
....হাবিজাবি ভাবনার মাঝে হঠাৎ লিফটটা থামে । আমিও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে লিফট থেকে বেরিয়ে দু-তিন পা এগিয়ে যাই । ঠিক তখনই খেয়াল হয় দিনের বেলাতেও ফ্লোরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার । আর কিছু ভাবার সময় পাইনি । পেছন থেকে কেউ যেন সড়াৎ করে টেনে আবার লিফটে ঢুকিয়ে দিল আমায় । দেখলাম তিন-চার রকম পাথরের আংটি পরা একটা হাত...
📄 ভালো ভৌতিক উপন্যাস পড়তে আমরা সবাই চাই । এই উপন্যাসেই লেখক বলেছেন - “ভূতের নেশা অনেকটা ড্রাগের নেশার মতো । প্রথমে মাথায় চাপে । তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে । এর পর প্রতি মুহূর্তে যেন কোনো অলৌকিক ভৌতিক ক্রিয়াকর্মের দিকে টেনে নিয়ে চলে । ছাড়তে চাইলেও ছাড়ে না ।” আসলে যে কোনো ‛নিষিদ্ধ’ বিষয়ের প্রতি আমাদের যেমন সহজাত টান আছে, ঠিক তেমনই... ভয় করবে জেনেও ভূতের গল্প পড়ার মজাটাই আলাদা । কিন্তু বর্তমানে ‛তন্ত্র-মন্ত্র, বীভৎসতা’ এসবের বাইরে ভালো ‛বিশুদ্ধ’ ভয়ের গল্প পড়তে পাওয়া রীতিমতো সৌভাগ্যের বিষয়... আর ঠিক এইখানেই সম্পূর্ণ সার্থক এই অলৌকিক থ্রিলার উপন্যাসটি ।
📜 বিষয়বস্তু : উপন্যাসের মূখ্য চরিত্র একজন খুবই সাধারণ ছেলে মিহির সরখেল । সদ্য নতুন একটি চ্যানেলে জয়েন করেছে সে । সেখানে জয়েন করার পর থেকেই তার জীবনে প্রবেশ করে অশরীরীর কালো ছায়া । নতুন কর্মক্ষেত্রে তাকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু অতিপ্রাকৃত ঘটনা উপলব্ধি করতে শুরু করে সে । তার অফিস পঁচিশ নম্বর ফ্লোরে, কিন্তু প্রতিদিনই তাদের বিল্ডিংয়ের লিফট্ তেরো নম্বর ফ্লোরে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে । কেন ? বারো বছর আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা তার জীবনে ডেকে আনে ভয়াবহ বিভীষিকা । অথচ আপাতদৃষ্টিতে সেই ঘটনার সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই । নাকি আছে ? কি ঘটেছিল বারো বছর আগে ? কেনই বা সেই অতীত প্রভাব ফেলছে মিহিরের জীবনে ? কি আছে ঐ তেরো নম্বর ফ্লোরে ?
