উনিশশো সাতাশির শিল্ড ফাইনালে কোনও এক রহস্যময় কারণে ফার্স্ট ইলেভেন থেকে বাদ পড়েছিলেন বাচস্পতি দত্ত । অথচ সেই সময় তিনি জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছিলেন। সেই ম্যাচের পর জীবনের সেরা ফর্মে থেকেও নিঃশব্দে ময়দান ছেড়ে দিতে হয় ওঁকে। এমনকী কোচ সজল ভট্টাচার্যকেও ময়দান আর খুঁজে পায়নি । তিরিশ বছর পর প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলার দীপন সেনগুপ্ত কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন বাচস্পতি দত্তের সঙ্গে ? কেরিয়ারের শুরুতেই কি তার পরিণতি হবে বাচস্পতি দত্তের মতো ? নাকি শাসক দলের নেতা ভবানী হালদারের মেয়ে রুক্মিণীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক তাকে আরও বিপদে ফেলবে ? অন্যদিকে রুক্মিণীও কি পারবে প্রভাবশালী বাবার হাত থেকে তার ভালোবাসার মানুষকে বাঁচাতে ? নাকি অসহায় হার মেনে নিতে হবে দুজনকেই । এই অবস্থায় দীপ আর রুকুর এই সম্পর্কের মধ্যে কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন সম্ময় নন্দীর মতো প্রখ্যাত সাংবাদিক বা সঞ্জয় গোপের মতো একজন ব্যর্থ মানুষ , যার ছোটবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল এলাকার ‘ দাদা ’ হয়ে ওঠার । আমাদের প্রতিদিনের জীবনে জড়িয়ে থাকা নানা চরিত্র নিয়েই এই উপন্যাস ‘ মেঘের ফাঁকে নীল ' । যেখানে প্রেম আর সম্পর্কের জটিলতার মধ্যে জড়িয়ে রয়েছে রাজনীতি , আর অবশ্যই বাঙালির প্রিয় ফুটবল
উপন্যাস - মেঘের ফাঁকে নীল লেখক - অভিমন্যু রায় প্রকাশক - দে'জ
'রাজনীতি' এবং 'ফুটবল' - বাঙ্গালীদের জীবনের ওঠাপড়ার সাথে যেন অঙ্গাঅঙ্গি ভাবে জড়িয়ে গেছে এই দুটি শব্দ। কথায় বলে বাঙ্গালীদের রক্তে আছে এই 'রাজনীতি' এবং 'ফুটবল'। পাড়ার রক হোক, বা চায়ের আড্ডার ঠেক বাঙ্গালীরা এই দুটি বিষয় পেলে ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা বা তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে যেতে পারে। রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য থাকলেও, ফুটবল নিয়ে বাঙ্গালী কিন্তু আড়াআড়ি ভাবে দুভাগে বিভক্ত। সবুজ-মেরুন কিংবা লাল-হলুদ নিয়ে বাঙ্গালীর রেষারেষি প্রায় শতবর্ষ প্রাচীন। কেউ কেউ একে ঘটি-বাঙালের লড়াই বললেও এই লড়াই নিয়ে আবেগ ফুটবলপ্রেমী বাঙালিদের মনে একটা আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। আর তাদের কাছে তাদের প্রিয় দুটি ক্লাব প্রায় দেবালয়ের সমকক্ষ। আলোচনার শুরুতেই এইসব কথা বলার কারন এই বইয়ের প্রায় সবটা জুড়েই রয়েছে এই বাঙালি আবেগ, তাদের প্রিয় দুটি ক্লাব এবং ফুটবল।
আসুন আলাপ করা যাক এই উপন্যাসের চরিত্রগুলির সাথে -
দীপন সেনগুপ্ত - একুশ বছর বয়সী দীপন একজন প্রতিশ্রুতিমান ফুটবল প্লেয়ার। যার দুপায়ে দুর্দান্ত বল কন্ট্রোলের সাথে রয়েছে তিরিশ-চল্লিশ গজের নিখুঁত ঠিকানা লেখা পাশ দেবার ক্ষমতা। একজন আদর্শ বল প্লেয়ারের ঠিক যে যে গুণগুলি থাকে তা সবকিছুই রয়েছে এই দীপনের মধ্যে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু টুর্নামেন্ট খেলে 'ম্যান অব দ্য ম্যাচের' খেতাব হাসিল করেছে। দীপনকে নিজেদের ক্লাবে খেলাতে এই মুহূর্তে বেশ কিছু ছোট-বড় ক্লাব আগ্রহী। কিন্তু দীপন কি চায়?
