ছোট্ট মেয়েটার কৌতুহলী প্রশ্ন, “তুমি কে?” রুদ্র ফিসফিস করে বলে , “আমি…কাগজের যাদুকর…৷”
“এই কাগজের ঘোড়াটা কি করবে?” ছেলেটা হাতে নিয়ে মেয়েটাকে প্রশ্ন করে৷ মেয়েটা ফিসফিসিয়ে বলে “তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে..” ছেলেটা পাশে তাঁকিয়ে দেখে মেয়েটা ওখানে নেই! স্কুলের বারান্দা থেকে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে৷ তাহলে এতক্ষন কার সাথে সে কথা বলছিল…!
…রাশেদা বুয়া পিছলে মেঝেতে পড়ে গেছে৷ নড়তে পারছে না৷ সহসা তার মনে হলো দুটো পা এগিয়ে আসছে…পা দুটো মানুষের নয়, ঘোড়ার!
শিবলি স্মরণ করতে পারে না মৃতদেহ গুলোর নিচে সে কতক্ষণ ছিল৷ গরমে ওগুলো পঁচে গন্ধ ছড়াচ্ছিল৷ শিবলির মনে হয়েছিল ওর আত্মার ভেতরে এই মাংশ পঁচা গন্ধ ঢুকে গেছে৷ সেখান থেকেই তার ডার্ক ফোবিয়ার জন্ম…
কঙ্কাবতীর শরীরে যেনো কস্তুরীর ঘ্রাণ! কেউ এতে ডুবে যায় আর কারও ভেতরে অস্থিরতার জন্ম হয়… মতিন এক মৃত দেহ বহনকারী কালো গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ও রাতে ঘুমায় না৷ কস্তুরীর ঘ্রাণ পাবার পর সে অস্থির হয়ে পড়ে৷ সারারাত রাস্তা থেকে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়… হাতে থাকে আধলা ইট৷
রেবতী নামের ছোট্ট একটা মেয়েকে মেরে করে ফেলার নির্দেশ আসে ওর কাছে৷ আর রেবতীর ছায়াটা দেখলে মনে হয় যেন ওটা ওর নয় একজন বুড়ির!
ডিপার্টমেন্টের সবাই ওকে ডাকে বুরা সাজ্জাদ৷ আর একটা কেস সলভ হলেই অলিখিত ভাবে ওর একটা রেকর্ড হয়ে যাবে…
মানুষের মনস্তাত্বিক বিবরণের একটা দলিল এই কাগজের যাদুকর৷ এই চরিত্রগুলো কখন কি করে বসে সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না! চলুন দেখা যাক ওরা সবাই মিলে কি ঘোট পাকায়…
‘কাগজের জাদুকর’ বইটা আমি যখন আমি হাতে নেই, তখন টার্গেট ছিলো একটাই। তা হলো একটা ছোট বই পড়বো। ব্যস, এটুকুই ছিলো চাওয়া। হাতে নেয়ার আগ পর্যন্ত আমি জানতাম না, এই বইটা কার, কি নিয়ে লেখা বা এই বইটার পাঠক রিয়্যাকশন কি। ইভেন মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বইটা আমি ইন্টেনশনালি কিনিও নাই। এক ভাই সেকেন্ড হ্যান্ড কিছু বই বিক্রি করছিলো, ওখানে এটা প্যাকেজে ছিলো। প্যাকেজের বাকি দুটা বই আমি কিনবো সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবলাম, এইটাও নিয়ে নেই। তখন বইটার নামও আমি খেয়াল করিনি। আমি আসলে বোঝাতে চাচ্ছি, বইটার কোনরকম না শুনে আমি স্রেফ ‘এমনি’তেই বইটা পড়ার জন্য হাতে নিলাম। এখানে বলে রাখা ভালো, আমি খুব সময়েই বইয়ের ব্লার্ব/সিনোপসিস পড়ি। আমার ধারণা অনেক ব্লার্বে কিছু স্পয়লার রয়ে যায় কিংবা এমন একটা ফোরশ্যাডো থাকে যেটা আসলে আমি বই পড়ে জানতে পারলেই বেশি খুশি হবো। তাই ব্লার্ব পড়িনা, এবং এই বইটার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। বই হাতে নিয়ে ২০ পৃষ্ঠা পড়ার পরই আমি বইয়ে ঢুঁকে যাই। খেয়াল করলাম, লেখকের লেখার ভঙ্গিটা বেশ সুন্দর, একটা সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার আছে। আর তখনই বইটার মলাটের দিকে আমি তাকিয়ে দেখি বইয়ের লেখকের নাম ‘পলাশ পুরপকায়স্থ’ (যে নামটা আমার আগে শোনা হয়নি)। বইয়ের মলাটে জনরা হিসেবে ‘প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’ ট্যাগ দেয়া আছে। এবার আমি একটু নড়েচড়ে বসি। কারণ প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার আমার বেশ পছন্দের জনরা হলেও এক মিসির আলি বাদে আর কোন প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার পড়ার এক্সপেরিয়েন্স আমার নাই। বাংলাদেশে কেউ আসলে প্যারাসাইকোলজিক্যাল ফিকশন লেখার খুব একটা আগ্রহী না বলেই আমি জানি, সেখানে নতুন এক লেখক যিনি প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার লিখে বসেছেন এটা নিঃসন্দেহে আমার জন্য অনেক আনন্দের একটা সংবাদ। যাই হোক, নড়েচড়ে