আজ থেকে কিছুদিন আগেও ভ্রমণ-সাহিত্য বা ট্র্যাভেলগ অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। পত্রিকার সংখ্যায় তো বটেই, আলাদা বই আকারেও আমরা এমন সব লেখা পেতাম, যাতে গাইড-বুকের মতো কিছু প্রয়োজনীয় তথ্যের সঙ্গে মিশত ব্যক্তিগত অনুভব এবং ইতিহাসের সুগন্ধ। তারপর পাঠকের রুচি বদলাল। অবশেষে করোনা এসে 'ভ্রমণ' ব্যাপারটাই বিষবৎ করে তুলল। ফলে মানসভ্রমণ করতে চাইলেও আমাদের নেটের কেঠো কথার ওপর ভরসা করতে হচ্ছে ইদানীং। হেনকালে 'ভাষা সংসদ' থেকে প্রকাশিত এই ঝকঝকে ছাপা এবং সাদা-কালো ফটোতে সমৃদ্ধ বইটি পড়ে চোখ ও মন জুড়িয়ে গেল। কী আছে এই বইয়ে? অরিন্দম ঘোষ-এর একটি সংক্ষিপ্ত 'কথামুখ'-এর পর এতে একে-একে স্থান পেয়েছে নানা সময়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা— যাদের কোনোটি নিতান্তই স্বল্পায়তন, আবার কোনোটি ধারে ও ভারে একেবারে নিবন্ধ-তুল্য। লেখাগুলো হল~ ১) ঘটনাপ্রবাহে পবিত্র তীর্থ তারকেশ্বর মাহাত্ম্য ২) বড়ো কাছারি মহামিলনক্ষেত্র ৩) গৌরাঙ্গ জন্মভিটা ৪) মায়াপুরের মায়া, নবদ্বীপের ছায়া ৫) বীরচন্দ্রপুরের আনাচে-কানাচে ৬) কথাশিল্পীর জন্মস্থান ও ত্রিধর্মের মিলনস্থল ৭) পুরাতাত্ত্বিক গ্রাম মলুটির উৎস সন্ধানে ৮) চলুন যাই ঘাটশিলা ৯) মুর্শিদাবাদ: ইতিহাস যেখানে কথা বলে ১০) মুরগুমার টানে লাল-পাহাড়ির দেশে ১১) সপ্তরঙা বড়ন্তির আশেপাশে ১২) স্বপ্নমাখা চাঁদিপুর ১৩) গোপালপুরে কয়েকদিন ১৪) দারিংবাড়ি আর মান্দাসারুর অজানা পথে ১৫) কথাশিল্পীর সামতাবেড়ে ১৬) দরিয়াপুর ও কপালকুণ্ডলা মন্দির ১৭) চেনা ছকের বাইরে পুরী লেখক চেনা-জানা 'টুরিস্ট-সার্কিট'-এর জায়গার বাইরে একটু ব্যতিক্রমী জায়গা নিয়েও লিখেছেন। এমনকি চেনা জায়গা নিয়েও লেখার সময় ভাষার সারল্য এবং তথ্যনিষ্ঠার জন্য লেখাগুলো পড়তে ভারি ভালো লাগে। তাছাড়া বেড়াতে যেতে চাইলে (যদি ভ্যাক্সিনের দুটো ডোজই নেওয়া হয়ে থাকে এবং টেস্টের রেজাল্ট নেগেটিভ আসে তাহলেই) যে-সব তথ্য জানা প্রয়োজন, সেগুলোও এখানে বলে দেওয়া আছে নিপুণভাবে। সর্বোপরি, লেখাগুলো একেবারেই নীরস নয়। ব্যক্তিগত অনুভূতি এবং আশা-নিরাশার জলে সিঞ্চিত বলেই এগুলো পড়ে তখনই সতৃষ্ণ নয়নে ব্যাগটার দিকে চোখ চলে যায়। মনে ফিরে আসে "এই শহর ছেড়ে, আরও অনেক দূরে..." গানটা। সত্যিকারের ভ্রমণ হোক বা মানস-ভ্রমণ— মন যেমনই চাক, এই বইটা তার জন্য বেশ কার্যকরী হবে বলেই আমার ধারণা। তাই সুযোগ পেলেই এটিতে ডুব দিন, আর বেড়িয়ে আসুন!