ফেক নিউজ' গত কয়েক বছরের অন্তরালে আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে সরল আর যুক্তিহীন মনে হয় যে খবরগুলোকে, সেগুলোই যে একটু একটু করে আমাদের সমাজের ভিত নড়বড়ে করে দিচ্ছে সে সম্পর্কে আমাদের অনেকেই অবগত নন।
প্রযুক্তি ও মানুষের জন্মগত সংস্কারকে হাতিয়ার করে বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই যে গরল-বীজ রোপণ শুরু হয়েছিল, তা আজ বিষবৃক্ষে পরিণত হয়ে মনুষ্যসমাজের প্রতিটি স্নায়ুকে আচ্ছন্ন করতে শুরু করেছে।
কর্পোরেটদের সঙ্গে চুক্তি করে চালানো সার্ভেলেন্স ক্যাপিটালিজম-এর এই বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক যে কীভাবে আমাদের মগজধোলাই করছে, তা বিশদে জানতে পারলে আতঙ্কে গায়ের রক্ত হিম হয়ে যায়।
রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার উদ্দেশ্য বিকল্প সত্যের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এই কাজ একদিনে কিন্তু সম্পন্ন হয়নি। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা হোক অথবা স্নোডেন লিক, পানামা পেপার্স হোক অথবা তুরস্কের মিলিটারি ক্যুপ-এর ব্যর্থতা, এমনকি গত ৬ জানুয়ারি ২০২১-এ ট্রাম্পের মিথ্যাচারে ভরসা করে এক দঙ্গল লোক ওয়াশিংটনে কংগ্রেসের বিল্ডিংয়ে চড়াও হওয়া --- আপাত দৃষ্টিতে বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হলেও, এই প্রত্যেকটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
'আইটি সেল' আর 'পেইড মিডিয়া'-এর যোগসাজশে চালিয়ে যাওয়া ধর্মীয় মেরুকরণ আর 'ডিভাইড অ্যান্ড রুল'-এর এই পদ্ধতি নির্বাচন হ্যাক করে আর মানুষকে 'ডিসইনফর্মেশন' দিয়েই থামেনি, এই আগুনের আঁচ এসে লাগছে প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও।
নিতান্ত সাধারণ কিছু মতবিরোধের ফলে পুরোনো স্কুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক যেমন ভেঙে যেতে পারে চিরকালের মতো, কিংবা আত্মীয়দের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে যেতে পারে, ফেসবুকে ব্লক হয়ে যেতে পারে পছন্দের আপন ব্যক্তিজনরা, সেই অভিজ্ঞতা হয়নি এমন মানুষ খুব কমই আছেন।
গত পনেরো বছরের রাজনৈতিক ঘটনাক্রম আর ফেক নিউজের ধারাবাহিক বিবর্তনের কথা তুলে ধরার এই কাহিনি ততটাই বাস্তব, যতটা আমাদের জীবন।
এই গল্প সেই রুঢ় বাস্তবের, যেখানে সত্যি ও মিথ্যের যুদ্ধে 'সত্যি' হেরে যায় প্রতিনিয়ত। জয়ী হয় 'মিথ্যে'। যেমন সে বরাবর জিতে এসেছে, জিতছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো জিতবে। 'সত্যমেব জয়তে'-এর স্তোকবাক্য বইয়ের পাতায় ধুলো খাবে ঠিকই, কিন্তু আমাদের অলক্ষেই হয়তো বা দুনিয়ার নতুন স্লোগান বাস্তবায়িত হবে ক্ষমতা দখলের যুদ্ধে---- মিথ্যের জয়!
"A lie can travel halfway around the world before the truth can get its boots on."
ওপরের লাইনটা একজন মহৎ সাহিত্যিকের উক্তি। জানেন তিনি কে ? মার্ক টোয়েন।
ক'জন বিশ্বাস করলেন ? ক'জন অবিশ্বাস করলেন ? ক'জনই বা বিশ্বাস অবিশ্বাসের তর্কে আসার আগে মিলিয়ে দেখলেন সত্যিটা ? খুঁজলেন সত্যির সপক্ষে প্রমাণ ?