বসে দুই সিটিং আমি শেষ করি পলাশ পুরকায়স্থের ‘কাগজের জাদুকর’। এবং বলতে দ্বিধা নেই, প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার জানার পড়ে বই নিয়ে যে এক্সপেক্টেশন আমার হয়েছিলো, তা পূরণ হয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে খেয়াল করলাম, এই বইটা প্রকাশের বেশ কিছুদিন হয়ে গেলেও এই বইটা নিয়ে থ্রিলার পাড়ায় কোন টুঁ-শব্দ নেই। স্রেফ একটা মাত্র রিভিউ দেখলাম ফেসবুকে, তাও সেটা লিখেছেন আমি ভাইয়ের কাছ থেকে বই কিনেছি তিনি। এইটা বেশ দুঃখজনক একটা ব্যাপার যে এত দারুণ বইটা নিয়ে থ্রিলার পিপাসু মানুষরা জানছে না। সে লক্ষ্যেই আমি একটা পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখার দুঃসাহস করলাম। অনেক শুনলেন বকবক, এবার চলুন মূল পাঠ প্রতিক্রিয়ায় চলে যাই।
প্লট দিয়ে শুরু করি। ‘কাগজের জাদুকর’ এর প্লটটা নিঃসন্দেহে ইউনিক। তুতুল এবং রেবতী একই স্কুলে পড়ে। দুজন দু ক্লাসে হলেও তুতুল যে তার বাবা-মায়ের অবর্তমানে গৃহকর্মী রাশেদা দ্বারা নির্যাতিত হয় এইটা রেবতী বুঝতে পারে। রেবতী তুতুলকে একটা অরিগ্যামি (কাগজের পুতুল) দেয়, আর তুতুলকে বলে এটা তাকে রক্ষা করবে। শিবলী একজন আর্মি পার্সন, অতীতের দুঃসহ স্মৃতি তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে ফেলায় সে সার্ভিস থেকে কিছুদিন ছুটি নেয়। এই ছুটির সময় একদিন ব্যস্ত রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা অ্যাক্সিডেন্টের সাক্ষী হয় শিবলী। অ্যাক্সিডেন্টের ঘটনাস্থল থেকে সে একটা ফোন উদ্ধার করে, স্পষ্টতই সে বুঝতে পারে এটার মালিক অ্যাক্সিডেন্ট হওয়া গরীব ছেলেটা নয়। এই ফোনের মালিক হিসেবে যে দম্পতিকে সে খুঁজে পায় তাদের সাথে কথা হবার পর বুঝতে পারে এই ফোনটা তাদের বাসা থেকে চুরি হয় তাদের গৃহকর্মী দ্বারা। আর এই গৃহকর্মী হচ্ছে সে যে তুতুলকে নির্যাতন করে অর্থাৎ শিবলীর সাথে যে দম্পতির দেখা হয় তারা হচ্ছেন তুতুলের বাবা-মা। রাতে বাসায় ফিরে তুতুলের বাবা-মা শিবলীকে ফোন করে জানায়, রাশেদাকে পাওয়া যাচ্ছে না। শিবলী রাতেই তুতুলদের বাসায় যায়। সেখানে গিয়ে তুতুলকে রাশেদার অন্তর্ধান নিয়ে জিজ্ঞেস করলে তুতুল জানায়, হর্সম্যান রাশেদাকে নিয়ে গেছে, কিচেনের দরজা দিয়ে। শিবলী তুতুলের কথা মতো কিচেনের দরজা দিয়ে বেসমেন্টে গিয়ে রাশেদার লাশ খুঁজে পায়। লাশটার মাথাটা স্বাভাবিক মাথার পজিশনের চেয়ে ১৮০ ডিগ্রী ঘুরিয়ে পেছনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্পষ্টতই এটা কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না। কিভাবে কি হলো, এটা যখন ভাবছে তখনই বেসমেন্টটা ভরে যায় ঘোড়ার আস্তাবলের তীব্র গন্ধে। আর তারপরেই সম্মুখীন হয় এক অতিপ্রাকৃত সত্তার সাথে, যার শরীরটা মানুষের মতো আর মুখটা ঘোড়ার মত। অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগে শিবলীর মনে হয়, এই সত্তাটা তুতুলের কাছে যে কাগজের হর্সম্যানটা দেখেছে ওটার মতই। তথ্য নিয়ে জানা যায়, এরকম আরো ৪টা অরিগ্যামি তাকে কাগজের যাদুকর বানিয়ে দিয়েছে এবং সেগুলো সে অলরেডী তার স্কুলের বন্ধুদের দিয়ে দিয়েছে। শিবলী বুঝতে পারে, অতিপ্রাকৃত এই খুনের মিছিল কেবল শুরু হলো। কাগজের পুতুল দিয়ে খুন হচ্ছে, এই টাইপ উদ্ভট কথা ধোপে টিকবে না কিন্তু শিবলী তার সিক্সথ সেন্স থেকে বুঝতে পারে, খুনগুলোর সাথে রেবতী আর এই কাগজের পুতুলগুলোর নিবিড় সম্পর্ক আছে। শিবলী নেমে পড়ে রহস্য উদঘাটনে। খুঁজে বের করতে হবে কে খুন হতে যাচ্ছে? আর কে লুকিয়ে আছে এই খুনের পেছনে? কাগজের জাদুকরটাই বা কে যে রেবতীকে বানিয়ে দিচ্ছে এই অরিগ্যামিগুলো? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, এই রেবতীর আসল পরিচয় কি? কিভাবে এই ছোট্ট মেয়েটা সবকিছু জেনে যায়? তার কি আসলেই কোন সাইকোলজিক্যাল পাওয়ার আছে নাকি এর পেছনে আছে অতিপ্রাকৃত কোন সত্তা?
