বিপুল কর্মজগতে বিচিত্র মানুষের সঙ্গে মিশেছেন আনিসুজ্জামান। ব্যক্তি হিসেবে তাঁর ছিল নানা সম্পর্কে জড়ানো এক প্রসারিত জগৎ। তাঁদের নিয়ে তিনি লিখেছেনও বিস্তর। কোনো মানুষের মূল্য বিচার করতে গিয়ে নিজের আদর্শ ও বিশ্বাস তাঁর জন্য কখনো অন্তরায় হয়নি। কারণ, তিনি মনে করতেন, যেকোনো ধারা থেকে উত্তম যা কিছু বাংলার সমাজে এসে মিশেছে, বাঙালি হিসেবে সবটুকুর ওপরই তাঁর অধিকার আছে। তাই তিনি সমান মমতায় লিখেছেন জসীমউদ্দীন, মওলানা আকরম খাঁ, কমরেড মণি সিংহ বা মনিরউদ্দীন ইউসুফের মতো বিচিত্র মত ও পথের মানুষ সম্পর্কে। বিচিত্র সেসব মানুষের মধ্য দিয়ে এ বইয়ে ধরা পড়েছে বাঙালি সমাজের বিবর্তনের এক সজীব ছবি।
Anisuzzaman was a Bangladeshi academic of Bengali literature. He was an activist who took part in the Language Movement (1952), participated in Mass Uprising (1969), and took part in the Bangladesh Liberation War (1971).
He was a member of the Planning Commission to the Government of Bangladesh during the Bangladesh liberation war and a member of the National Education Commission set up by the government after liberation. He was inducted as a National Professor by the Government of Bangladesh in 2018.
লেখক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান কে জানতাম অনেক আগে থেকে। প্রথম আলোতে তিনি শব্দ নিয়ে ছোট্ট একটা লেখা লিখতেন,মানে একটা শব্দ নির্ধারন করতেন, তারপর সেটার বিভিন্ন ব্যবহার বিধি ,বিভিন্ন কিছু নিয়ে আলোচনা করতেন। পত্রিকা তে স্যারের এই লেখা টা দেখলেই,আমি খুঁটিয়ে পড়তাম। তবে বেশিদিন লিখতে পারেন নি এটা,যেটুকু লিখেছেন তা নিয়ে একটা বই বের হয়েছে, নাম সম্ভবত " আমার অভিধান "। এছাড়া কিছু দিন আগে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের একটা বই পড়েছি,সেখানেও জেনেছিলাম আনিসুজ্জামান কে নিয়ে। তবে উনার কোন বই পড়া হয়ে উঠেনি এতদিনেও,সেই কষ্টের ছেদ ঘটালাম " স্মৃতির মানুষ " পড়ে।
লেখক উনার পরিচিত বিজ্ঞ জনদের নিয়ে আলোচনা করেছিলেন পত্র পত্রিকায়, সেগুলো একত্র করা হয়েছে "স্মৃতির মানুষ " বইতে । সেখানে দেশের বিভিন্ন স্তরের মেধাবী লোকের কথা আছে। সে সকল লোক সম্পর্কে ছোট্ট পরিসরে খুব চমৎকার আলোচনা করেছেন লেখক। ফলে লেখা গুলো পড়তে পড়তে উল্লেখ্য বিজ্ঞ জনদের প্রতি শ্রদ্ধা বোধ জাগ্রত হয়। তার চাইতে আনন্দের বিষয় হচ্ছে, এই বই পড়লে আরো শ'খানেক নতুন বইয়ের নাম পাওয়া যাবে। তবে দুঃখের বিষয় ও আছে,তা হলো বইটা বড্ড ছোট।
জীবনের শেষ ৫ বছরে(বেশীও হতে পারে) নিজের ওপর এক ধরনের নির্যাতনই করেছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। এটা অনেকটা বাধ্য হয়েই জানি। শিক্ষকতা থেকে অবসরের পর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এক সম্মাননীয় ব্যক্তি হিসেবে বিভিন্ন পদ-পদবী ধারণ করেছেন। এজন্য দিনের পর দিন তাঁকে অসংখ্য সভা সমিতিতে অতিথির আসন গ্রহণ করতে হয়েছে। তিনি প্রচন্ড সময়নিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু বাঙলার সন্তানরা তো আর তা না। ঘন্টার পর ঘন্টা সভা-সেমিনারে বসে থাকতে হত এই শিক্ষাবিদকে। নিজে কখনোই বক্তৃতা দীর্ঘ করতেন না। না করলে কি হবে? ঢাকার যানজট নিয়ে নিত বাকি সময়! তাহলে নিজের সৃষ্টিশীল কাজের কি হবে? তার উপর ফরমায়েসী লেখালেখি তো আছেই। করোনার সময়েও নিস্তার পায়নি মানুষটা। সেসময়েও কথিত স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করে অংশ নিতে হয়েছে সভা-সেমিনারে। শেষমেশ করোনা আক্রান্ত হয়ে একেবারে অন্যলোকে!