আচ্ছা "সত্যি আসলে কী ? আমি যেটাকে সত্যি বলে মনে করি, আমি যেটাকে প্রমাণ বলে মনে করি, সেটাই যে আদপে সত্যি তার নিশ্চয়তা কোথায় ? আমি যে ব্যক্তিগত সংস্কারের বশবর্তী হয়ে সত্যি-মিথ্যে বিচার করছি না সেটা কে বলতে পারে ?"
ঘুলিয়ে যাচ্ছে তো সব ? হ্যাঁ এটাই উদ্দেশ্য ছিল, আপনার চিন্তা ভাবনার সরলরেখাটাকে পেঁচিয়ে জট পাকিয়ে দেওয়া। নিজের যুক্তি বিচার বুদ্ধির ধারাটাকে এলোমেলো করে দেওয়া। সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের লেখা 'মিথ্যামেব জয়তে' পড়তে বসে আপনার চিন্তা ভাবনা যুক্তি বোধ বিচার বিবেচনা এভাবেই এলোমেলো হয়ে যাবে বারবার। আপনি বুঝতে পারবেন এই বইয়ের প্রতিটা তথ্য বা ফিকশনের আড়ালে ঘটনাপ্রবাহ সত্যি এবং এই সত্যির মধ্যে দিয়েই আপনার রোজকার চলা ফেরা, সোশ্যাল মিডিয়ায় আড্ডা মারা, সবটা চলছে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে; আর এই পুরোটাই হচ্ছে তৃতীয় কোনো ব্যক্তি বা সত্ত্বার ২৪*৭ নজরদারিতে। বুঝতে পারবেন কিন্তু বিশ্বাস করতে চাইবেন না। যত অবিশ্বাস করবেন তত জড়াবেন আর একসময়ে এই বিশ্বাস অবিশ্বাসের দ্বন্দ্বের মাঝে আপনি হয়ে উঠবেন নিছকই এক খেলার পুতুল যার রোজনামচা আসলে নিয়ন্ত্রিত হয় অপর কোনো শক্তির দ্বারা।
সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইলিং কাকে বলে জানা আছে সুধী পাঠক ? আপনি সকালে কখন ঘুম থেকে ওঠেন, তারপর কী কী করেন, মর্নিং ওয়াক বা স্নান সেরে ঠাকুর পুজো, কর্মক্ষেত্রে বেরোন না বাড়িতেই নানারকম কাজকর্ম করেন, কী খেতে ভালোবাসেন, ঘুরতে ভালোবাসেন না নিজগৃহের নিভৃত কোণেই অবসর যাপন করতে পছন্দ করেন, ঈশ্বরে বিশ্বাসী না নাস্তিক, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী – এই সব তথ্যই সর্বক্ষণ মনিটরড্ হয় রাষ্ট্র বা তৃতীয় কোনো পক্ষ দ্বারা আর এই সমস্ত তথ্যের মাধ্যমেই তৈরি করা হয় প্রতিটা মানুষের সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইল।
কী হয় এই প্রোফাইল দিয়ে ?
বিহেভিয়ারাল অ্যানালিসিস করে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনার জন্য ব্যবসায়িক স্বার্থে বা রাষ্ট্রক্ষমতার স্বার্থে ব্যবহার করা হয় এই সাইকোলজিক্যাল প্রোফাইল। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে প্রচার করা হয় এমন স্ট্র্যাটেজিতে যাতে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বলে আর কিছু থাকে না।
নির্দিষ্ট অ্যালগরিদমের দ্বারা এই ধরণের বিহেভিয়ারাল অ্যানালিসিস এমনকি ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে। ২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বারাক ওবামার ক্যাম্পেনে, বিপক্ষের রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীও একই পদ্ধতির সাহায্য নেন ক্যাম্পেনে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে এই একই পদ্ধতি অবলম্বন করে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন নরেন্দ্র মোদী ! আর এই অভিনব পদ্ধতি ব্যবহৃত হয় ইন্টারনেট, মূলতঃ ফেসবুকের সাহায্যে।
ফেসবুক কোথায় পায় এত মানুষের তথ্য ? খুব সহজ, বিশ্ব জুড়ে কোটি কোটি মানুষ তাঁদের প্রোফাইল তৈরি করেছেন ফেসবুকে, তাঁরা নিজেরাই নিজেদের সমস্ত তথ্য দিচ্ছেন আর সেই তথ্য আদতে ব্যবহৃত হচ্ছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ব্যবসায়িক বা ক্ষমতা দখলের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে। তাঁরা হয়ে যান টারগেটেড অ্যাডভারটাইজিংয়ের শিকার।
আরও আছে বন্ধু।
🔻মিথ্যাকে সুপরিকল্পিতভাবে বারবার ব্যাবহারকারীর সামনে এনে 'সত্য' বলে প্রতিষ্ঠিত করা।
🔻ইন্টারনেট, ফেসবুক ও বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে জনতার মানসিক অবস্থা আর চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রণ করা।
🔻লক্ষ লক্ষ ফেক নিউজ সাইট চলছে মানুষের মনের সংস্কার আর প্রেজুডিসকে হাতিয়ার করে ব্যবসায়িক স্বার্থসিদ্ধি করার অভিপ্রায়ে। তার বেশিরভাগই দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা...