দারুণ জমজমাট রহস্যে ঘেরা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার ‘কাগজের জাদুকর’। প্লট নিয়ে তেমন কোন ড্রব্যাকই আমার চোখে পড়েনি। স্রেফ কিছু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে, যেগুলো পরে কোন পর্ব আসলে হয়তো ক্লিয়ার হতে পারে। না হলেও খুব একটা ক্ষতি নেই। লিখনশৈলীতে খানিকটা ড্রব্যাক আছে। যেমন : লেখার অনেক জায়গায় ডিটেইলিং এর অভাব মনে হয়েছে। পুরোটা সময় জুড়ে আমরা জানিনা কোন এলাকায় ঘটনাটা ঘটেছে, কোন থানার পুলিশ এটা নিয়ে কাজ করছে, এরকম খুনগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে দেশের প্রশাসন কেমন চাপ অনুভব করছে, তার কি ইম্প্যাক্ট তদন্ত অফিসারের ওপর পড়ছে তার কিছু জানা যায় না। আর লেখকের লেখার স্টাইলটা খানিকটা ভিন্ন যেটা আমার ভালোই লেগেছে। তবে অনেক চ্যাপ্টার শেষে তিনি কোন একটা চরিত্রের শেষ পরিণতি কি হয়েছে সেটা লিখেছেন। যদিও সেই ক্যারেক্টারের পরিণত এই গল্পের ইউনিভার্সে কোন ভূমিকাই রাখে না। এই জায়গাগুলোতে ‘কাগজের জাদুকর’ কিছুটা খেই হারিয়েছে, আর সবই মোটামুটি ভালোই ছিলো। ‘কাগজের জাদুকর’ এর আরেকটা ড্রব্যাক হচ্ছে চরিত্রায়ন। কোন চরিত্রেরই তেমন কোন ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরী নেই। চরিত্রায়নের এই মিসিং জিনিসটা দেখে আমার মনে হয়েছে, আমি কোন একটা ঘটনার অংশবিশেষ দেখছি যার পেছনে কি ছিলো আমার জানা নেই, ঘটনা শেষ হলে পরে কি হবে তাও আন্দাজ নেই। তবে না জানলেও পড়তে গিয়ে যে সমস্যা হবে, এমনটা মোটেও না। বরং লেখকের সাবলীল লিখনশৈলী আপনাকে বইটা পড়ার সময়টাতে দারুণ একটা উত্তেজনা অনুভব করাবে। শেষকথা হিসেবে বলবো, কিছু কিছু ড্রব্যাক থাকলেও ‘কাগজের জাদুকর’ আমি বেশ উপভোগ করেছি এবং লেখকের প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার লেখার চেষ্টাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। বইটা যে মানের, তার অর্ধেক মানের বই দিয়ে বইগুলোর গ্রুপ ফ্লাডেড হতে দেখেছি, হাইপ উঠতে দেখেছি। আমার মতে, এই বইটা হাইপে না ওঠার কারণ ৩টা। বইটা নিয়ে প্রকাশনীর খুব বেশি মার্কেটিং না করা, কোন বিখ্যাত প্রকাশনী থেকে বইটা প্রকাশ না হওয়া আর প্রতিষ্ঠিত কোন লেখক হিসেবে অদ্যাবধি বাজারে পরিচিত না হওয়া। তবে আশা করছি, সামনের বইগুলো আরো বেশি পারফেক্ট হবে এবং শুধু লেখা দিয়েই লেখক হিসেবে মার্কেটে জায়গা করে নেবেন পলাশ পুরকায়স্থ।
❝যাদুকর! তুমি কাগজ দিয়ে কী বানাও? যাদুকর ফিসফিস করে বলে, আমি ভয়ের শরীর তৈরি করি, তুমি খেলবে?!❞
বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবচেয়ে দুর্বোধ্য এবং ব্যাখাতীত রহস্য হলো মানুষের ‘মন’। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরিবর্তন মানুষের চিরায়ত বাস্তবতাকে ভেঙ্গেচুরে খান-খান করে দেয়, উন্মক্ত করে তোলে অন্তর্নিহিত দানবকে। মনের সেই স্বাভাবিক বেড়াজাল ভেঙ্গে গহীনের দানবকে যদি নিয়ন্ত্রণ করে কেউ, কী হবে? গল্পটা সেই দানবের মুক্ত হওয়ার, চিরচেনা বাস্তবতা পেরিয়ে প্রতিশোধের, সর্বোপরি গল্পটা ‘কাগজের জাদুকর’-এর।
★কাহিনী সংক্ষেপ- জাপানফেরত কঙ্কার টনক নড়ল, যখন সে নিজের একমাত্র কন্যার মাঝে অতিপ্রাকৃত কিছু ব্যাপার লক্ষ্য করল। আট বছর বয়সী শিশু রেবেতীর কথাবার্তা বড়দের মতন, কাগজের অরিগ্যামি তার বেশ প্রিয়। কিন্তু অরিগ্যামি গুলোয় কোনো সত্তা আছে কি, সেগুলোকে কেন জীবন্ত লাগে? কেন এক বৃদ্ধার ছায়ার হাসি শোনা যায় রেবতীর একান্তে। কী অন্ধকার অধ্যায় চাপা পড়ে আছে সুদূর জাপানে, যার প্রভাবে একের পর এক নৃশংস খুন হচ্ছে ঢাকায়। প্রতিটা খুনের সাথে জড়িত অরিগ্যামি, প্রতিটা খুনে এক নাম ধোঁয়াশা তৈরি করছে–কাগজের জাদুকর! কে এই সত্তা? অতিপ্রাকৃত নাকি যৌক্তিক ধাঁধা। শিবলী আর সাজ্জাদ পারবে কি হিংস্র খুনগুলির রহস্য ভেদ করতে?