রুক্মিনী ওরফে রুকু - রুকু রুলিং পার্র্টির একজন প্রভাবশালী নেতার একমাত্র কন্যা। যে ভালবাসে দীপনকে কিন্তু তার বাবা কিছুতেই এই সম্পর্ক মেনে নিতে রাজি নয়। দীপন রুকুকে প্রথমদিকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলেও শেষপর্যন্ত ভালবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পরে। রুকু কি তার বাবার অমতে দীপনকেই তার জীবনসঙ্গী হিসাবে বেছে নেবে?
ভবানী হালদার - রুলিং পার্র্টির একজন প্রভাবশালী নেতা এবং রুকুর বাবা। রুকুর মায়ের সাথে ভালবেসে বিয়ে হলেও কাজের চাপে পরিবারকে এখন খুব বেশি সময় দিতে পারেন না। মেয়ের সাথে দীপনের মেলামেশা একদম পছন্দ করেন না। অথচ এই মানুষটা কয়েকবছর আগেও এমন ছিল না। ভবানী হালদারও তার জীবনের অতীতকে কিছুতেই সামনে আসতে দিতে চান না। কি ঘটনা লুকিয়ে রয়েছে হালদার পরিবারের অতীতে?
সন্ময় নন্দী - ক্রীড়া সাংবাদিক হিসাবে জীবনের কুড়িটা বছর পার হয়ে গেছে সন্ময় নন্দীর। সাংবাদিকতার শুরুতে যারা তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, বর্তমানে তারা কেউ তার ধারেকাছে নেই। হয় তারা সন্ময়ের কাছে বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছে, অথবা পাকাপাকি ভাবে সরে গেছে মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি থেকে। বর্তমানে তার কলকাতার বুকে রয়েছে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং দামি গাড়ি। এছাড়াও নামে-বেনামে উপার্জন করেছেন অগাধ সম্পত্তি যার হিসাব এই বয়সে এসে তিনি আর রাখেন না। সন্ময়ের স্ত্রী সুপর্ণা এই বাঁকা পথের উপার্জনকে মোটেই ভালো চোখে দেখে না এবং এনিয়ে তাদের মধ্যে প্রায়ই অশান্তি লেগে থাকে। সন্ময়ের এই লাগামছাড়া জীবনযাত্রা এবং অর্থের প্রতি অন্ধ মোহ তাকে কোন পথে নিয়ে চলেছে?
বাচস্পতি দত্ত ওরফে বেচু দত্ত - আজ থেকে তিরিশ বছর আগে মোহনবাগান ক্লাবের রাইসিং স্ট্রাইকার হিসাবে বেচু দত্ত সেইসময়ের কাগজের পাতায় আলোড়ন তুলেছিলেন। সেই সময়ের সাংবাদিকরা মনে করত কলকাতা ময়দান আরেকটা সুরজিৎ সেনগুপ্তকে পেতে চলেছে এবং বেচুর ইন্ডিয়া টিমের জার্সি পাওয়া শুধুমাত্র সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু সবকিছু পাল্টে গেল শিল্ড ফাইনালে ইস্টবেঙ্গল ম্যাচের আগের দিন। কি ঘটেছিল সেদিনের সেই ম্যাচে?
