সুমি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি এমন কিছু যে হয়ে যাবে, ভাবতে পারেনি আসাদও। সুমন ফেঁসে গেছে, বাজে ভাবে ফেঁসে গেছে সে। পরপর দুটো মৃত্যু। সন্দেহভাজন আছে, কিন্তু সাক্ষী নেই। শাকিল তদন্তে নেমে বের করে আনে এক কঠিন সত্য, যে সত্যকে বিজ্ঞান বিশ্বাস করে না। পার্থিব আর অপার্থিব শক্তির খেলা জমে উঠেছে।
মাথার ভেতর মুখ- কথা বলা রোগ। নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে- আহা রে! আহা রে!
সাধারণত লেখকের একটা গল্প থাকে, যেটাকে আমরা বলি প্লট। সেই গল্পটাকে যে লেখক যত সুন্দর ভাবে বলতে পারেন সে লেখককে আমরা তত বেশী সফল বলি। অন্যভাবে বললে বলা যায় সে লেখকের লিখনশৈলী তত ভালো।
এই বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে লেখকের আসলে কোন গল্প ছিলো না। এমনি ঝোঁকের মাথায় গল্পটা লিখে ফেলেছেন। যে কারণে গল্পটাকে আমার অন্তঃসারশূন্য মনে হয়েছে। ওদিকে লেখার মাঝে প্রচুর গালাগালি ব্যবহার করা হয়েছে। বইয়ের কোন কোন চরিত্র গালাগালি করলে তা ঐ চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বলে ধরে নেয়া যায়। কোন বেশিরভাগ চরিত্রই যদি গালাগালাজ করে তাহলে জিনিসটা অন্যরকম হয়ে যায়। এ বইয়ের আরেকটা মূল সমস্যা হচ্ছে প্রচুর চরিত্র। অবশ্য গল্পের ধাঁচ অনুযায়ী স্বাভাবিকের চেয়ে বেশী চরিত্র এ গল্পে আসাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে একটাও কোর চরিত্র থাকবে না এবং একটা চরিত্রেরও চরিত্রায়ন ডিটেইল্ড হবে না এটা আশা করিনি। সবমিলিয়ে বইটা পড়ার এক্সপেরিয়েন্স খুব একটা আশানূরুপ না।
একের পর এক খুন হয়, খুন তবে দেখলেই মনে হয় তা আত্মহত্যা। কোনো কারণ ছাড়া হুট করে কেউ কেনো আত্মহত্যা করবে? একটা খুনের সাথে আরেকটা খুনের মিল পাওয়া যায়! তবে, যা দিয়ে আত্মহত্যা করা হয় তাতে অন্য এক ব্যক্তির আঙুলের চাপ পাওয়া যায়। অবাক করা বিষয়, যার আঙুলের চাপ পাওয়া গিয়েছে সে ব্যক্তি সাত বছর আগে মারা গিয়েছে! তাহলে কিভাবে এলো আঙুলের চাপ? আর এই হত্যাগুলো কি আত্মহত্যা? নাকি, খুন?
বইয়ের প্রচ্ছদ সুন্দর, নাম সুন্দর, আরো বেশী সুন্দর উৎসর্গটা! তবে বইয়ে অনেক অশ্লীল কথা লেখা আছে, যা না লেখলেও হতো। খুব জরুরী ছিলো এমন তো না!গালাগালিও অনেক, যা অনর্থক। আর কিছু কথা বেখাপ্পা লেগেছিলো, যেমন- কুদ্দুস আমিনকে বলছিলো, আপনি এ টাইমে? কোনো চায়ের দোকানদার কোনো রিক্সাওয়ালাকে এভাবে প্রশ্ন করে না। তাছাড়া আরও এমন অনেক লাইন ছিলো! যাই হোক, বইয়ের কাহিনী সুন্দর।বকুলফুল, নয়নতারা আরও ভালো ছিলো! এই বইয়ের নামটাই আমাকে বেশী আকর্ষণ করেছিলো, লেখকের সব বইয়ের নামই সুন্দর!
