জন্ম ২০ জনুয়ারি ১৯৬৫, নাটোরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্নাতক। স্নাতকোত্তর ডিগ্রী স্বাস্থ্য অর্থনীতিতে। সমকালীন মূলধারার বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অপরিহার্যতা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত। অনবরত বাঁকবদল তাঁর সাহিত্যিকতার প্রধান বৈশিষ্ট। বিষয় ও আঙ্গিকে, মাধ্যম ও প্রকরণে তাঁর স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত অবস্থান সকল মহলেই স্বীকৃত। পেয়েছেন বাংলা একাডেমিসহ দেশের প্রধান প্রায় সকল সাহিত্য পুরস্কার।
গত শতাব্দীতে ঘটে যাওয়া অন্যতম বৃহৎ একটি পরিবর্তন সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থান এবং পতন।মাঝখানে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। লেখক আমাদের নিয়ে গিয়েছেন সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ভেঙে যাওয়ার পরপরই একটা সময়ে।
যখন সমাজতন্ত্রের উত্থান হলো তখন যেমন এদেশে সেটাকে গ্রহণ করেছিল কিছু লোক আবার যখন ভেঙে গেল তখন তারাই সেটাকে বর্জন করে যার যার সুবিধাজনক অবস্থানে নাম লিখিয়ে নিল। লেখক কয়েকজন মানুষের মাধ্যমে আমাদের জানিয়েছেন সমাজতন্ত্রের স্বরূপ। কিভাবে গর্ভাচেবের গ্লাসনস্ত এবং পেরেস্ত্রৈকা সমাজতন্ত্রের পতনেন উস্কানি দিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর আমাদের দেশেও যখন পার্টির ভাঙন ঘটতেছিল তখন নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মীরা দ্বন্দ্বে পড়ে যায় যে তারা কী করবে?
কারণ তারা দেখেছে অনেক উপর সারির নেতাদের দুর্নীতি কিংবা ভাঙনের পর ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে রাজনীতি অথচ সম্পদ ছিল পার্টির সকলের।আমরা দেখতে পাই ফরহাদ মিয়ার মত একজন কর্মী যিনি কিনা উপর সারির নেতাদের ভাগ-বাটোরোয়ার বিপক্ষে। দোলাচলে ভোগা মনা মাস্টারের কর্মকাণ্ড আমাদের ভাবিয়ে তোলে তাঁর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে? কিংবা প্রগতিশীল চন্দনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব পাঠককেও হতাশার মধ্যে ফেলে দেয়। লেখক আসলে আমাদের দেখাতে চেয়েছেন কীভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং আমাদের দেশের সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা সমান্তরালে উত্থিত হয়ে একেবারে মুখ থুবড়ে পড়লো। এখানে যেমন স্তালিনের সমালোচনা এসেছে তেমনিভাবে আমাদের দেশের নেতাদের টাকা খেয়ে অযোগ্য ব্যক্তিতে রাশিয়াতে স্কলারশিপের টাকায় পড়তে পাঠানোর কঠোর সমালোচনা এসেছে।
বিপ্লবের গোল্ডেন বয় নিহত বুখারিন কিংবা আমাদের তেভাগা আন্দোলনের নির্যাতিত ইলা মিত্র যেন একই শোষিত সমাজের প্রতিনিধি। শাসকের ধর্ম একটাই। শোষণ করা। কিন্তু শাসক যখন সাম্যের গান গেয়ে ক্ষমতায় আরোহন করে এবং শোষক হয়ে যায় তখন তাদের মধ্য হতেই জাগো জাগো রব উঠে। এই জাগো জাগো রবই বাঁচিয়ে রাখে ফরহাদ, মনা মাস্টার কিংবা চন্দনের মতো নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের যারা ১৯৯১ এর সোভিয়েত ভাঙনের পরেও মচকে যায় নি।১৯৯২ ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা অটল কিছু মানুষের গল্প।
সোভিয়েত রাশিয়ার ভাঙ্গনের প্রায় সাথে সাথেই এদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও দেখা যায় ভাঙ্গনের সুর। দুই তিন ভাগে বিভক্ত পার্টির লিডারেরা। ভাগ বন্দবস্ত হচ্ছে পার্টির সব সম্পত্তি। সেই সময় একা লড়ে যাচ্ছেন ফরহাদ। ফরহাদের লড়াইয়ের মাঝেই জাকির তালুকদার আমাদের নিয়ে গেলেন স্তালিনের রাশিয়ায় যেখানে স্তালিন নিজের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে বন্ধু কমরেড নিকোলাই ইভানোভিচ বুখারিনকেও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দিলেন সেই সময়ে। এদিকে গ্রাম বাংলার মনু মাস্টার যে সারা জীবন মানুষের জন্য কাজ করেছেন, ক্ষেতমুজুর, কৃষক সমিতির ভিত্তি গড়েছেন সে নিজের সাথে নিজের দ্বন্দ্বে মুহ্যমান। নিজের সাব-কনশাস চিন্তার জগত তাকে নিজের বিবেকের কাঠগড়ায় দাড় করিয়েছে। একদিকে বাংলার ইমম্যাচিউরড ভোটার অন্যদিকে নিজের দলের সুখের পায়রা পার্টি নেতারা যারা ছিলেন বাম রাজনীতির পথপ্রদর্শক তারাই নেমেছে পথ ভোলানোর ষড়যন্ত্রে। পরেছে বিশ্বাশহন্তার পোষাক। কবি সাহিত্যিক যারা একসময় দলের হয়ে কলক ধরেছেন, খেয়েছেন সমাজতন্ত্রের জয়গান, নিয়েছেন সুযোগ সুবিধা তারাও নিশ্চুপ পার্টির দুর্দিনে। অপরদিকে চন্দনের মত সাহসী তরুন যে খেটে খাওয়া দিনমজুর ও তার স্ত্রীর সম্ভ্রম রক্ষার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে হোমড়াচোমরা পুলিশ অফিসের উপর। এই সব দ্বন্দ্বে যখন মনু মাস্টার প্রায় দিশেহারা তখন আসে ননী ভৌমিকের 'মস্কোর চিঠি' যে চিঠি নিপীড়িত নির্যাতিত মানুষকে স্বপ্ন দেখায়। নতুন ভোরের স্বপ্ন।
বইটা কমিউনিস্ট রাজনীতি নিয়ে.... সেই সাথে তৎকালীন অর্থাৎ ১৯৯২ সালের রাজনীতির সার্বিক চিত্র ফুটে উঠেছে।
আমি এই ধরনের বই আগে পড়িনি। এখন লিখতে গেলে রাজনৈতিক দল কিংবা রাজনীতিকের নাম ব্যবহার করে তাদের নেতিবাচক কার্যক্রম তুলে ধরা বিপজ্জনক। এই বইয়ে কিছুটা হলেও আছে। যে কারণে বেশি ভালো লেগেছে।
তবে বইটা নিয়ে বলতে গেলে বা লিখতে হলে আমাকে আরো পড়তে হবে। এই ব্যাপারে আমার জানা-শোনা কম।
লেখকের এটাই আমার প্রথম পঠিত বই। লেখার ধরন ভালো লেগেছে। কিন্তু একটা উপন্যাস শেষ করার পর প্লটের পর প্লট অর্থাৎ প্লেইন একটা গল্প মাথায় গেঁথে থাকে। সেটা থাকেনি, বিচ্ছিন্ন ভাব অনুভব করছি।