এই উপাখ্যান শুরু হয় কুয়াশাঘেরা এক এ অরণ্যের শেষপ্রান্তে অবস্থিত সেই কার থেকে, যেখানে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে খোদ নগরীর রাজকন্যাকেই। বাবা-মা জীবিত নেই তার। বদলে কুয়াশানগরীর রাজা এখন প্রাক্তন মহামন্ত্রী, যাঁর নির্দেশে চোখের সামনে বদলে যাচ্ছে নগরীর হালচাল। বরাবর শান্তিপ্রিয় নগরী এখন সেজে উঠছে যুদ্ধের জন্য আর তৈরি করছে বহিরাগত শিবির। যারা কখনও না কখনও বাইরে থেকে এসেছে এ-রাজ্যে, তাদের ধরে ধরে সেখানে পাঠানো হচ্ছে। বন্দি আছে অবশ্য আরও একজন। তার নাম বিপ্লবী। সে রাজার এইসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছে, দল বেঁধেছে, তাই তাকে পুরে রাখা হয়েছে বন্দিশালায়। এই বিপ্লবীকেই ভালবাসে রাজকন্যা। সেও এই নতুন রাজার বিরোধী। বিচারের পর মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হয় বিপ্লবীর। রাজকন্যার বিরহ বিষাদে বদলে যায়। একদিকে তার দুই মায়াবিনী সহচরী তার মন ভাল করবার চেষ্টায় ব্যর্থ হতে থাকে, অপরদিকে বৃদ্ধ বিদূষকের অপবুদ্ধির জোরে নতুন রাজাও হয়ে উঠতে থাকেন ক্ষুরধার। আর ঠিক তখনই কুয়াশানগরীর মাটিতে এসে দাঁড়ায় এক আগন্তুক। নিজের পরিচয় যে দেয় ভিনদেশি ব’লে। আর জানায়, পেশায় সে স্মৃতির কারিগর। এখান থেকে কাহিনি এক অভাবনীয় দিকে মোড় নেয়। এই উপাখ্যানের পরতে পরতে জাদুর সঙ্গে মিশে যায় বাস্তবতা, সংকেতের সুতোয় বাঁধা পড়ে সময়, রাজনীতির সঙ্গে মিশ খায় রূপকথা। সংলাপে আর গানে, দৃশ্যকল্পে আর কথকতায় ‘কুয়াশানগরীর উপাখ্যান' হয়ে ওঠে এমনই এক আশ্চর্য কাহিনি, যা সমসাময়িক হয়েও চিরকালীন, আঞ্চলিক হয়েও সর্বজনীন।
Srijato Bandopadhyay (born 21 December 1975 in Kolkata), is an eminent poet of the Bengali younger generation. He won the Ananda Puroskar in 2004 for his book Udanta Sawb Joker: All Those Flying Jokers. He has also attended a writer's workshop at the University of Iowa.
His notable works include Chotoder Chiriyakhana: The menagerie for kids (2005), Katiushar golpo: Tales untold (2006), Borshamongol : The monsoon epic (2006), Okalboisakhi: Storms unprecedent (2007), Likhte hole bhodrobhabe lekho: Write politely, if you have to (2002), Ses Chithi: Last Letter (1999), Bombay to Goa (2007), Coffer namti Irish : Irish Coffee (2008), Onubhob korechi tai bolchi : Revealing the feeling (1998).
Having worked as journalist, he is now on the editorial board of the magazine "Prathama". He lived at Garia and spend his childhood at Kamdohari, Narkelbagan.
Srijato is the grandchild of classical vocalist Sangeetacharya Tarapada Chakraborty and nephew of musician and the Khalifa of Kotali Gharana Pandit Manas Chakraborty; his mother is also a classical vocalist Gaan Saraswati Srila Bandopadhyay.
Other than poetry he has also penned the lyrics of many popular playbacks in several movies like Autograph (2010 film,)Jaani Dyakha Hawbe, c/o Sir (2013 film),Mishawr Rawhoshyo,Iti Mrinalinee, charulata, Abosheshe etc.