মৃন্ময় ওরফে বাবু পাল - একসময় মোহনবাগান ক্লাবে ডিফেন্সে খেলতেন এবং সেই সূত্রেই এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে চাকরি পেয়ে যান। তারপর চলে আসেন কোচিং করাতে। বর্তমানে দীপনের তালতলা ক্লাবের কোচ। বাবু চায় দীপনকে মোহনবাগান ক্লাবে খেলাতে। তার জন্য দীপনকে কি কি করতে হবে, আর কি কি ছাড়তে হবে সব কিছু ঠারোঠারো বুঝিয়ে দিয়েছেন। দীপনকে এই মোহনবাগান ক্লাবে খেলানোর পিছনে কি বাবু পালের নিজস্ব কোনো স্বার্থ কাজ করছে?
সজল ভট্টাচার্য - একসময়ে মোহনবাগান এবং ইস্টবেঙ্গল দু'ক্লাবেই খেলেছেন টানা পনের বছর। তাকে দলে পাবার জন্য সেই সময় দু'ক্লাবের রেষারেষি ছিল দেখার মতন। খেলা ছাড়ার পর হয়ে যান ময়দানের পেশাদার কোচ। মোহনবাগান ক্লাব ছাড়ার পর বেশ কিছু একাডেমির দায়িত্বও সামলেছেন। বর্তমানে বয়স আশি বছরের কাছাকাছি প্রায়, বাড়ির সামনে বাচ্চাদের ফুটবল কোচিং এর দেখাশোনা করেন। এনার জীবনেও আছে এক কলঙ্কময় অতীতের স্মৃতি যার কথা তিনি কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারেন না। একটা সময়ের পর তার মেয়েও তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কোন কলঙ্কময় অতীতের স্মৃতিকে বুকে আঁকড়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন তিনি?
এছাড়াও এই কাহিনিতে রয়েছে সঞ্জয় গোপ, লাল্টুদা, রনিদা, জিনি, জিতু এবং বাপ্পাদার মতন রংদার সব চরিত্র। এরা সবাই কোন না কোন ভাবে দীপন বা রুকুর বর্তমান পরিস্থিতির সাথে জড়িয়ে আছে। এতটা পড়ে বুঝতে পারা যাচ্ছে যে এই কাহিনী শুধুমাত্র ফুটবল বা বাঙালির আবেগের সাথেই জড়িয়ে নেই। এই কাহিনীতে রয়েছে নস্টালজিয়া, ড্রামা, সাসপেন্স, ইমোশন এবং টিন-রোম্যান্স। আর এইসবকিছুকেই খুব সুন্দরভাবে কাহিনীতে ব্যবহার করেছেন নবাগত লেখক অভিমুন্য রায়। কোথাও কোন কিছুর বাড়াবাড়ি নেই, ঠিক যতটা প্রয়োজন কাহিনীতে ততটাই রয়েছে। এই লেখা পড়লে বোঝা যায় লেখক ফুটবল ময়দানের রাজনীতি থেকে খেলোয়াড়দের জীবনের অনেক অন্ধকার দিকের সাথেও খুব ভালভাবে পরিচিত। পাশাপাশি ময়দানের ক্লাবগুলির চেনা-অচেনা দিকগুলিকেও খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন। ---------------------------------
এই লেখায় যে যে জিনিসগুলো ভালো লেগেছে -
১) লেখক অন্যান্য স্পোর্টস রাইটারদের মতন খেলোয়াড়ের জীবনযুদ্ধ দেখানোর টিপিক্যাল ফর্মুলাকে এই কাহিনীতে বেছে নেননি। বরং একটা অন্য দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ময়দানের কাহিনীকে পাঠকদের কাছে তুলে ধরেছেন যা অনেকটাই যুগোপযোগী। লেখকের ভাষা বেশ সাবলীল এবং কাহিনী বলার ভঙ্গিও আধুনিক লেখকদের মতন। ফলে বইটা হাতে নিয়ে পড়তে বেশ ভালোই লেগেছে।
