ইতিহাসের আদলে ফিকশন না কি ফিকশনের আদলে ইতিহাস! ইতিহাস আশ্রিত ফিকশনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায় খুব বেশি অতিরঞ্জিত বর্ণনা থাকে, মূল ইতিহাসের প্লটের সাথে কল্পনাপ্রসূত অনেক কিছুই যোগ হয়, যার সত্য মিথ্যা বিচারের অবকাশ থাকে না। কারণ ফিকশন তো ফিকশন-ই! পবিত্র ভূমি, ক্রু সেড, মুসলিম বিশ্ব, জেরুজালেম এই শব্দগুলো বহন করে এক র ক্তাক্ত অতীতের, ইতিহাসের নৃশংস হ ত্যা যজ্ঞের। দ্বিতীয় আরবান পোপের পরিকল্পনায় খ্রিস্টানদের বিষিয়ে তোলা হয় মুসলিমদের বিরুদ্ধে। বানোয়াট সব গালগল্প বলে উদ্বুদ্ধ করা হয় হাজারো মানুষকে যু দ্ধের জন্য। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হওয়া শুরু হয় ধীরে ধীরে। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে একত্র হয় বিষিয়ে ওঠা খ্রিস্টানরা। লক্ষ্য পবিত্র ভূমি মুসলিম অত্যাচারীদের থেকে দখল করা আর স্বর্গের পথ সুনিশ্চিত করা। বলা হয়েছে, স্বয়ং যীশু তাদের সাথে আছেন। ❛ক্রু সেড❜ নামধারী অপ্রশিক্ষিত বিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হতে থাকে সেনাপতিরা। পথে চালাতে থাকে নিষ্ঠুরতা, অবরোধ করে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা দখল নেয়। আচমকা এসব আক্রমণে কোণঠাসা মুসলিম বাহিনী। সম্মিলিত হয়ে প্রতিহত করা থেকে তাদের বরং নজর ছিল নিজেদের অন্তঃকোন্দল নিয়ে। এই দুর্বলতাই কাজে লাগায় নিষ্ঠুর ক্রু সেডরা। ধীরে ধীরে জেরুজালেমের অধিকার নিয়ে নেয় এই বাহিনী। মুসলিম শাসন তখন হুমকির মুখে। মুসলিম নেতারা এক পা এগিয়ে যায় এক হওয়ার জন্য, তো তিন পা পিছিয়ে যায় অভ্যন্তরীণ বিবাদে। জেরুজালেমের বিপদকে নিজের তথা মুসলিম জাতির বিপদ থেকে আঞ্চলিক বিপদ হিসেবে গণ্য করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন তারা। গাফিলতির ঘুমে আচ্ছন্ন এই মুসলিম নেতাদের মাঝে কিরিজ আরসালান প্রথম ক্রুসেডে অসামান্য অবদান রাখেন। এরপর মাওদুদ হাল ধরেন এবং নিঃস্বার্থ চেষ্টা চালিয়ে যান ক্রুসেডার থেকে জেরুজালেম এবং মুসলিম আধিপত্য ফিরিয়ে আনতে। পেরেছিলেন কি? একা একজন নিঃস্বার্থ মানুষ কি পারবেন তৎকালীন গাফলতের ঘুমে আচ্ছন্ন মুসলিম নেতাদের টনক নাড়াতে? পাঠ প্রতিক্রিয়া: ❛পাইন বনের যোদ্ধা❜ ইমরান রাইহান এর লেখা ইতিহাসধর্মী ফিকশন। ১৪৪ পৃষ্ঠার হইতে লেখক প্রথম ক্রুসেড সহ জেরুজালেম পতন, মুসলিম বিশ্বের অবস্থা, মুসলিমদের উপর হওয়া প্রথম ক্রু সেডের ভয়াবহতা, নিষ্ঠুরতা দারুণভাবে তুলে ধরেছেন। ফিকশনের আকারে লেখা হলেও বইতে প্রাধান্য পেয়েছে মূল ইতিহাস। ইতিহাস পড়তে ভালো লাগার দরুণ এই বইয়ের ইতিহাসের বর্ণনার আধিক্য আমার খুব একটা সমস্যা করেনি। বিভিন্ন চরিত্রের সাথে লেখক ইতিহাসের ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো লেখক নিজস্ব ধারায় লিখেছেন। অতিরঞ্জিত বর্ণনা, ফিকশন হিসেবে আম গাছকে কলা গাছ মনে করেননি। যা বইটাকে ভালো লাগার অন্যতম কারণ। ইতিহাসের ঘটনাগুলোর রেফারেন্স প্রতি অধ্যায়ের শেষে দিয়ে দিয়েছেন। বিভিন্ন অধ্যায়ের শিরোনামের সাথে তাকে সার্থক করে বর্ণনা করেছেন। বিশাল ইতিহাসকে ছোটো কলেবরে বর্ণনা করা খুব সহজ বিষয় নয়। লেখক সেক্ষেত্রে সার্থক। ইতিহাসকে সঠিক রেখে ফিকশন রচনা করলে দেখা যায় কল্পনার কল্পনায় বাস্তব ফিকে হয়ে যায়। এই বইটি সে দোষমুক্ত। খ্রিষ্টান বাহিনীর সম্মলিত হওয়া,তাদের নিষ্ঠুর আচরণ, বর্বর চিন্তা, মুসলিম শাসকদের গাফিলতি, জিহাদের স্বপ্নে বিভোর এক নেতার গল্প বলেছেন তিনি। বইয়ের শেষে আগ্রহউদ্দীপক লাইনের মাধ্যমে ইশারা করেছেন দ্বিতীয় খন্ডের। ইতিহাস নিয়ে আগ্রহী কেউ বিনা দ্বিধায় বইটা পড়তে পারেন।
