'বামপন্থী দল বলে সাধারণভাবে যারা পরিচিত, যেমন বামফ্রন্ট, বামফ্রন্টকে বামফ্রন্ট বলা একটা রাজনৈতিক রসিকতা ছাড়া আর কিছু নয়। দক্ষিণপন্থীরা তাদেরকে এই রসে সিঞ্চিত করে থাকে, কিন্তু এই বামফ্রন্টের মধ্যে কিছু বাম চরিত্র আছে বলে মনে করি না। এরা সকালে সেক্রেটারিয়েটের করিডোরে ঘোরাঘুরি করে, দুপুরে মতিঝিলে চাঁদা আদায় করে, সন্ধ্যায় পার্টি অফিসে বিপ্লব করে এবং রাত্রে আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির সঙ্গে যোগসাজস করে। ' - বদরুদ্দীন উমর
১৯৮৭ সাল থেকে ২০১৭ অর্থাৎ তিন দশক ধরে বিভিন্ন পত্রিকা ও সাময়িকীতে বদরুদ্দীন উমর ছোটো-বড়ো সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখান থেকে বাছাইকৃত অনেকগুলো সাক্ষাৎকারের সংকলন এই বই। ৩৬০ পাতার বইটি প্রকাশ করে 'রাবেয়া বুকস'। দীর্ঘদিন আউট অফ প্রিন্ট ছিল। সম্প্রতি আবার পাওয়া যাচ্ছে বইখানা।
বদরুদ্দীন উমর আজীবন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনীতি করেছেন, লিখেছেন। প্রচলিত অর্থে সাফল্য বলতে যা বোঝায়, তা তিনি পাননি। অন্তত এদেশে তাঁর স্বপ্নের সমাজতন্ত্র কায়েম হয়নি। বরং তা হয়ে গেছে সুদূরপরাহত। অনেকেই বদরুদ্দীন উমরের চাইতে বড়ো বিপ্লবী ছিলেন। আজ তারা কক্ষচ্যুত। কেউ সাইনবোর্ড পাল্টে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাপার মতো দক্ষিণপন্থি দলে মিশে গেছে। কারো কারো সাইনবোর্ড বদলের জরুরত পড়েনি। বিপ্লবীর নামের আরশতলে থেকেই দিব্যি এমপি-মন্ত্রীগিরি করেছেন। এখানেই বদরুদ্দীন উমর ব্যতিক্রম। তিনি কখনোই লক্ষ্যচ্যুত হননি। বিপ্লবের বাসনা তাকে সব সময় প্রাণশক্তির জোগান দিয়েছে৷ লেখক হিসেবে তিনি বেশির ভাগ মানুষের কাছে পরিচিত। অথচ লেখক পরিচয়কে তিনি অত্যন্ত গৌণ জ্ঞান করেন। নিজের লেখাগুলোকে তিনি কালজয়ী দাবি করেন না ; বরং সময়ের প্রয়োজনে এগুলোকে বড়োজোর 'রাজনৈতিক পাম্ফলেট' মনে করেন। বদরুদ্দীন উমরের কাছে তার পরিচয়, তিনি একজন রাজনীতিবিদ। যার স্বপ্ন বিপ্লবকে বাস্তবে রূপদান করা।
উমরের সাক্ষাৎকারগুলো বিনা বিরতিতে পড়া কষ্টসাধ্য। কারণ 'বিপ্লব', 'শ্রেণিশত্রু', 'বুর্জোয়া' ও 'পুঁজিবাদ' ইত্যাদির মতো বামপন্থিসুলভ গৎবাঁধা বুলিতে প্রায় প্রত্যেকটি সাক্ষাৎকার ভারাক্রান্ত। তিনি সবকিছুকেই বামপন্থার লেন্স দিয়ে দেখেছেন। ব্যাখা করেছেন পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের আদি দ্বন্দ্বকে মাথায় রেখে। যা পাঠক হিসেবে আমাকে অনেকটাই বিরক্ত করেছে। তবুও প্রশ্ন জাগে কেন চার তারকা দিলাম। সেই কৈফিয়ত দিই-