📜 প্রতিক্রিয়া : এই বইটির প্রকাশের সময় অভিযান পাবলিশার্সের পেজে লেখা ছিল - ‛মাত্র দু'ঘন্টা যথেষ্ট তেরো নম্বর ফ্লোর কে পুরো ঘুরে দেখার জন্য, কারণ এখানে একবার ঢুকে পড়লে সহজে বেরোতে পারবেন না আপনি ।’ বিশ্বাস করুন এই কথাগুলির একটি বর্ণও মিথ্যা নয় । এত গতিশীল, টানটান, রোমাঞ্চকর ‛অলৌকিক’ থ্রিলার আমি শেষ কবে পড়েছি বলতে পারবো না । এই গল্প জমিয়ে আরাম করে বসে পড়ার গল্প নয়, বরং এই গল্প পড়তে পড়তে পাঠক ‛গা-ছমছমে’ অনুভূতি পাবেন... অথচ ঘটনাপ্রবাহের টানে বই রেখে দিতেও পারবেন না ।
এই বইটি আর পাঁচটা ‛ভৌতিক-অলৌকিক’ উপন্যাসের চেয়ে অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি কারণে ।
▫️লেখকের ঝরঝরে গদ্য এবং টানটান লেখনী বইটির অন্যতম ‛প্লাস পয়েন্ট’। ইচ্ছা করলেই লেখক উপন্যাসটিকে রসিয়ে রসিয়ে লিখে পাতার সংখ্যা বাড়াতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেই পথ দিয়ে যাওয়ার চেষ্টাও করেননি । বরং তিনি জোর দিয়েছেন ‛টু দ্য পয়েন্ট’ লেখার ওপর, যার ফলস্বরূপ উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে ভীষণ দ্রুত গতিসম্পন্ন । লেখকের সুন্দর বর্ণনার কারণে প্রতিটি ঘটনা চোখের সামনে ফুটে উঠেছে... ফলে একটার পর একটা ঘটনা পাঠককে ক্রমাগত শিহরিত করে ।
▫️এত ’রিয়েলিস্টিক’ ভৌতিক উপন্যাস সাধারণত দেখা যায় না । প্লটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেখক যেসব চরিত্র এবং পরিবেশ সৃষ্টি করেছেন তা আমাদের সকলেরই বেশ পরিচিত । পড়তে পড়তে একবারও মনে হয়নি - ‛ধুর, এ আবার হয় নাকি !’ বরং বারবার মনে হয়েছে এগুলো সত্যি-সত্যিই কারো জীবনে ঘটে থাকতেও পারে ।
▫️এই উপন্যাসের আর একটি বিশেষত্ব হল এর বিষয়বস্তু । লেখক গল্পটিকে ‛অলৌকিক’ জঁনরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং অলৌকিক এবং রহস্যের মিশেলে একটি অত্যন্ত টানটান কাহিনী ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন । যার ফলে গল্পটি পড়তে পড়তে বেশ কিছু জায়গায় পাঠকের মনে হতেই পারে যে এটি একটি রহস্য উপন্যাস, যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় আছে অলৌকিকের ছোঁয়া... হয়তো শেষে এইসব অলৌকিক ঘটনাবলীর আড়াল সরিয়ে আসল রহস্যের উদ্ঘাটন হবে ।
📄 সবমিলিয়ে বলতে পারি... আমাদের সকলের খুব পরিচিত বিষয়বস্তুকে লেখক এত সুনিপুণভাবে ভৌতিক এবং রহস্যের মোড়কে পরিবেশন করেছেন... যা ‛রহস্য’ এবং ‛ভৌতিক’ উভয় শ্রেণীর পাঠকদের জন্যেই অবশ্যপাঠ্য একটি উপন্যাস হয়ে উঠেছে ।
শেক্সপিয়র’র সেই বিখ্যাত উক্তির বাংলা করলে দাঁড়ায় “নামে কী এসে যায়?” আপাতদৃষ্টিতে ঠিক হলেও সবক্ষেত্রে নয় মোটেই। আমাদের প্রত্যেকেরই এক একটা নামের প্রতি অদ্ভুত ভালোবাসা থেকে যায়, বলা ভালো ‘অবসেশন’। কোনো জায়গায় সেই নাম শুনতে পেলেই নিজের অজান্তে মাথা ঘুরিয়ে খুঁজে বেড়াই সেই নামের উৎসখানা। কিন্তু সেই নামে যদি মিশে থাকে কোনো অশরীরীর ভালোবাসা আর অপেক্ষা মেশা দীর্ঘশ্বাস? তখন সেই ‘অবসেশন’ হয়ে দাঁড়ায় সাক্ষাৎ শমনের হাতছানি। মধ্যবিত্ত পরিবারের চাকুরিজীবী মিহির সরখেল নিপাট ভালো মানুষ। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার। নতুন চাকরিতে জয়েন করার ঠিক পর থেকেই এক যুগ আগের এক অমীমাংসিত রহস্যের অশরীরী কালো থাবা আঘাত হানে মিহির আর তাঁর পরিবারের উপর। সাথে তাঁর অফিসের কলিগরাও পড়েন বিপাকে। জীবন আর মৃত্যুর মাঝে না দেখতে পাওয়া সূক্ষ্ম ব্যবধানে আটকে পড়া এক প্রেমিকার সারল্য মাখা প্রেম, আকাঙ্খা, কামনা, ঘৃণা, প্রতিশোধ ঘুরে বেড়ায় অফিসের দেওয়ালের মাঝে।
কী চায় মিহিরের ‘তিলু’? অলোকের নামের আড়ালে আলো কি ফেলতে পারবে সায়ন? নীলাম্বর কি পারবেন এই মহা শক্তিশালী প্রতিশোধউন্মুখ অশরীরীর সংঘে যুঝতে?
