বইটির প্রস্তাবনায় মিলন দত্ত লিখলেন—'সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজের কারো পক্ষে সংখ্যালঘুর সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা বুঝে ফেলা সহজ নয়।' তবুও সার্বজনীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ কাজে তিনি সফলও হয়েছেন বটে।
পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এবং শিল্প-সংস্কৃতির মূল স্রোতে যতদিন পর্যন্ত মুসলমানরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে পারবে না ততদিন পর্যন্ত তাদের আত্মপরিচয়ের গ্লানি ঘুচবে না। সামগ্রিকভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, মুসলমান বাঙালিদের সত্যজিৎ-মৃণাল-শীর্ষেন্দু নেই, হেমন্ত-মান্না বা অজয় চক্রবর্তী নেই, সুচিত্রা সেন অথবা মমতাশংকর নেই। এই না থাকার কারণ কী?
সময় পাল্টেছে, সমাজ পাল্টেছে। এখন মুসলমানদের উচিত মগ্নতার সাথে সংস্কার ও সমন্বয়ী প্রক্রিয়া গ্রহণ করা। এই কাজটা করতে না পারলে তারা চিরকালই বৃত্তের বলয়ের বাহিরেই অবস্থান করবে।
সংখ্যালঘু হওয়ার কারণে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা নানানভাবে নিপীড়ন, নির্যাতনের স্বীকার। এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় দরিদ্রতা ও তাদের শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়াকে। সংখ্যাগুরু হিন্দুদের যারা সরকারে আসে তারা যে এই পিছিয়ে পড়া মুসলমানদের নিয়ে গুরুত্ব দিবে সে প্রয়োজনীয়তাও কখনো উপলব্ধি করে না।
মূলধারার রাজনীতিতে মুসলমানরা অংশগ্রহণ করেও যে এই ধারায় পরিবর্তন নিয়ে আসবে সে উদ্যোগও তাদের মধ্যে দেখা যায় না। তাছাড়া, দেশভাগের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান কখনোই কোনো মুসলিম রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করেনি। দেশভাগের পর তারা ত্রিশ বছর কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে, পরের ত্রিশ বছরের বেশি সময়জুড়ে তারা ছিলো বামফ্রন্টের পক্ষে। পরবর্তীতে ২০১১ ও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা তৃণমূল কংগ্রেসকেই রাজ্যের ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছে। এর কারণ আসলে কী?
মিলন দত্তের 'কেমন আছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান' বইটি যথেষ্ট থট প্রোভোকিং। বইটির পাঠ বেশি বেশি হওয়া দরকার। বিশেষ করে মাদরাসার শিক্ষার্থীদের এই বইটি নিয়ে ঘাটাঘাটি করা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের হাল-হাক্বিকত বুঝতে আরো বৃহৎ কলেবরের বই আছে কিন্তু ইন্ট্রোডাকশন হিসেবে এটা পড়াই যায়।
বইটির অল্প কয়েকটি জায়গায় লেখকের মত নিয়ে আমার যথেষ্ট দ্বিমত আছে। এটা বাদ দিলে 'কেমন আছে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান' বইটি আমার কাছে ভালোই লেগেছে। পড়তে পারেন।