ফাল্লাচি তাঁর স্বভাবজাত মেধায় নারীদের যন্ত্রণাদায়ক দ্বিধা, সমস্যা এবং আশাগুলো উন্মোচনের জন্য তাদের অন্তরাত্মা, বিবেক ও হৃদয়ে গভীর অনুসন্ধান চালিয়েছেন, যা পাঠককে জাদুর মতো টানে। নিউইয়র্কার স্বাধীনতা নিয়ে তুমি অনেক আলোচনা শুনবে। ‘ভালোবাসা’ শব্দটার মতো ’স্বাধীনতা’ শব্দটারও দারুণ অপব্যবহার আছে। এমন লোকদের পাবে যারা স্বাধীনতার জন্য হয়ে যায়, নির্যাতন সহ্য করে, এমনকি মৃত্যুও বরণ করে। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য নির্যাতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আবিষ্কার করবে যে স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই। বড়জোর স্বাধীনতার অনুসন্ধানের মধ্যেই এর অস্তিত্ব।
বই: লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন লেখক: ওরিয়ানা ফাল্লাচি অনুবাদক: নুসরৎ নওরিন প্রচ্ছদ: সব্যসাচী হাজরা প্রকাশনী: বাতিঘর প্রথম প্রকাশ: মার্চ ২০২১ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১০১ মুদ্রিত মূল্য: ২৬০/-
একজন মা একজন যোদ্ধা।
একটি মেয়ে... কখনও কন্যা তো কখনও বোন, আবার খালামুনি- ফুপিও... আবার কারো স্ত্রীও... মামী- চাচীও... মা... নানী-দাদীও। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে নতুন নতুন সম্পর্কের এই যে সম্বোধনগুলো একজন নারীর জীবনে যেমন খুশি আনে তেমনি আনে দায়িত্বও। সন্তানকে যে জন্ম দেন তিনি মা। আবার মায়ের যত্ন দিয়ে যিনি বড় করেন তিনিও মা। একজন নারী যখন মা হন তখন নতুনভাবে পৃথিবীকে দেখতে শুরু করেন। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় একজন মা কতটা যে অস্থির থাকেন শুধু একজন মা-ই জানেন। নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা একটি নতুন জীবনের সুখস্বপ্নে বিভোর থাকেন, তো কখনও অজানা ভয়ে কেঁপেও ওঠেন।
একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীর মনের কথা বইয়ে বলা হয়েছে। গর্ভধারণের জন্য যার চারিপাশের মানুষগুলো বদলে যায়। সন্তান আগমনের খবর জানার পর বাবা পালিয়ে যায়। "বাবা" বলা উচিত নাকি "কাপুরুষ"? সিঙ্গেল মাদার হয়ে সন্তান লালন-পালন যে কতোটা কঠিন তার বাবা-মা, বান্ধবী, অফিসের বস, ডাক্তারসহ আশেপাশের মানুষগুলো বারবার মনে করিয়ে দিতে থাকে। কিন্তু নিজের সন্তান বা নতুন একটি জীবনকে পৃথিবীর বুক থেকে নিঃচিহ্ন করা কি এতোই সহজ? সবার মতের বিরুদ্ধে যেয়ে একজন নারীর "মা" হয়ে ওঠার গল্প বলা হয়েছে। কিন্তু পরিণতি কী হবে?
একজন মা নিজের মনে যেসব কথা বলেন ও আবেগ অনুভব করেন সবই অনাগত সন্তান বুঝতে পারে এমনটা বিশ্বাস থেকেই নিজের মতো করে অনুভূতি, আবেগ, সম্পর্ক, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে দেখা যাবে বইয়ে। পৃথিবীতে আসার পর কী কী প্রতিকূলতা আসতে পারে ও কীভাবে তার মোকাবিলা করবে সন্তানকে সেসব নিয়েই বলতে থাকে। প্রেগ্ন্যাসিতে কমপ্লেক্সিসিটি দেখা দিলে অনাগত সন্তানের প্রতি বিরক্ত হয় আবার ক্ষমাও চায় তো আবার কখনও চুক্তিও করে। গর্ভধারণের জন্য একজন নারীর মন ও দেহে কী কী পরিবর্তন আসছে পারে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেহেতু পুরো কাহিনীই একজন মায়ের মনের কথা তাই কিছুটা অগোছালোও। মনের কথায় তো আর ধরাবাঁধা নিয়ম থাকে না।
মনের কাঠগড়ায় যে বিচারকার্যের চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে... দারুণ! কেন সব দায়ভার শুধু একজন মায়ের হবে? একটা শিশুর প্রতি মা-বাবার অধিকার যদি সমান হয় তো সব দায়দায়িত্ব শুধু মা'য়ের কেন হবে? সমাপ্তি বিষাদময় কিন্তু সুন্দর। সবকিছুর তো পূর্ণতা হয় না...!