সময় বড় কম, ঊষাকালের মধ্যে খুলবে কি এই রহস্যের জট? নাকি একটু একটু করে অদৃশ্য হাত গুটিয়ে নেবে সুতোর শেষ প্রান্ত? প্রশ্ন অনেক, উত্তর মিশে আছে ‘তেরো নম্বর ফ্লোর’এর অন্ধকার আর পোড়া গন্ধে।
পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ এমন গতিশীল, উত্তেজনাপূর্ণ, রোমাঞ্চকর, রহস্যাবৃত অলৌকিক কাহিনীকে রেটিং-এর বেড়াজালে না বেঁধে সরাসরি চলে আসব বইটির ভাল-খারাপ দিক গুলিতে। লেখকের ঝরঝরে গদ্য আর টানটান প্লট আপনাকে বাধ্য করবে ঘড়ি দেখা ভুলতে। প্রত্যেক পাতায় ভরপুর উত্তেজনার আবেশে যেই মুহূর্তে আপনি ডুবে যাবেন, ঠিক সেই সময় মনে হবে সে এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক আপনারই পিছনে, তাঁর গরম নিশ্বাস কাঁপিয়ে দেবে আপনার বুক; কিন্তু না…, পিছনে আপনি ঘুরতে পারবেন না আর না পারবেন বইটি ছেড়ে উঠতে। এখানেই লেখকের সার্থকতা। এমন রিয়েলিস্টিক ভৌতিক কাহিনী আজকাল বিরল। সেখানে দাঁড়িয়ে প্লটের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অভিষেক চট্টোপাধ্যায় সাজিয়ে গেছেন একের পর এক চরিত্র। প্রতিহিংসার ভাঁজে কখন জড়িয়ে যাবে আপনার দুচোখের অশ্রুধারা, আপনি নিজেও বুঝতে পারবেন না। আরেকটি বিষয় যা না বললেই নয়, তা হল লেখক গল্পটিকে শুধু অলৌকিক জঁনরার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি, অলৌকিকের সাথে এ কাহিনীতে জড়িয়ে গেছে রহস্য, খুন, প্রেম, অনুভুতি আরও অনেক কিছু। তাই লেখকের কথাতেই, “ভূতের নেশা অনেকটা ড্রাগের নেশার মতো। প্রথমে মাথায় চাপে। তারপর সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর প্রতি মুহূর্তে যেন কোনো অলৌকিক ভৌতিক ক্রিয়াকর্মের দিকে টেনে নিয়ে চলে। ছাড়তে চাইলেও ছাড়ে না।” এই বইটিও তেমনি না ছাড়তে পারার মতো বই।
তবে, ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে বইয়ের প্রচ্ছদ কাহিনীর ঘনঘটার কাছে একেবারেই সাদামাটা হয়ে গিয়েছে। কাহিনীর লেখা যেমন স্বচ্ছন্দ, ছাপা ও বানানও তেমনই শুদ্ধ। সব মিলিয়ে বলতে পারি, বেশ একটা গা-ছমছমে ভয়ের ও রহস্যের উপন্যাস পড়তে চাইলে এটিকে আপন করে নিতে পারেন। হতাশ হবেন না। অলমিতি।