ছোটবেলায় বিটিভিতে "মনোবিক্ষণ যন্ত্র" নামক একটা নাটক দেখিয়েছিল। নাটকটার বিষয়বস্তু ছিল বেশিরভাগ মানুষ মুখে এক কথা বলে বা এক ধরনের আচরণ করে আর ভেতরে ধারণ করে অন্যকিছু। আমরা মনে মনে অনেক কিছুই বলি (ভালো বা মন্দ) কিন্তু বাইরের মানুষের কাছে সেটা প্রকাশ করিনা। পরিস্থিতি ভেদে দেখা যায় অনেকসময় নিজের ভেতরের সব রাগ বা আবেগ এক নিমিষে ঝেড়ে ফেলি। মনের আবেগ সেটা নরম বা হিংস্র যাই হোক তা প্রকাশ ধনী-গরীব নির্বিশেষে একই রকম। স্টিফেন কিং বলেছিলেন "Monsters are real, and ghosts are real too. They live inside us, and sometimes they win." একই শহরে পর পর কয়েকটা মৃত্যু। খোলাচোখে আত্মহত্যা, কিন্তু প্রযুক্তি বলে অন্য কথা। পোস্টমোর্টেম রিপোর্ট দেখে তদন্ত অফিসারের চোখ ছানাবড়া। প্রথমদিকে প্রতিটা মৃত্যু আলাদা মনে হলেও তদন্ত করতে করতে দেখা যায় ঘটনাগুলো যেন একই বিনিসুতোয় গাঁথা। খুন, আত্মহত্যা না-কি অন্যকিছু সে খোঁজ করতে গিয়ে এমন এক সত্যের সম্মুখীন হয় তদন্তকারী অফিসার যা শুনলে আপনিও চমকে যাবেন। একই মানুষের কত রূপ থাকতে পারে, ক্ষণে ক্ষণে সে রূপ কিভাবে বদলে যেতে পারে তার সাথে দারুণ একটি রহস্য কিভাবে কতগুলো মানুষের জীবন একেবারে বদলে দিল তার নিখুঁত বর্ণনা রয়েছে বইতে। স্থান, কাল, পাত্র ভেদে একই রহস্য কিভাবে সবাইকে এক ছাদের নিচে এনেছে তা না পড়ে অনুভব করা যাবেনা। লোভ, প্রেম, মৃত্যু, বিশ্বাসঘাতকতা, অপমান, প্রতিশোধ সাথে অ-ব্যাখ্যার কিছু ঘটনা একসাথে বাসা বেধেছে। নিখাদ ভালোবাসা আর সম্পর্কের টানা পোড়নের এই পার্থিব-অপার্থিবের খেলায় শেষ হাসি কে হাসবে? মানুষ? না-কি সেই নয়নের আড়ালের কেউ? অতিপ্রাকৃত, ভৌতিক বা যা চোখে দেখা যায়না এমন কিছু ঘটনা প্রকৃতি যেন চায়না মানুষের কাছে প্রকাশ করতে। ব্যাখ্যাতীত বিষয়গুলো সে তার বুকের ভেতর সযন্তে লালন করে। একদিন প্রকৃতির নিয়মে এমনিতেই সব বুঝে যাবে, জেনে যাবে। আমরা অপেক্ষায় রই সেদিনের। তুলে ধরছি মনে দাগ কাটা বইয়ের কিছু উক্তি: ১. চিন্তা খুব খারাপ জিনিস। হাসিতে মুছে যায়না, মুখের রেখায় সবই ফুটে ওঠে। ২. টাকা ধরতে গেলে সুখ ধরা যায়না। ৩. মানুষের কত রূপ। কিছু মুখে প্রকাশ পায়, কিছু অন্তরে। ৪. অপমান খুব খারাপ জিনিস, যা মানুষের অন্তরে চোরকাঁটার মতো মৃত্যু পর্যন্ত বিঁধে থাকে। বইয়ের প্রারম্ভেই পাঁচ লাইনের লেখাটি আমার মস্তিষ্কে গেঁথে গেছে ভালোভাবে। বইটা যতক্ষণ পড়েছি ততক্ষণ লাইনগুলো গানের মতো সুর তুলে গেছে। মাথার ভেতর মুখ কথা বলা এক রোগ নয়ন তাহারে পায়না দেখিতে আহা রে! আহা রে! কাহা রে! কাহা রে! বি:দ্র: উপন্যাসের কোনো চরিত্রের নামই রিভিউতে লিখিনি। আপনারা যখন পড়বেন তখন নিজেই জেনে যাবেন। একদম শূন্য থেকে পড়া শুরু করলে অতিপ্রাকৃত থ্রিলার পড়ার আবেগটাই ভিন্ন হবে। বইটা হাতে নিয়ে পড়া শুরু করলে কখন আপনি ১৪৮ পৃষ্ঠায় এসে পড়বেন বুঝতেই পারবেন না!
নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে রয়েছ নয়নে নয়নে, হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে হৃদয়ে রয়েছ গোপনে।
চরনগুলো কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রার্থনা কবিতার অংশবিশেষ। অনেক ছোটকালে তিনি লিখেছিলেন এই কবিতা। পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এর সামনে কবিগুরু নিজ জবানিতে পাঠ করে শোনান এই কবিতা। কালজয়ী এই কবিতার পাঠ সন্তানের কণ্ঠে শুনে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে রাখেন কবিগুরুর পিতা। পরক্ষণেই চোখ খুলে স্মিত হেসে পুত্রের হাতে পাঁচশত টাকার একটি চেক ধরিয়ে দিয়ে তিনি বললেন,
“দেশের রাজা যদি দেশের ভাষা জানিত ও সাহিত্যের আদর বুঝিত, তবে কবিকে তো তাহারা পুরস্কার দিত। রাজার দিক হইতে যখন তাহার কোনো সম্ভাবনা নাই তখন আমাকেই সে-কাজ করিতে হইবে।”
বাংলা সাহিত্যে অতিপ্রাকৃত জনরার বরপুত্র এ সময়ের জনপ্রিয় লেখক মনোয়ারুল ইসলামের 'নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে' বইটি শেষ করে সত্যিই আজ কবিগুরুর প্রতি পিতার এই রোমাঞ্চকর স্মৃতিটা আমার মনের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে ঘটেছে এর উল্টোটা। আমার খুব করে ইচ্ছে করছে লেখককে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলি, 'মশাই বই লিখেন সমস্যা নেই। পাঠকের ঘুম কেড়ে নেয়ার অধিকার তো আপনাকে কেউ দেয়নি। এহেন অপরাধে (?) আপনার নামে আদালতে মামলা ঠুকে দেয়া উচিত'।
প্যাঁচাল বাদ দিয়ে এবার আসি মূল কথায়। এখানেও সমস্যা। আলোচনা শুরু করতে গিয়েও চরম বিপত্তিতে পড়ে গেলাম। কিভাবে শুরু করব, কোত্থেকে শুরু করা যায়, মাথার ভেতর ক্রমাগত কিলঘুষি মারছে এরকম নানান প্রশ্ন। একে তো বইয়ের ঘোর এখনও কাটিয়ে উঠতে পারিনি, অপরদিকে স্পয়লারের চরম আশঙ্কার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রিভিউ লিখতে বসেছি। কেন জানি বার বারই মনে হচ্ছে, গল্পের প্লটটা আলোচনায় আনতে গেলেই বু��ি স্পয়লার হয়ে যাচ্ছে। মশাই, বড়ই বেকায়দায় ফেলে দিলেন আমাকে। আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি, স্মিতা চৌধুরানি চরমভাবে গ্রাস করে ফেলেছে আপনাকে।
তথাপি অতি সতর্কতার সাথে কিছু আলোচনা নিয়ে আসার চেষ্টা করেছি। আসাদের সাথে পালিয়ে যাবার প্রত্যয়ে ঘর থেকে সোনা-গয়না নিয়ে বেরিয়ে আসে সুমি। সন্ধ্যা লগনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিদ্যা ভবনের সামনে এসে সুমি মুখোমুখি হয় এক ভৌতিক পরিবেশের। দমকা উড়ে আসা কালো মেঘের আচ্ছাদনে রোদ্রোজ্জ্বল সূর্য হঠাৎ করে আড়াল হয়ে যাওয়ার মতোই এক অবর্ণনীয় মানসিক পরিবর্তন দেখা দেয় সুমির মাঝে। আবছায়া অন্ধকারে মুখোমুখি সুমি আর আসাদ। সাইড ব্যাগ থেকে একটা সুইস নাইফ হাতে নেয় সুমি। নিচের দিকে থাকা বাটনে চাপ দিতেই চিক করে বেরিয়ে আসে ধারালো ফলা। এই ভর সন্ধ্যায় মাথাটা হঠাৎ ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল সুমির। ক্যাঁচ করে একটা জোরালো শব্দ হলো।