ছোট বেলা থেকেই ধারণা পিডিএফ মানেই ফ্রী 😑। বই কিনতে পারছি না গুগলে ফ্রী পিডিএফ খুঁজো, বই খুজে পাচ্ছি না গুগলে ফ্রী পিডিএফ খুঁজো। ফ্রী পিডিএফ আর ই-বুক নিয়ে আমার চিন্তা ভাবনা এখন অন্য রকম হলেও, টাকা দিয়ে ই-বুক কিনতে তারপরও কেমনে কেমনই লাগে। . যাই হোক,অনেক দিনের ইচ্ছা ছিলো ই-বুক কেনার। আর ইমরান রাইহান হাফিজাহুল্লাহর লেখা "পাইন বনের যোদ্ধা" হলো টাকা দিয়ে কেনা আমার প্রথম ই-বুক 😐 ফিজিকাল বই এর সাথে তুলনায় যাবো না। ফ্রী পিডিএফ এর সাথেও তুলনায় যাবো না। আসলে তুলনা করে লাভ নাই৷ কাগজের বই পড়ে যে আরাম, ই-বুকে তার সিকিভাগও পাওয়া যায় না। তবে নিজের কাছে মনে হলো ভ্রমণের সময় বা ঘুমানোর আগে ফেইবুকের পাতার চেয়ে এই ই-বুক পড়া বেশি কাজের( অডিওবুকও শোনা যায় তবে যারা পড়তে ভালবাসেন তাদের জন্য ই-বুক)।
এবার আসি বই এর রিভিউ। গত নভেম্বরের দিকে বইটা প্রথম বাজারে আসে। প্রথম থেকেই বইটা নিয়ে অনেক হাইপ। গত কয়েকবছরে দেশে ইসলামি বই এর চাহিদা বাড়লেও বাংলায় ইসলামী ইতিহাস নিয়ে যে সব বই আসছে তার প্রায় সবই অনুবাদ। ইসমেইল রেহান, রাগিব সারজানি, আলি মুহাম্মদ সাল্লাবীর বই এর অনুবাদ পড়েই মোটামুটি ইতিহাসের সাথে পরিচিত হচ্ছে অনেকে। এই জায়গায় বাংলায় ইতিহাস লিখে ভালই জনপ্রিয় হয়েছেন ইমরান রাইহান হাফিজাহুল্লাহ। উনার "ইতিহাস পাঠের প্রসঙ্গ কথা" বইটাও পাঠকপ্রিয় হয়ে ছিলো। . লেখকের রিসেন্ট প্রকাশ পাওয়া "পাইন বনের যোদ্ধা" মূলত ইউরোপীয় খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের প্রাচ্য আক্রমণের শুরু থেকে মওদুদ বিন তুনতেকিনের প্রতিরোধ সংগ্রাম পর্যন্ত টাইম লাইনের একটা অভার ভিউ বলা চলে। ক্রুসেডারদের অর্গানাইজড করার জন্য পোপ দ্বিতীয় আর্বানের উদ্যোগ, ক্রুসেডারদের প্রাচ্যে আগমন, নিকিয়া, এডেসা, এন্টিয়র্ক, বাইতুল মাকদিস পতন, তৎকালিন আঞ্চলিক মুসলিম শাসকদের মাঝে অন্তর্দন্দের ঘটনার ছোট আকারে বর্ননা পাওয়া যাবে। বই এর ঘটনাপ্রবাহ শেষ হবে শিয়া বাতিনীদের হাতে মওদুদ বিন তুনতেকিনের গুপ্ত হত্যা আর ক্রুসেড যুদ্ধের অন্যতম নায়ক ইমাদুদ্দিন জিনকিকে খুজে পাওয়ার মধ্যে দিয়ে।
রাগিব সারজানি বা আলি মুহাম্মদ সাল্লাবীর বই এর মত তথ্যে ভরপুর না হলেও আবেগী হাতে যত্ন নিয়ে লিখা একটা বই। একটু চিন্তা করে পড়লে যে কেউ বুঝতে পারবেন। ক্রুসেড নিয়ে যাদের ভাল ধারণা আছে তাদের কাছেও বোরিং ফিল হবে না। প্রতিটা অধ্যায়েই লেখক কাহিনীর গভীরে প্রবেশ করার প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। বইটা শেষ করার পর মনে হচ্ছিলো লেখকের উচিত ছিলো ক্রুসেড যুদ্ধের ঘটনাকে আরো দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
ইসলামি ইতিহাসকে এমন আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর ভাবে ফুটিয়ে তুলতে অন্তত আমি এই প্রথম দেখলাম। ঘটনার বিবরণে অবশ্যই ফিকশনের ছোয়া আছে যা পাঠ্য অভিজ্ঞতা আরও মজাদার করে তুলে। যা একনাগাড়ে বইটি পড়ে যেতে সাহায্য করে। তাছাড়া ইতিহাসের তথ্যসূত্রের ব্যাপারে আমরা মনে হয় ইমরান রাইহান ভাইয়ের মতো ইতিহাস প্রেমী একজন লেখকের উপর আস্থা রাখতে পারি।