স্মৃতির মানুষের বেশিরভাগ লেখাই নব্বই থেকে শুন্যের দশকে ভোরের কাগজ ও প্রথম আলোর জন্য লেখা নিবন্ধ। সবগুলোই বিশিষ্টজনদের নিয়ে। স্মৃতিকথা পড়ে ভীষণ আনন্দ পাই বলে পড়া শুরু করা। তবে এখানেও স্থান পেয়েছে ফরমায়েসি কিছু লেখা। স্মৃতিকথা বলতে যা বোঝায় অনেক লেখাতেই তা আসেনি। তবে উপভোগ করেছি তাঁর ছাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, শামসুর রাহমান, কামাল হোসেন, সরদার ফজলুল করীমদের নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা! নিজের শিক্ষককে নিয়ে অনেক ছাত্রই কত স্মৃতিকথা লিখেছেন, কিন্তু ছাত্রকে নিয়ে কয়জন লেখেন! ইলিয়াসের মৃত্যুর পর তাঁর শিক্ষক আনিসুজ্জামান লিখলেন__
"আমাদের বিভাগের ছাত্রছাত্রীদের এক সময়ে খুব ঘটা করে বরণ ও বিদায় দেওয়া হত। ইলিয়াসদের বরণ করেছিলাম, কিন্তু বিদায় দিইনি। ওদের বিদায়ের অনুষ্ঠানের সময়ে আমি দেশের বাইরে। ৪ তারিখে ইলিয়াস চলে গেল বটে, কিন্তু আমি তাকে বিদায় দিইনি। দেব না।"
আবার মুনীর চৌধুরীকে পেয়েছেন শিক্ষক হিসেবে। তারপর সহকর্মী। ছাত্রজীবন থেকেই মুনীর চৌধুরীর সাথে ছিল তাঁর বন্ধুর মত সম্পর্ক! সৃষ্টিশীল উদার মানুষ মুনীর চৌধুরীকে নিয়ে তিনি লিখেছেন__
"আমরা দুজনই যখন শিক্ষক, তখন সাইকেলের সামনে আমাকে বসিয়ে নিয়ে গেছেন। গবেষণার জন্য মাইক্রোফিল্ম রিডার বসাতে অসুবিধে হচ্ছিল, তিনি জায়গা করে দিলেন আজিমপুরের তাঁর দুই কামড়ার ফ্ল্যাটের শয়নকক্ষে। যখন নীলক্ষেতের বাসায় উঠে আসি, তখন রোজ সকালে মেজ ছেলেটিকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে চলে আসতেন আমার বাসায়। খাওয়ার টেবিলে বসে আমাদের জন্য রুটিতে মাখন লাগিয়ে দিয়েছেন, নিজে খেয়েছেন শুধু এক কাপ চা।"
মুনীর চৌধুরীর বই পড়ার আগ্রহ নিয়ে লিখেছেন__
"নতুন কোনো বই পড়লে জানিয়েছেন তার মর্মকথা কিংবা গুনাগুন; আমি নতুন কি পড়লাম তা জানতে চেয়েছেন সাগ্রহে। নিজে নতুন বই কিনলে সঙ্গে সঙ্গে দেখিয়েছেন আমাকে, আমার কেনা নতুন বই দেখে আগ্রহী হলে নিয়ে গেছেন তা আমার পড়ার আগে।”
আনিসুজ্জামান ভীষন বিনয়ী মানুষ ছিলেন। রাষ্ট্র তাঁকে ক্ষমতার কেন্দ্রে রাখলেও ক্ষমতার মোহ তাঁর ছিল না। শিল্প সংস্কৃতির আসরে ভীষণ সুবক্তাও ছিলেন তিনি। রসিকও। ডক্টর কামাল হোসেনকে নিয়ে লিখেছেন__
"ডক্টর কামাল হোসেন বয়সে আমার দু মাস ছোট- তাতে আমি খুবই আনন্দিত। কেননা আর কোনো দিক দিয়ে আমি তাঁর চেয়ে বড় হতে পারিনি- এই একটি ক্ষেত্রে তো হয়েছি।”