বেশ স্বাচ্ছন্দেই কেটে যাচ্ছিল সুমন-মারিয়ার দাম্পত্য জীবন। এক অজানা কারণে ব্যাংকার সুমনের সংসারে উদিত হয় এক ভয়াবহ দুর্যোগের ঘনঘটা। ওয়াশরুমের আয়নায় ধুম করে লাথি মারে সে। হঠাৎ করেই মেরুদণ্ডে চোরা হিমশীতল স্রোতে বয়ে যায় সুমনের। ভাঙা কাচের সুচালো ফালিটা হাতে নেয় সে। খচর খচর শব্দে এক নিমিষেই অন্ধকার নেমে আসে সুমন-মারিয়ার সুখের সংসারে।
এভাবেই একের পর এক খুন হয়ে যাচ্ছে কিছু মানুষ। খুনের তদন্তে নেমে এক ইস্পাত কঠিন সময়ের মুখোমুখি হন সাব-ইনস্পেকটর মুরাদ। নিজেই জড়িয়ে পড়েন কঠিন সময়ের জালে।
আপাত দৃষ্টিতে সবগুলো ঘটনাই আত্মহত্যা মনে হলেও এতে বাধ সাধে আধুনিক প্রযুক্তি। ফিঙ্গারপ্রিন্ট রিপোর্ট হাতে পেয়ে চোখ দুখান বেরিয়ে আসার উপক্রম হয় ইনভেস্টিগেশন টিমের। চরম বিপত্তিতে পড়ে যায় পুরো ডিপার্টমেন্ট। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। এর ডালপালার বিস্তৃতি পেতে থাকে রাজধানী পেরিয়ে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর থেকে শুরু করে আখাউড়ার রূপনগর গ্রাম পর্যন্ত। যার বিভিন্ন দৃশ্যপটে দেখা মেলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মুখোশধারী বিভিন্ন মানুষের।
লেখক অত্যন্ত সিদ্ধহস্তে প্রত্যেকটি চরিত্রকে দিয়েছেন আলাদা স্বকীয়তা। একজন থ্রিলারপ্রেমী হিসেবে আমি শতভাগ রহস্যের স্বাদ অনুভব করেছি। বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, এর গতি রোলারকেস্টার থেকেও বেশি অনুভব করেছি। এক মলাটে এতো থ্রিল নিয়ে খুব কম সংখ্যক বই-ই আমি পড়েছি।
রহস্য, রোমাঞ্চ, হিংসা, লোভ, ক্ষোভ, ঘৃণা আর ভালোবাসার মিশেলে সৃষ্ট 'নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে' আমার পড়া বেস্ট বইয়ের তালিকায় জায়গা করে নিলো। কিছু দৃশ্যপটে লেখক রেখেছেন পাঠকের ভাবনার ক্ষেত্রে নিজস্ব স্বাধীনতা। পাঠক এগুলো নিজের মতো করে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিভিন্ন আঙ্গিকে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন। এই বিষয়টা আমাকে দারুণভাবে বিমোহিত করেছে। কিছু অবৈজ্ঞানিক বিষয় বইটিতে স্থান পেয়েছে, লেখক যা মুখবন্ধে নিজেই নিরুৎসাহিত করেছেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বিষয়গুলো অবৈজ্ঞানিক হলেও পড়তে গিয়ে পাঠক চরম রহস্য অনুভব করবেন। দৃশ্যপটের সাথে লেখার চমৎকার বর্ণনাশৈলীর কারণে এসব অবৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোও বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে আমার কাছে। আর এখানেই বোধহয় লুকিয়ে আছে অতিপ্রাকৃত জনরার রহস্য।
আগে নিয়মিত রিভিউ লিখতাম। বই পড়া শেষ করেই রিভিউ লেখার জন্য মনপ্রাণ উতলা হয়ে উঠতো। নানাবিধ কারণে অনেকদিন রিভিউ লিখি না। মনে হচ্ছে যেন ভুলে গেছি সব। কোথায় যেন হারিয়ে ফেলেছি রিভিউ লেখার প্যাটার্ন। যাই হোক, আজকে মূলত রিভিউ লিখি নাই। বইটি পড়া শেষে মনের অভিব্যক্তিটুকু অগোছালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। সবশেষে যা বলে আজকের বকবকের ইতি টানতে চাই তা হলো, সত্যিকার অর্থেই দুর্দান্ত একটি বই পড়েছি অনেকদিন পর। নালন্দা থেকে প্রকাশিত মোন্তাফিজ কারিগরের করা চমৎকার প্রচ্ছদে প্রকাশিত বইটির বাইন্ডিং থেকে শুরু করে প্রিন্টিং এবং কাগজের মানও ছিল অতি চমৎকার। বইটির আরেকটি বিশেষ দিক হলো পুরো বইটিতে, একটি মাত্র ভুল বানান আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। ঝরঝরে লেখা আর ছোট ছোট বাক্যগঠনে পুরো বইটি ছিল পাঠরস আস্বাদনের এক ইনটেনসিভ রস ইউনিট।