একাত্তরে বামপন্থিরা সম্মিলিত কোনো প্রয়াস নিতে পারেনি। বরং চীনের প্ররোচনায় তারা বিভ্রান্ত হয় এবং এদেশের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য রীতিমতো গোর খুঁড়ে রাখে। অনেক চীনপন্থি বাম চীনের দেখানো লাইনে হাঁটা শুরু করে। নিজের চোখে যা দেখছে তা তাদের বিশ্বাস হয় না। এসব বামপন্থি দুশমন চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান সময়ে তারা বিপ্লবীর বেশে প্রতিবিপ্লবীসুলভ আচরণ করে। তাই বদরুদ্দীন উমর মনে করেন, একাত্তরে বামপন্থিদের ঐতিহাসিক ভুলের খেসারত দিয়ে হয়েছিল অত্যন্ত নির্মমভাবে। শেখ মুজিবের সরকার বামপন্থিদের মাফ করেনি। দমন করেছে কঠোরহাতে। একাত্তরে বামপন্থিদের অনেকেই জনতার হৃদয় স্পন্দন ধরতে পারেনি। তাই বামপন্থিরা হারিয়েছিল তাদের পাটাতন। যা আর কখনোই ফিরে পায়নি। বদরুদ্দীন উমর বামরাজনীতিতে একনিষ্ঠ আস্থাশীল হয়েও কঠোরভাবে বামপন্থিদের ভুলগুলো চিহ্নিত করেছেন। নিজেদের দোষগুলোকে গোপন করতে চাননি। এমনকি নিজের কোথায় কোথায় ভুল ছিল তা-ও উল্লেখ করেছেন বিনাদ্বিধায়।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে তিন খণ্ডে অসামান্য কাজ করেছেন বদরুদ্দীন উমর। কোন নেতার কী মূল্যায়ন ছিল তা নিয়ে সুস্পষ্ট বক্তব্য তিনি দিয়েছেন। পরবতীতে চরম প্রতিক্রিয়াশীল অলি আহাদের তিনি সমালোচনা করেছেন। এ-ও অস্বীকার করেননি ভাষা আন্দোলনে অলি আহাদের মতো উজ্জ্বল ভূমিকা আর কারো ছিল না।
ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা নিয়ে বদরুদ্দীন উমর অত্যন্ত কড়াভাবে বলেছেন। যা এখানে উদ্ধৃত করার প্রয়োজন মনে করি না। এটুকু বলব, প্রচলিত বয়ানকে তিনি নস্যাৎ করে দিয়েছেন। শেখ মুজিবের প্রতি বদরুদ্দীন উমর ক্ষেত্রবিশেষে শালীনতার গণ্ডি অতিক্রম করেছেন বলেই মনে হলো।
দেশভাগ ও তৎকালীন রাজনীতি নিয়ে দেওয়া একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার এই বইয়ের সবচেয়ে বড়ো আকর্ষণ। দেশভাগের পটভূমির পাশাপাশি বঙ্কিমচন্দ্র, বিদ্যাসাগর ও রামমোহনের মতো নামজাদা মানুষকে নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার পিতা আবুল হাশিম, সোহরাওয়ার্দী ও শরৎ বসু প্রমুখের 'অখণ্ড বঙ্গ প্রস্তাব' কেন ও কাদের কারণে ব্যর্থ হলো তা নিয়ে বিস্তারিত বলেছেন বদরুদ্দীন উমর। যা পড়তে অত্যন্ত ভালো লেগেছে। অনেক কিছুই জানতে পেরেছি।
যা বিশ্বাস করেন তা অজনপ্রিয় হলেও বলতে পারার সাহস খুব কম বাঙালির থাকে। কারণ বাঙালি নেতা ও লেখকদের জনপ্রিয় হওয়ার বাসনা অত্যন্ত বেশি। এই সর্বগ্রাসী রোগে বদরুদ্দীন উমর আক্রান্ত নন। তিনি যা সত্য বলে মনে করেন, তা জোরালোভাবে বলেন। বলতে ভালোবাসেন কঠিন কথা সহজভাবে।
রাজনীতি নিয়ে অনাগ্রহী পাঠকের এই বই পড়তে শুরু করা অনুচিত হবে। তাতে তার রিডার্স ব্লকের মতো অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বদরুদ্দীন উমরের 'সাক্ষাৎকার' চানাচুরের মতো পলিটিক্যাল নন-ফিকশন নয় ; গভীর পর্যবেক্ষণশীল ও ধৈর্যশীল না হলে এই বইয়ে আগ্রহ পাবেন না।