তরুণ মজুমদারের জন্ম বাংলাদেশের বগুড়া জেলায়, ৮ জানুয়ারি ১৯৩১। উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত "চাওয়া পাওয়া" সিনেমা পরিচালনার মধ্যে দিয়ে ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্র জগতে পদার্পণ করেন তরুণ মজুমদার। এরপর একের পর এক বাণিজ্যসফল ছবি তৈরির মধ্যে দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে স্থায়ী আসন অর্জন করেছেন। তাঁর পরিচালিত বিখ্যাত ছবির মধ্যে কয়েকটি হলো : সংসার সীমান্তে, গণদেবতা, শ্রীমান পৃথ্বীরাজ, ফুলেশ্বরী, দাদার কীর্তি, ইত্যাদি। শেষ জীবনে লেখালিখি শুরু করেছিলেন। "সিনেমাপাড়া দিয়ে" নামের আত্মজীবনী লিখে সর্বস্তরের পাঠকের প্রশংসা লাভ করেছেন। মৃত্যুর ঠিক আগে শেষ করেছিলেন তাঁর একমাত্র উপন্যাস "ঘরের বাইরে ঘর"। মৃত্যু - ৪ জুলাই ২০২২ কলকাতায়।
Facebook এর একটি page এ এটা ধারাবাহিক ভাবে পড়া শুরু করি। কিন্তু অত slowly পড়তে পারবো না বলে শেষ পর্যন্ত বইটার physical কপিই জোগাড় করে ফেললাম। Courtesy: আমার মায়ের December e কলকাতা ভ্রমণ। বইটা এক কথায় বলতে গেলে অপূর্ব! যেমন কন্টেন্ট তেমনি লেখার স্টাইল! তবে হ্যাঁ, এই বই ভালো লাগবে তাদের ই যারা ১৯৬০/৭০ এর সিনেমা ভালোবাসেন আর ওই দিনগুলি সম্পর্কে জানতে চান। তরুণ মজুমদারের কোনো সিনেমা এর আগে দেখে না থাকলেও এই বই পড়ে আনন্দ পাবেন। হতে পারে কিছু সিনেমা দেখার ইচ্ছে জাগবে এই বই পড়ে। সেও এক বিশাল পাওয়া। প্রচুর চরিত্রের সমাবেশ - কানন দেবী, উত্তমকুমার, সুচিত্রা সেন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, উৎপল দত্ত, রবি ঘোষ, অনুপ কুমার, মৌসুমী, শমিত ভঞ্জ, সৌমিত্র ইত্যাদি, কাজেই শুধুমাত্র এত নক্ষত্রের গুনেই এই বইটা ইন্টারেস্টিং হতে বাধ্য, কিন্তু সেটা এই বইয়ের মূল নয়। লেখকের আত্মজীবনী ও নয় এটি। সেই দিক থেকে দেখতে গেলে এই বইয়ের কাঠামো শ্রীকান্ত উপন্যাসের মত। লেখক এর পথ চলার গল্প। দীর্ঘজীবী এই মানুষটি পথ চলতে যত মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন, তারা সবাই কোনো না কোনো ভাবে তাঁর জীবন স্পর্শ করেছে, সেই স্পর্শের আনন্দই এই বইয়ের মূল। তাই এই বইয়ে "মানুষ" উত্তমকুমার যেমন আছেন, তেমনি আছেন কালীঘাটের দেহপসারিনীরা, স্বমহিমায় উজ্জ্বল। ভালো লেগেছে বইটার শেষটা। কেন যে সিনেমাপাড়া দিয়ে ১৯৮০র একটা বিশেষ দিনে এসে শেষ হয়ে যায়, যদিও তরুণ মজুমদার কয়েকবছর আগে পর্যন্ত সিনেমা করেছেন,সেটা বইটা পড়তে পড়তে বোঝা যাবে, তাই আর বললাম না। শেষ করবো এইটুকু বলে যে মন খারাপ লাগলেই আমি এতকাল শ্রীকান্ত পড়তাম। মন ভালো হয়ে যেত। তার সাথে এবার যোগ হলো সিনেমাপাড়া দিয়ে। ধন্যবাদ তরুণ মজুমদার। ভালো থাকবেন।
অসামান্য একটি বই। এইটুকু বললেই সবকিছু বলা হয়ে যায়। তরুণ মজুমদার এক দীর্ঘজীবী পুরুষ। দীর্ঘ জীবনে তিনি বহু জ্ঞানী গুণী মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন। এই বইটা কেনার পরে পড়ে উঠতে পারব কিনা এই নিয়ে একটু সন্দেহ ছিল। প্রথমতঃ পৃষ্ঠাসংখ্যা, দ্বিতীয়তঃ একই বিষয় নিয়ে এতটা লেখা। আজকাল ধৈর্য একটু কম। কিন্তু এই বইটি পড়তে শুরু করার পরে অসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে পড়ে ফেললাম। দিনে ৫০ পাতার বেশি পড়বো না, এই ভাবেই এগোচ্ছিলাম। নিজেকে জোর করে ৫০ পাতার মধ্যে আটকে রাখতে বাধ্য করছিলাম। নইলে এই বইটির আসল রস অনুভূত হতো না আমার কাছে। আর বেশি কিছু বলতে চাই না। এটুকুই বলতে চাই যে, বইটি না পড়লে হয়ত জীবনে এমন কিছু ক্ষতি হবে না কিন্তু পড়লে অবশ্যই এক অনাবিল আনন্দ পাওয়া যাবে। তাই কিনে বা ধার করে বা লাইব্রেরি থেকে নিয়ে যেভাবেই হোক পড়ে ফেলুন। আমার পড়া সাম্প্রতিক জীবনীগ্রন্থের মধ্যে সেরা।