একজন মা শুধু যত্নের না বরং সাথে অনেক ভালোবাসারও দাবিদার। কারণ, মা ভালো না থাকলে তার শরীরে একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠা নতুন জীবনটিও ভালো থাকে না।
এক নারী তার গর্ভের ভ্রুণের সাথে কথা বলার মধ্যে দিয়েই বইটা শুরু। চাকুরীজীবি এক নারী, সামনে কর্মক্ষেত্র তার সাফল্যের সম্ভাবনা। এমনই এক সময় অনুভব করলে সে অন্তঃসত্ত্বা। এক জন অবিবাহিত নারী, যার নিজের মধ্যে বেড়ে ওঠা অন্য একটা প্রাণের উপস্থিতি টের পাবার পর অন্য সবার মত সে ও প্রথমে চিন্তা করলো গর্ভপাতের কথা। কিন্তু নিজের ভেতর থেকে কেউ একজন তাকে জানিয়ে দিলো। এই ভ্রুণকে মানুষ বানাতে হবে। তাকে নিয়ে আসতে হবে পৃথিবীতে।
তবে ঠিক এই মূহুর্তে সে বুঝতে পারলো তার চারপাশে কেউ নাই। আত্মীয় বন্ধু সবাই আস্তে আস্তে দূরে সরে গেলো। সবার মতামত তার উপর চাপিয়ে দিয়ে তাকে নানা ভাবে জোর করতে থাকে, কিন্তু সে নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে। এ লড়াইটা তার নিজের এবং পাশে কেউ থাকবে না এই মনোবলটা নিয়ে শুরু হলো তার কথোপকথন, নিজের ভ্রুণের সাথে নানা বিষয়ে কথা বলা।
সমাজ-সম্পর্ক-মানবিকতা-ধর্ম- রাজনীতি-অর্থনীতি জীবনের নান কাহিনি, এলোমেলো সব কথাবার্তা। রাষ্ট্রযন্ত্রের নানা সমালোচনা, সমাজের নান ধ্যাণধারনাকে ও টেনে আনা হলো এই আলোচনায়। একই সাথে নিজেদের সম্পর্ক ও বোঝাপড়াটাও নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেওয়া হলো এই কথোপকথনে। শুরু থেকে শেষ অবধি এক মায়েক কথোপকথন তার অনাগত এক সন্তানের সাথে।
ছোট একটা বই অথচ কি ভিষণ মন ভারি করে দেওয়া একটা বিষয়। প্রতিটি পৃষ্ঠাতে ভাবনার বিষয় টা থমকে দেওয়ার মত। একজন নারীর গর্ভধারণের নিঃসঙ্গ এক যাত্রা। অনুবাদ বই আমাকে মোটেই টানে না কিন্তু বইটা মোটেই অনুবাদ বলে ভাবতে পারছি না। চমৎকার এক বিষয় নিয়ে অসাধারণ এক বই।
আমরা মানুষ, মানুষ বলতে নর এবং নারীকে বোঝায়।সবমিলিয়ে আমরা মানবজাতি কিন্তু এই মানবজাতির সবসময় মানবজাতি থাকে নাহ।ধর্ম,রাজনীতি, সমাজ মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিভাজন সৃষ্টি করে। এমনকি ভাষাও মানুষকে আলাদা করতে পারে যেমনটা নরহত্যা অথবা বেশ্যা গালি অর্থে।কিন্তু নরহত্যা বলতে শুধু পুরুষ বোঝায় এর নারীহত্যার কোন শব্দ নেই। আবার বেশ্যা বলতে নারীদের গালী অর্থে ব্যবহ্রত হয় কিন্তু পুরুষবাচক শব্দ নেই।একজন নারীকে বিভিন্ন পর্যায়ে যেতে হয় তার সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে অনেক বাঁধা সম্মুখীন হতে হয়,যদি সন্তান টি পুরুষ হয় তাহলে সমস্যার অনেকটা নিরুশন হইলো কিন্তু মেয়ে সন্তান জন্মদিলেই সমস্যার শুরু হইলো।এই যে সভ্যতার শুরু হয়েছে তার দোষটা নাকি মেয়েদের কারণেই হয়েছে এখন মেয়েরা যদি গর্ভধারণ না করে তাহলে সভ্যতার কি হবে?মেয়েদের কি শুধু গর্ভধারণ করার জন্য আর রক্তনিয়ে পরিক্ষা করার জন্যই পৃথিবীতে আসা?সমাজের ভাঁজে ভাঁজে বিস্ময়সূচক চিহ্নের অবসান কবে ঘটবে?কি সেই স্বাধীনতা?