গল্পটা সহজ। কুয়াশানগরীর রাজার রাজত্ব এখন পৃথিবীজুড়ে।আমি যা বলবো তা-ই ঠিক,আমি যা করবো তা-ই ন্যায়, আমি যা পালন করবো তা-ই ধর্ম।অন্য সব ভুল, সব মিথ্যা, সব দেশদ্রোহিতা, সব ধর্মানুভূতিতে আঘাত। এই নিয়েই তো চলছে।করোনা অতিমারীর আগে, ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে আয়োজন করে দেশ থেকে তাড়ানোর যে চক্রান্ত শুরু হয়েছিলো,তার বিরুদ্ধে গোটা ভারত উত্তাল হয়ে উঠেছিলো।শ্রীজাত রূপকথার সহজ আবরণে এই গল্পটাই তুলে এনেছেন।কবিতায় যেমন তিনি লিখেছেন- "তুমি যদি বারংবার কোপ মারতে পারো ছিন্ন কাঁধে ফের মাথা জন্মাবে আমারও।" এই গল্পটা ঠিক তাই।গল্পের উপসংহার মনে থাকবে বহুদিন,স্মৃতির চেয়ে ভারী কিছু নেই।
রূপকথা শুধু ছোটদের নয়, বড়দেরও হয়। এই উপাখ্যান তেমনি এক রূপকথা। রাজারানীর গল্পের আড়ালে ষড়যন্ত্র, প্রেম আর বিপ্লবের কাহিনী। ঘোর ধরানো, নেশা জাগানো লেখনি। আমার শুধু একটাই অভিযোগ গল্পের কলেবর আরো বড় হলে ভালো হত। ওয়ার্ল্ডবিল্ডিংয়ে আরো কিছু পৃষ্ঠা খরচ করলে ভালো হত। বিশেষ করে রাজকন্যার দুই সহচরী আর কালো ঘোড়ার ব্যপারটা। ভিনদেশী বেশ সম্ভাবনাময় চরিত্র ছিলো, কিন্তু তার ব্যাপ্তি কম লেগেছে। বাংলায় পুরোপুরি আমাদের সংস্কৃতি ভিত্তিক ফ্যান্টাসি কম দেখা যায়। এই গল্পটা আরো একটু বড় হলে তেমনই স্বাদ পেতাম। শেষ হয়েও হইলো না শেষ।
যে বইই পড়ছি, না জেনেও, চলমান পরিস্থিতির সাথে চমৎকার খাপ খেয়ে যাচ্ছে। আসলে এই পরিস্থিতি তো আর একদিনের বা একমাসের নয়, অনেক অনেক দিনের। তাই মিলে যাওয়াটা কাকতাল নয়।
“দেশ কাকে বলে, সে হয়তো আপনারা বোঝেন, যারা গণ্ডির মধ্যে থাকেন। গণ্ডি দিলেই দেশ। তুলে দিলেই আর দেশ নেই। আমি তো ঘুরে-ঘুরে বেড়াই, গণ্ডি মানি না। থাকি না কোথাও, যাইও না কোথাও। তাই আমার কোনও দেশ নেই।”
কুয়াশানগরীর নাম অবশ্য আগে কুয়াশানগরী ছিল না। আগে এই অরণ্য আর উপত্যকার রাজ্যে সব মৌসুমই ঠিকঠাক বোঝা যেত। কিন্তু সেদিনের পর থেকে এই রাজ্যে সারাবছরই কুয়াশা লেগে আছে। সবসময় স্যাঁতস্যাঁতে একটা ভাব। উঁচু উঁচু গাছের শাখা প্রশাখা ভেদ করে সূর্য এখন মাটিতে পড়া মানে রীতিমতো সৌভাগ্যের ব্যাপার। আশেপাশে এমন আরো কিছু রাজ্য আছে। সেসব রাজ্যও এই অরণ্য-উপত্যকার রাজ্যের চেয়ে কম সুন্দর নয়।
এই সুন্দর রাজ্য অবশ্য আগের মতো আর সুন্দর রইলো না। যেদিন রাজা আর রাণী পাশের রাজ্য থেকে দাওয়াত খেয়ে আসার সময় পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা যান, ঠিক সেদিন থেকে। রাজকন্যা তখন বয়স ছয়েকের। পিতামাতার মৃত্যুর খবর স্বাভাবিকভাবেই কষ্ট দিয়েছিল তাকে। তবে এই খবর তার রাজকন্যা হয়েও ভবঘুরে আর জেদি স্বভাবের মধ্যে ছেদ ফেলেনি। রাজার মৃত্যুর পর মহামন্ত্রী সেই রাজ্যের ভার নিলেন। এবং তারপর থেকেই শুরু হলো মহামন্ত্রীর এতদিন যাবত করে আসা সব পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
রাজা আর রাণীর মৃত্যু যে নেহাৎ দূর্ঘটনা ছিল না, তা রাজকন্যা অনেক পরেই জেনেছিলেন। তবুও তা জানার আগে থেকেই তিনি মহামন্ত্রী তথা নতুন রাজার স্বভাবের বিরোধী ছিলেন। রাজকন্যা বেশ কয়েকদিন থেকে দানা-পানি পর্যন্ত মুখে তোলেন নি। যেই স্বাদ তিনি একবার পেয়েছেন, তারপর আর অন্য স্বাদ তার মুখে রুচেনি। ওদিকে বিপ্লবীর অবশ্য এসব নিয়ে মাথাব্যথা নেই। সে আপাতত পাহাড়ের গায়ে লাগা কয়েদখানায় বন্দী হয়ে এখনো রাজার পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এই রাজা শান্তি বলতে শুধুই অর্থকড়ি বোঝেন। সেজন্যই তো এতদিনের মিত্র রাজ্যগুলোর সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাজা। পুরনো বাসিন্দাদের রাজ্যছাড়া করার ব্যবস্থা করছেন।
বিপ্লবীর এই অবস্থা হঠাৎই হয়নি। এর পেছনে রয়েছে বহু মর্মান্তিক গল্প। রয়েছে ক্ষোভ, দুঃখ, শান্তির আশা। রাজকন্যাও বয়ে বেড়িয়েছেন প্রতীক্ষার ঝুলি। নতুন রাজা কি তাদের এতোদিনের শান্তিপূর্ণ দেশটিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করেই ছাড়বে? নাকি অতি আশ্চর্যজনক কোনো পরিণতির সম্মুখীন হবে এই কুয়াশানগরী? আর স্মৃতির কারিগরের আগমণের পেছনেও তো নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে!
