হাসনাত শোয়েবের লেখা ভালোলাগার মূল কারণ স্বতন্ত্রতা। লেখকের নিজস্ব জগতের গভীর আত্মগত কথা পড়ে সব বুঝতে পারি না; এজন্য আমার জ্ঞানের স্বল্পতা মূলত দায়ী। তবে তাঁর লেখার ধরণ তাকে অন্যান্য লেখকের থেকে আলাদা করে। এজন্যই হাসনাত শোয়েবের যেকোনো লেখা আমার প্রিয়।
সমসাময়িক লেখকদের এধরনের গদ্য পড়ে লেখকদের আলাদা করে আইডেন্টিফাই করা কষ্টসাধ্য। সেখানে হাসনাত শোয়েব লেখা পড়লেই বোঝা যাই যে এটা তাঁর লেখা। এটাই লেখক হিসেবে হাসনাত শোয়েবের সার্থকতা।
তবে কোনো বই পড়ে যে সব বুঝতে পারতে হবে তেমন কোনো কথা নেই। একটা লাইনও যদি ভালো লাগে এবং ভাবতে বাধ্য করে তবে তাই সই।
"সেই সব ফল, তাদের অসুখ। ক্রমশ ছুটে গেছে হাসপাতালের দিকে। সারি সারি মৃত লাশ শেষে পড়ে থাকে। অসুখের ফল তার বিমর্ষতা নিয়ে, ফিরে আসে তোমার ঘরে, যুদ্ধের ময়দানে। ঘোড়ার আস্তাবলে অসংখ্য সংসপ্তকের ভিড়ে পড়ি শুয়ে যাবতীয় ঈর্ষা নিয়ে। কালও যাবে সে রোগীর পথ্য হয়ে। গাণ্ডীব ছুঁড়ে পেড়ে নেবে আরো ফল। অট্টহাসি ছুঁড়ে দেবে তোমাদের ক্রুরতার দিকে।"
"সেই সব প্রসূতিদের মনে আছে, যারা মেতেছিল সন্তান প্রসবকালীন গানে? ফিরে পেতে চেয়েছিল মেঘমল্লার। কিছুই পায়নি তারা। কেবল হরিৎ এই রাত। যার বুকে থেমে থেমে বাজে ধনুর্বিদ্যা। সেও কি তবে গান, বিপদ সংকেত? ফেরা হবে না জেনেও গলায় তুলেছিল সুর, হাতে নিয়েছিল পিস্তল। অসংখ্য চিৎকার ও শব্দে যারা ভেদ করে গিয়েছিল তোমাদের হেভিমেটাল।" - পৃষ্ঠা ১৮
'শেফালি কি জানে' পাঠের পর হাসনাত শোয়েবের প্রতি মনুষ্য আচরণজনিত হাই এক্সপেক্টেশন তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক বিষয়। তবে লেখালেখি মনে হয় ওভাবে কাজ করে না। লেখক / কবির শ্রেষ্ঠ কর্মের সাথে অন্যান্য কাজের তুলনা এসে যায় তবে প্রতিটি লেখা বা গ্রন্থের তো নিজস্ব সিগন্যাচার থাকে। 'সন্তান প্রসবকালীন গান' এরকম নিজস্বতা নিয়ে এগুনো এক কবিতার বই।
রিভিউর প্রথমটা পড়লেই দেখা যায় ছন্দ বা কবিতার প্রথাবদ্ধ ব্যাকরণের চেয়ে অনুভূতি প্রকাশের দিকে পুরো বই জুড়ে হাসনাত শোয়েবের নজর ছিলো বেশি। ভাষা যদিও চিন্তার অগ্রবর্তী, তারপরও শুধুমাত্র ভাষায় সব মনোযোগ দিয়ে দিলে অনেক সময় কবির মূল ভাষ্য হয়তো হারিয়ে যেতে পারে।
কবিতাগুলো আমার মনে হয়েছে একটি আরেকটির সাথে ধারাবাহিকভাবে কানেক্টেড। সব কবিতা মিলিয়ে একটি আখ্যান রচনা করতে চেয়েছেন মনে হয় হাসনাত শোয়েব। যেখানে 'সন্তান প্রসবকালীন গান' এর গল্পই শুনানো হয়েছে।