লেখক এবং অনুবাদক দুজনেরই পড়া প্রথম বই "লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন"। কিছু বই থাকে না? পড়ার পরে লিখা গুলো হজম করতে খানিক সময় নিতে হয়! এইটা ঠিক সেইরকম ঘরানার বই। পড়ে ফেলেছি বেশ কয়েক মাস হবে কিন্তু বইটা নিয়ে লিখতে বসেও মনে হচ্ছে যেন মাত্র পড়ার পরে লিখতে বসেছি। লেকিকাকে নিয়ে কিছু কথা বলি - ওরিয়ানা ফাল্লাচি যুদ্ধ সাংবাদিক হিসেবে বহুল পরিচিত একজন সাংবাদিক যিনি ক্ষুরধার সব প্রশ্নে জর্জরিত করতেন বিখ্যাত রাজনীতিবিদদের এবং যার চিন্তা চেতনা যথেষ্ট বিতর্কিত বলে সমালোচনা আছে। লেখিকা এই বইয়েও কিছু প্রশ্ন রেখে গেছেন যা চিরকালীন। - কেন নতুন আরেকটি শিশুকে পৃথিবীতে আনা উচিৎ? কেন অসংখ্য অন্যায় অবিচারের বেড়াজালে জর্জরিত ত্রুটিপূর্ণ এই পৃথিবীতে নতুন একটি শিশুকে আনতে হবে? সে তো চিৎকার করে একদিন তার মা কে বলতে পারে ~ আমাকে কেন এখানে এনেছিলে?
গল্পটা একজন নারীর। একজন অবিবাহিত গর্ভবতী নারীর যার সামনে হাতছানি দিচ্ছে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ( তিনি চাকুরীজীবী ছিলেন এবং অনেক সম্ভাবনার দুয়ার তখন খোলা ছিল তার সামনে) আর তখনই তিনি তার মাঝে এক নতুন প্রাণ বেড়ে উঠার খবর পেয়ে বসলেন । সমাজের রীতিনীতি মোতাবেক তাকেও বলা হলো গর্ভপাতের কথা কিন্তু নানা দিক বিবেচনা করে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি শিশুটিকে পৃথিবীর মুখ দেখাবেন। এর পরে শুরু হয় অনাগত এই শিশুর সাথে তার দৈনিক কথোপকথন। এই কথোপকথনই পুরো বই জুড়ে লিখেছেন লেখিকা। একজন বিবাহিত আর অবিবাহিত নারীর গর্ভধারণ দুরকম কিন্তু দিন শেষে তা শুধু গর্ভধারণই। তিনি যখন জানতেন না তার গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ কি হতে পারে, তখন তিনি দুই লিঙ্গেরই কিছু ভালো মন্দ দিক নিয়ে জানান তার সন্তানকে। ~
" নারী হওয়া চমৎকার ব্যাপার কারণ নারী হয়ে জন্ম নিলে ব্যস্ত থাকার অনেক কিছু পাবে।" আবার মাতৃত্ব নিয়ে বলেন - " মা হওয়া কোনো পেশা কিংবা কর্তব্য নয়। কেবল অনেক গুলো অধিকারের মধ্যে একটা। অন্যদের এই ব্যাপারটা বোঝানো তোমার জন্য যে কি কঠিন হবে! কালেভদ্রে বুঝতে পারবে। বেশির ভাগ সময় বোঝাতেই পারবে না।"
যদি সে পুরুষ হয়ে জন্মায় তার জন্যে বলেছেন - " অন্ধকার রাস্তায় ধর্ষিত হওয়া নিয়ে তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। " " অবাধ্য হতে পারবে বিদ্রুপের শিকার না হয়েই, প্রেম করতে পারবে গর্ভধারণের ভয় ছাড়াই, উপহাসের শিকার না হয়েই নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারবে, কিন্তু তুমি অন্য ধরনের দাসত্ব আর অন্যায়ের মধ্যে পড়ে যাবে। একজন পুরুষের জন্যও জীবন সহজ নয়। কেবল তোমার একটা নুনু আছে বলে তোমাকে নির্দেশ দেবে যুদ্ধে অন্যকে খুন করতে কিংবা খুন হতে।"