★পাঠপ্রতিক্রিয়া- গল্পের প্লটটা বেশ ইন্টারেস্টিং, বইয়ের শুরু থেকেই একরাশ রহস্য রেখে কাহিনীর প্রারম্ভ ঘটে, এক কথায় পার্ফেক্ট স্টার্টিং! স্টার্টিংটাই আমার আগ্রহের পারদ তুঙ্গে উঠিয়েছিল। স্বভাবতই একটানে পড়ে যাবার তাড়না অনুভব করছিলাম। গল্পে কোনো বাহুল্য নেই, তাই প্রচুর দ্রুত কাহিনী এগিয়ে গেছে–যা আমার কাছে পজিটিভ দিক ঠেকেছে। বইয়ের ব্যাক কভারে একাধিক চরিত্র দেখে শঙ্কা জেগেছিল, এতগুলো চরিত্র ঠিকমত এগোবে কি? তালগোল পাকাবে নাতো? কিন্তু আমার চিন্তা অমূলক ছিল, প্রতিটা চরিত্র ক্রমানুসারে উপস্থিত হয়েছে, এবং তাদের কর্ম যথাযথভাবে পালন করেছে। চরিত্রগুলো পার্ফেক্টলি গোছানো হয়েছিল, বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। মাঝের ৪/৫ পৃষ্ঠায় একঘেয়েমি আসছিল, কিন্তু পরে আবার আগ্রহের পাল্লা ভারী হয়ে যায়। শেষের দিকে গল্পের মোড়, চরিত্রগুলোর মানসিক টানাপোড়ন, উত্থান-পতন এবং রহস্য সমাধান অনবদ্য ছিল, পুরোটা সময় গল্পে ডুবে ছিলাম, বইয়ের সমাপ্তি বেশ এঞ্জয় করেছি। একাধিক চরিত্র থাকলে সমাপ্তি নিয়ে অনেক সময় অভিযোগ থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে সমাপ্তি সব চরিত্রের জন্যে পার্ফেক্ট লেগেছে। চাইলে সামনে এই কনসেপ্ট নিয়ে আরও কাজ করা যাবে, এভাবেই লেখক সমাপ্তি টেনেছেন।
★চরিত্রায়ন- বইয়ে অনেক চরিত্র বিদ্যমান। প্লটটার ভিত্তি বলা চলে ‘চরিত্রায়ন’। মূলত রেবতী, কঙ্কা(রেবতীর মা), শিবলি, বুরা সাজ্জাদ, মতিন–এই চরিত্রগুলোই ফোকাসে ছিল। তবে যে এই গল্পের গোড়পত্তন ঘটায়, যাকে কেন্দ্র করে সব রহস্যের সূচনা, সেই ‘রেবতী’-কে প্রচণ্ড অনুভব করেছি। এই চরিত্রটা ১০০% নিখুঁত ছিল তা হলফ করে বলতে পারি। প্রতিবার ওর আগমন ছমছমে অনুভূতির সৃষ্টি করত। এই চরিত্র মনে গেঁথে থাকবে বহুদিন। এছাড়া গল্পের প্রতিটা মোড়ের সাথে সাথে চরিত্রগুলোর মনস্তাত্তিক পরিবর্তন চিন্তার খোরাক জুগিয়েছিল।
★ভালো-মন্দ দিকগুলি- প্রথমেই বলতে হয় গল্পের কনসেপ্টটা দারুন। প্যারাসাইকোলজি অর্থাৎ প্যারানরমাল সাইকোলজি নিয়ে ভিন্নধর্মী এক মৌলিক। গল্পের শেষ অবধি সন্দিহান থাকাবেন যৌক্তিক না কি অতিপ্রাকৃত গল্প এটা। মাঝে মাঝে দৃশ্যগুলো মানসপটে ভাসলে শিউরে উঠবেন। এতগুলো চরিত্র সাজিয়ে এত ফাস্ট গল্প লেখায় লেখক প্রশংসার দাবি রাখে। গল্পের মন্দ দিক বলতে গেলে–বেশ কিছু বানান ভুল ছিল, বিশেষ করে কি আর কী এর ব্যবহারে অসংগতি দৃষ্টিকটু ছিল। এছাড়া বলল/বললেন এর পর সংলাপের আগে কমা অনুপস্থিত। তাছাড়া সংলাপে মাঝে মাঝে শুদ্ধ এবং অশুদ্ধের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন লেখক, যেকোন একটা ধরে চরিত্র এগিয়ে নিলে বেশ হতো।
পরিশেষে, ভিন্নধর্মী কনসেপ্টে লেখা দারুণ মৌলিক ‘কাগজের জাদুকর’। কাহিনীটা শেষ অবধি আপনায় আচ্ছন্ন রাখবে, মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়নের ও আবেগের সাথে অতিপ্রাকৃত আখ্যান পড়ে বেশ উপভোগ করবেন নিশ্চিত।
#বইকথন বইয়ের নাম - কাগজের জাদুকর লেখক - পলাশ পুরকায়স্থ জনরা - প্যারাসাইকোলজিকাল থ্রিলার প্রকাশনী - কুহক কমিক্স এন্ড পাবলিকেশন্স পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১৯১
প্রথমত আমার পড়া এই জনরার প্রথম বই, দ্বিতীয়ত এই লেখকের পড়া প্রথম বই। প্রথম কিছু পাতা পড়ে খুব বেশি আশা না করলেও শেষে বইটি আমাকে হতাশ হবার কোন সুযোগ দেয় নি। লেখকের লেখার ধরনেও একটা সাইকোলজিকাল ব্যাপার স্যাপার আছে। যদিওবা প্রথম দিকে আমার একঘেয়ে লেগেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে লেখার গভীরে প্রবেশ করে আর থামতে হয় নি।