মশাই, চালিয়ে যান। কলম চলুক অামৃত্যু। অনেক অনেক শুভকামনা জানবেন। এবার বাঁশি বাজানোর পালা। হ্যাপি রিডিং প্রিয় পাঠক।
বইঃ নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে লেখকঃ মনোয়ারুল ইসলাম প্রকাশনীঃ নালন্দা প্রচ্ছদঃ মোস্তাফিজ কারিগর পৃষ্টা সংখ্যাঃ ১৪৮ মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা।
নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে আহা রে, আহা রে কাহা রে, কাহা রে? লেখক অতিপ্রাকৃত বললেও আমার কাছে বইটা একটা সাসপেন্স থ্রিলার লেগেছে। exactly my rating is 4.70/5.00
বইয়ের নাম ‘নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে’। কি মনে হয়? নিছক কোন প্রেমের বই? নাহ! নামটা অভিমানী প্রেমময় লাগলেও বইটি পুরোদস্তর একটি আধিভৌতিক থ্রিলার ঘরানার বই। তবে মনোয়ারুল ইসলামের লেখা বইটি আধিভৌতিক থ্রিলার জনরার হলেও এতে একাধারে ভালোবাসা, পরোকিয়া প্রেম, একের পর এক রহস্যজনক খুন, অশুভ শক্তিসহ সবই পাবেন।কাহিনীর শুরু ঢাকা থেকে হলেও কালক্রমে গল্প বিস্তার করে রূপনগর গ্রাম পর্যন্ত। খুনের ঘটনা ঘটে সেখানেও তবে সেই সাথে দেখা যায় গ্রামীণ রাজনীতির ছাপচিত্র তথা ক্ষমতার অপব্যবহার।
বইয়ের কাহিনী শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল থেকে। রহস্যজনক ভাবে সেখানে খুন (নাকি আত্মহত্যা) হয় সুমি। আর এই খুনের সুত্র ধরেই চলতে থাকে একের পর এক খুন। শুরুতে প্রতিটি হত্যার কাহিনী একটু বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল। একের পর এক এভাবে খুন কেন হচ্ছে? কিন্তু পরে দেখলাম ধিরে ধিরে লেখক প্রতিটি খুনের কাহিনীর মেলবন্ধন খুব সুচারু ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এক এক করে।
প্রতিটি পাতায় ছিল টান টান উত্তেজনা । পুরো বইয়ে কোথাও কাহিনী ধির গতির ঠেকেনি। খুন নাকি আত্মহত্যা? যদি আত্মহত্যাই হয় তাহলে কি সব মানসিক চাপের কারণে হয়েছে? মানসিক চাপের কারণেই যদি হবে তাহলে তাদের সাথে যে অশুভ শক্তির একটা দ্বন্দ দেখা যায় সেটার কারণ কি? – এই সব কিছুর কাহিনী জানার জন্য পড়তে পড়তে চলে যেতে হবে বইয়ের শেষ অব্ধি।
বরাবরের মত এই বইয়ে স্মার্ট সাব ইন্সপেক্টর তুর্জয় শাকিলের উপস্থিতি ভালো লেগেছে।লেখকের বইগুলো পড়ে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে এই চরিত্র না থাকা মানে পুরো বইয়ে কি যেন অনুপস্থিত।
বইয়ে বানান ভুল তেমন চোখে পড়েনি তবে বইয়ের এক জায়গার তুলনা দৃষ্টিকটু লেগেছে। ইউনুস পাগলের দাঁতের ���র্ণনা শুরুতে ‘নোংরা বিশ্রী’ বলা হলেও পরের বার তার দাঁতের রঙ ‘গু’ কালারের সাথে তুলনা করা হয়েছে যেটা ভালো লাগেনি আমার।
বইয়ের উৎসর্গপত্রটা খুব মন ছুঁয়ে গেছে আমার। নিজের স্বর্গবাসী নানা এবং নানুকে বইটি উৎসর্গ করেছেন লেখক খুব সুন্দর কথামালা দিয়ে। উৎসর্গপত্রও এত্ত সুন্দর হতে পারে !