🔻ক্রমাগত নজরদারির মাধ্যমে এমনকি কিছু কিছু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠনকে চিহ্নিত করে তাদের পরিকল্পিত ভাবে অপরাধ করার প্ররোচনা দেওয়া হয়!
ফেসবুক বা গুগলের অ্যালগরিদম বানানোই হয় এই ভেবে যাতে ইউজার সেই পোস্ট বা সার্চ অপশনই দেখতে পায় যাতে সে সত্যি আগ্রহী বা যেদিকে তার প্রেজুডিস বা চিন্তাভাবনা তাকে ধাবিত করে। এই প্রোগ্রাম ব্যবহার করেই এই প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়। অতএব এই সার্চ বার বিভিন্ন ইউজারকে বিভিন্ন অপশন দেখায়। এই ইউজার ক্লাস্টার আবার তৈরি হয় জাতি-ধর্ম-দেশ বা চিন্তাধারার বিভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে। অতএব সত্যি মিথ্যের মাঝের বেড়াজালটা আর থাকে না। সেটাই সত্যি বলে প্রমাণিত করা হয় যা সত্যি হলে রাষ্ট্রের বা ব্যবসায়ীর লাভ আছে। After all "Obvious lies make great propaganda."
গুগলের প্যারেন্ট কোম্পানি আলফাবেট শ্রেষ্ঠ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্য নিয়ে এই প্রোগ্রাম তৈরি করেছে। মানুষের প্রতিক্রিয়া বুঝে সাজেশন দেওয়া এই প্রোগ্রামের প্রধান কাজ। এটা একপ্রকার ইমোশনাল ম্যানিপুলেশন।
স্নোডেন লিক, কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা, পানামা পেপার্স, পেগাসস – নামগুলো খানিকটা চেনা চেনা লাগছে কি ? এর প্রতিটা নিয়ে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায়, ঝরঝরে গদ্যে, ইনভেসটিগেটিভ জার্নালিজমের পটভূমিকায় লিখিত সমকালীন গল্পের মোড়কে বিশদে আলোচনা করেছেন লেখক, যা পড়ে আপনার রাতের ঘুম উড়ে যাবে।
তাহলে শুধুই কি অন্ধকার চারদিকে ? ক্রমাগত নজরদারিতে রাষ্ট্রের হাতের পুতুল হয়ে ফেসবুকে বড় বড় বিদগ্ধ আলোচনা করে জ্ঞানের আস্ফালন করে আদপে এক কারাগারে বন্দী আমরা সবাই ?আলোর দিশা কি সত্যি আর নেই ?
হ্যাঁ বা না কোনো উত্তর দেব না। শুধু বই থেকে একটা অংশ তুলে দিচ্ছি। পাঠক বিচার করবেন।
¶¶২০১৭ সালে শিল্পী ও সঙ্গীতজ্ঞদের ওপর চাপানো নিষেধাজ্ঞা ও মিথ্যে মামলার বিরুদ্ধে অনশন শুরু করে গ্রুপ ইয়োরামের একাধিক সদস্য। টানা ২৮৮ দিন অনশন করার পর মারা যায় হেলিন। সে একা নয়, গানের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি নিয়ে অনশন করার ফলে মৃত্যুবরণ করে ইব্রাহিম গোকচেক ও মোস্তফা কোচেকের মত বহু শিল্পী। প্রত্যেকের বয়স ছিল তিরিশের নীচে। তাদের অপরাধ, তারা গান গাইতে চেয়েছিল...¶¶
"প্রতিরোধের স্বর সর্বদাই বেঁচে থাকে, সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয় না কোনোদিনই।"
গ্রুপ ইয়োরামের কথা জানা ছিল না আমার। আপনার যদি জানা থাকে তাহলে আলোর সন্ধান আপনি নিশ্চিত পাবেন। না জানা থাকলে এই বিষয়ে কিছু বইপত্র খুঁজে পড়ে নিতে হবে। আমিও খুঁজছি। এই আলোটা খুব প্রয়োজন, খুব...