বইটির শুরুতে রাশেদা বুয়ার হতে অত্যাচারে ভীত এক বাচ্চা ছেলে তুতুল কে তার স্কুলের নিচু ক্লাসে পড়ুয়া রেবতী একটা কাগজের পুতুল দেয়। আর বলে এই পুতুল রাখলে তার ভয় লাগবে না। এরপরই এক অনাকাংখিত ঘটনায় রাশেদা বুয়ার পরিচিত এক পিচ্চি (লেখক জানান নি আসলে এই পিচ্চি কে) রোড অ্যাকসিডেন্ট এ মারা যায়। সেদিন রাতেই এই কাগজের পুতুল তার খেলা দেখায়, রাশেদা বুয়া কে ঘাড় মটকায়ে মেরে ফেলে। এই ঘাড় মটকায়ে মেরে ফেলা নিয়ে আমাদের সমাজে অনেক কল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। সাধারণত ভূতেরা এইসব কাজ করে থাকে। অপরদিকে কৌতুহল বশত আর্মি অফিসার শিবলী এই কেসে জড়িয়ে পরে। ডার্ক ফোবিয়ায় আক্রান্ত শিবলী রাশেদার লাশ দেখতে গিয়ে অদ্ভূত এক অভিজ্ঞতার সম্মখীন হয়। ঘোড়া মুখো এক আজব মানুষ আর আস্তাবলের গন্ধের কারণে প্রথমে প্যারানরমাল টাইপ কিছু ভেবেছিলেন। এরপর কেস অফিসার বুরা সাজ্জাদ (বদ সাজ্জাদ) আসে দৃশ্যপটে। শিবলী আর সাজ্জাদ মিলে একে একে আরও রহস্যের ভেতরে প্রবেশ করতে থাকে। শিবলী এই রেবতী নামক মেয়েটির খোঁজ করতে গিয়ে অবাক হয়। কে এই রেবতী যার বয়স ৭/৮ বছর অথচ কথাবার্তা একজন প্রাপ্তব়স্কদের মতো? এমনকি তার ছায়াও ঠিক তার সাথে যায় না। একজন কুঁজো বুড়ির মত লাগে ছায়াটা। রেবতীকে এক কাগজের জাদুকর এই কাগজের পুতুল গুলো বানিয়ে দেয়। তার কাছে থাকা পুতুলগুলোর মধ্যে চারটি পুতুল তার স্কুলের চারটি বাচ্চা কে দেয়, যারা মূলত কোন না কোন ভাবে অত্যাচারিত কিংবা মানসিক ভাবে বিধস্ত। এই চারটি পুতুল কি আরও চারটি খুন করবে? এই কাগজের জাদুকর আসলে কে? তার লক্ষ্য কি?
মানুষের ব্রেইন কার্যক্ষমতা কতটুকু তা আমরা এখনো পুরোপুরি জানতে পারি নি। তা জানবোই বা কেমনে! আমাদের মস্তিষ্কের পূর্ন ব্যবহার তো দূরে থাক ১০ ভাগের এক ভাগও ব্যবহার করতে পারি না। তবে কিছু কিছু মানুষ অসাধারণ কিছু ক্ষমতা নিয়ে জন্মায়। এই ক্ষমতা গুলো তাদেরকে অস্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত করে দেয়। এমনি কিছু সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার স্যাপার ও গবেষণা উঠে এসেছে এই বইয়ে। তবে লেখকের আরও তথ্য উপাত্ত যোগ করা উচিৎ ছিল। ��াছাড়া বইতে অনেক কিছুই এখনো খোলাসা করা হয় নি। অনেক চরিত্রের ব্যাখ্যা এখনো বাকি আছে। চরিত্রগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড খুব একটা ক্লিয়ার করা হয় নি। সবচেয়ে মজার বিষয়, গল্পটি কোন এলাকায় ঘটেছে এটাই এখনো জানি না। হয়তো পরের পার্ট এ লেখক সেগুলো ব্যাখ্যা করবেন।
আর একটি বিষয় এখানে না বললেই নয়। বইতে বানান ভুল চোখে পরার মতো। এমনকি এক লাইনের মাঝ থেকে লাইন কাট হয়ে নিচের লাইন থেকে লেখা শুরু হয়। আশাকরি প্রকাশনী এই দিকে নজর দিবেন। সর্বোপরি ছোটখাটো ভুল গুলো বাদ দিলে লেখকের সাবলীল ও ভিন্ন ধরনের লেখন স্টাইল, আর ভিন্ন রকমের গল্প আপনাকে দারুণ উত্তেজনা দিবে।
কাগজের জাদুকর... মুহূর্তের মধ্যে কাগজ দিয়ে বানিয়ে ফেলতে পারে বিভিন্ন আকৃতির প্রতিকৃতি। তারপর? জাদুবলে জীবন পেয়ে যায় প্রতিকৃতিগুলো!!!
আট পায়ে সন্তর্পণে হানা দেয় ভয়ের মন্ত্র বিকল হয়ে পড়ে বিবেক যন্ত্র ভয়ই ভূত ভয়ই ভবিষ্যৎ ভয়েই বর্তমান ভয়েই বহমান ভয়েই আটকে থাকা ভয়েই বিবশ হওয়া ভয়েই সাহস ভয়েই ভুলে থাকা.... যাদুকর! তুমি কাগজ দিয়ে কি বানাও? যাদুকর ফিসফিস করে বলে, আমি ভয়ের শরীর তৈরী করি, তুমি খেলবে!
● আখ্যান —
ব্যাস্ত সড়ক চারিদিকে গাড়ি চলছে পথিমধ্যে পথিকেরা রাস্তা পার হচ্ছে। কিন্তু হঠাৎই একটি ছেলে রাস্তা পার হতে যেয়ে থমকে দাড়িয়ে যায় মাঝরাস্তায়... ঘাড় ঘুরিয়ে কী যেন দেখছে সে নাকি কাউকে? কিন্তু কিছু তো নেয় সেখানে!!! বেপরোয়া গাড়ির আঘাতে ছিটকে পড়ে ছেলেটি। মৃত্যুর আগে তার চোখের মণিতে কিসের যেন ছায়া দেখা যায়...