◽পাঠপ্রতিক্রিয়া :
এই বইটা পড়ার সময় মনে হয়েছে যে কিশোরদের জন্যই অধিক উপযোগী এই বই। এই উপন্যাসে বাস্তবতার সাথে মিশে গিয়েছে জাদু আর অলৌকিক কিছু চরিত্র। একটা শান্তিপূর্ণ রাজ্য কিভাবে ভুল নেতৃত্বের হাতে পড়ে খারাপ পরিণতির দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তা নিয়েই এই গল্প। এর মাঝে রয়েছে বিপ্লবী আর রাজকন্যার ভালোবাসার এক সুন্দর পরিণতি।
অনেকগুলো জিনিস খাপছাড়া গোছের ছিল। যেমন: হঠাৎ করেই রাজ্য কুয়াশায় ঢেকে যাওয়া এবং সারাবছরই কুয়াশা লেগে থাকা, এর পেছনের কারণ কী? এটা কি আদৌ শুধুমাত্র প্রতীকায়িত করার জন্য নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল? আবার, রাজকন্যার সেই দুই ন গ্ন সহচরী যাদের পিঠে ছিল গোলাপি রঙের পাখা, তারা আসলে কেমন চরিত্র? তারা এইখানে আসল কিভাবে? তাদের উৎস কোথায়? এছাড়াও সেই দুই প্রেত, যারা কিনা বলছিল যে মৃত্যুর পরও তাদের একপ্রকার শাস্তির মধ্যে রাখা হয়েছে, ব্লা ব্লা ব্লা, এটার কনসেপ্ট কী? প্রেতদেরই বা শাসন করছে কে, শাস্তি দিচ্ছে কে? ইত্যাদি। এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবলেই বোঝা যায় যে, কিশোরদের জন্যই এই বই উপযোগী। যেখানে সামান্য অলৌকিকতার কোনো মিশেলে এক চমৎকার রূপকথার গল্প ফাঁদা হয়েছে। গল্পের শেষটাও রূপকথার গল্পের মতোই।
বড়োরা পড়লে যে একদমই খারাপ লাগবে, তাও না। উপরোক্ত বিষয়গুলোকে গুরুত্বের সাথে না দেখে যদি সামনে পড়া যায় তাহলে খারাপ লাগার কথা না। তবে খুঁতখুঁতে ভাব থাকলে না পড়াই ভালো। এই বইয়ের পজিটিভ এবং নেগেটিভ রেটিংয়ের হার প্রায় সমান সমান। তাই ঠিকঠাক জেনে নিয়ে পড়া ভালো।
এই গল্পে ভালো লাগার কিছু দিক হলো, লেখকের বর্ণনার হাত খুবই সুন্দর। বিভূতিভূষণের লেখার মতো অনেকটা ফিল পেয়েছি। লেখক তার নিজের কল্পনা অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন। গল্পটা পড়ার সময় আমি নিজেও লেখকের কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এছাড়া গল্পে সৎ ও সঠিক নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা এবং অসৎ ও বেঠিক নেতৃত্বের পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে। মোটের ওপর ভালো একটা গল্প বলা যায়। একদম খারাপ না। কিশোর বয়সী পাঠকরা পড়লে বেশি আনন্দিত হবে।