মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় মঠ-অধ্যক্ষ ধর্মপালের। পাইন-ওক গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে তারাভরা আকাশ। কেউ কি ঢুকেছে মঠের ভিতর? ভাল করে কিছু বোঝার আগেই আততায়ীর আগুনের শলাকা বিঁধে যায় তাঁর কপালে। ঘটনাচক্রে সেসময়ই লেপচাজগতে বাবা-মা আর দীপকাকুর সঙ্গে বেড়াতে গিয়েছে ঝিনুক। কী হল তারপর?
সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম ২১ জানুয়ারি ১৯৬১, হুগলির উত্তরপাড়ায়। পিতৃপুরুষ বিহারে প্রবাসী। মাতৃবংশ বাংলাদেশের দিনাজপুরে। স্কুল-কলেজের পাঠ উত্তরপাড়ায়। ফটোগ্রাফি নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। একটি ফটোপ্রিন্টিং সংস্থার কারিগরি বিভাগের প্রধান। ছাত্রজীবনে লেখালিখির শুরু। দেশ পত্রিকায় প্রথম গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর বৃহত্তর পাঠক মহলে সমাদর লাভ।শ্রেষ্ঠ উপন্যাস রচনার জন্য ১৯৯৯ ও ২০০২ আনন্দ-স্নোসেম শারদ অর্ঘ্য, শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ও শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প রচনার জন্য ২০০৩ সালে আনন্দ-ন্যাশানল ইনসিয়োরেন্স শারদ অর্ঘ্য এবং শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প রচনার জন্য ২০০৬ সালে ডেটল-আনন্দবাজার শারদ অর্ঘ্য পেয়েছেন। এ ছাড়া ১৯৯৭-এ পেয়েছেন গল্পমেলা পুরস্কার, ২০০১-এ সাহিত্যসেতু পুরস্কার, ২০০৫-এ বাংলা আকাদেমি থেকে সুতপা রায়চৌধুরী স্মারক পুরস্কার, ২০০৭-এ শৈলজানন্দ জন্মশতবর্ষ স্মারক পুরস্কার, ২০১৩-এ তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য সম্মান, ২০১৪ সালে গজেন্দ্রকুমার মিত্র ও সুমথনাথ ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার।
বিগত কয় বছর ধরে ক্রমাগত পুজোয় 'দীপকাকু চাই!' 'দীপকাকু চাই!' বলে বাড়ি-পাড়া-বন্ধুমহল সব মাথায় করেছিলাম। ১৪২৮-এ এসে মেওয়া ফললো। অদ্ভুত সিরিজ এই একটা। মাঝে হঠাৎ করে বন্ধই বা কেন হয়ে ছিল আবার আজকের এই আজব পুনরাগমন। কলকাতা থেকে দূরে যারা আমরা বসবাস করি, তাদের কাছে প্রকাশকদের হাঁড়ির খবর জানাটা ভারী মুশকিল। দুয়েকটা চিঠি পত্তর লিখব তারও জো নেই, আনন্দমেলার আবার সম্পাদকীয় জিনিসটার প্রতি গভীর অরুচি। যাক গে সেসব। বাজারি মনোপলির পাঁক ঘেঁটে কোনো লাভ নেই। সোজা গপ্পে আসা যাক।
তা, কাহিনী ভীষন ক্লিশেড। বাঙালির গোয়েন্দা গপ্পের ভ্রমনের পটূমিকা থাকবে না, সেটা হয় না। এখানেও আছে। দীপকাকু, ঝিনুক এবং বাকিরা স্বপরিবারে এবারে উত্তরবঙ্গে। বেড়াতে এসেছেন দার্জিলিং ঘেঁষা লেপচাজগতে। এসেই তালেগোলে জড়িয়ে পড়লেন সেখানকার মঠ-অধ্যক্ষ-এর মৃত্যু রহস্যে।