রাশেদা বুয়া ভয় দেখায় তুতুলকে। রেবতী নামের ছোট মেয়েটি তাকে কাগজের হর্সম্যান দেয়, বলে কাগজের জাদুকর দিয়েছে তাকে। বাচ্চাদের বন্ধু কাগজের জাদুকর। যারা বাচ্চাদের কষ্ট দেয় কাগজের জাদুকর তাদের শাস্তি দেয়... রাশেদা বুয়ার মুন্ডু উল্টানো বিভৎস লাশ পাওয়া যায়!
ঘটনাক্রমে জড়িয়ে যায় সাবেক আর্মি অফিসার শিবলি। আভাস পায় অতিপ্রাকৃতিক অস্তিত্বের। হর্সম্যান, কাগজের জাদুকর কারা এরা? যেখানেই কাগজের পুতুল সেখানেই খুন! সাথে যুক্ত হয়েছে সাইকো গোয়েন্দা সাজ্জাদ। মতিন নামের সাইকো কিলার পড়ে যায় শিবলির পিছে। প্রত্যেকেই যেন এক একটি রহস্য, জড়িয়ে যায় একে অপরের সাথে...
● পর্যালোচনা ও প্রতিক্রিয়া —
"কাগজের জাদুকর" প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার। বইটি মূলত প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য, বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল টার্ম আছে যেগুলো নির্দিষ্ট বয়সে না গেলে বুঝতে সমস্যা হবে। সময় নিয়ে পড়ার মতো একটি বই।
প্রতিটি মানুষই আলাদা সত্ত্বা। আর এই সত্ত্বা গড়ে উঠে তার মননের জগৎ অর্থাৎ নিজস্ব মস্তিষ্কের কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে। কিন্তু কোনো বিষয় বা ব্যক্তি যদি প্রভাবিত করে তাহলে সে সত্ত্বা কি আর নিজস্ব থাকে? মস্তিষ্ক আবার আলাদাই এক বিস্ময়। বইয়ে বিভিন্ন চরিত্রের সাইকোলজিক্যাল কন্ডিশনস নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু মূল আকর্ষণ কাগজের জাদুকর, যার সাথে জড়িয়ে যায় বইয়ের অনান্য চরিত্র। কোনো চরিত্রকেই একদম ভালো বা খারাপ দেখানো হয় নায়। পড়তে পড়তে দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছিলাম কার চরিত্র আসলে কেমন। বিভিন্ন সাইকোলজিক্যাল আর প্যারানরমাল বিষয়ে বর্ণনা আছে।
প্রথমের কাহিনির দ্রুততার জন্য ধরতে কিছুটা বেগই পেতে হয়েছে। চমৎকার কল্পপট। কে ভিক্টিম আর কে শিকার ভাবনায় পড়ে গেছিলাম। লাস্টের টুইস্টেই আসল রহস্য। চিত্রপটের বর্ণনা দারুণ যেন চোখের সামনেই ঘটছে; খুটিনাটি বর্ণনা। রহস্য ও টুইস্টে ভরপুর। তবে কিছু বিষয় পরিষ্কার না। যত সম্ভবত পরবর্তী বইয়ের জন্য সাসপেন্সগুলো রাখা হয়েছে। শেষ হয়েও হইলো না শেষ এমন। বইয়ে কিছু ইলাস্ট্রেশন থাকলে আরও ভালো জমতো।
● লেখনশৈলী —
সাবলীল লেখনী। চিত্রপট ও সাইকোলজিক্যাল বিষয়গুলোর যথাসম্ভব সুন্দরভাবেই ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছেন লেখক। প্যারাসাইকোলজিক্যাল টার্মগুলো যেন পাঠক সহজেই বুঝতে পারে সেজন্য পারিপার্শ্বিক উদাহরণও দেয়া হয়েছে। এই বিষয়টা ভালো লেগেছে।
● চরিত্রায়ন —
বইয়ে ছোট-বড় বিভিন্ন চরিত্র রয়েছে। তবে পাঁচটি চরিত্রকে বইয়ের মূল আকর্ষণ মনে হয়েছে আমার।
শিবলি: চৌকস সাবেক আর্মি অফিসার। অতীতের ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ঘটনার দরুন ডার্ক ফোবিয়ার শিকার।
রেবতী: রহস্যময় ছোট একটি মেয়ে। মেয়েটির সাথে কুঁজো এক বুড়ির ছায়া দেখা যায়।
সাজ্জাদ: সাইকো গোয়েন্দা। অপরাধী ধরার থেকে কেস সমাধানে আগ্রহ বেশি। যাকে অপরাধী ভাবে তাকেই অপরাধী প্রমাণ করে।
মতিন: সাইকো কিলার। রাতে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে। আজব এক চরিত্র। কিন্তু বাচ্চাদের ভালোবাসে।
কঙ্কা: রেবতীর মা। আজব এক রোগের শিকার।
● প্রডাকশন —
পেজ, বাঁধাই ভালো হয়েছে। মজবুত তবে পেজ উল্টিয়ে পড়তে কোনো সমস্যা হয়নি।
● বানান ও সম্পাদনা —
চোখে পড়ার মতো খারাপ হলো বইয়ের সম্পাদনা। এত বানান ভুল আজ পর্যন্ত কোনো বইয়ে পাই নাই। একই পেজে ৬/৭ টা বানান ভুল কমবেশিও আছে। একই লাইন শেষ না হয়েই অর্ধেক উপরে অর্ধেক নিচে। বিরামচিহ্নের ব্যবহারেও কিছু ভুল রয়েছে। কিছু জায়গায় চরিত্রের নামেও সমস্যা আছে।
● প্রচ্ছদ ও নামলিপি —
প্রচ্ছদ এককথায় অসাধারণ। বেশ কিছু কল্পপটের মিশেলে প্রচ্ছদ। নামলিপিও নান্দনিক।
প্যারাসাইকোলজিক্যাল থ্রিলার প্রিয় পাঠকদের জন্য রিকমেন্ডেড। পরবর্তী সংস্করণে ত্রুটিগুলো সংশোধন করা হলে বইটি আরও পাঠকপ্রিয়তা পাবে বলে আশা করি।
বইটার গল্পটা দারুন। তবে লেখনী কোথাও ভাল কোথাও খারাপ,,, আরও এডিটিং/ রিরাইট দরকার ছিল।
সম্পাদনা ছাড়াই বই ছাপানো হয়েছে বলে মনে হয়েছে,, বানান ভুল ছিল অনেক।
পাঠকদের বইয়ের প্লট / ঘটনা আলাদা ভাবে লিখে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে, যেইটা কাহিনির বর্ননার মাধ্যমে করলে বেটার হত। লেখকের এই ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আছে বলে মনে হল।
ফ্ল্যাপ থেকেঃ "এই কাগজের ঘোড়াটা কি করবে?" ছেলেটা হাতে নিয়ে মেয়েটাকে প্রশ্ন করে৷ মেয়েটা ফিসফিসিয়ে বলে "তোমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে.." ছেলেটা পাশে তাঁকিয়ে দেখে মেয়েটা ওখানে নেই! স্কুলের বারান্দা থেকে হাসি মুখে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ে৷ তাহলে এতক্ষন কার সাথে সে কথা বলছিল...!