ভীষণ উপভোগ করেছি সরদার ফজলুল করিমকে নিয়ে লেখা স্মৃতিকথা। ২১ বছর বয়সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন সরদার করিম। কমিউনিস্ট পার্টির এক সক্রিয় সদস্য হিসেবে সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন তখন তাঁর। বিপ্লবের জন্য ছেড়ে দেন শিক্ষকতা। কারাভোগ, আন্দোলন, জ্ঞানচর্চা সব কথাই উঠে এসেছে এই নিবন্ধে। পরে অবশ্য অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সহযোগিতায় আবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন তিনি। তারপর একটানা চলে অনুবাদ আর লেখালেখি। ৯০ বছর বয়সেও লেখালেখি আর জ্ঞানার্জনে ছিলেন সক্রিয়। ২০১৪ সালে আনিসুজ্জামান লিখেছেন__
"টেপরেকর্ডার নামের যন্ত্র এখন তাঁর চিরসঙ্গী। সুযোগ পেলেই কাঁধের ঝোলা থেকে সেটা বের করেন। শব্দ ধারণ করেন অন্যের। এসবই ইতিহাসের উপকরণ। আর দিনপঞ্জি লেখেন প্রত্যহ। অনেক তুচ্ছ কথা থাকে তাতে, অনেক উচ্চভাব। সরদার ফজলুল করিমের কাছে 'জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা'।”
ইতিহাস এখন নানাভাবেই লেখানো হয়। কেউ স্বেচ্ছায় লেখে কেউবা অনিচ্ছায়! তাতে সঠিক ইতিহাস কতটুকু থাকে তা নিয়েও থাকে সংশয়! তবে সোনার ধুলোবালি মাখা এমন স্মৃতিকথার মাঝে ইতিহাসও উঁকি দেয় নির্ভয়ে। মনে পড়ে কেবল__
"থমথমে রাত, আমার পাশে বসল অতিথি- বললে, আমি অতীত ক্ষুধা- তোমার অতীত স্মৃতি! -যে দিনগুলো সাঙ্গ হল ঝড়-বাদলের জলে, শুষে গেল মেরুর হিমে, মরুর অনলে, ছায়ার মত মিশেছিলাম আমি তাদের সনে; তারা কোথায়? - বন্দি স্মৃতিই কাঁদছে তোমার মনে।" (স্মৃতি, জীবনানন্দ দাশ)
অধ্যাপক আনিসুজ্জামান একটা লম্বা সময় ধরে বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন। সেই সূত্রে তার চলাফেরাও ছিল এমনই অনেক বিশিষ্ট নাগরিক বা খ্যাতিমান লোকদের সাথে।
'স্মৃতির মানুষ' বইটিতে আনিসুজ্জামান এমনই ২০ জন মানুষকে নিয়ে লিখেছেন। বেশিরভাগ লেখাই মূলত স্মৃতিচারণা। সেই সাথে উঠে এসেছে যাদের সম্পর্কে লেখা হয়েছে খুব কাছ থেকে দেখা তাদের জীবনবোধ ও পারস্পরিক সম্পর্কের দিকটিও। অনেকগুলো লেখাই বিভিন্ন উপলক্ষে, বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।
স্মৃতিকথা হিসেবে চমৎকার একটি বই এটি। ছোটো ছোটো লেখায় বিভিন্ন ব্যক্তি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য উঠে এসেছে এতে। এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের নামও। সবমিলিয়ে দারুণ উপভোগ্য এক বই 'স্মৃতির মানুষ'।