🔷আমি ভূতের ভয় পাই না, সেই কারণেই সাধারণত ভূতের গল্প আমার বেশি পড়া হয়না। থ্রিলার,ডার্ক, প্রেম, সামাজিক এই সব বই সাধারণত পড়া হয়। কিন্তু রিসেন্টলি লেখকের ম্যাও পড়ে এতো ভালো লাগে যে কলেজস্ট্রিট এর অভিযান থেকে এই বইটি ও তার নেক্সট পার্ট টাও কিনে নিই। 🔷যথারীতি সময় নষ্ট না করে বইটা হাতে তুলে নিই। আমি ছোট্ট করে আমার অনুভূতি টা শেয়ার করছি। এটি শুধু ভৌতিক উপন্যাস নয়, হরর ক্রাইম থ্রিলার যাকে বলে একদম তাই। ভূত তো অবশ্যই আছে, তার সাথে আছে ক্রাইম, মার্ডার মিস্ট্রি।তাছাড়া একটা প্রেম কাহিনী ও আছে এই গল্পে। মিহির এক নতুন অফিসে জয়েন করে। সেই বিল্ডিং এর ১৩ নম্বর ফ্লোর এ একটা রহস্য আছে, কী ঘটনা ঘটেছিল অতীত এ? অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনা কেন মিহির অফিস এ জয়েন করার পর আবার মাথা চারা দিয়ে উঠল? এই গল্পের প্রতি মোড়ে রহস্য আছে, আর লেখকের এই রহস্যের বুনন পাঠক কে ধরে রেখেছে। তাছাড়া কিছু সিন এর বর্ণনা এমন আছে যেন চোখের সামনে ফুটে উঠছে। সিন গুলো পড়লে গায়ে কাঁটা দিতে বাধ্য। যারা ভুতে ভয় পায় তাদের দারুণ ভয় লাগবে। মানে রাতে বাথরুম এ যেতে গেলেও দুবার ভাবতে হবে। তন্ত্র সাধনা নিয়েও কিছু বিবরণ আছে এই গল্পে , মানে মাংসে নুন যতটা লাগবে ঠিক ততটাই। অতিরিক্ত কিছু নেই। সেই কারণেই এটা গল্পটি টানটান হয়ে উঠেছে। গল্প নিয়ে বেশি কিছু কথা বলব না তাহলে পড়ার মজাটাই নষ্ট হয়ে যাবে।
❇️গল্প নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই, তবে প্রকাশনী নিয়ে দুটো কথা বলতে চাই
🔴এই বই তে লক্ষ্য করলাম একটাই প্যারাগ্রাফ এর মধ্যে পর পর অনেকগুলি চরিত্রের ডায়লগ। কোনো লাইন ব্রেক নেই। এবং একটানা ২ টি পেজ এমন ও আছে যাতে কোনো প্যারাগ্রাফ নেই। একজন পাঠক হিসাবে এভাবে পড়তে বেশ অসুবিধা ই হচ্ছে, পড়তে গিয়ে বার বার থেমে গিয়ে আবার পড়তে হচ্ছে। আমার মনে হয় এডিটর এর যত্নশীল হওয়া দরকার এই ব্যাপার এ। এটাতে হয়তো বইটি ১১২ পাতার জায়েগায় ১৩০ পাতা হতো, কিম্তু পাঠকদের সুবিধা হতো। 🔴তাছাড়া একজন পাঠক যখন ১১০ পাতার একটা ২৫০ টাকার (মুদ্রিত মূল্য) বই নেয় সে তখন বেস্ট টা ডিজার্ভ করে। বইটি দুবার পড়া হয়েছে মাত্র তাতেই ফর্মা এর সেলাই খুলে যাচ্ছে(ছবি কমেন্ট এ)। 🔴ইদানীং কিছু প্রকাশনী এর কাজ আমার খুব ভালো লেগেছে তা আমি আমার পাঠ প্রতিক্রিয়া তে ব্যক্ত করেছি। কিন্তু অভিযান পাবলিশার্স এর বই এর দাম অনেক অনেক বেশি সেই তুলনায় মান জঘন্য। ভবিষ্যৎ এ দুবার ভেবে দেখব অভিযান এর বই কেনার আগে।
"অসাধারণ" বলব না, তবে নিঃসন্দেহে এটি একটি ভালো বই। গল্পের চরিত্রগুলো যথেষ্ট রিলেটেবল, যেন আমাদের আশেপাশেরই কেউ। গল্পের মধ্যে যে ঠান্ডা শিরশিরে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়—এই ধরণের spine-chilling অ্যাম্বিয়েন্স এখনকার বাংলা ভূতের গল্পে খুব একটা দেখা যায় না, তাই সেটা বেশ ভালো লেগেছে।