উপন্যাস জুড়ে দুটো মোক্ষম গলদ। প্রথমটা আমার নিজের খাতায় বরাদ্দ। এত বছর পরে চরিত্রদের সাথে সাক্ষাৎ হলো বটে, তবে বিগত গল্পের মূল কিছু তথ্য সেই অর্থে মনে করতে পারলাম না। দীপকাকু কি শুধুই শখের গোয়েন্দা? ঝিনুক কি তার নিজের ভাইঝি? হলে সবাই একে অপরকে আপনি বলে সম্বোধন করছে কেন? এই এইখানে বলে রাখি ঝিনুক আমার ওই....যাকে বলে... ছেলেবলার ক্রাশ 👍 জানি না, এই তথ্যে আপনাদের কি লাভ হলো। তবে সেই তাকেই আগের কিছু গল্পে বেশ ম্যাচিউর ভাবে লেখা হয়েছিল। এখানে কেন জানি না সেই এক ঘেয়ে গোয়েন্দার স্কুলপড়ুয়া-মার্কা কিশোর সহকারী হিসেবে সে বিদ্যমান। কে জানে, হয়তো তিল কে তাল করছি আমি।
এবারে আসি, দ্বিতীয় গলদে। এবং এটাই মোক্ষম। সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় প্রবীণ সাহিত্যিক। হয়তো আমার ছোট মুখে বড় কথা হয়ে যায়। তবে, দীপকাকুকে তিনি যুগের সাথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন নি। হয়তো এটা আশা করা যুক্তিসঙ্গত নয়। দিনের শেষে গল্পখানা স্রেফ শিশুদের জন্যে লেখা এক পুজাবার্ষিকীর অংশ। এখানে হালের তান্ত্রিক হরর গুঁজে দেওয়া চলে না। তবে আমি সেসব চাইছিও না। চাইছি শুধু একটু লজিক। এই নতুন জায়গায় ঘুরতে এসে, পারমিশন না নিয়ে ক্রাইম সিন এক্সামিন করা। লোকাল আই-ওর সাথে বচসা। সখের গোয়েন্দার প্রতি অফিসারের শ্লেষ। শিঘ্রই লালবাজার থেকে আসা ফোন, এবং সেই ইন্সপেক্টরের প্রাইভেট ডিটেকটিভ-এর পদলেহন। সবটাই আগে বহুবার পড়েছি না?
সৈকত মুখোপাধ্যায়ের উমাশঙ্কর চৌবের মতন একজন বাস্তববাদী রহস্যসন্ধানীর গল্প পড়ে আসার পর, এবারের দীপকাকু একেবারেই মুখে রচল না। কিন্তু তাই বলে বলছি না, পড়বেন না। অবশ্যই পড়ে দেখুন। পুজোর দিনে, পুরোনো ধাঁচের রহস্য গল্প ভালই লাগবে। আর হ্যা, ঝিনুক যে মার্শাল আর্টসটা এখনো সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছে সেটা জেনে - চিত্ত বেজায় বিগলিত।
দীপকাকু সিরিজের এই উপন্যাসটি হচ্ছে গোয়েন্দা কাহিনির ক্ষেত্রে একটি একাডেমীক টেক্সটবুক। একটি টিপিক্যাল শারদীয়া পত্রিকার গোয়েন্দা কাহিনিতে যে যে এলিমেন্ট থাকে - ১) গোয়েন্দা চরিত্রটি সদলবলে কোথাও ঘুরতে গেছে, ২) সেখানে গোয়েন্দাপ্রবর কোন কেসে জড়িয়ে পড়ছে কাকতালীয়ভাবে, ৩) রহস্যের মাঝে-মাঝে কিছু ট্রাভেলগ, ৪) লোকাল নানা চরিত্রের আনাগোনা, ৫) প্রাইভেট ডিটেকটিভ সব ক্লু পাচ্ছে কিন্তু পুলিশ অন্ধ, ৬) শেষে একটা মারকাটারি এন্ডিং এবং গোয়েন্দা থরোলি বোঝাচ্ছে বাকিদের যে কীভাবে সব হল। এসবই এই কাহিনিতে রয়েছে। এটা ভালো যেমন, তেমন এটাই মন্দ। খুব একটা আউট অফ দ্য বক্স প্লট কিছু ছিল না, সবটাই গোয়েন্দা গল্পের চেনা ছকে ফেলে পয়েন্ট টু পয়েন্ট লেখা। এই সিরিজের বেশি লেখা পড়িনি আগে। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারলাম না, দীপকাকুকে ঝিনুক আপনি-আজ্ঞে করে কেন? আমার কাকাকে তো আমি আজন্ম তুমিই বলে এলুম। এরই সাথে এখন এই সিদ্ধান্তে আসা গেল যে রহস্যকাহিনি পড়ার ক্ষেত্রে স্যাচুরেশন এসে যাচ্ছে। মাসখানেক এবার অন্য টপিকের বই পড়তে হবে।