বছর বছর আমাজনের জঙ্গলে ভয়ংকর দাবানল, অস্ট্রেলিয়ান বুশ ফায়ার - এ কি শুধুই প্রকৃতির খেয়াল? নাকি সাধারণের অলক্ষ্যে বাস্তবায়িত হয় অসাধু কোনো পরিকল্পনা? ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশের সরকার, ইউনাইটেড নেশনস, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠন কীভাবে জড়িয়ে আছে গ্লোবাল ওয়াইল্ডফায়ার ক্রাইসিসে? এই ধ্বংসলীলা রুখতে কিয়োটো প্রোটোকল বা প্যারিস অ্যাকর্ডের ভূমিকাই-বা কী? ক্লাইমেট চেঞ্জ নিয়ে চলতে থাকা বিশ্বব্যাপী বিতর্ক আর পরিবশ নিধনের মাঝে যখন দু-পক্ষে বিভক্ত হয়ে গেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিডিয়া, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আর অ্যানার্কিস্টিরা, তাদের অবস্থানের আড়ালে নির্ধারিত হয় কোন সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা?
গ্লোবাল ওয়াইল্ড ফায়ার ক্রাইসিস ও আমাজন ফায়ার নিয়ে লেখা বাংলার প্রথম বাস্তভধর্মী ক্লাইমেট ফিকশন- অনলগর্ভা।
An interesting and intense read. The vast research the author has carried out in order to adorn the story is immense and commendable. The way the storyline unfolds a contemporary debatable and controversial agenda, it is no doubt praiseworthy and a must read for nature & adventure lovers.
বিগত কয়েক বছর ধরে সংবাদ পত্রের পাতায় প্রায়ই বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন অরণ্যে দাবানল বা বুশফায়ারের খবর চোখে পড়ে। দাবানল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। উত্তপ্ত আবহাওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রার কারণে বনাঞ্চলের গাছপালা শুষ্ক ও দাহ্য হয়ে ওঠে। পাতায় পাতায় ঘর্ষণের ফলে আগুন ধরে যায় ও ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ফলে সে আগুন নেভানো খুবই কঠিন কাজ। দাবানলের কারণে কত হাজার গাছ ও কত লক্ষ বন্যপ্রাণ যে ধ্বংস হয় তার কোনো সীমা পরিসীমা নেই।
কিন্তু শুধুই কি প্রকৃতির খেয়ালে বনে আগুন লাগে ? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে থাকে মানুষের অপরিসীম লোভ বা কোনো রকম অসাধু ঘৃণ্য পরিকল্পনা ? ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইন ফরেস্ট বা অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলে যে ভয়াবহ দাবানলের ঘটনা ঘটেছে তাতে লক্ষ কোটি গাছ ও বন্যপ্রাণের বিনাশ হয়েছে। আমাদের দেশে বা রাজ্যেও তো প্রায়ই এই ধরণের ঘটনা ঘটছে। ২০২০ সালে বাঁকুড়ার শুশুনিয়া পাহাড়ের দাবানল বা এই ২০২২-এই মাত্র কয়েক মাস আগে বর্ধমানের আউশগ্রাম বা জলপাইগুড়ির বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলের আগুনের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের মণিপুরে সরকারী খতিয়ান অনুযায়ী গতবছরে প্রায় ৪৯৯ বর্গ কিলোমিটার অরণ্যভূমি ধ্বংস হয়েছে, যার প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান দাবানল। ২০১৫ সালে এই সংখ্যাটা ছিল ২৬৩ বর্গ কিলোমিটার। অর্থাৎ সাত বছরে প্রায় দ্বিগুণ !
