ফয়জুল ইসলামের গল্পগ্রন্থ 'বখতিয়ার খানের সাইকেল'-এ মোট পাঁচটি গল্প সন্নিবেশিত হয়েছে। সবগুলো গল্পই নগর জীবনের বিবিধ বিপন্নতা নিয়ে রচিত। নগর জীবনের মুত্যৃন্মুখ অব্যবস্থাপনা, নাগরিকদের অসহায়ত্ব এবং পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগের ক্ষেত্রে তাদের জাড্যতা নগ্নভাবে বিধৃত হয়েছে নাম-গল্পে। ‘পুতুলখেলা' নামের গল্পে ফুটে উঠেছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজকাঠামোর আবর্তে নগরের নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র যেখানে একজন নারী তার স্বামীর হাতে শেষপর্যন্ত খুনই হয়ে যায়। বহুমাত্রিক সূচকে দরিদ্র এবং ঝুঁকিগ্রস্ত নাগরিকদের কষ্টক্লিণ্ন জীবনসংগ্রাম, তাদের নিরুপায়তা এবং তাদের সকলের নিরন্তর স্বপ্ন দেখার গল্প ‘ডলার। নগরের কোনও ধসে পড়া বিল্ডিংয়ের মৃত্যুফাঁদে নিঃখোজ হয়ে যাওয়া প্রেমিকার প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা জেগে থাকে ‘অলক্ষ্যে'-এ এবং মূল চরিত্র দুর্ঘটনা-পরবর্তী সময়ে তীব্র মানসিক বিচলনের শিকার হয়। অন্যদিকে, ‘ঋতুরেখায়' নামের গল্পটি নারী-পুরুষের জীঘাংসাময় রাজনৈতিক সম্পর্কের বস্তুনিষ্ঠ বয়ান। ফয়জুল ইসলামের বর্তমান গল্পগ্রন্থের গল্পগুলো পাঠ করলে সমসাময়িক নগর-জীবনের এমন কিছু বিপন্নতার ছবি ফুটে উঠবে। এ ছবিগুলো নতুন কোনও ছবি নয়। লেখক তার নিজস্ব পর্যবেক্ষণ এবং অন্তর্গত মীমাংসার ফসল পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন মাত্র।
ফয়জুল ইসলামের জন্ম ২৪ নভেম্বর ১৯৬৩, ঢাকার সিদ্ধেশ্বরীতে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়েছেন পাবনা জিলা স্কুল ও পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পরে উন্নয়ন অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেন যুক্তরাষ্ট্রের উইলিয়ামস কলেজ থেকে। প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নক্ষত্রের ঘোড়া’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৮ সালে। ফয়জুল ইসলাম ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। তাঁর ‘খোয়াজ খিজিরের সিন্দুক’ বইটি প্রথম আলো বর্ষসেরা বইয়ের পুরস্কার লাভ করেছে।
ফয়জুল ইসলামের গল্প বরাবরই আমার ভালো লাগে। এ মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যে তার চেয়ে শক্তিমান গল্পকার খুব কমই আছে বলে মনে করি। "বখতিয়ার খানের সাইকেল" তার সেরা গল্পগ্রন্থের মধ্যে পড়ে না তবে মজলিশি গদ্য, তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ আর জীবনের প্রতি গভীর মমত্ববোধের কল্যাণে বইটি উল্লেখযোগ্য। নামগল্প "বখতিয়ার খানের সাইকেল" এর বক্তব্য চমৎকার কিন্তু ঠিকভাবে তা গল্পের শরীরে ফুটে ওঠেনি। "পুতুলখেলা" গল্পে সাধারণ বাঙালি মেয়ের বিয়োগান্ত পরিণতি