২) লেখক প্রধান দুটি ক্লাবের নস্টালজিয়া এবং রেষারেষির ঘটনার পাশাপাশি বেশ কঠিন কিছু সত্যিকেও সোজাসুজি ভাবে কাহিনীতে বলেছেন। যেমন - ক্লাবের পরিকাঠামো নিয়ে কোন দূরদর্শী ভাবনাচিন্তা দুই ক্লাবের মধ্যেই নেই যাতে ভবিষ্যতের প্লেয়াররা একটা ভালো পরিবেশ পায়। দুইক্লাবের কর্মকর্তা এবং সমর্থকরা শুধুমাত্র একে অপরকে ডার্বিতে হারিয়েই তৃপ্ত থাকতে চায়। দল আন্তর্জাতিক ময়দানে নেমে কোন বড় ট্রফি জিতে আসুক বা দলের কোন প্লেয়ার আন্তর্জাতিক ক্লাবে ভালো খেলুক এরকম কোন ইচ্ছা বা তাগিদ তাদের মধ্যে দেখা যায় না। এদের সবটাই দল কেন্দ্রিক ভাবনা।
৩) ময়দানে নামি খেলোয়াড়দের খেপ খেলার দিকটাকেও খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন এই কাহিনীতে। এই খেপ খেলা যে কত প্রতিশ্রুতিমান প্লেয়ারদের কেরিয়ার চিরকালের মতন নষ্ট করে দিয়েছেন তা এই কাহিনী চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
৪) অনেক ফুটবলার রেল, পোর্র্ট সহ নানা রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানে পাকাপাকি সরকারি চাকরি পাবার পর খেলার বুটকে চিরতরে সরিয়ে দিয়েছে। তার বদলে বেছে নিয়েছে ছোট-বড় ক্লাবে কোচিং এর সুখী ব্যবস্থাকে। এই কাহিনীতে সেকথার উল্লেখও আছে।
৫) তবে এইসবকিছুর পাশাপাশি ব্রিদিং রিলিফ হিসাবে রয়েছে কলকতার সমস্ত হেরিটেজ ফুড-হাবের সুলুক সন্ধান। উত্তর থেকে দক্ষিনের সব নামজাদা হেরিটেজ খাবারের দোকানের নাম ঘুরেফিরে এসেছে এই বইয়ের পাতায় পাতায়। শ্যামবাজারের গোলবাড়ির মটন-কষা টু রাদুবাবুর দোকানের স্পেশাল-চা ভায়া কলেজস্ট্রিটের গুঞ্জনের চপস্যুই কিছুই বাদ যায়নি লেখকের তীক্ষ্ণ নজর থেকে। আর বিষয়গুলিকে কাহিনীর সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে যে তা পড়তেও বেশ স্বাদু লেগেছে। ---------------------------------
লেখাটিতে সেভাবে বোর হবার কোন দিক আমি খুঁজে পায়নি। তবে কিছু ছোটখাটো জিনিস ভালো লাগেনি।
যেমন - ১) সারা বই জুড়ে ভবানী হালদার বলা হলেও ১১নম্বর পৃষ্ঠায় ওনাকে ভবানী দত্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
২) বইয়ের স্পাইন রাউন্ড না করে স্কোয়ার করলে বেশি ভালো হত। পাতলা বইতে রাউন্ড স্পাইন জমে না।
৩) বইয়ের প্রচ্ছদ আরও ভালো হতে পারত। রঞ্জন বাবুর থেকে প্রত্যাশা অনেক বেশি আমাদের আশা করি এই বিষয়গুলি পরবর্তী এডিশনে ঠিক করে নেওয়া হবে। সবমিলিয়ে নবাগত লেখক অভিমন্যু রায়ের লেখা আমার পড়তে বেশ ভালোই লেগেছে।
