মোকাবিলা ২০০৬ সালে (ফাল্গুন ১৪১২) প্রথম প্রকাশের মধ্য দিয়েই ধর্ম, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং নাস্তিকতা সম্পর্কে প্রথাগত বদ্ধমূল চিন্তা সমূলে আঘাত হানে। যার জের প্রবল ভাবে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় ও রাজনীতিতে সবলে ও সবেগে জারি রয়েছে । লেখাগুলো লেখা হয়েছে পাশ্চাত্যের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের রণনীতি মোকাবিলার তীব্র তাগিদ থেকে। ইসলাম আতঙ্ক (Islamophobia) বা বিদ্বেষের বিশ্বব্যাপী চর্চার পরিপ্রেক্ষিতে। বাংলাদেশে ইসলাম বিদ্বেষ একই সঙ্গে ইসলাম নিমূলের রাজনীতির সঙ্গে একাকার। বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে যা এখনও নির্ধারক উপাদান এবং সক্রিয়। ইসলাম বিদ্বেষ ও নির্মূলের রাজনীতি ও সমরনীতির বিরুদ্ধে ফরহাদ মজহার নিয়মিত লেখালিখি করলেও ‘মোকাবিলা’ ভিন্ন ধরনের গ্রন্থ। মূলত ধর্মের প্রশ্ন মোকাবিলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপ্লবী রাজনীতির নীতি ও কৌশল নির্ণয়ের তাগিদ ও আকুতি থেকেই লেখাগুলো প্রণীত হয়েছে। এই বইটির মূল প্রতিপাদ্য হচ্ছে বাংলাদেশের ‘বামপন্থা’, বিশেষত মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিনের অনুরাগী ও অনুসারীরা ধর্ম প্রসঙ্গে ভুল নীতি ও আত্মঘাতী কৌশলে আটকা পড়ে রয়েছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের অবিশ্বাস্য ও অস্বাভাবিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে হলে ধর্ম সম্পর্কে আজগুবি ধ্যান-ধারণা পরিহার করতে হবে; মার্কস, এঙ্গেলস ও লেনিন মনোযোগ ও নিষ্ঠার সঙ্গে পাঠ ও পর্যালোচনা জরুরি কাজ। অন্যদিকে এই গ্রন্থটি ধর্মপন্থিদেরও আকৃষ্ট করেছে, বিশেষত যারা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিরোধে ইসলামের ইতিবাচক ভূমিকা আছে বলে বিশ্বাস করেন। ইসলাম তাদের রাজনৈতিক অনুপ্রেরণা ও আদর্শের ভিত্তি। আকৃষ্ট করবার কারণ, মার্কস, এঙ্গেলস, লেনিন বা এককথায় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে নাস্তিকতার যে নির্বিচার অভিযোগ আনা হয়, বইটি সেই হরেদরে একাট্টা অভিযোগ সরাসরি নাকচ করে। ফলে ধর্মের প্রশ্নে মার্কস ও কমিউনিজম সম্পর্কে যে সকল প্রথাগত মত আজও সক্রিয় ও সজীব পর্যালোচনার প্রতিবন্ধক সেই বাধাগুলো কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বইটি খুবই সহায়ক। ধর্মের সঙ্গে রাষ্ট্রের কিম্বা ধর্মের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধ বিচারের প্রশ্ন অনেক জটিল বিষয়।‘মোকাবিলা’ সেই সকল জটিল জিজ্ঞাসাকে যথাসাধ্য সরল ভাবে উপস্থাপন ও মীমাংসার চেষ্টা। বাংলাদেশের চিন্তাশীল পাঠক ও রাজনৈতিক কর্মীদের অবশ্যই পাঠ্য।
Farhad Mazhar (ফরহাদ মজহার) is a Bangladeshi writer, columnist, poet, social and human rights activist, and environmentalist. He graduated with honours in pharmacy from the University of Dhaka in 1967 and worked as a pharmacist in New York in the seventies and eighties. Mazhar also studied political economy in New School of Social Research. He is the founding member and managing director of UBINIG (Policy Research for Development Alternative) a policy research and advocacy group in Bangladesh working as an integral part of the community with the grassroots people to strengthen common resistance against the dominant processes of globalisation as well as creating space for strategic negotiations whenever possible.