বরাবরের মত লেখকের এই বইয়ের প্রচ্ছদও করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর এবং দুর্দান্ত লেভেলের কাজ হয়েছে এটা প্রচ্ছদশিল্পীর।
বইয়ের একটি উক্তি ভালো লেগেছে; ‘টাকা ধরতে গেলে সুখ ধরা যায় না। টাকা চোখে আলাডা একটা পরত ঢেলে দেয়। আড় মানুষ হোয়ে যায় অন্ধ’
পরিশেষে বলবো, যারা আধিভৌতিক থ্রিলার ঘরানার বই পড়তে পছন্দ করেন তাদের জন্য লেখক মনোয়ারুল ইসলামের ‘নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে’ মাস্ট রীড একটা বই।পুরোই ‘পয়সা উসুল’ বই একখানা!
এক নজরেঃ
বই – নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে লেখক – মনোয়ারুল ইসলাম মুদ্রিত মূল্য – ৩০০ টাকা প্রকাশনী – নালন্দা প্রকাশকাল – মার্চ ২০২১
"মাথার ভেতর মুখ কথা বলা এক রোগ নয়ন তাহারে পায়না দেখিতে আহা রে! আহা রে! কাহা রে! কাহা রে! "
অসমাপ্ত প্রেম। রহস্যজনক কয়েকটা খুন। অশুভ শক্তির সাথে শুভ শক্তির জমজমাট খেলা। কাহিনী শুরু ঢাকা ইউনিভার্সিটির কার্জন হল থেকে। সুমি হঠাৎ খেয়ালে কথা বলা শুরু করলো। যার সাথে সে কথা বলছে তাকে দেখা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। খুন হতে থাকে একের পর এক। রমনা থানার মামলার সাথে শাহবাগ থানার মামলার যোগসূত্র আছে। পিবিআই অফিস থেকে সাব ইন্সপেক্টর সুরুজ জানায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। কি সেই তথ্য? যে তথ্য জেনে ইন্সপেক্টর শাকিলের মাথা ঘুরে যায়। উপন্যাস একটা সময় ঢাকা শহর থেকে চলে যায় রূপনগর নামের এক গ্রামে। সেখানেও রহস্য। এইসব রহস, অতিলৌকিক বিষয় আশয়ের সমাপ্তি ঘটে উপন্যাসের প্রায় শেষ। ভালো লাগার মতো একটি বই।
মাথার ভেতর মুখ- কথা বলা রোগ। নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে- আহা রে! আহা রে!
এক কথায় বলব দারুণ একটা বই। ভৌতিক আবহের সাথে রহস্যের সংমিশ্রণ 😍 একটানা ১০০ পেজ পড়ে এরপর বিরতি নিয়েছিলাম। অনেকদিন পর এত দারুণ ভৌতিক আবহের বই পড়েছি। অতিপ্রাকৃত রহস্য উপন্যাস হিসেবে দারুণ হয়েছে বইটি। মনোয়ারুল ইসলাম ভাইয়া আমার প্রিয় লেখকদের মাঝে অন্যতম। আশা করি, প্রত্যেক বইমেলায় তাঁর আরও অতিপ্রাকৃত উপন্যাস পাব।
বইটিতে উঠে এসেছে একের পর খুন। যার তদন্ত করতে যেয়ে তদন্ত অফিসারদের বেহাল অবস্থা। একটার সাথে একটার যোগসাজশ খুঁজে পেলেও ধরতে পারেনা আসামীকে।
সুমি, সুমন, মাসুদ, বুলবুল, জয়নাল....... এরা কেউ জানেনা কেন হচ্ছে, কি কারণে হচ্ছে। তবুও তাদের সাথে খেলা করে একজন! সে একজন কে?