লেখক সুদীপ চট্টোপাধ্যায় বয়সে তরুণ। কিন্তু তাঁর পড়াশোনার পরিধি বিপুল। বিভিন্ন বিষয়ের ওপর তাঁর বেশ কিছু লেখা আগেও পড়েছি ও মুগ্ধ হয়েছি। 'মিথ্যামেব জয়তে' এই তালিকায় এখনও পর্যন্ত সর্বশ্রেষ্ঠ সংযোজন। এঁর সব লেখা পড়ার চেষ্টা করব আমি।
ধন্যবাদ প্রকাশক দ্য ক্যাফে টেবলকে এরকম একটা বই প্রকাশ করে পাঠকের সামনে নিয়ে আসার জন্য।
পুনশ্চ: এই পাঠ অভিজ্ঞতার একদম শুরুতে যে উক্তটি দেওয়া হয়েছে তা মোটেও মার্ক টোয়েনের নয়। বইয়ের শুরুতেও এই উক্তিটি রয়েছে এবং মিথ্যে তথ্য দেওয়ার জন্য 'আত্মপক্ষ' তে লেখক ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন। আসলে এভাবেই প্র��পাগান্ডা ছড়ায়, এটা বোঝানোর দরকার ছিল।
পাঠক বন্ধুরা পড়বেন এই বই। আজকের পৃথিবীতে আপনার অবস্থান ঠিক কী ও কোথায় তার সম্বন্ধে কিছু ধার���া থাকা একান্ত আবশ্যক।
আমাদের রোজকার জীবনে ব্যবহৃত ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিশ্বের উন্নত ও প্রযুক্তি নির্ভরশীল দেশগুলোতে আজ মানুষের রাজনৈতিক মতামত অনেকাংশই উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রপাগান্ডা ভিত্তিক করে তোলা হচ্ছে সুকৌশলে। কেবল অর্থবলে প্রভাবশালী সংগঠন ও ব্যক্তিত্বেরা কিভাবে সাধারণের অজান্তে তাদের ব্যক্তিগত তথ্য সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গোপন/কৌশলী চুক্তির ভিত্তিতে হাতিয়ে নিজেদের প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহার করছে, তা নানা জটিল technological term ও বিষয়ের অনুপুঙ্খ আলোচনায় লেখক তুলে ধরেছেন কাল্পনিক ও বাস্তবের নানা চরিত্রের চিত্রায়নে।
বাংলাভাষায় এখনো পর্যন্ত আমার জানা এই বিষয়ে কোনো বই দেখিনি। প্রযুক্তি ও তার নানাবিধ ব্যবহার নিয়ে আগ্রহ যাদের, তারা সত্যিই রোমাঞ্চিত হবেন।
ভোটের প্রচারে কিভাবে ভারত - আমেরিকা - রাশিয়ার প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল সোশ্যাল মিডিয়া কে কাজে লাগায়, রাজনৈতিক ও পাওয়ার গেম সংক্রান্ত কতো জটিল terminology ও কার্যকলাপ হতে পারে, আমার আপনার ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে গভীর বিশ্লেষন করে মানিপুলেটিভ কায়দায় জনগণকে প্রভাবিত করা হয়, মিম - রোস্ট - হেট পোস্ট - ফেক নিউজের খেলায় কিভাবে আমাদের ধর্মীয় - রাজনৈতিক - সাংস্কৃতিক সেন্টিমেন্টাল দুর্বলতা কে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল বা মুক্তমনা প্রতিবাদী বা সত্যান্বেসি সমাজ ও ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে জনসাধরণকে খেপিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করা হয়, তার কাহিনী এখানে লিপিবদ্ধ।