বইটিতে প্রথম ক্রুসেড কোন উদ্দেশ্যে কিভাবে শুরু হলো তা খুব চমৎকার বর্ণনাভঙ্গিতে তুলে ধরা হয়েছে। কিভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে তখনকার পোপ ও তার কিছু অনুসারীরা প্রোপাগাণ্ডার মাধ্যমে সাধারণ খৃষ্টানদের মন-মগজে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষের অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে। কিভাবেই বা তারা সক্ষম হয়েছে লক্ষ লক্ষ সাধারণ খৃষ্টানদের দ্বারা এই বিদ্বেষপূর্ণ চেতনার ভিত্তিতে বিশাল একটি বাহিনী সংঘটিত কর��ে। আর কিভাবে পর্যায়ক্রমে এই বাহিনী দ্বারা রক্তের বন্যা ভাসিয়ে জেরুজালেমসহ আরও অন্যান্য মুসলিম ভূমি আক্রমণ ও দখল করতে সক্ষম হয়েছে।
অপরদিকে ক্রুসেড আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তৎকালীন মুসলিমবিশ্বের অবস্থা ও প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরা হয়েছে। যা মূলত তখন নানান সাম্রাজ্য দ্বারা বিভক্ত আর নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিলো। তবে সকল মুসলিম শাসকরাই যে ক্রুসেড আগ্রাসনের মোকাবিলায় একেবারে নিস্ক্রিয় ছিলেন তেমনটাও নয়। যেরকম জোরদার ও সংঘবদ্ধ ভাবে জবাব দেয়া উচিত ছিল সেরকম কিছু না হলেও মুসলমানদের প্রতিরোধের ফলে কিছুটা হলেও বেগ পোহাতে হয়েছে ক্রুসেডারদের আর তার সাথে বাধাগ্রস্ত হয়েছে তাদের আগ্রাসনের নানান পরিকল্পনাও।
মুসলমানদের মধ্য থেকে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য তৎকালীন সেলজুক সুলতান কিলিজ আরসালান ও মসুলের শাসক মাওদুদ ইবনে তুনিতকিনের প্রতিরোধ প্রচেষ্টা। এই দুই বাহিনীর কাছে পৃথক পৃথক বিভিন্ন যুদ্ধে ক্রুসেডাররা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। যার ফলে মুসলিমবিশ্বে তাদের আগ্রাসনের পরিকল্পনা অনেকাংশে ব্যহত হয়েছিল। যদিও তখন পর্যন্ত ক্রুসেডাররা অনেক শক্তিশালী ছিল এবং জেরুজালেমও তাদেরই দখলে ছিল।
বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা জিজ্ঞেস করলে এক কথায় বলবো,অসাধারণ। সিরিজের সামনের বইগুলো পড়ার জন্য অপেক্ষায় রইলাম, ইন শা আল্লাহ। বইয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আল্লাহ উত্তম প্রতিদান দিন আর সিরিজের বাকি বইগুলো শীঘ্রই নিয়ে আসার তৌফিক দিন,আমীন। সকল প্রশংসা এই বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহর।
ইতিহাসের প্রতি টানটা এমনিতেই একটু বেশি৷ তার উপর যদি ফিকশনের ঢঙে লেখা হয় তাহলে তো সোনায় সোহাগা ৷ তবে ফিকশনের আদলে লেখা ইতিহাসের ক্ষেত্রে অতি রঞ্জনের আশংকা থেকেই যায়, যা ক্ষেত্র বিশেষে বিরক্তিকর। তবে লেখক যখন ইমরান রাইহান, তখন এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকা যায়।
ঘটনার বিবরণ শুরু হয়েছে ইউরোপকে ক্রুসেডের জন্য উদ্বুদ্ধ করার মধ্য দিয়ে। এরপর বাইতুল মুকাদ্দাস দখল,মুসলিম ভূখণ্ডে ক্রুসেড সাম্রাজ্যের সূচনা ও বিস্তার, মাওদুদ বিন তুনিতকিন এর কাছে ক্রুসেডারদের শোচনীয় পরাজয় এবং শেষ হয়েছে মাওদুদের পরিণতির মাধ্যমে। এছাড়াও উঠে এসেছে ক্রুসেডারদের নিজেদের মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক মুসলিম শাসকদের উম্মাহবোধ ভুলে গিয়ে নিজেদের স্বার্থপরতার আখ্যান৷
সমাপ্তিটাও করা হয়েছে একটা চমৎকার লাইন দিয়ে যা পড়েই দ্বিতীয় খন্ডের জন্য আগ্রহ আরো বেড়ে গেছে— "আগামীদিনে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নেতৃত্ব থাকবে কার হাতে?"