"আমাদের জীবনের চেয়ে রহস্যময় এই পৃথিবীতে আর কিছুই নেই সন্ময়! জীবন আমাদের সঙ্গে প্রতি মুহূর্তে মজা করে। বুঝিয়ে দেয় আমরা আসলে কিছুই না। তাই কোনওদিন কোনও কিছুতেই আর অবাক হই না। তুমিও হয়ো না। দেখবে জীবন থেকে অনেক কিছু শিখতে পারবে। এর থেকে বড় শিক্ষক কিন্তু আর কেউ হয় না। এটা মাথায় রেখো সবসময়।"
কোনো এক জায়গায় পড়েছিলাম "ফুটবল শব্দটার মধ্যে সবথেকে বেশি যেটা আছে সেটা হল আবেগ।" ছোট-বড়, ধনী-গরীব কেউ বাদ নেই এই আবেগের হাত থেকে। ফলে হেরে গেলে দুচোখ দিয়ে বয়ে চলা জলস্রোত আর জিতলে উন্মাদনা এই সবকিছুই আছে ফুটবলকে ঘিরে। কিন্তু মাঠের ভেতরের সাথে সাথে মাঠের বাইরেও এমন বহু বিষয় থাকে যা সরাসরি খেলার মধ্যে হস্তক্ষেপ না করলেও পরোক্ষভাবে তার ছাপ রেখে যায়। সেই সমস্ত গল্প আমরা বইয়ের পাতায়, টিভির পর্দায় এবং লোকমুখে পড়েছি, দেখেছি ও শুনেছি। তাদের মধ্যে কিছু গল্প কালের নিয়মে হারিয়ে গেছে এবং কিছু গল্প থেকে গেছে আমাদের সাথে। আলোচ্য গল্পটি সেই জায়গাটি করে নিতে পারল কিনা তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক।
গল্পটা শুরু হয় দীপন সেনগুপ্ত নামের এক তরুণ ফুটবলারকে কেন্দ্র করে। সে কোচ বাবু পালের নেতৃত্বে তালতলার ফাস্ট ডিভিশনে অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলে। ঠিকমতো গাইড করলে সে যে বড় ক্লাবে খেলতে পারবে তা তার কোচ বাবু পাল যেমন জানে তেমনই জানেন ঢাকুরিয়ার প্রগতি সংঘের কোচ বাচস্পতি দত্ত। কিন্তু তিরিশ বছর ধরে তাদের মধ্যে বয়ে চলা ইগোর লড়াই কি সেই ছেলেটির উন্নতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে? অনেকের মতো সেও কি তলিয়ে যাবে ব্যর্থতার অতলে?
"প্রেম মানুষকে শান্তি দেয় কিন্তু স্বস্তি দেয় না।" শাসক দলের নেতা ভবানী হালদারের মেয়ে রুক্মিণীকে ভালোবেসে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল দীপন। বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার শখ তার কোনোকালেই ছিল না। কিন্তু প্রেম এতকিছু বোঝে না। অবাস্তব হলেও আস্কারা দেয় আবেগকে। ঠিক সিনেমায় যেমন হয়। তাই কড়া ট্যাকল সামলে সেও স্বপ্ন দেখে তাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পেয়েছে। কিন্তু আদৌ কি বদলাবে পরিস্থিতি? নাকি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা ও ফুটবল দুটোকেই বিশ বাঁও জলে ফেলে তাকে এগিয়ে যেতে হবে?
"পৃথিবীটা কতটা ছোট বুঝতে পারছ সন্ময়? আর পৃথিবীর সবথেকে রহস্যময় জিনিস হল আমাদের জীবন। সেটা যে আমাদের কখন সবকিছু মিলিয়ে দেবে কেউ বলতে পারে না।"
অন্যদিকে এদের সাথে জড়িয়ে যায় সন্ময় নন্দী নামের এক প্রখ্যাত সাংবাদিক, সঞ্জয় গোপের মতো একজন ব্যর্থ মানুষ, হারিয়ে যাওয়া কোচ সজল ভট্টাচার্য এবং আরো অনেকের জীবন। এরা কারা? কিভাবে তারা জড়িয়ে একে অপরের সঙ্গে?