ফেসবুকের বিরুদ্ধে ইউরোপের কোর্টে কেস, ওবামা মোদীর ভোটের কাজে ফেসবুকে বিশেষ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে জনতার perception কে কাজে লাগিয়ে জনমানসে রাজনৈতিক এজেন্ডা instill এর চেষ্টা, right wing insurgency - বেআইনি data surveillance - Snowden leak - Cambridge analytica এর বিতর্ক, ভারতের cyber act ও তার বাস্তব পরিকাঠামোর দুর্বলতার সুযোগে রাষ্ট্রের confidential তথ্য লোপাট, তুরস্কের রাজনৈতিক আঙিনায় মুক্তমনাদের এমনকি শিল্প - সাহিত্যের কণ্ঠরোধের চেষ্টা, ধর্মীয় সুড়সুড়ি মূলক ফেক নিউজ ও মিম এর প্রচার করে হিন্দু মুসলিমের মধ্যে দাঙ্গা-খুনোখুনি লাগানো, সুস্থ আপাত স্বাভাবিক জনসাধারণের পারস্পরিক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিষিয়ে ওঠে সোশ্যাল মিডিয়ার নানারকম প্রপাগান্ডা পোস্টের কারণে বা নামকরা মিডিয়াহাউসের ধর্মীয় - রাজনৈতিক মেরুকরণমূলক বা আংশিক খবর বারেবারে প্রচারের কারণে, বিশ্বব্যাপী নানা শেল কোম্পানির মাধ্যমে লাখ লাখ ডলারের চোরাই ডিল, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, প্রভাবশালী মিডিয়া কে অর্থ ও প্রতিপত্তির লোভ দেখিয়ে বা প্রভাব খাটিয়ে কিভাবে চাঞ্চল্যকর ও চিত্তাকর্ষক ঘটনা কে বারে বারে ডিজিটাল প্লাটফর্মে তুলে ধরে অনাকর্ষক সত্য কে পিছিয়ে দেওয়া হয়, হালফিলের ইসরাইলি পেগাসস স্পাইওয়্যার এর ব্যবহার, কিভাবে পৃথিবীব্যাপী মুক্তমনা সাংবাদিকগণ শত হুমকিমেল ও ভয়দেখানো হোচট খাওয়ার পরও নিজেদের সামলে, কেবল সত্য কে ভালবেসে গোপনে,প্রতিপদে মৃত্যুর হাতছানি কে অগ্রাহ্য করে, কখনও প্রাণের মানুষকে চির বিদায় জানিয়ে অজ্ঞাত ঠিকানায় বেনামে বা low profile জীবন বেছে নিয়ে একাগ্র চিত্তে কাজ করে চলেছেন, তার জীবন্ত দলিল এই বই।
লেখক এই বইতে সাগরসম তথ্য ঘটনার মালা গেথে বলতে নিয়ে অভিজ্ঞান - রেহানা - বাণী - ক্ষিতিজ - জুন্যাদ - তিয়ারা চরিত্র গুলো ব্যবহার করেছেন। তারা প্রাথমিকভাবে কিছুটা নিষ্প্রাণ মনে হলেও উপন্যাসের মধ্য ও শেষ ভাগে ধীরে ধীরে প্রাসঙ্গিক ও হৃদয়স্পর্শী হয়ে উঠেছে। গল্পের অন্তভাগে অভিজ্ঞানের রণক্লান্ত হতাশা, ক্ষিতিজের মব লিঞ্চিং, রেহানার বাস্তব অবস্থান ও রাষ্ট্র প্রদত্ত পরিচয় চিরকালের মত হারিয়ে অভিজ্ঞানের কাছে শেষ মেসেজ পাঠানোর খবর পেয়েও রেহানার অস্তিত্বের খবর বুকে পাথর রেখে অভিজ্ঞানের কাছে বানীর গোপন করা -- পাঠকবর্গকে নাড়িয়ে দেয়।
গল্পের শেষে Happy ending নেই, অনাড়ম্বরভাবে জয় হয় ইচ্ছাকৃত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অসত্যের। Apparently হেরে যায় গল্পের বাহক চরিত্র গুলি -- জয় হয় মিথ্যার।
প্রাচীনকাল থেকে নিজের সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে যেকোন সম্রাটই চেয়েছেন সাধারণ মানুষের মনের হদিশ পেতে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ জনগণের মনকে দমন করে বদলে দিয়েছেন মনন, কেউ বা চেষ্টা করেছেন জনগণের মনকে বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার, কেউবা আগের দুই পদ্ধতির মাঝামাঝি কোন পন্থায় পরিচালনা করেছেন নিজের শাসনব্যবস্থা। যুগ বদলালেও বর্তমান রাষ্ট্রনায়ক থেকে শুরু করে পাড়ার রাজনৈতিক নেতা অস্বীকার করতে পারেননি জনগণের মনের গতিবিধির গুরুত্বকে । দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে বারংবার চেষ্টা হয়েছে জনগণের মনের গতিবিধিকে বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করার।