মার্ক্স ধর্মের পর্যালোচনা সেরে নিতে বলতেন যেকোনো পর্যালোচনার শুরুতে। আর বলতেন ধর্মের ঐতিহাসিক বিবর্তন বিকাশের প্রক্রিয়া বুঝতে। এইখানে সতর্ক বার্তা দিতে চাই; মার্ক্স পাঠ পর্যন্ত এগোনোর আগেই মানুষের প্রথাগত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আর ঈশ্বর যে আলাদা–এই বোধ তৈরি থাকাটা জরুরি। নতুবা 'বৈপ্লবিক পরিবর্তন' বা 'মানুষের মুক্তি' বা 'শ্রেণি সংগ্রামের' ফজিলত বোঝা যাবে না ফরহাদ মজহারের মতোন গোলমেলে (প্রতিনিয়ত নয়া ডিসকোর্সে শিফট করা) বুদ্ধিজীবীর বই বা বক্তৃতার সাহায্যে।
মোকাবিলা মূলত মজহারের দিক থেকে মার্ক্স লেলিন হেগেলের ধর্ম সংক্রান্ত দর্শনের ইন্টারপ্রিটেশন। পুঁজিবাদী বিশ্ব ও বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনীতির সমালোচনা। এনলাইটেনমেন্ট ও পাশ্চাত্য আধুনিকতা নিয়া কিছু টুকরো ভাবনা। বোধকরি বাংলাদেশীয় কনটেক্সটে 'ধর্মের উত্তোরণ : কমিউনিজমের সহজ পাঠ' হিসাবে বইটা ভালো। লেখকের অনেক রিপিটিটিভ আলাপ আর চিন্তাভাবনার স্ববিরোধিতা টের পাওয়ার পরেও নিজে যা কিছু লার্নিং বা ফাইন্ডিং নোট করেছি, পরবর্তীতে মার্ক্স এবং সমাজতন্ত্র আবিষ্কারের পথে কিছুটা সহায় হলেই হয়।
তো একটা বই পড়লে মানুষ নাকি আগের মতো থাকতে পারে না যেমন সমুদ্র দেখলেও থাকে না সে আগের মানুষটা। ফরহাদ মজহারের মোকাবিলা পড়তে ম্যালা সময়-মনোযোগ লাগসে। পেন্সিল আর হাইলাইটারে ভরাইলাম কাগজপত্র। নানান বুদ্ধিবৃত্তিক কথাবার্তা নোটও করলাম ( আবার এইটাও শুনেছি যে প্রথমবার মজহার পড়লে নিজেরে বিশ্বখ্যাত মার্ক্সিস্ট হেগেলিয়ান লাগবে), আমার এখন ভাবতেই মজা লাগতেসে যে আগের মতো কখনোই ধর্ম বা বুর্জোয়া বা এলিট বা গণতন্ত্র ইত্যাদি ইত্যাদি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক শব্দগুলা আর র্যানডমলি উচ্চারণ করতে পারবো না আমি। কিংবা সাদাকালো বাইনারিতে ধর্মতত্ত্বকে দেখতে। কিংবা সমাজ আর রাষ্ট্রের সম্পর্ককে লিনিয়ার ভাবতে। সবকিছু গুবলেট পাকাইতেসি আরকি।
কিছুটা কঠিন মনে হলেও বইটা অনেক ভাল ছিল। মজহার মার্কসকে তথাকথিত মার্কসবাদীদের থেকে ভিন্ন ভাবে উপস্থাপন করেছেন। এই মার্কস অন্ধ ধর্মবিদ্বেষী নয়, তার ধর্ম নিয়ে ধারণা প্রচলিত মার্কসবাদীদের মত সংকীর্ণ না। ধর্মকে তিনি নির্যাতিত মানুষের আশা ও দীর্ঘশ্বাস হিসেবে দেখেছেন। এটি মানুষের বৈষয়িক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেটা পরিবর্তন না করে ধর্মকে অতিক্রম করা সম্ভব না।
মজহার আরো দেখিয়েছেন মার্কস প্রচলিত ধর্মনিরপেক্ষ বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে অনেকটা ধর্মতত্ত্বের উপরই নির্ভরশীল হিসেবেই বুঝেছেন। ধর্ম যেমন মানুষের ইহলৌকিক সমস্যার সমাধান না করে পরকালে মুক্তির স্বপ্ন দেখায়, তেমন ভাবেই বুর্জোয়া রাষ্ট্র মানুষকে সত্যিকারের মুক্তি বা সাম্য না দিয়ে সংবিধান, আইন ইত্যাদির মাধ্যমে এসবের একটি পারলৌকিক জগৎ তৈরি করে। ধর্মের সাথে এর পার্থক্যের দিক হলো, বুর্জোয়া রাষ্ট্রের এই পারলৌকিক জগৎ ইহলোকেই কায়েম করা হয়। রাষ্ট্র নিয়ে এই চিন্তাটা আমার মাইন্ড ব্লোসিং লেগেছে। রাষ্ট্র নিজেই যদি একটি ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় হয়, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র কি তাহলে অর্থহীন হয়ে যায় না?