এটুকু বলতে পারি, এরা প্রত্যকেই ধোঁয়াশা এক ধুম্রজালের নানান অমূলক আর অলীক সামাজিক পরিকাঠামোয় বন্দী হয়ে রয়েছে। নিজেদের স্বতন্ত্র সত্তাকে খুঁজে নেওয়ার লড়াইয়ে তারা অনেকটাই পিছিয়ে। তারা কি পারবে আবারও জীবনের ময়দানে নামতে? মেঘের ফাঁকে জীবনের নীলটাকে আবারও কি তারা ফিরিয়ে আনতে পারবে?
এইসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের দায়িত্ব আপনাদের ওপর ছেড়ে আমি বরং বইটি পড়ে কেমন লাগলো সেই নিয়ে কয়েকটি কথা বলি,
১. প্রতিটি চ্যাপ্টারের নামকরণ করা.. এই কনসেপ্টটা আমার খুবই পছন্দের। তাই শুরুতেই এক পয়েন্ট।
২. সহজ এবং নির্মেদ ভাষা ও গতিময় লেখনী পাঠককে বইটির শুরু থেকে শেষ অবধি ছুটতে বাধ্য করে।
৩. চরিত্রদের অত্যন্ত যত্ন নিয়ে তৈরি করেছেন লেখক। ফলে তাদের সঙ্গে রিলেট করতে কোনোরকম অসুবিধা হয় না।
৪. গল্পের স্ট্রাকচারটা নতুন নয়.. কিন্তু তার ভিতরের এলিমেন্ট গুলোকে চমৎকারভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আমরা যতই তর্ক করিনা কেন এই কথাটি সত্য যে বাজারে অতিনাটকীয়তার গ্রহণযোগ্যতা আছে। তা নাহলে টিভি সিরিয়াল ও সিরিয়াল মার্কা কিছু উপন্যাস এতটা রমরমিয়ে চলত না। লেখক চাইলে এতেও সেই সমস্ত মেলোড্রামা ঢুকিয়ে বইটিকে কলেবরে বৃদ্ধি করতেই পারতেন। সেই সুযোগও ছিল। কিন্তু তিনি সে পথে হাঁটেননি। আর তার জন্য আমার তরফ থেকে সাধুবাদ জানাই। আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন, "In the end, it's not the years in your life that count. It's the life in your years." তাই গল্পের ক্ষেত্রেও কম কথা বলেই যদি কোনো একজনের জীবনদর্শনকে ফুটিয়ে তোলা যায় তাহলে অহেতুক শব্দ খরচ করার দরকার পড়ে না।
৫. স্মরণজিৎ চক্রবর্তীর লেখা যারা পড়েছেন তারা বুঝতে পারবেন অভিমন্যু রায়ের লেখায়ও তার কিছু প্রভাব আছে। এমনকি কিছু কিই-এলিমেন্ট যা প্রেমের ম্যাজিশিয়ানের লেখায় ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আসে সেগুলোও এখানে অল্পবিস্তর পেয়ে বেশ ভালোই লেগেছে। বাপ্পাদার ক্যারেক্টারটা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
৬. বিবেকানন্দ পার্কের ফুচকা, রবীন্দ্র সরোবর লেক, মৌচাকের সিঙারা, শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়, হরিদাস মোদক, গোলবাড়ি, ফড়িয়াপুকুর মোড়ের অমৃত, কলেজ স্ট্রিটের দাস বুক স্টল, গুঞ্জনের চাইনিজ এরকম বেশ কয়েকটি জায়গা খুবই সুন্দরভাবে গল্পের সাথে যুক্ত করেছেন লেখক। যা পড়তে গিয়ে মনটা নস্টালজিক হয়ে ওঠে।
৭. রঞ্জন দত্তের করা প্রচ্ছদটি আমার খারাপ লাগেনি কিন্তু আরেকটু অন্যরকম করা যেতে পারত। কয়েকটি অলংকরণ থাকলেও মন্দ হত না। তবে কালার প্যালেটটা যথাযথ হয়েছে।
৮. সযত্নে, শুদ্ধ মুদ্রণে বইটিকে পরিবেশন করার জন্য দে’জ পাবলিশিং-কেও স্যালুট।
শেষমেশ এটাই বলব, গল্পটি শুধু ফুটবলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে উঠেছে বেশ কিছু মানুষের হাসি কান্নার কোলাজ, যা পড়তে পড়তে কখনও গলার কাছটায় দলা পাকানো কষ্ট অনুভব করেছি, আবার কখনও আনন্দে ভিজে উঠেছে চোখের কোণ। তাই আমার তরফ থেকে ফুল মার্কস। ভ্যাপসা গরমে এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি বা শর্মার লস্যির স্বাদ নিতে চাইলে বইটিকে কোনোমতেই উপেক্ষা করবেন না। নমস্কার!