খেলাচ্ছলে বর্ণনা করেছেন লেখক। যেন তার জীবনের মূল্য নেই, তা শুধুই এক পুতুলখেলা। বইয়ের সেরা গল্প "ডলার। " পুরনো এক কোটের পকেটে ৩৮২ ডলার পাওয়া দিয়ে গল্পের শুরু। লেখক হাসাতে হাসাতে এমন এক জায়গায় গল্প নিয়ে যান যেখানে এক চোখে থাকে হাসি আর আরেক চোখে কান্না। "অলক্ষ্যে" রচিত হয়েছে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি অবলম্বনে। পোশাক কর্মীদের মৃত্যু, উদ্ধারকাজে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আর পরবর্তীতে তাদের ট্রমা নিয়ে খুব বেশি গল্প এখনো লেখা হয়নি। সে হিসেবে গল্পটি উল্লেখযোগ্য। "ঋতুরেখায়" বইয়ের সবচেয়ে অদ্ভুত গল্প। কীভাবে পুরোটা হজম করবো তা এখনো বুঝতে পারছি না তবে গল্প হিসেবে বেশ নতুনত্বের দাবিদার একথা বলাই যায়।
ফয়জুল ইসলামকে বর্তমানের অন্যতম শক্তিশালী গল্পকার বলা যায়। এ পর্যন্ত পড়া তিনটি গল্পগ্রন্থের সবকটি ই আমার ভালো লেগেছে। গল্পের বৈচিত্র্য, সূক্ষ্ম হিউমার, বিস্তৃত পরিধি সব মিলিয়ে তাঁর গল্প বেশ উল্লেখযোগ্য । লেখকের উপর শহীদুল জহিরের প্রভাব লক্ষণীয় সদর্থক অর্থে। সাধারণত ফয়জুল ইসলামের গল্পের দৈর্ঘ্য বেশ বড় হয় যা উনার খামতি বলে মনে হতে পারে। তবে উক্ত গ্রন্থের পাঁচটি গল্প দীর্ঘ দৈর্ঘ্যের প্রতি সুবিচার করেছে মানে গল্পগুলো ঝুলে যায়নি।
১. বখতিয়ার খানের সাইকেল: ঢাকা শহরের লেক সার্কাস এলাকায় মাঝরাতে শোনা যায় এক ভূতুড়ে সাইকেলের বেলের আওয়াজ। সবাই শব্দ শোনে কিন্তু আরোহী কে কেউ দেখতে পায়না। বখতিয়ার খানের বাল্যবন্ধুরা আন্দাজ করে যে এটা বখতিয়ার খানেরই সাইকেল যে কিনা মারা গেছে কিছুদিন পূর্বে। অতঃপর তারা নেমে পড়ে রহস্য উদঘাটন করতে। আমাদের জাতিগত চিরায়ত এক ব্যাপার নিয়ে উক্ত গল্প।
২. পুতুলখেলা: গল্পটি শুরু হয় দেশভাগের আগে বিহারের দাঙ্গা দিয়ে কিন্তু মূলত লাডলি বেগমের শৈশবের পুতুলখেলার মোজেজা নিয়ে। তার জীবন যেন পুতুলখেলার মতোই তুচ্ছ, অহেতুক!
৩. ডলার: পিওন সাত্তার ভুঁইয়ার স্যুট-কোটপ্রীতির কথা পুরো মহল্লায় চর্চিত হয়। একদিন সে পুরনো কোট কিনতে গিয়ে পেয়ে যায় ৩৮২ ডলার। অতঃপর শুরু হয় মানুষের ঈর্ষা,লোভ আর আকাঙ্ক্ষার অভূতপূর্ব এক গল্প। অতি ইন্টারেস্টিং!
৪. অলক্ষ্যে : মোহাম্মদ বুলবুলের প্রেমিকা সোমা আখতার নিখোঁজ হয়ে যায় এক বিল্ডিংধ্বসে। কয়দিন পরপর বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি কিংবা বড় কোন স্থাপনা ধ্বসে মারা যায় হাজার হাজার শ্রমিকশ্রেণীর মানুষ। সেই ধ্বংসস্তূপ কে ঘিরে একজন মানুষের বেদনা আর ট্রমার হ্নদয়বিদারক গল্প। ৫. ঋতুরেখায়: এমন আশ্চর্য গল্প আগে পড়িনি। একেবারে ভাবনার বাইরের এক জিনিস! চমৎকার যে তা বলতেই হবে। প্রকৃতির চিরায়ত এক নিয়ম তবে তা ভিন্ন এক জগতের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে।