কিছু মানুষ জীবনকে আশ্চর্য নির্লিপ্তভাবে নিতে জানে—ভেঙে পড়ে, কিন্তু মচকায় না। সুনির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য ঠিক করে এরা জীবনের পথে পা বাড়ায়নি। জীবনে এটা হতে হবে, ওটা করতে হবে তেমন কোনো অ্যামবিশন তাদের নেই। নিঃসঙ্গ হতে চায়নি কখনো—তবু তারা একা। সে কারণেই মুহূর্তটাকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে হয় তাদের। এরা বার বার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। যা নেই তার চেয়ে যা আছে সেই বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেয়। একদম কম্পাস দিয়ে মেপে একটা বৃত্ত এঁকে তার মধ্যে থাকতে চায়। শক্ত করে কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে চায় যেন সেই বৃত্তের বাইরে তাদের কেউ টেনে নিয়ে যেতে না পারে। প্রায়শই ব্যর্থ হয় তারা। তখন ভেঙে পড়ে আবার। তারা নিঃসঙ্গ কিছু মানুষ। আর নিঃসঙ্গতা ব্যাপারটাই বড় অদ্ভুত! যত দূরে সরতে চাইবেন, ততই সে আপনাকে পেয়ে বসবে। পার্টি করবেন, হুল্লোড়ে মাতবেন। নিস্তার নেই। মানুষ শেষ পর্যন্ত একা। এমন এক গন্তব্যের দিকে সে ছুটে চলে যেখানে সে পৌঁছতে চায়নি কখনো। ব্লাইন্ড স্পট সেইসব নিঃসঙ্গ মানুষের গল্প। ১১ জন আলাদা আলাদা মানুষের গল্প।
৩.৫/৫ আলভী আহমেদের লেখার সাথে আমার পরিচয় হয় একটা ছোটগল্পের মাধ্যমে। গল্পটার নাম ছিল 'ফুলদানি, আপেল ও কিন্ডেল'। মনে আছে, প্রায় এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলেছিলাম গল্পটা। এরপর তার মৌলিক লেখা আরও পড়া হয়েছে। কিছু মুগ্ধ করেছে, কিছু হতাশ। তবে তার লেখায় যে সহজিয়া ভাব আছে, তা অটুট থাকতে দেখেছি প্রতিটা লেখাতেই। 'ব্লাইন্ড স্পট' ১১টা গল্পের সংকলন। এর মধ্যে কয়েকটা আগেই পড়া ছিল। বাকিগুলো পড়লাম প্রথমবারের মতো। একজন মানুষের মনের ভেতর যে কানাগলি আছে, ঠিক সেখানটাতেই আলোকপাত করা হয়েছে এই ১১টা গল্পের প্রতিটাতেই। সেদিক থেকে সবগুলো গল্পের মূলভাবই কোনো না কোনো দিক দিয়ে একই সুরে বেজে ওঠে। ইতোপূর্বে উল্লেখ করা 'ফুলদানি, আপেল ও কিন্ডেল' গল্পটি যাদের পড়া আছে, তারা 'যেভাবে গল্প হয়' শিরোনামের গল্পটি পড়ে বিশেষ আনন্দ পাবেন। এছাড়া 'কিংস গ্যামবিট', 'অদৃশ্য মানব' গল্প দুটোর কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়। নামগল্পটিও বেশ।
মনে হল লেখক হারুকি মুরাকামি স্টাইলে লিখতে চেয়েছেন। তবে ঠিকমতো জমেনি। অনেকগুলো গল্পে মশলা ছিলো, আরো ভালো করার সুযোগ ছিল কিন্তু কেন যেন সেটা হয়ে উঠেনি। বইয়ের ছাপানো লেখা পড়তেও চোখে আরাম ছিলোনা। পাতাগুলো কেমন খসখসে।
আলভী আহমেদের গল্প আমি প্রথম পড়ি প্রথম আলোর সাপ্তাহিক সাহিত্যপাতা অন্য আলোয়। ‘ফুলদানি, আপেল ও কিন্ডেল’ নামের গল্পটি চমকে দিয়েছিল। পরে পত্রিকা, ম্যাগাজিন ও ওয়েবজিনে পড়েছি আরও কিছু গল্প। ভালো লেগেছিল সেগুলো। তবে এবার ভালো লাগল না। কারণটা ধরতে পেরেছি। কিছু কমন ফর্মুলা আছে আলভী আহমেদের গল্পে। যে কারণে একটানা পড়ে গেলে বিরক্তি এসে যায়। একঘেয়ে লাগে খুব। একটি গল্প থেকে অন্যটি আলাদা মনে হয় না। গল্পগুলোর চরিত্রও লাগে সবাই একই রকম। এরমধ্যে আবার তুলনামূলক যে চারটা গল্প ভালো সেগুলোর তিনটা আগে পড়া ছিল। তাই আলভী আহমেদের প্রথম গল্পগ্রন্থ থেকে ভালোলাগার মতো তেমন কিছু পাওয়া গেল না।
প্রত্যেক লেখক ই নিজস্ব একটা বৈশিষ্ট্যে তাঁর লেখাটা লিখে থাকেন। সেই নিজস্বতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রতিটি লেখাতেই। লেখক আলভী আহমেদ এর লেখাতেও তেমন একটা নিজস্বতা স্পষ্ট। গল্পের শুরুটা নিতান্ত সাদামাটা, যেমনটা হয় সাধারণত। তবে শেষে গিয়ে প্রচন্ড একটা ধাক্কা খেতে হয়। প্রতিটা গল্পেই এই সময়, কাল, চেনাজানা শহর, প্রিয় জায়গা, চেনা কিছু মানুষ ও মানুষের মনস্তত্ত্বকে নিয়েই গল্প। এই সময়ের সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতি, মানসিক দ্বন্দ্ব স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে প্রতিটি গল্পে।
লেখক আলভী আহমেদে এর দুটো গল্পগ্রন্থ পড়েছি আগে। ‘ব্লাইন্ড স্পট’ লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ। এটাতে মোট এগারোটা গল্প আছে। সাদাসিধা মসৃণ কিছু গল্প নিয়ে এই সুন্দর গল্পগ্রন্থটি।
দারুন গল্পগুলো।জীবনের কোন না কোন ক্ষেত্রে আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ থাকলেও আমরা সবাই একাকীত্বে ভুগী।তেমনি গল্পগুলোর মূল চরিত্রগুলো একা।কিছু না পাওয়ার হতাশা, কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আবার হারানো কিছুকে ফিরে পেয়েও আবার হারানোর ইচ্ছা।দুঃখবিলাসী জীবনের গল্প।
মুচমুচে মেট্রো গল্প সব। মেট্রোতে বসে পড়া শুরু করেছি এবং সেদিনই শেষ করে ফেলেছি। রিডার্স ব্লক কাটানোর জন্যে একটা আদর্শ বই। গল্প বলার সহজাত ভঙ্গীটা প্রশংসনীয়। টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা আছে তার। সাথে ড্রাই হিউমার, বিদ্রুপ এবং মাঝেমধ্যে কিছু মেটাফর সহযোগে জীবন দর্শন। ভালো লেগেছে পড়ে যেতে। কিন্তু গল্প শেষে খুব অসাধারণ কিছু লাগে নি, তবে আবার পড়ব তার বই।
ব্লাইন্ড স্পট' নামটা শুনলেই যেন একটা অন্ধ, ফাঁপা জায়গার, সময়ের কথা সামনে আসে। আবার লেখকের মনে হয়তো শূন্যস্থান মানে অন্য মানেও হতে পারে। গল্পগুলো ঝরঝরে, ভাষায় পরিমিতি বোধ আছে। ব্যক্তি অভিজ্ঞতা গল্প হয়ে উঠেছে লেখকের বর্ণনায়। যে কথাটা খুঁজছিলাম, জীবন আছে এ গল্প সংকলনের।