আমি বিশ্লেষক নই। সামান্য একজন পাঠক মাত্র। আলোচ্য গল্পের বইটি পড়ে ভালো লাগলো, তাই লিখছি। ময়দান ও সংবাদ জগতের চেনা অথচ অচেনা কিছু নাম এর সাথে সুন্দর character presentation, অহেতুক গল্পটিকে দৈর্ঘ্য না বাড়ানো, সাথে বাঙালির চিরন্তন ফুটবল flavour এবং এই সব কিছুকে ঘিরে দুটি মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি সম্পর্কের সমীকরণ। সব মিলিয়ে বেশ জমজমাট ব্যাপার।
"North er praye sob lok e south kolkata alposolpo chene. Kinto south er onek lok sara jibon e shyam bajar er panch matha more e aseni."... Boi ta porte porte amra hotat ek nostalgia mode e chole jai . Sotti, puro kolkata kota lok e ba ghure dekheche. North-south, football, politics, prem...Ei uponnash er maddhome amra fire gechi bangalir jiboner sathe jorie theke onek antorik dike. Ek protibhaban torun footballer Dipon er maddhome amra fire gechi hyto amader e dekha kichu fele asa diner somoy. Onekdin por ekta sundor vabe tule dhora golper modhe amra fire gelam bangla pather fele asa din e. Ki kore eta somvob holo nijei pore dekhun.
বাঙালির ফুটবল, ময়দানি রাজনীতি, ইস্টবেঙ্গল - মোহনবাগানের চিরকালীন ডার্বিজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার মাঝেই এক উঠতি প্রতিশ্রুতিমান তরুণ ফুটবলারকে নিয়ে এই কাহিনি আবর্তিত হয়। ফুটবলের সঙ্গে সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আসে এক মিষ্টি প্রেমের গল্প। এইসবের ককটেলেই ছদ্মনামের আড়ালে লেখক 'অভিমন্যু রায়'-এর প্রথম উপন্যাস 'মেঘের ফাঁকে নীল', দেজ পাবলিশিং থেকে প্রকাশিত।
লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসাবে পাঠক হিসাবে ব্যক্তিগতভাবে আমার বেশ ভাল লেগেছে। তবে মাল্টিপল স্টোরিলাইন বা ক্যারেক্টার একই সুতোতে গেঁথে দেওয়া একটু বেশিই আরোপিত লেগেছে, যদিও তাতে কাহিনির গতি শ্লথ হয়নি, গল্প তরতরিয়ে এগিয়েছে। পড়ার পরে একটা ফিল গুড ফ্যাক্টর কাজ করে। শেষের উপসংহার অংশগুলো বেশ ভালো লেগেছে এন্ডিং হিসাবে, অনেকটা যেন জাম্পকাটে সিনেমা দেখার মত।
শিল্পীর নাম যখন রঞ্জন দত্ত, তখন প্রচ্ছদ আরেকটু ভালো আশা করেছিলাম। আর 'পরে/পড়ে', 'কি/কী'-জনিত মুদ্রণ প্রমাদ বেশ কিছু চোখে পড়েছে যেটা দেজের থেকে অভিপ্রেত নয়। লেখককে আন্তরিক শুভেচ্ছা ভবিষ্যতের জন্য।