“আমার এই ক্ষুদ্র তুচ্ছ জীবনের সত্যিকারের সঞ্চয় বলতে এই সামান্য অভিজ্ঞতাগুলি ছাড়া আর তেমন বিশেষ কিছুই নেই। এর কোনওটা ছোট, কোনওটা বড়। কিছু কিছু হয়তো কৃষ্ণপক্ষের আকাশপটে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো, আবার এমনও আছে, অগণিত, যারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ দূরবর্তী হয়ে আবছা ছায়াপথে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু হারিয়ে যায়নি কিছুই। কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটুখানি বিশ্রামের জন্য যখন ঘরের আলো নিভিয়ে বসে থাকি তখন স্পষ্ট টের পাই সেই তারাগুলি, সেই ছায়াপথের আলোর কণিকাগুলি কখন যেন নিঃশব্দে আমার ঘরে ঢুকে আমার চারপাশে গোল হয়ে বসে আছে। চোখে চোখ পড়লেই নীরব জিজ্ঞাসা তাদের–দেখ তো চেয়ে আমারে তুমি চিনতে পারো কিনা?”
তরুণ মজুমদারের অসাধারণ প্রতিভায় রচিত হয়েছে স্মৃতিকথাধর্মী দু-খণ্ডের গ্রন্থ, নাম ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’। এই বই দুটি চলচ্চিত্রের জাদু ও জীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতার অনন্য চিত্রায়ণ। প্রতিটি পৃষ্ঠায় নিবিড় আবেগ, স্মৃতি ও সিনেমার জগৎ রয়েছে, যা পাঠককে নতুন এক ভুবনে নিয়ে যায়।
বইয়ের পাতা উল্টাতেই মনে হয়, এক নতুন জীবন এবং সিনেমার গল্প শুরু হচ্ছে। সাবেক পূর্ববঙ্গের একটি ছোট শহরের একটি সাধারণ পরিবারের সন্তান, যে তার স্বপ্নের পেছনে দৌঁড়াচ্ছে। তিনি প্রথমে একটি পাবলিসিটি সংস্থায় শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে সিনেমার জনপ্রিয় তারকাদের সঙ্গে পরিচিত হন। বইটিতে কানন দেবী থেকে উত্তম কুমার পর্যন্ত, তাঁর প্রথম অভিজ্ঞতার বিভিন্ন কাহিনী বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা পাঠকদের নতুন চিন্তা এবং অনুভূতির জগতে নিয়ে যাবে।
অবাক করা কাহিনীগুলিতে নামী তারকাদের ব্যক্তিত্ব যেন নতুন এক আদলে ফুটে উঠেছে। কানন দেবী, যিনি শুধুমাত্র একজন মহানায়িকা নন, লেখকের কলমে তাঁর 'থিরবিজুরি' রূপও প্রকাশ পেয়েছে। পাশাপাশি, মহানায়ক উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁর মজার সম্পর্ক, সুচিত্রা সেনের সঙ্গে অজানা ঘটনা এবং সেই সময়ের বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা ও তাঁদের অন্তরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলো চমৎকারভাবে উঠে এসেছে।
তরুণ মজুমদার প্রতিষ্ঠানগত সীমা ছাড়িয়ে তাঁর নিজস্বতা প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট ছিলেন—এটি তাঁর ‘যাত্রিক’ গোষ্ঠী থেকে শুরু করে পরিচালকের আসনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস। পটভূমি বদলের এই প্রক্রিয়া যেন একটি অবিরাম যাত্রা। সন্তোষ ও হতাশার শেষে, সামনে আসে এক নতুন চিত্রনাট্য, যা রাজেন তরফদার এবং ঋত্বিককুমার ঘটকের স্মৃতিগুলোকে জীবন্ত করে তোলে।
এইভাবে বিভিন্ন কাহিনীর মাধ্যমে সিনেমার সঠিক ইতিহাস, চলচ্চিত্র প্রযুক্তি ও সমাজের পরিবর্তনের একটি উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি উন্মোচিত হয়েছে। পাঠক যেন কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়—ছবির সেই বিশেষ মুহূর্তগুলো, যেখানে তরুণ মজুমদারের অক্লান্ত পরিশ্রম লুকিয়ে রয়েছে।
অতএব, ‘সিনেমাপাড়া দিয়ে’ শুধুমাত্র একটি বই নয়, বরং এটি একটি মহানগরের হৃদয়ের অন্তর্দৃষ্টি। এখানে স্মৃতি, স্বপ্ন এবং বাস্তবতার মিলন ঘটেছে, যা বর্তমান প্রজন্মকে সিনেমার জগতে নতুন এক দিগন্তের সন্ধান দেবে।