প্রতিটা অধ্যায়ের শেষে রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে।কিন্তু কোন অংশ কোন বই থেকে নেওয়া হয়েছে সেটা তেমন একটা পরিস্কার রেফারেন্সিং করা হয়নি। এছাড়া বেশ কিছু বানান ও সম্পাদনাগত ত্রুটি চোখে পড়েছে৷ এক জায়গায় টেনক্রেডকে বোহেমন্ডের ভাই বলা হয়েছে, আবার অন্য জায়গায় বলা হয়েছে ভাগ্নে। আবার এই দুই টেনক্রেড আলাদা দুই ব্যক্তি কিনা তাও পরিষ্কার করা হয়নি।
ইতিহাসপ্রেমীরা যদি পড়ে না থাকেন তবে পড়তে পারেন। আশা করি আশাহত হবেন না।
◾কাহিনী সংক্ষেপ: ফজরের আজানের বেশ আগে ঘুম ভাঙল বৃদ্ধ ইমামের। দেয়ালে ঝুলানো প্রদীপের মৃদু আলোয় ঘরের ভেতরটা আবছা দেখা যাচ্ছে। গা থেকে চাদর সরাতেই শুনলেন বাইরে নিশাচর পাখি ডাকছে। দরজা খুলে বাইরে এলেন তিনি। দরজার পাশে রাখা পানির পাত্র থেকে অজু করতে করতে ইমামের মনে হলো আজকের রাতটা বেশ বিষন্ন লাগছে। আকাশে মিটিমিটি করে জ্বলছে তারা। বাতাস স্থির হয়ে আছে, যেন চারপাশের প্রকৃতি বহন করছে কোন শোকবার্তা। ইমামের মন ভালো নেই। তার মনে হচ্ছে কোথাও একটা বিপদের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নিকিয়ার শাসক কিলিজ আরসালান অবস্থান করছেন শহর থেকে নয়শো কিলোমিটার দূরে, মালাতিয়া শহরে। শহরের মালিকানা অর্জনের লড়াইয়ে তিনি মুখোমুখি হয়েছেন গাজি বিন দানিশমন্দের। ইমামের মনে হলো সেলজুক পরিবারের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব একদিকে তাদের শক্তি খর্ব করছে, অন্যদিকে ক্রুসেডারদের মুসলিম ভূমি আক্রমণের সাহস যোগাচ্ছে।
◾ পাইন বনে যোদ্ধা বইতে মূলত প্রথম ক্রুসেডে সূচনা, ক্রুসেডারদের জয়, মুসলমানদের পুনরায় উঠে দাড়ানোর প্রচেষ্টা , জেরুসালেমের পতনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। পোপ দ্বিতীয় আরবানের নেতৃত্বে প্রথম ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধ সংঘটিত হয়। ক্রুসেডের মূল উদ্দ্যেশ্য ছিলো জেরুসালেমসহ মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো খ্রিস্টানদের করায়ত্ত করা। পোপ দ্বিতীয় আরবান মিথ্যা বানোয়াট গল্প বলে সাধারন খ্রিষ্টান জনগনকে যোদ্ধের জন্য উস্কাতে থাকে। ক্রুসেডে যারা অংশ নিবে তাদের সকলের সারাজীবনের পাপ ক্ষমাকরা হবে, এবং যারা ঋণগ্রস্থ তাদের তা পরিশোধের লম্বা সময় দেয়া হবে, যারা দাগি আসামি তারা যদি যোদ্ধে অংশগ্রহন করে তাহলে তাদের শাস্তি মাফ করা হবেবে। আর যারা যোদ্ধে মারা যাবে তাদের জন্য রয়েছে প্রতিশ্রোত স্বর্গ। এরকম নানা রকম প্রলোভন দেখিয়ে খ্রিস্টান সাধারণ জনগনকে ক্রুসেডের পতাকা তলে সমবেত করেন পোপ দ্বিতীয় আরবান। ক্রুসেডাররা এতই বর্বর ছিলো যে তারা জেরুসালেম জয় করার পর সেখানকার অধিবাসি সত্তর হাজার মুসলমানকে নির্বিচারে হত্যা করে। সেদিন এতই রক্ত প্রবাহিত হয়েছিলো যে ক্রুসেডাররা তাদের ঘোড়াগুলোকে হাটু সমান রক্তের উপর দিয়ে ছুটিয়েছিলো। এরপরেও তারা থেমে ছিলোনা। মুসলমানদের লাশকে পুড়িয়ে সিন্ধ করে তারা তা বক্ষন করে চরম বর্বরতার পরিচয় দেয় সেদিন।
◾পাঠপ্রতিক্রিয়া: ক্রুসেডের ইতিহাস আমাকে যেমন মুগ্ধ করে আবার তেমনই দুঃখিত করে। ক্রুসেডের মাঝে রয়েছে মুসলমানদের ভেঙ্গে পড়ার ইতিহাস আবার পুনরায় বীরের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ইতিহাস। ইমরান রাইহানে "পাইন বনের যোদ্ধা " বইটিতে ছোট পরিসরে খুব সুন্দরভাবে প্রথম ক্রুসেডের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে যা সত্যি আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। লিখার ধরণও অত্যন্ত সাবলীল যার কারণে পড়তে গিয়েও তেমন একটা সমস্যা হয়নি। কেউ যদি ছোট পরিসরে ক্রুসেড সম্পর্কে জানতে চান তাহলে এই বইটি আপনি পড়তে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে আপনার।