নিজের অনাগত সন্তানকে জানিয়েছেন তার কর্মক্ষেত্রে , বাড়িতে, বাহিরে, ডাক্তারের কাছে অর্থাৎ পুরো সমাজে শিশুটিকে দুনিয়াতে নিয়ে আসবার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় তাকে কি কি পোহাতে হচ্ছে। সমাজের নিত্যদিনের অন্যায় অবিচার যা একসময় গিয়ে গা সয়া হয়ে যায়। সে ( অনাগত শিশু) কার কাছে কেমন? সে যে তার পিতার কাছে একটা ফেলনা বস্তু ছাড়া আর কিছু নয় তা বলতেও বাদ রাখা হয় নি। সাথে জানিয়েছেন জীবনের চলতে পথের কঠিন মোলায়েম সব বাস্তবতা।
" স্বাধীনতা নিয়ে তুমি অনেক আলোচনা শুনবে। ' ভালোবাসা ' শব্দটার মতো ' স্বাধীনতা ' শব্দটারও দারুণ অপব্যবহার আছে। এমন লোক পাবে যারা স্বাধীনতার জন্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, নির্যাতন সহ্য করে, এমনকি মৃত্যুও বরণ করে। কিন্তু স্বাধীনতার জন্য নির্যাতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমি আবিষ্কার করবে যে স্বাধীনতার কোনো অস্তিত্ব নেই। বড়জোর স্বাধীনতার অনুসন্ধানের মধ্যেই এর অস্তিত্ব। "
অল্প কথায় কখনোই এই বই নিয়ে আমার কথা শেষ হবার নয়। এ ধরনের বই সবারই পড়া উচিৎ, সংগ্রহে থাকা উচিৎ। ফেব্রুয়ারিতে বই মেলায় এই বই দেখে শুধু মাত্র নামে আকৃষ্ট হয়ে কিনে ফেলেছিলাম বইটা এবং যখনই দেখি আমার এতো বইয়ের আড়াল থেকে এই বইটা উঁকি দিচ্ছে, একটা অনুভুতি কাজ করে যা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। অনুবাদ করা বই আমার খুব একটা ভালো না লাগলেও এই অনুবাদ ঠিক অনুবাদের মতো মনে হয় নি। যেন অনুবাদক নিজের কথা আর নিজের অনুভূতি তুলে ধরেছেন। এর জন্য লেখিকা নুসরৎ নওরিনকে ধন্যবাদ।
বই বেশিরভাগ সময় রিভিউ দেখেই কেনা হয়। তবে এ বইটা কেনা হয়েছিল এর প্রচ্ছদের কারনে। হাস্যকর হলেও সত্যি তাই। মূল লেখিকা ওরিয়ানা ফাল্লাচি একজন সাংবাদিক। এটা তার আত্নজীবনীমূলক গ্রন্থ নয়, বরং জীবনের খুব ছোট্ট কিন্তু গুরত্বপূর্ণ একটি সময়ের বর্ণনা আছে এই বই এ, যার পুরোটাই সত্যি। মূলগ্রন্থ "লেটার টু এ চাইল্ড নেভার বর্ন" এর আরো একটা অনুবাদ আছে, "হাত বাড়িয়ে দাও" আনু মোহাম্মদ এর অনুবাদে। আমি জানিনা সেটা কেমন হয়েছে, কারন ঐ যে বললামই, "প্রচ্ছদ এর প্রেমে পড়ে কেনা"।
এবার আসি মূল গ্রন্থে। লেখিকার তার অনাগত সন্তানকে নিয়ে জল্পনা কল্পনা, দ্বন্দ্ব-স্নেহ, সব কথোপকথনের মাধ্যমে উঠে এসেছে পুরো বইটাতে। কথোপকথন বললে ভুল হবে, কারন লেখিকা একাই বলে গেছেন আর কল্পনা করে গেছেন, ভ্রুণ তো আর বলতে পারেনা!