উপন্যাসে উঠে আসে সমাজের নানা শ্রেণীর মানুষ। নিজেদের প্রবৃত্তি দ্বারা তারা কতটা নিয়ন্ত্রিত তা দেখা যায় স্পষ্টভাবে। শহর থেকে গ্রাম ছাপিয়ে যায় তদন্তের ঢেউয়ে। শেষ পর্যন্ত সাব ইন্সপেক্টর শাকিল ও আশিক বুঝে নেয় ব্যাপারটা অন্য দিকের...কুল কিনারা করতে হিমশিম অবস্থা⁉
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় তরুণী সুমিকে দিয়ে শুরু হয় এক দারুণ খেলা...সেই খেলার শেষটা খুঁজতে পড়তে হবে বইটার শেষ পর্যন্ত। বইয়ের নাম শুনে একরকম মনে হলেও পড়ার পর আর এক রকম অনুভূতি কাজ করবে। লেখক এখানে পুরোপুরি সার্থক বলা যায়। দারুণ একটি সাসপেন্স এবং প্যারানরমাল থ্রিলার উপন্যাসের নাম- নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে।
নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে মনোয়ারুল ইসলাম প্রকাশনী- নালন্দা প্রচ্ছদ- মোস্তাফিজ কারিগর মূল্য- ৩০০
বই : নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে লেখক : মনোয়ারুল ইসলাম
কাহিনী সংক্ষেপ একের পর এক মৃত্যু, রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সাদা চোখে আত্মহত্যা। কিন্তু... বাধ সেধেছে আধুনিক প্রযুক্তি। খুন, আত্মহত্যা না-কি অপার্থিব কিছু! লাশ আছে; সন্দেহভাজন আছে; কিন্তু সাক্ষী নেই। তদন্ত কর্মকর্তা শাকিল তদন্তে নেমে খুঁজে পায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। কিন্তু সে কতটা গতি আনতে পারবে তদন্তে, যেখানে প্রযুক্তি খাড়া করে দিয়েছে এক কঠিন সত্য! জমে উঠেছে পার্থিব-অপার্থিবের খেলা। কে জিতবে- মানুষ? না-কি অদেখা ভুবনের কেউ!
পাঠ প্রতিক্রিয়া গল্পের শুরুটা বেশ গোলমেলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে বুঝলাম প্রথম প্রায় ৬০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত শুধু গল্পে ভিত। এই অংশটুকু যে কারোই এলোমেলো মনে হতে পারে। গল্পের দ্বিতীয়ভাগে গিয়ে বোঝা যায় এ সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা। গল্পটা আমার মোটামুটি লেগেছে। তীব্র ভয়ের ব্যাপার-স্যাপার তেমন ছিল না। আর গল্পটাও কিছুটা প্রেডিক্টেবল ছিল। এক্সপেকটেশন আরো বেশি ছিল। পুরোপুরি মন ভরেনি। এছাড়া গল্পে প্রচুর স্ল্যাং ছিল। এরমধ্যে গল্পের প্রয়োজনে কিছুটা মানায়, কিন্তু অনেকটুকুই প্রয়োজন ছিল না বলে মনে হয়েছে। এই ব্যাপারটা ভালো লাগেনি। অবশ্য এর আরেকটা কারণও হতে পারে। মনোয়ার ভাইয়ের ৪টা বই পড়েছি এর আগে। সেগুলোতে স্ল্যাং খুবই কম ছিল। এজন্য হয়তো মাথায় এই ব্যাপারটা সেট হয়ে গেছে যে, মনোয়ার ভাইয়ের লেখায় স্ল্যাং মানায় না! যা হোক, সবমিলে ভালো। একবার পড়াই যায় "নয়ন তাহারে পায় না দেখিতে"।
প্রচ্ছদ-প্রোডাকশন বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। তার কাজ আমার বরাবরই খুব ভালো লাগে। এই বইটার প্রচ্ছদও দারুণ লেগেছে। সেই সাথে বইয়ের বাঁধাই। নালন্দাকে এইদিক দিয়ে অনেকটাই আগানো। বইতে বানান ভুল তেমন চোখে পড়েনি।