🔰 পাঠ প্রতিক্রিয়া: পাইন বনের যুদ্ধ ( প্রথম ক্রুসেড, কিলিজ আরসালান, জেরুজালেমের পতন)
সালটা তখন ১০৮৮ খ্রিস্টাব্দ, ��্যাথলিক গির্জায় পোপ তৃতীয় ভিক্টরের মৃত্যুর পরই নতুন পোপ হিসেবে নিযুক্ত হন ৫৩ বছর বয়সী দ্বিতীয় আরবান। এই দিনটার জন্যই তিনি অপেক্ষা করেছেন বছরের পর বছর, কিন্তু নানান ঝামেলায় কাজে নামতে নামতেই সময় অনেক পেরিয়ে গেছে। সময়টা তখন ১০৯৫ খ্রিষ্টাব্দ, বাইজেন্টাইন সম্রাটের সাথে জোট গড়ে তুলে পোপ, উদ্দেশ্য কেবল একটাই, শিগগিরই মুসলিম ভূখন্ডের উদ্দেশে অভিযান শুরু করা। এই উদ্দেশ্যেই দক্ষিণ ফ্রান্সের ক্লেরমন্ট শহরে আয়োজন করা হয় এক সম্মেলনের, যেখানে পোপ একের পর এক বানোয়াট গল্প বলে চলেন, যেখানে বর্ণনা করেন মুসলমানরা মসজিদুল আকসা দখলে রেখে কীভাবে পবিত্রভূমির পবিত্রতা নষ্ট করছে। বলেন মুসলিম শাসকদের লুকিয়ে রাখা ধনভাণ্ডারের কথা। তারই কথায় উজ্জীবিত হয়ে গঠিন হয় ক্রুসেডারদের যুদ্ধ বাহিনী।
১০৯৬ সালের ২১শে অক্টোবর রেমন্ড ও গডফ্রের নেতৃত্বে ২০ হাজার ক্রুসেডার আক্রমণ করে নিকিয়ায়, কিন্তু সেলজুক সুলতান কিলিজ আরসালানের নেতৃত্বে মুসলমানদের প্রতিরোধে পিছু হাটতে হয় ক্রুসেডারদের। সেসব অবশ্য ৬মাস আগের ঘটনা, এবার আরো প্রশিক্ষিত, সুসজ্জিত হয়ে ফিরে এসেছে ক্রসেডাররা, কিলিজ আরসালান তখন ৯০০ কিলোমিটার দূরে মালাতিয়া শহরে দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে আরেক মুসলিম শাসক গাজি বিন দানিশমন্দের সাথে। খবর পেয়ে কিলিজ আরসালান ফিরলেও আসলে কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয় না, বরং যুদ্ধে হেরে পিছু হাঁটতে হয় সুলতানকে। এদিকে ক্রুসেডারদের টপকে নিকিয়ার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় বাইজেন্টাইন সম্রাট। লুটপাট গণহত্যা করতে না পারার রাগে দুঃখে তারা সেখান থেকে বেরিয়ে অবরোধ করে কেনিয়া, যেখানে আশ্রয় নিয়েছিলো সুলতান কিলিজ আরসালান, দ্বন্দ্ব ভুলে গাজি বিন দানিশমন্দের সাথে জোট বেঁধেও হারতে হয় সুলতানকে, ফলে কেনিয়া দখলে আসে ক্রসেডারদের, এশিয়া মাইনরের ভেতরের দিকে চলে যান সুলতান। এদিকে ক্রুসেডাররা কেনিয়া দখলের পরপরই তারা দখল নিয়ে নেয় পার্শ্ববর্তী অঞ্চল হিরাক্লিয়া। এবং কী কোনো যুদ্ধ ছাড়াই কায়সারিয়া, মারআশ মতো আরো অনেক শহর একের পর এক দখলে আসতে থাকে তাদের।
এদিকে বাইজেন্টাইন সম্রাট আর গির্জার প্রভাব থেকে বের হয়ে ক্রসেডার সেনাপতিরা চাচ্ছিলেন নিজেদের রাজ্যগঠনে, যার প্রেক্ষিতে ১০৯৮ সালের মার্চে বল্ডউইন এডেসায় প্রবেশ করে মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরে প্রথম ক্রসেড রাজ্য এডেসা প্রতিষ্ঠা করে।
বল্ডউইন যখন এডেসা নিয়ে ব্যস্থ, ক্রুসেডারদের মূল বাহিনী তখন এশিয়া মাইনরের দূর্গম এলাকা পাড়ি দিয়ে অবরোধ করে এন্টিয়াক, যে শহর প্রকৃতিগত ভাবে সুরক্ষিত হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় অবরোধ আর আঞ্চলিক মুসলিম শাসকদের প্রচেষ্টার পরও পতন ঘটে ক্রসেডারদের হাতে, পালিয়ে যায় শহরের সুলতান ইয়াগিসিয়ান। তারই দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত আলেপ্পোর শাসনাধীন বৃত্তাকার প্রাচীরঘেরা শহর মাআররাতুন নুমান। ক্রুসেডাররা এ শহরও অবরোধ করে নভেম্বরের মাঝামাঝি, অস্ত্র আর রসদের জন্য। শুরুর দিকে গভীর পরিখা ও প্রাচীরের আড়ালে অবস্থানরত শহরবাসী বেশ নিশ্চিন্তে থাকলেও খুব সহজেই শহরের পতন হয়। ক্রুসেডাররা আত্মসমর্পণ করলে ক্ষমা করে দিবে বলে শহরের সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করে নৃশংস ভাবে খুন করে প্রায় ২০,০০০ মুসলিমকে, বন্দি করে শিশু, মহিলা আর তরুণদের।