পরিশেষে মজহার হেগেলিয় দর্শনের খ্রিষ্টীয় ও বর্ণবাদি দিক উপস্থাপন করেন। হেগেল নিয়ে এখন পর্যন্ত যা পড়েছি এর মধ্যে মজহারের লেখাটাই সবচেয়ে সহজবোধ্য মনে হয়েছে। জানতে অবাক লাগলো যে হেগেলের 'দর্শনের ইতিহাস' মূলত দর্শনের মাধ্যমে খ্রিস্টধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার একটি প্রচেষ্টা। হেগেলের মতে খ্রিস্টধর্ম মানুষকে অসীম, নিরাকার ও ইউনিভার্সাল ঈশ্বরের ধারণা শেখানোর ফলেই মানুষের চিন্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে, এবং তার মধ্যে স্বাধীনতা ও সাম্যের চেতনা তৈরি হয়েছে। অন্য কোনো ধর্ম এটা করতে পারেনি। জানি না হেগেলকে ঠিকঠাক বুঝেছি কিনা। কিন্তু মজহারের মতে হেগেলের এই ধারণা পশ্চিমা আধুনিকতার মূলে আছে। এর বিরুদ্ধে মোকাবিলা করাই বাংলাদেশের মতো একটি পেরিফেরাল দেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
বইটার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলাপ আছে অনেক। পশ্চিমা মতবাদ, কমিউনিজম সংক্রান্ত আলাপ আর ধর্ম এগুলো আলাপকালে ব্যবহার হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে। হয়তো বাংলাদেশের রাজনীতি আর সমাজে এসব মতবাদ আর যারা এসব মতবাদ দিয়েছেন তাদের যৌক্তিকতা যাচাই করার জন্য এমন লেখা লেখা হয়েছে। কার্ল মার্ক্স, হেগেল, লেনিন, এঙ্গেলস ও তাদের লেখা বিভিন্ন বিষয়ের বিরুদ্ধে যারা লিখেছেন তাদের নিয়েও আলোচনা আছে। মৌলিক কিছু বিষয়ে আমাদের ভুল ধারণা আছে তা এসব লেখার মাধ্যমে প্রমান হয়ে যায়। হেগেল নিয়ে তার কথাঃ হেগেলীয় ধারণায় দর্শণের জন্য প্রাচ্য অযোগ্য। কারণ নতুন ভাবনা চিন্তাকে সে ভয় পাই। পশ্চিমারা এটাকে একদম ভালো ভাবে আঁকড়ে ধরে রাখছে। হেগেলের মতে আবার মুসা, মুহাম্মদ শুধু মাত্র ঈশ্বরের বাহক। কিন্তু যিশু ভালো ঈশ্বরের পুত্র। তবে ঈসা নাহ। যিশুরে তারা সোনালী চুল শুভ্র আবরণে দেখছে। কারণ প্রাচ্যের ঈসা তাদের দর্শণ জ্ঞান দিবে কেন? এক কথায় পাশ্চাত্যের যে বর্ণবাদী আচরণ তা অনেকটাই জাস্টিফাই হয় হেগেলীয় বর্ণনায়। যদিও তার অন্য কাজও আছে। তবে হেগেল প্রায় পুরোটা জীবন খ্রীষঠ ধর্মের গুণগান আর অন্য ধর্মের দার্শনিক গুরুত্বরে নাকচ করে কাটাইছেন।
I reviewed this book on the Daily Prothom-Alo, a leading national daily in Bangladesh at 2006. For me, idea of this book is a very essential one, specially on the face of the capitalist propaganda about the relation between religion and communism. Farhad Majhar is again unconventional in analyzing and comparing the same historical role of religion and left politics in the mankind and the conspiracy with which they became opponents to each other and drifted from one another.