বর্তমানে মানুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছা-অভ্যাস-বদভ্যাস-পছন্দ-অপছন্দ সবকিছুর তথ্যই সহজে হাতের মুঠোয় চলে আসছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রামের মাধ্যমে। তাদের প্রাইভেসি পলিসির সূক্ষ্ম ফোঁকর গলে কিভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের তথ্য এসে পড়ছে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনদাতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে এবং নিজদলের স্বার্থ চরিতার্থ করতে কিভাবে ফেক নিউজ, প্রোপাগান্ডার ফাঁদে জড়িয়ে ফেলা হচ্ছে সাধারণ মানুষকে তারই তুখোড় লেখনী "মিথ্যামেব জয়তে"। এই বই মোটেও শুধু ভারতবর্ষের উপরে নির্মিত নয়, এর গন্ডি সমগ্র বিশ্ব জুড়েই। লেখক সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা ও অধ্যবসায়ের অনন্য ফসল এই বইটি। লেখকের টানটান নির্মেদ লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে বিশ্বজুড়ে ক্যাপিটালিজমের উত্থানে কিভাবে অনুঘটকের রূপ নিচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলি। ভারতবর্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের আইটি সেলগুলির বাড়বাড়ন্তের পূর্বে কিভাবে অন্যান্য বিত্তশালী দেশে থাবা বসিয়েছে মানুষের মন বোঝার এই আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রোগ্রাম; কিভাবে সেই প্রোগ্রামের মাধ্যমে নিজের অজান্তে বা জেনেশুনেই বদলে দেওয়া হচ্ছে মানুষের মনন, বাচন, দৃষ্টিভঙ্গি অথবা কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ছোটখাটো কোন মিছিল থেকে শুরু করে কোন দাঙ্গার স্ফুলিঙ্গ - এই সবকিছুই বাস্তবের পটভূমিকায় আলোচিত হয়েছে এই বইতে। এই বইতে রেহানা, অভিজ্ঞান, জুন্যাদ, ক্ষিতিজ, বাণীদের পাশাপাশি প্রচুর রিয়েল লাইফ চরিত্রও রয়েছে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানুষের মগজ দখলের এই কারবারের সাক্ষী বিভিন্ন মহাদেশে। কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা, স্নোডেনের আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু করে ট্রাম্পের প্রচার, এমনকি সকলের পরিচিত পিকেবাবু এবং অমিত মালব্যের কথাও যৎকিঞ্চিৎ উঠে এসেছে এখানে। সোশ্যাল মিডিয়ার খোলসে ডিসইনফর্মেশন সরবরাহ করা এবং মানুষের মনকে ম্যানিপুলেট করার বিপদসীমা নিয়ে বাংলাভাষায় লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ এবং অবশ্যপাঠ্য বই "মিথ্যামেব জয়তে"। না পড়লে নেটবিলাসী অনেক পাঠক একখানি টাটকা সুপাঠ্য বই মিস করবেন। প্রসঙ্গত, বারবার মিথ্যে কথা সর্বত্র জোরের সাথে প্রচারিত হতে থাকলে সেই মিথ্যেই দখল করে নেয় সত্যের স্থান। সত্য সকলের কাছে উন্মুক্ত থাকলেও মিথ্যের দুর্ধর্ষ প্রচার মানুষের চোখে সেই সত্যকে তুচ্ছ এবং নির্বিষ করে দেয়। লেখক তাই হয়তো মিথ্যের এই যুদ্ধজয়ের নামে সার্থক নামকরণ করেছেন "মিথ্যামেব জয়তে"।