...রাশেদা বুয়া পিছলে মেঝেতে পড়ে গেছে৷ নড়তে পারছে না৷ সহসা তার মনে হলো দুটো পা এগিয়ে আসছে...পা দুটো মানুষের নয়, ঘোড়ার!
শিবলি স্মরণ করতে পারে না মৃতদেহ গুলোর নিচে সে কতক্ষণ ছিল৷ গরমে ওগুলো পঁচে গন্ধ ছড়াচ্ছিল৷ শিবলির মনে হয়েছিল ওর আত্মার ভেতরে এই মাংশ পঁচা গন্ধ ঢুকে গেছে৷ সেখান থেকেই তার ডার্ক ফোবিয়ার জন্ম...
কঙ্কাবতীর শরীরে য���নো কস্তুরীর ঘ্রাণ! কেউ এতে ডুবে যায় আর কারও ভেতরে অস্থিরতার জন্ম হয়... মতিন এক মৃত দেহ বহনকারী কালো গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ও রাতে ঘুমায় না৷ কস্তুরীর ঘ্রাণ পাবার পর সে অস্থির হয়ে পড়ে৷ সারারাত রাস্তা থেকে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়... হাতে থাকে আধলা ইট৷
রেবতী নামের ছোট্ট একটা মেয়েকে মেরে ফেলার নির্দেশ আসে ওর কাছে৷ আর রেবতীর ছায়াটা দেখলে মনে হয় যেন ওটা ওর নয় একজন বুড়ির!
ডিপার্টমেন্টের সবাই ওকে ডাকে বুরা সাজ্জাদ৷ আর একটা কেস সলভ হলেই অলিখিত ভাবে ওর একটা রেকর্ড হয়ে যাবে...
মানুষের মনস্তাত্বিক বিবরণের একটা দলিল ���ই কাগজের যাদুকর৷ এই চরিত্রগুলো কখন কি করে বসে সেটা আপনি কল্পনাও করতে পারবেন না! চলুন দেখা যাক ওরা সবাই মিলে কি ঘোট পাকায়...
অনুভূতি কথনঃ কাগজ দিয়ে খেলনা বা পুতুল বানানোর অভ্যাস প্রত্যেক ছেলে মেয়েরই থাকে। কাগজের খেলনা ঘিরে যে প্যারানরমাল থ্রিলার গল্প গড়ে উঠেছে সত্যিই উপভোগ করার মত বিষয়। বইয়ের চরিত্রগুলো বেশ বিচিত্র প্রকৃতির,যেন আমাদের আশেপাশের কোন চরিত্র! এই বইটি তে মানুষের মনোজগৎ, চিন্তা ধারা, মনোবল, পরোপকারিতা, সত্যের অনুসন্ধান বিভিন্ন বিষয়ের স্বাদ পেয়েছি।
চরিত্র বিশ্লেষণঃ রেবতী যেন ছোট্ট শরীরে একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষ, তার আচারণ ই এমন। তার মা কঙ্কা যিনি ককঙ্কাবতী নামে একটি এডিট ফার্ম চালান। শিবলি একজন রিটায়ার্ড আর্মি পার্সন। যার মানসিক জোর প্রচুর, যদিও সে অন্ধকার কে ভয় পায়। গোয়েন্দা অফিসার সাজ্জাদ,যে বুড়া সাজ্জাদ নামে পরিচিত। মতিন নামের চরিত্র টা বেশ কম্পলিকেটেড লেগেছে । তবে পুরো বই জুড়ে রেবতী আর শিবলি চরিত্র টা বেশ ভাল লেগেছে।
প্রচ্ছদ ও প্রডাকশনঃ প্রচ্ছদ টা আপনাকে সম্মোহিত করার ক্ষমতা রাখে। বইটা হাতে নিলে যে আমি কতক্ষণ তাকিয়ে থাকি, নিজেও জানিনা😊 হার্ড বাইন্ডিং বেশ ভাল ছিল🙂
বানান ও সম্পাদনাঃ বানানের অবস্থা বেশ খারাপ। তবে আমার মত যারা মনোযোগী পাঠক তাদের অসুবিধা হবে না। প্রকাশনীর কাছে বিশেষ অনুরোধ পরবর্তী সংস্করণে বইয়ের বানানের দিকে বিশেষ নজর দিবেন।
লেখক নিয়ে কিছু কথাঃ পলাশ দাদার বই আমি কখনো পড়ি নাই এটা তার প্রথম বই যেটা আমি পড়ে ফেললাম। লেখকের জন্য শুভকামনা রইলো। ভবিষ্যতে আরো চমৎকার বই উপহার দিবেন আশা করি।