শহর পতনের চার দিন পর ক্রুসেডাররা যে কাণ্ড করে বসে, তাতে তাদের অতীতের সকল নৃশংসতা ও বর্বরতা হার মানে। শুরুটা কে করেছিল জানা যায় না, তবে ১৬ ডিসেম্বর দুপুরে দেখা গেল ক্রুসেডার শিবিরে বন্দি মুসলিমদের হত্যা করে তাদের মাংস রান্না হচ্ছে। নরমাংস রান্না শেষে ক্রুসেডাররা বিকৃত উল্লাসে খেতে বসে। বিকৃত মস্তিষ্কের দুয়েকজন উন্মাদ ক্রুসেডার প্রস্তাব দেয় শিশুদের মাংস দিয়ে কাবাব বানালে খেতে সুস্বাদু হবে। সেদিন রাতেই কয়েকজন মুসলিম শিশুকে হত্যা করে আগুনে পোড়ানো হয় মাংস, উৎকট গন্ধে ভারী হয়ে আসে বাতাস। যেকোনো বিবেকবান মানুষ এ কথা শুনে আটকে উঠার কথা কিন্তু সেদিন ক্রুসেডার শিবিরে কেউই এই ঘৃণ্য কাজে দ্বিমত করেনি।
মাআররাতুন নুমানে জন্মেছিলেন বিখ্যাত কবি ও দার্শনিক আবুল আলা মাআররি। মাআররির মৃত্যুর ৪০ বছর পর তার শহর গুঁড়িয়ে দিলো ক্রুসেডাররা, তার কবরের পাশে পড়ে রইল লাশের স্তূপ। এ ঘটনার তিন বছর আগে জন্ম নেওয়া শেইজারের আমিরের ছেলে উসামা ইবনু মুনকিয পরে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, যারা ক্রুসেডারদের চেনে তারা স্বীকার করবে, ক্রুসেডাররা ছিল পশুর মতো, যাদের মাঝে যুদ্ধ ও হিংস্রতা ছাড়া আর কোনো গুণাবলিই ছিল না।
১০৯৯ খ্রিস্টাব্দের ১৫ই জুলাই পতন ঘটে জেরুজালেমের, সেখানে একদিনেই হত্যা করা হয় ৭০হাজার মুসলিমকে। একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণে জানা যায়, বাইতুল মুকাদ্দাস জয়ের পরদিন চারদিকে শুধু মুসলিমদের লাশের স্থুপ পড়ে ছিলো, যাদের রক্তে তার হাঁটু পর্যন্ত ডুবে গিয়েছিলো।
এদিকে দীর্ঘ সময় ধরে মুসলিম শাসকরা নিজেদের কর্তব্য ভুলে বিভোর ছিল গাফলতের ঘুমে, তাদের সে ঘুম আরও দীর্ঘ হয়। হয়তো তারা ভেবেছিল, ক্রুসেডারদের আক্রমণের এই সংকট শুধু ফিলিস্তিনি মুসলমানদের সংকট। এখানে তাদের কীই-বা করার আছে। তারা বড়জোর দোয়া করতে পারে। তারা নিজেরাও যাপিত জীবনের অনেক টানাপোড়েনে আছে, ক্রুসেডারদের ব্যাপারে নাক না গলিয়ে বরং সেগুলো আগে সমাধান করা দরকার। এদিকে মাওদুদ বিন তুনিতকিন কয়েকবার চেষ্টা করলেও মুসলিম ঐক্যতা না থাকা আর বিশ্বাসঘাতকতার কারণে তাকে পিছু হাটতে হয়। এরপরও তিনি কখনও হাল ছাড়েননি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চেষ্টা করে গেছেন ক্রসেডারদের বিরুদ্ধে লড়তে, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতা তাকে রুখে দিয়েছে বার বার।
ইতিহাসের বই পড়া বেশ হ্যাপার কাজ, যদি ঘটনা ইন্টারেস্টিং আর বর্ণনা আকর্ষণীয় না হয় তাহলে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বই পড়ে যাওয়াটা বেশ কঠিন মনে হয়। তার উপর বই যদি বড়ো হয় তাহলে শুরু করার আগ্রহটাও কম থাকে। এদিক দিয়ে ইসলামী ইতিহাসের নানান অধ্যায়ের কাহিনি জানতে লেখক ইমরান রাইহানের বইগুলো আমার কাছে বেশ উপযোগী লাগে।