আমার অভিমত- প্রথমেই বইয়ের যে বিষয়টা আমার হৃদয়ে বেশ নাড়া দিয়েছে তা হলো বইটির উৎসর্গ। বইটি মনোয়ার ভাই তার নানা, নানুকে উৎসর্গ করেছেন। আমার জীবনেও আমার নানা-নানুর প্রভাব আছে বেশ। উৎসর্গটি পড়ে আমিও আমার নানা-নানুর কথা ভেবে ভাবনায় পড়ে যাই�� আমি বই পড়লে বইয়ের কিছু উদ্ধৃতি যা বেশি ভালো লাগে তা টুকে রাখি। আর এ বইটি শুরুই হয়েছে স্টিফেন কিংয়ের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে। "Monsters are real, and ghosts are real too. They live inside us, and sometimes, they win." আসলেই কিন্তু তাই! আমরা নিজেদের মাঝেই নিজেদের অজান্তেই দানব-ভুত-প্রেত লুকিয়ে রাখি। ঋপুর তাড়নায় কখনো কখনো সেই দানব, ভুত-প্রেত বেড়িয়ে আসে। তখন আমরা আর আমাদের মাঝে থাকি না। জীবনে তখন অনেক অনাকাংখিত ঘটনা ঘটিয়ে ফেলি।
বইতে কাহিনি পরিক্রমায় দেখা যায়- ঘটনার শুরু হয় কিছু মৃত্যু দিয়ে, এগুলো কি খুন নাকি আত্মহত্যা? যারা মারা গেলেন তাদের সাথে কে কথা বলতো?তাদের নিকটাত্মীয়রা সবাই কি সন্দেহভাজন? আত্মহত্যা মনে হলেও ব্যাপারটা কিন্তু এত সহজ ভাবে নিচ্ছে না পুলিশ। এ আবার কার ফিঙ্গার প্রিন্ট! এবার ধরা পড়বে কি খুনী? তদন্তে নেমে তারাও ছুটলো পোটলায় রাখা গয়নার পেছনে। পেছন থেকে কে যেনো কলকাঠি নাড়ছে, মনে হচ্ছে অশরীরী কেউ। শহরে রেহনুমা-ফয়সাল দম্পত্তির বাসায় কাজ করে আমেনা বুয়া গ্রামের বাড়িতে পৌছেই দেখতে পেলো তার ছেলে বুলবুলের লাশ! এটাও কি আত্মহত্যা না খুন? মেম্বার সোলেমান খাঁ, তার পুত্র জয়নালের শাস্তি আর এসব ঘটনাচক্র সব কিছুর পেছনে কি তবে লোভই দায়ী? কি সেই কালো-অধ্যায় লুকয়ে রেখেছেন শাহজাহান সোবহান ওরফে আমান রহমান? হয়তো সবাই একদিন ঠিকই প্রকৃতির নিয়মে সব বুঝে যাবে, জেনে যাবে। থাকুক না হয় অপেক্ষায় সেদিনটার জন্য-
আমার অনুভূতি- আমি একজন ধীর গতির পাঠক, অনেক ভালো ভালো বই শেষ করতে আমার বেশ সময় লেগে যায়। তবে নয়ন তাহারে পায়না দেখিতে বইটার কাহিনী, ভাষা, ঘটনাপ্রবাহ বেশ গতিময়, প্রাঞ্জল। সহজ ভাবে বলতে গেলে বইটি বেশ সুখপাঠ্য ছিলো আমার কাছে। গতকাল সেহরির পর ভেবেছিলাম অল্প একটু পড়ে ঘুমিয়ে পড়বো, কিন্তু পড়তে পড়তে এতোতাই ডুবে ছিলাম যে একনাগাড়ে পড়ে শেষ করে ফেলেছিলাম। ১৫০ পৃষ্ঠার বইটি এক বসাতেই পড়ে ফেলা যাবে।
পছন্দের কিছু লাইনঃ • নিয়তি জিনিসটা এমনই- এটাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না; কিন্তু এর ফল ঠিকই ভোগ করতে হয়। • টাকা ধরতে গেলে সুখ ধরা যায় না। টাকা চোখে আলাদা একটা পরত ঢেলে দেয়। আর মানুষ হয়ে যায় অন্ধ।
একনজরে- বইয়ের নামঃ নয়ন তাহারে পায়না দেখিতে লেখকঃ মনোয়ারুল ইসলাম প্রচ্ছদঃ মোস্তাফিজ কারিগর প্রকাশনীঃ নালন্দা প্রকাশকালঃ মার্চ ২০২১ জনরাঃ অতিপ্রাকৃত ও ভৌতিক উপন্যাস বা হরর থ্রিলার মুদ্রিত মূল্যঃ ৩০০ টাকা।