আমরা সংবাদপত্রে দাবানলের খবর পড়ি, মনে ভাবি ইস্ কত গাছ কত বন্যপ্রাণী শেষ হয়ে গেল। তারপর ভুলে যাই। বছরের পর বছর ধরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকে আগুন আর পুড়ে খাক হতে থাকে অরণ্য। পুড়ে যাওয়া অঞ্চলে হাইওয়ে তৈরি হয়। খামার তৈরি করে পশুপালন হয়, সেই নধর পশুর মাংস চলে আসে বাজারে উইথ হাই ডিমান্ড। মাটি খুঁড়ে চলতে থাকে সোনা বা আরও দামী কোনো পদার্থের খনির খোঁজ, যা বাজারে বিকোবে চড়া দামে। বিষাক্ত খনিজ রাসায়নিক বয়ে যায় অরণ্যের প্রাণ স্বরূপা নদীর ধারায়। অরণ্য সংলগ্ন উপজাতিরা বাস্তুহারা হয়ে হয় মারা যায় নাহয় মৃত্যু সদৃশ জীবন কাটাতে বাধ্য হয় কোনো শরণার্থী ক্যাম্পে। আর এই সমস্ত ব্যাপারটা 'উন্নয়নের' নামে প্রোপাগান্ডা বানিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের মানুষের মনে।
রাষ্ট্রনায়করা উদ্বেগ প্রকাশ করেন, কিন্তু প্রভাবশালী কোনো আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইন প্রণয়ন হয় না। বর্তমান আইন ও বহুদেশীয় চুক্তিগুলোকে জাস্ট পাত্তাই দেওয়া হয় না। মিটিং হয়, সেমিনার হয়, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশবিদরা বক্তৃতা দেন। আর বিশ্ব জুড়ে বিভিন্ন বনাঞ্চলে দাবানলের ঘটনা জিওমেট্রিক প্রগ্রেশনে বাড়তে থাকে। নষ্ট হতে থাকে পরিবেশ, বদল হতে থাকে ক্লাইমেট প্যাটার্ন, ধ্বংস হতে থাকে বাস্তুতন্ত্র।
এই অ্যালার্মিং বিষয়টার প্রতি পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন লেখক তাঁর অনলগর্ভা বইটিতে।
তরুণ লেখক সুদীপ বরাবরই বিশ্বের বিভিন্ন সমস্যাগুলোকে অ্যাড্রেস করেন তাঁর বইতে। এই বইটাও তার ব্যতিক্রম নয়। ২০১৯ সালে ব্রাজিলের অ্যামাজন রেইন ফরেস্টের ভয়াবহ ওয়াইল্ড ফায়ারের পটভূমিতে এক রোমাঞ্চকর কাহিনীর অবতারণা করেছেন তিনি যার চরিত্র গুলোর নাম ছাড়া বোধহয় আর কিছুই কাল্পনিক নয়।
এটা কোনও নন-ফিকশন ডকুমেন্টারি নয়; উপন্যাস। তাই গল্পের প্রয়োজনেই এসেছে বৈজ্ঞানিক, পরিবেশবিদ, সাংবাদিক, মিডিয়া টাইকুন, ফায়ার ফাইটার ও এনজিও কর্মী ও বেশ কিছু উপজাতীয় চরিত্র। কল্পনার মিশেলে এসেছে বেশ কিছু রোমহর্ষক ঘটনা বা ইতিহাসের কথা যার সবটাই যে কেবলমাত্র কল্পনা নয়, বিভিন্ন আর্কিওলজিক্যাল খননকার্য ও গবেষণায় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে আস্তে আস্তে। আগ্রহী পাঠক নিচে দেওয়া লিংক গুলো থেকে এর সত্যতা যাচাই করে নিতে পারেন। লেখকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় এই লিংক গুলো প্রাপ্ত হয়েছি।
মানুষের অপরিমেয় লোভ ও ঠুনকো 'উন্নয়নের' স্বপ্ন যে কতখানি বাতুলতা তা এই বইটা পড়লে খানিক বোঝা যাবে।
বিষয়বস্তুর অনন্যতায় ঝকঝকে ছাপা পেপারব্যাক বইটি সামান্য কিছু মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া এক দারুণ প্রোডাকশন। ধন্যবাদ জানাই একপর্ণিকা প্রকাশনীকে এই বইটি পাঠকের দরবারে হাজির করানোর জন্য।
লেখকের কাছে অনুরোধ পৃথিবীর জ্বলন্ত সমস্যাগুলোকে এইভাবেই পাঠকের সামনে তুলে ধরতে থাকুন। লেখকের অস্ত্র তাঁর কলম তাই কলম দিয়েই প্রতিবাদ চলতে থাকুক।