সতর্কবার্তাঃ ১.বইটা আপনি প্রাপ্তবয়স্ক না হলে পড়বেন না। ২.বইটা ধীরেসুস্থে পড়বেন,একটানা পড়ার চেষ্টা করবেন না ৩.বইটা যারা পড়বেন তার নিজেদের সংশোধন করে নিবেন। তাদের কাছে বিশেষ অনুরোধ ছোট বাচ্চাদের অত্যাচার করবেন না,আপনারা যদি কোন বাচ্চার বাবা মা হোন তাহলে তাকে রোবটের মত পরিচালিত করবেন না। (বিঃদ্রঃ মনে আঘাত দিয়ে থাকলে ক্ষমা করে দিবেন)
বইয়ের প্রচ্ছদ আর কাহিনী সংক্ষেপ পড়ে বেশ আগ্রহ নিয়ে বইটা কিনেছিলাম। আমার expectation হয়তো বেশিই ছিল পাশাপাশি ইদানিং বেশ ভাল ভাল মৌলিক বই পড়ার সুযোগ হয়েছে... বইটা তেমন ভাল লাগেনি।
বইয়ের ভাল দিক বলতে এর কিছু ইন্টারেস্টিং প্লট পয়েন্ট আছে আর ২-৩টা মনে রাখার মত চরিত্র। তাহলে সমস্যা কোথায়? গল্পের গাঁথুনিতে। নেগেটিভ অংশে যাওয়ার আগে বলে রাখি আমি লেখকের আগের কোন লেখা পড়ার সুযোগ হয়নি এইটাই প্রথম। হয়তো এই ধাঁচের লেখা আমার জন্য না।
শুরুর দিকে যখন কিছু চরিত্রের বর্ণনা দাওয়া তখন খুবই one-dimensional লেগেছে। লেখক নিজে পাঠকের সুবিধার্থে অনেক জায়গায় ছোট খাটো ব্যাখ্যা দিয়ে রেখেছেন যেটা আমার পছন্দ হয়নি। কোথাও এক চরিত্রের কথাবার্তা এমন কেন এই ব্যাপারে সরাসরি পাঠকের উদ্দেশ্যে বলে দিয়েছেন সে ছোট হলেও সে এভাবেই কথা বলে। এই ব্যাপারটা লেখা পড়েই হয়তো বুঝতে পারছি handholding এর দরকার ছিলনা কোন। অনেক জায়গায় চরিত্রদের মধ্যে কথাবার্তা পড়ে মনে হয়েছে লেখার ভাষায় কথা বলছে বাস্তব জীবনের স্বাভাবিক কথাবার্তার ধরণ না। কিছু কিছু জায়গায় উনার পুরানো বইয়ের রেফারেন্স আছে আবার ভবিষ্যতে আসবে এমন বইয়েরও। কিছু জায়গায় আমার মনে হয়েছে তাহলে কি ওই বইটা পড়ে নিলে ভাল হবে? এইটা কি কোন সিরিজের অংশ? আসলে standalone-ই তাই এভাবে কনফিউজ করার দরকার ছিলনা। উল্লেখ করলেও শেষে হয়তো লিখে দাওয়া যেতো গল্পের মাঝে মাঝে রেফারেন্স না এনে। তবে সবচেয়ে বড় সমস্যায় হয়তো লেখকের দোষ নেই... বানানের সমস্যা। পুরা বইয়ে ১০-১৫টা এমন না, অনেক সময় একই পৃষ্ঠায় ৩-৪টা পাবেন। শেষের অর্ধেকে এই অবহেলার পরিমাণ আরও বেড়েছে যেমন নামের বানানেও কখনও দীয়া কখনও দিয়া কখনও রেবতি কখনও রেবতী। লেখার মাঝে ঃ এমন ছিল অনেক জায়গায়। একবার পড়লেই যে কারও চোখে লাগার কথা তাই এইটা অবহেলাই বলতে হয়।
এই বইটা নিয়ে প্রকাশনীর তেমন মাথা ব্যথা ছিল না শুরুতে। যে কারণে বহু ভুলসমেত পান্ডুলিপিটা ছাপিয়ে দিয়েছে। এতে অবশ্য ভোগান্তি গেছে প্রকাশনীর৷ পরে পাঠকদের কাছে ক্ষমাও চেয়ে। এসব নিয়ে মাথা ব্যথা নেই আমার। বইটার এতো এতো ভুল গুলোকে একদিকে রাখলে গল্পটা যে দারুণ একটা উপভোগ্য গল্প সেটা বলে বুঝানো যাবে না। এমন গল্প খুব কমই লেখা আছে বোদহয় আমাদের দেশে৷ লেখকের লেখনকৌশল আর বর্ণনা ভঙ্গিও অসাধারণ, মনোমুগ্ধকর। মনের মাঝে দাগ কেটে যাওয়ার মতো একটা গল্পও বটে।
বই নিয়ে কিছু বলবো না, শুধু বলবো কুহক কমিক্স এন্ড পাবলিকেশন এদের নিয়ে, আমার কাছে এদের কে ১০০% বাটপার মনে হয়েছে। লেখক যে কপি তাদের কে দিয়েছে তারা সেটা ১বারও না পড়ে হাজারটা বানান ভুল নিয়ে বইটা ছাপায় ফেলেছে। যে আমার কাছে পাঠক দের সাথে ধোঁকাবাজি ছাড়া আর কিছু মনে হয় নাই।