কবিতার সাথে মিথলজিক্যাল প্রাসঙ্গিকতা এবং সমসাময়িক পপ কালচারের উপমা হিসেবে প্রয়োগ ভালো লেগেছে। যদিও কবিতার উর্ধ্বে এসব ছাপিয়ে যায় নি। এই পরিমিতিবোধ প্রশংসনীয়। তবে আমার কাছে যেহেতু সবগুলো কবিতার বিষয়বস্তু বা থিম এক এবং ধারাবাহিকভাবে এক আখ্যানের দিকে অগ্রসরমান মনে হয়েছে, তাই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোয় একই থিমের কল্পনা পরিধি আরেকটু বৃহৎ হলে ভালো লাগতো। এক কবিতা হতে আরেকটির থিম একই হওয়ার পরও আরো বৈচিত্রময়তা সম্পন্ন হলে ভালো লাগতো। এই বিষয়ে কবির কথা-ই অবশ্য শেষ কথা। উক্ত বিষয়ে হাসনাত শোয়েব কি বলবেন সেটি শুনতে আমি আগ্রহী।
"সব সুরই একদিন হারিয়ে ফেলে তার বাদককে। হঠাৎ দুপুরের পর তার মনে পড়বে না কোনো সুর। মনে পড়বে না জেনেও সে গান বাঁধে। যেন এই আহির ভৈরবেই সে ডানা মেলে ছিল, ধরেছিল সন্তান প্রসবকালীন গান। সেই গান যার আছে শরীর। আছে মাংস ও জন্মদাগও। কোনো এক ভোরেই সে শিখেছিলো ধনুর্বিদ্যা। বাদককে লক্ষ্য করেই একদিন যে ছুঁড়ে দেবে সমস্ত বান।" - পৃষ্ঠা ২৬
একটা বড় ক্রেডিট কবি হাসনাত শোয়েবকে অবশ্য দিতে হয়। তিনি কবিতাপাঠকের মনোজগতে চেতনে বা অবচেতনে একধরণের বিপন্নতা এবং বিমর্ষতা সৃষ্টি করতে চেয়েছেন মনে হয়েছে। এই কর্মটি তিনি ভালোভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন।
বই রিভিউ
সন্তান প্রসবকালীন গান লেখক : হাসনাত শোয়েব প্রথম প্রকাশ : অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ প্রকাশনা : চন্দ্রবিন্দু প্রচ্ছদ ও স্কেচ : ইউসুফ বান্না নামলিপি : রাজীব দত্ত অলংকরণ, মুদ্রণ ও বাঁধাই : চন্দ্রবিন্দু ডিজাইন এন্ড প্রিন্টার্স রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
যেমন বাংলা বইয়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন বোঝার জন্য লেকচার/পাঞ্জেরী গাইড, মাধ্যমিক গণিত বইয়ের জন্য আদিল গাইড, চৌধুরী হোসাইনের সাথে সলুশন বই থাকতো সেরকম এই বইয়ের জন্যও একখানা সহায়িকা বই বের করা জনগণের দাবি।
"মইরা যাবার আগে তোমার পরমকাঙ্খিত আকাঙ্ক্ষা কি? - প্রথমে অমরত্ব লাভ করা, তারপরে মরে যাওয়া।" উপরের কথাগুলো এই বইয়ের জন্য প্রযোজ্য। হাসনাত শোয়েব সাহেবের উচ্চাভিলাসী এই সৃষ্টকর্ম ঠিক খুব একটা মুভ করাতে পারলো না। কিছু জায়গাতে রিপিটেটিভ শব্দচয়ন বিরক্তিই লেগেছে।
হাসনাত শোয়েবের স্বার্থকতা এই যে, কোন বইয়ের, হোক সেটা উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ কিংবা কবিতা, তা পাঠ করার ক্ষেত্রে এক লাইন থেকে আরেক লাইনে যাওয়ার পরে, আগের লাইন সম্পর্কে যে সচেতন থাকতে হয় বা এক পৃষ্ঠা থেকে আরেক পৃষ্ঠায় গেলে পূর্বের পৃষ্ঠার ব্যাপারগুলো মাথায় রাখবার যে একধরণের কসরত করতে হয়, তিনি অর্থাৎ হাসনাত শোয়েব আমাদের সেই জায়গা থেকে মুক্তি দিতে পারছেন।