লেখক সংক্ষেপে পুরো একটা সময়ের ইতিহাসকে অল্প পৃষ্ঠাতে মলাট বন্দি করেছেন, বর্ণনাটা এমন ভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেনো উপন্যাস থেকে বর্ণনা করা কোনো ঘটনা মনে হয়। পাইন বনের যুদ্ধ বইয়ে প্রথম ক্রুসেডের ইতিহাস স্থান পেয়েছে, যাদের ইসলামি ইতিহাস এবং ক্রসেড যুদ্ধ নিয়ে আগ্রহ আছে তাদের জন্য বইটি চমৎকার পছন্দ হবে।
তাছাড়া বইটি পেপারব্যাক ১৪৪পৃষ্টার বই হওয়ায় পড়তেও তেমন সময় লাগবে না। এদিকে বইয়ের বর্ণনা আর ইতিহাসের ধারাবাহিক উপস্থাপন বইটি পড়তে আরো বেশি আগ্রহী করে তুলবে। সেই সাথে বইয়ের বর্ণনা গতিশীল হওয়ার কারণে সময়ও তেমন লাগবে না শেষ করতে।
প্রথম ক্রুসেডের ইতিহাসে মুসলিম শাসকদের গাফেলতি, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর ঐক্যতার অভাব দেখে বইটা পড়তে গিয়ে প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছি। এবং কী কোনো শাসক যখন নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য শত্রুর সাথে হাত মিলিয়ে যেসব মুসলিম শাসক এই নৃশংস বর্বরতা বন্ধ করতে চেয়েছিলো তাদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা আর বিরুদ্ধাচারণ করেছেন তা পড়ে রীতিমতো চমকে উঠেছি।
সবমিলিয়ে প্রথম ক্রসেডের কাহিনি জানতে, বুঝতে এবং প্রথম ক্রুসেডের সূচনা ও মুসলিম বিশ্বের রাজ্যগুলোর পতনের কারণ অনুসন্ধানে সংক্ষিপ্ত আকারে পুরো বিষয়টা জেনে নেওয়ার জন্য লেখক ইমরান রাইহানের এই পাইন বনের যুদ্ধ বইটা আমার দারুণ লেগেছে।
বহুদিন পর রাত-বিরেতে শান্তিতে একটা বই পড়ে শেষ করতে পারলাম! বিশেষ করে ইতিহাসের উপরে। ইতিহাসের বই পড়তে নিলে টেবিল আর হাতের কাছে ডাইরি, কলম ছাড়া কেন জানি বসা যায় না। আর না নিয়ে বসলেও কেমন যেন খালি খালি লাগে। যার কারণে ইতিহাসের বই একদমই শান্তিতে পড়া যায় নাহ!! অনেকে তো এজন্যই ইতিহাস পড়তেও ভালোবাসে নাহ। কিন্তু “পাইন বনের যোদ্ধা” বইটা ইতিহাসের উপর একদম ভিন্ন ধাঁচের একটা বই মনে হইলো। মাত্র দুই রাতে দু'ঘন্টা করে সময় নিয়ে চার ঘন্টার মধ্যে শেষ করেছি মেবি। বলা চলে, এক বসায়ই বইখানা শেষ করা। পড়তে গিয়ে লেখকের বর্ণনার ক্ষেত্রে ভাষার সৌন্দর্যের করার নোট করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে জাগেনি আর ইতিহাসের বইয়ের ক্ষেত্রে নোট না করতে পারার সে অপরাধবোধটা সেটাও জাগেনি। নসীম হিজাজী বা এনায়েতুল্লাহ আলতামাশের ইতিহাস নিয়ে উপন্যাসের বইগুলোর মতো একটা ফিল পাওয়া গিয়েছে ক্যান জানি। যদিও তাদের বইয়ের মতো বানোয়াট কাহিনী নাই বইটায়।
পোপ দ্বিতীয় আরবানের ক্রুসেড যুদ্ধের ঘোষণা, মুসলিম শাসকদের নিজেদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আর তার সুযোগে ক্রুসেডারদের একের পর এক মুসলিম রাজ্য দখল অতঃপর ক্রুসেডারদের বাইতুল মাকদিস দখল!! আর তারপরই মুসলিমদের উপর বাইতুল মাকদিসের পবিত্র ভূমিতে ক্রুসেডারদের সেই চরম নৃশংসতার বর্ণনা। এক বন্ধু বইটা পড়ে বলেছিলো, “বইটার গল্পভাষ্য বিশেষ করে গণহত্যা বা নৃশংসতার এই বর্ণনাগুলো নাকি অনেকটা হরর স্টাইলের ফিল্ম বা গল্পের মতো লাগে।” বাস্তবে আমিও এমনই কিছুটা ফিল পাইছি! ইতিহাসের কাঠখোট্টা বইগুলাতে যা আসলেই বিরল। তার উপর আবার অবিকৃত ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে!! উপন্যাসের ক্ষেত্রে ভিন্ন কথা। সোজা কথায়, বাংলায় ইতিহাস লেখা ও বর্ণনার ক্ষেত্রে বইটা যেন একটা নতুন ধাঁচের উদ্ভোদন করলো! এমন ধাঁচ এই প্রথমই দেখলাম।
বইয়ের লেখক এবং বই সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য ইতিহাসের উপরে ভিন্ন ধাঁচের বইটা মার্কেটে আনার জন্য একরাশ ভালোবাসা আর দুআ রইলো!!