আগে বেশ কিছু লেখকের স্মৃতিকথা পড়লেও এমন চমৎকারটা আর পড়ি নাই, পরেও আর পড়বো কি না জানি না। লেখক স্মৃতি কথাতে সাধারণত নিজের জীবনের পরিচিত ও কাছের মানুষ বা স্মৃতিতে থাকা সব লিখে থাকেন, তবে ব্যতিক্রমি এই বইটাতে লেখক ২০ জন বিখ্যাত জ্ঞানী গুণীদের সঙ্গে কাটানো সময়, ব্যক্তি জীবন ও কর্মজীবন নিয়ে খুব অল্প করে লিখেছেন। যা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, পরে ২০২১ সালে বইমেলাতে বই আকারে প্রকাশিত হয়।
আনিসুজ্জামানের চেনা-পরিচিত বা কাছের প্রায় ২০ জনের মৃত্যুবার্ষিকী, জন্মদিন বা অন্যকোনো বিশেষ দিনে লেখার সংকলন এই বইটা। তিনি ছিলেন উদার মনের মানুষ। মতের অমিল থাকলেও তিনি তা ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন। এজন্যই এই বইয়ে আমরা এতো মানুষ সম্পর্কে খুব কম সময়ে তাঁর কাছ থেকে ভালো ধারণা পেয়েছি। কোনো কোনো ব্যক্তির বিভিন্ন বই নিয়ে আলোচনা আর ব্যাখ্যা বইটাকে আরও গুরুপূর্ণ করে তুলেছে। সবমিলিয়ে চমৎকার একটা বই।
"হুমায়ুন আহমেদ এক বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক কে নিজের একটি লেখা দেখিয়ে বললেন মতামত দিতে৷ অধ্যাপক বললেন লেখনী সুন্দর কিন্তু গভীরতা নেই। হুমায়ুন লেখাটি পকেটে পুরতে পুরতে বলেন, এটা আসলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর লেখা, আমি শুধু নাম চেঞ্জ করে দিয়েছি। ওনার লেখায় যেহেতু ডেপথ নেই, আমারটাতেও না থাকলে চলবে।"
এমন ট্রিভিয়ার পাশপাশি লেখকের মননশীলতার পরিচয় পাওয়া যায় অন্যের মূল্যায়নে। অন্য সবার মৃত্যুর উপলক্ষে ওনাকে লেখতে হচ্ছে, এই ধারণার শোকাবহতার ছাপ রয়ে গেছে প্রতি লেখাতেই৷ আমরাও পড়ছি আনিসুজ্জামান মারা যাওয়ার পরেই। ওনার বিশাল কাজের নানা অনুষংগ জানা হলো।
শামসুর রাহমান, মুনীর চৌধুরী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এর মতো প্রসিদ্ধ ব্যাক্তির পাশাপাশি কামালউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ, জাহাংগীর তারেক এর মতো অচেনা অজানা ব্যাক্তি দের সাথে সাক্ষাৎ হলো৷
এ বইটিতে বেশ কাঠখোট্টা, ফ্যাক্ট নির্ভর এবং টু দ্য পয়েন্টে তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। মহৎ ব্যক্তিদের জীবনের অনেক নাটকীয় ব্যাপারগুলোও নিরস ভাবে উপস্থাপনের গুণ বা দোষ কিংবা দক্ষতা তার করায়ত্ত। হয়তো পত্রিকার কলাম হওয়ার দরুন লেখাগুলোর বৈশিষ্ট্য এমন।