বই এর শুরুতে লেখিকার সমসাময়িক বিচ্ছেদ এর কথা জানতে পারি। তার ভালবাসার প্রতি একধরনের বিদ্বেষও প্রকাশ পায় এর পর থেকে। এরপরই জানতে পারেন তিনি অন্তর্সত্ত্বা। এই সময়টা প্রত্যেক নারীর জীবনেরই এমন এক কঠিন সময় যে, যিনি সময় টা পার করেন, আর যিনি সময়টাতে পাশে থাকেন দুজনই কিছু অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে যান। ১০০ পেইজ এর বই এক বসায় শেষ করা যায়, কিন্তু যতক্ষণ বইটা হাতে ছিল তার অস্থিরতার আবেশটা আমি নিজেও অনুভব করতে পারছিলাম।
সাধারণত আত্নকথন গুলিতে লেখক/লেখিকারা নিজেকে অনেক বড় (!) করে দেখানো বা নিজেকে ভিক্টিম প্রমান করার একটা প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু এ বইয়ে লেখিকার কঠিন-কোমল সব দিকই আপনি পাবেন।
যেমন এই লেখিকাই যখন প্রথম দিকে তার স্বামীর প্রতি তীব্র ঘৃণা ব্যক্ত করেন, কিন্তু শেষ মুহুর্তে এসে তিনি তারই সহচার্য কামনা করেন। শুরুতে সন্তানকে পৃথিবীর মুখ দেখাতে না চাওয়া এই লেখিকা আবার তার স্বামীর অনুরোধেও সে সন্তানকে মিসকারেজ করেননি। এই লেখিকারই শুরুতে এক পুরুষ ডাক্তারের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায় যে কেন তাকে এত সেনসিটিভ আর কেয়ারি হতে হবে এই অবস্থায়? হয়তো পুরুষ বলেই তিনি এমন করছেন; আবার এই লেখিকারই শেষের দিকে একজন নারী ডাক্তারকে দোষারোপ করতে দেখা যায়- তারা ধারণা তিনি নারী হয়েও লেখিকাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারেননি। এই লেখিকাই একবার ক্যারিয়ার সচেতন মানুষ, যার কাছে তার অনাগত সন্তান একজন নারী হিসেবে "অতিরিক্ত দায়িত্ব" ছাড়া আর কিছু নয়, আবার সেই লেখিকারই তার সন্তানকে নিয়ে কত ফ্যান্টাসি তা প্রকাশ পায় পুরো লেখা জুড়ে। লেখিকা তার অনাগত সন্তানকে পুরুষ হিসেবেই কল্পনা করেন। আর তার সাথে কথোপকথনে প্রকাশ পায় পুরুষশাসিত সমাজের প্রতি তার এক ধরনের ক্ষোভ বা হতাশা। তার ভ্রুণ এর কাছে যে তার অনেক চাওয়া! লেখিকার মা হিসেবে খাম-খেয়ালিপনা আপনাকে কখনো তার প্রতি বিরক্তির উদ্রেক করবে আবার এই লেখিকারই তার সন্তানের প্রতি ভালোবাসা আপনাকে কাঁদাতেও সক্ষম। আর মনে হয় বলা ঠিক হবে না। ১০০ পেইজ এর বই, এখানেই যদি সব বলে দিই তো পড়বেন কি?? তবে এটা বলবো যে, বইটা শুধু নারীদের জন্য "মাস্ট রিড" নয়, বরং সকল পুরুষদের জন্যও "শিওর রিড"। আর অনুবাদক নুসরৎ নওরিন কে নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। একবারো মনে হয়নি অনুবাদ পড়ছি। শুরু থেকে শেষ অবদি ভাষার সাবলীলতা বজায় রেখেছেন।
যে কোন বুক রিভিউ এর শেষে একটা সেগমেন্ট থাকে "নিজের কিছু পছন্দের লাইন"। এটা লিখতে গেলে পুরো বইটা লিখে দিতে হবে এখানে। পুরো বইটার প্রত্যেকটা পৃষ্ঠায় ডাবল ইনভার্টেড কমার মধ্যে রেখে চালানোর জন্য অনেক বাক্য আছে। এর পাতায় পাতায় অনুভূতি, যা আপনাকে পাঠক হিসেবে সুখ(!) প্রদান করতে যথেষ্ট।