● সংক্ষেপে বই পরিচিতি :
▪︎ বইয়ের নাম : পাইন বনের যোদ্ধা ▪︎ লেখক : মুহতারাম ইমরান রাইহান ভাই! ▪︎ প্রকাশক : Sanchalan Prokashoni - সঞ্চালন প্রকাশনী ▪︎ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৪৪ পৃষ্ঠা ▪︎ মলাট মূল্য : ২০০৳
অনলাইন দুনিয়ার কল্যাণে(!) আমাদের প্রজন্ম হয়তো "ক্রুসেড(Crusade)" শব্দটা অনেকবার শুনেছে কিন্তু এর সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য পড়াশোনা অধিকাংশই করেনি। আজকাল বিভিন্ন গেমিং দুনিয়ার মাধ্যমে পশ্চিমা সভ্যতা ও তাদের দাসরা আমাদের দিয়ে Crusade Mode খেলাচ্ছে। কিন্তু এই তারাই হাজার বছর আগে শতাব্দী যাবত মুসলিমদের উপর এই Crusade এর মাধ্যমে অত্যাচার ও নির্যাতনের স্টিমরোলার চালিয়েছিলো,আমাদের আল-আকসা কেড়ে নিয়ে লাশের পাহাড় দাঁড় করিয়েছিলো।
সেই সময়ও আমরা বর্তমানের মতো বিভিন্নভাবে নিজেদেরকে বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিলাম বলে তারা এই সাহস করতে পেরেছিলো। বর্তমান সময় যেন সেই ইতিহাসের অবয়ব।
সম্মানিত লেখক এর "পাইন বনের যোদ্ধা" নামক বইটিতে কুখ্যাত প্রথম ক্রুসেডের ঘটনাবলি গল্প আকারে উপস্থাপন করেছেন। অনেকেই ইতিহাসের মোটা মোটা বই পড়তে পছন্দ করেন না। তাদের জন্য সংক্ষিপ্ত আকারে জানতে এই বইটি উত্তম হবে।
বরাবরের মতোই আমি ইতিহাস পাগল, আর সেটা যদি হয় মুসলিম ইতিহাস তাহলে তো কথাই নেই, বইটি পড়ি ই-বুক ভার্সনে বইটই এ্যাপে। ক্রুসেড যুদ্ধের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, আমি ক্রুসেড ইতিহাস নিয়ে ছোটবেলা থেকেই বেশ আগ্রহী, বাজারে অন্যান্য বড় বড় ক্রুসেড রিলেটেড বইয়ের মতো এতো বিস্তারিত নেই, তবে ভালো লেগেছে বইটি পড়ে।
তবে এই বইয়ে একটা জিনিস যেটা খারাপ লেগেছে সেটা হলো, এই বইয়ের স্টোরি তে ৭০-৮০% বিজয় হয় কাফেরদের, কিন্তু এই রিলেটেড অন্যান্য বই গুলোতে তার বিপরীত।
গল্পের প্রকরণে লেখা ক্রুসেডের সত্য ইতিহাস। অসামান্য ধারাবিবরণী। এক চুমুকে পড়ে ফেলার মতো। গদ্য অত্যন্ত গতিশীল। প্রতিটি বাক্য নতুন সংকেত রেখে রেখে এগিয়ে যায়।
দারুণ লেগেছে রাজনৈতিক গোলটেবিল বৈঠকের আলাপচারিতার চিত্রায়ণ, চরিত্রগুলোর মগজে কী চলছে তা বলা। ভালো লেগেছে যুদ্ধের চিত্রায়ণ, ঘটনার বিন্যাস, দৃশ্য থেকে দৃশ্যে গড়িয়ে যাওয়া।