বইটার মলাটটা দেখতে খাসা। প্রচ্ছদের নীচের ওয়ার্ড ক্লাউডে ক্লাইমেট ফিকশন কথাটা নজরে পড়ার মতো করেই লেখা। বেশ কিছুদিন আগে বইটা কেনা হলেও বিভিন্ন কারণে শেষ করা হয়ে উঠছিল না। পড়া শেষ করে বলতে বাধ্য হচ্ছি এ বই কালেকশনে রাখার মতোই। লেখক ইংরাজি ভাষাতেও বইটা ছাপালে হয়তো আরো অনেক পাঠকের ঘরে পৌঁছে যেতে পারতেন। (নেটফ্লিক্সের কারো হাতে পড়লে তো ....,😁)
শেষ কিছু বছর ধরেই আমাজন, অস্ট্রেলিয়ার অরণ্যে দাবানল ছড়িয়ে পড়ার কথা আমরা খবরের কাগজে পড়ে আসছি কিংবা টিভিতে দেখছি। কতো গাছ নষ্ট হচ্ছে, কত পশুপাখি মারা পড়ছে ভেবে তাৎক্ষণিক আহা-উহুর পর আবার ডুবে যাচ্ছি নিজেদের জীবনের ব্যস্ততায়। কানাঘুষো শোনাও যাচ্ছে যে এই দাবানল নাকি ম্যানমেড। ইচ্ছাকৃতভাবে এই আগুন জি ইয়ে রাখা হচ্ছে মুনাফালোভীদের সুবিধা করে দেওয়ার জন্য। আমাজন জঙ্গলে দাবানলের পটভূমিকায় লেখা এই উপন্যাসের পরতে পরতে আছে প্রচুর তথ্য। তথ্যের প্রাচুর্য এবং লেখকের কল্পনা মিলেমিশে উপাদেয় লেখনী উপহার দিয়েছে। লেখার ভাষা বাগাড়ম্বরহীন এবং মধ্যম গতিসম্পন্ন হলেও মাঝেমাঝে পাঠককে হোঁচট খেতে হতেই পারে নিজ মস্তিষ্কে চরিত্রগুলোর সাথে ঘটনাপ্রবাহের সমতাবিধানার্থে। লেখক বাস্তব তথ্যের সাথে কল্পনা এমন অদ্ভুতভাবে মিশিয়েছেন যে এক-দুবার গুগল সার্চ করেছি বাস্তব আর কল্পনার তফাৎ বুঝতে। গল্পের গতি কিন্তু তাই বলে থেমে থাকেনি। (গুগল সার্চের কথা লিখেছি বলে মোটেও ভাববেন না যে ভুলভাল কিছু লেখা, বরং বুঝে নিতে হবে এখানে লেখনীর গভীরতার জন্য পাঠক হিসেবে ঘটনার সাথে একাত্ম হতে বাধ্য হয়েছি পরোক্ষে) নেদারল্যান্ডসের উতরেক্ত ইউনিভার্সিটির মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ থেকে গল্পের শুরু। সেখান থেকে গল্পের যোগসূত্র তৈরি হয়েছে ব্রাজিলের বিভিন্ন শহর ও বনাঞ্চল পর্যন্ত। ঘটনাক্রমে প্যারিসে ইউনাইটেড নেশনসের হেডকোয়ার্টারেও গড়িয়েছে জল। ওদিকে আমাজনের জঙ্গলে আগুন নেভাতে গিয়ে অদ্ভুত রোগের শিকার হচ্ছে ফায়ার ফাইটাররা। এর নেপথ্যে কারণ কি? আমাজনে বারবার আগুন লাগলে কাদের লাভ? আমাজনের জঙ্গলের নীচে কী আছে? ব্রাজিল সরকারের আসল মোটিভ কী? পরিবেশ কি আদৌ রক্ষা করা সম্ভব হবে শেষ পর্যন্ত? ঐ অদ্ভুত রোগটা কি সারছে শেষ পর্যন্ত? এরকম আরো অনেক প্রশ্নের থ্রিলিং উত্তর পেতে হলে পড়ে ফেলতে হবে বইটি। গল্পে অনেক চরিত্র এবং একইসাথে অনেকগুলো ঘটনা সমান্তরালে ঘটে চলার বর্ণনা রয়েছে। যারা আমাজনের দাবানল বিষয়ক তথ্য জানতে অরাজি নন তারা দিব্যি হজম করে নেবেন বইটা (তবে ধীরেসুস্থে পড়লে হজম আরো ভালোভাবে হবে)।
একপর্ণিকা প্রকাশন "ব্যাবসা" বানানের প্রতি আলাদা ভালোবাসা পোষণ করে একথা আগেও এক রিভিউতে লিখেছিলাম। এই বইতে বানান এবং বাক্যগঠনের ভুল লেখকের "ত্রিকালচক্ষু" বইয়ের তুলনায় সামান্য কম। পাঠকেরা অবশ্য লেখকের লেখনীর মহিমায় ওসব ভুল নিজগুণে মাফ করে দেবেন বলেই বিশ্বাস। বইয়ের শেষে সহায়ক তথ্যপঞ্জি নেই দেখে অবাক হয়েছি।