সত্তর দশকের জাপান। অদ্ভুত এক বিষণ্ণতা ছেয়ে আছে সর্বত্র। সেই বিষণ্ণমাখা দিনগুলোতে নামহীন এক যুবক গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে আসে নিজের শহর কোবেতে। যুবক টোকিওর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে। জীবন সম্পর্কে ব্যাপক উদাসীন এই তরুণ গল্পকথক। জীবনের একুশটি বসন্তে যুবক মোট তিনবার প্রেমে পড়েছে। কিন্তু একবারও তা ধরে রাখতে পারেনি। কোনো এক অদ্ভুত কারণে প্রেম আর প্রেমিকা দুটোই শূন্যে মিলিয়ে যায়। তাই যুবক দুনিয়ার অন্তর্নিহিত অর্থটা জানতে চায়। এমতাবস্থায় পরিচয় হয় র্যা টের সঙ্গে। দুজনের মধ্যে একটা বিষয়ে বেশ মিল – দুজনই লেখক হবার স্বপ্ন দেখে।
তরুণ অনুপ্রাণিত হয় অচেনা এক লেখকের রচনায়। সেই লেখকের লেখায় দর্শন খুঁজে বেড়ায় সে। অন্যদিকে, র্যা ট চায় ঘুর্ঘুরে পোকা নিয়ে বেশ সিরিয়াস একটা উপন্যাস লিখতে। কিন্তু এসব কিছু না করে, সমুদ্র তীরের সেই বন্দর শহরে জে’র বারে বসে দুজনে শুধু বিয়ার গেলে। সেবারই চতুর্থবারের মতো প্রেমে পড়ে যুবক। কিন্তু মেয়ে আর যুবক দুজনই চায় নিজের কাছ থেকে পালাতে। এমনকি র্যা টও চায় নিজের কাছ থেকে নিজেকে বাঁচাতে। যৌবনের এই নিরস সময়কালের গল্পটা মাত্র ১৮ দিনের। কিন্তু ডালপালা বিস্তার করে তা তরুণের পুরো যৌবনের এক চিত্রিত রূপ হয়ে উঠে যেন।
তরুণ বসে থাকে বারে কিন্তু তাঁর মনোজগত হেঁটে চলে সমানতালে, বাস্তব আর পরাবাস্তব জগতের মধ্যিখানে। পাঠক হেঁটে বেড়ায় সেই মনোজগতের অলিগলি জুড়ে। মুরাকামির অন্যান্য সাহিত্যের মতোই এই গল্পেও পরাবাস্তবতা এসে ভিড় করে বাস্তবতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে। সম্পর্কের জটিলতা, একাকীত্ব আর নিঃসঙ্গতার ভাজে দর্শন প্রকাশ পায় ক্ষনে ক্ষনে। বিশ্ববিখ্যাত লেখক হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস হিয়ার দ্য উইন্ড সিং। যা প্রকাশের পরপরই জিতে নেয় জাপানের সম্মানজনক গুনজো সাহিত্য পুরষ্কার। র্যা ট ট্রিলজির প্রথম বইয়ের পরাবাস্তব জগতে পাঠকদের স্বাগতম।
“মুরাকামি মানেই যেন পোস্টমর্ডানিজমে পূর্ণ কোনো সাহিত্য। এবং তা মুগ্ধ করতে ও আনন্দ দিতে কখনোই ব্যর্থ হয় না।” - দ্য অপরাহ ম্যাগাজিন
“মুরাকামির প্রথমদিককার লেখা হলেও নতুনত্ব বা অপরিপক্বতার ছিটেফোঁটাও নেই। বরং ইতিমধ্যেই এবং পরিপূর্ণভাবেই মুরাকামিকে খুঁজে পাওয়া যায়।” - দ্য গার্ডিয়ান
Haruki Murakami (村上春樹) is a Japanese writer. His novels, essays, and short stories have been best-sellers in Japan and internationally, with his work translated into 50 languages and having sold millions of copies outside Japan. He has received numerous awards for his work, including the Gunzo Prize for New Writers, the World Fantasy Award, the Tanizaki Prize, Yomiuri Prize for Literature, the Frank O'Connor International Short Story Award, the Noma Literary Prize, the Franz Kafka Prize, the Kiriyama Prize for Fiction, the Goodreads Choice Awards for Best Fiction, the Jerusalem Prize, and the Princess of Asturias Awards. Growing up in Ashiya, near Kobe before moving to Tokyo to attend Waseda University, he published his first novel Hear the Wind Sing (1979) after working as the owner of a small jazz bar for seven years. His notable works include the novels Norwegian Wood (1987), The Wind-Up Bird Chronicle (1994–95), Kafka on the Shore (2002) and 1Q84 (2009–10); the last was ranked as the best work of Japan's Heisei era (1989–2019) by the national newspaper Asahi Shimbun's survey of literary experts. His work spans genres including science fiction, fantasy, and crime fiction, and has become known for his use of magical realist elements. His official website cites Raymond Chandler, Kurt Vonnegut and Richard Brautigan as key inspirations to his work, while Murakami himself has named Kazuo Ishiguro, Cormac McCarthy and Dag Solstad as his favourite currently active writers. Murakami has also published five short story collections, including First Person Singular (2020), and non-fiction works including Underground (1997), an oral history of the Tokyo subway sarin attack, and What I Talk About When I Talk About Running (2007), a memoir about his experience as a long distance runner. His fiction has polarized literary critics and the reading public. He has sometimes been criticised by Japan's literary establishment as un-Japanese, leading to Murakami's recalling that he was a "black sheep in the Japanese literary world". Meanwhile, Murakami has been described by Gary Fisketjon, the editor of Murakami's collection The Elephant Vanishes (1993), as a "truly extraordinary writer", while Steven Poole of The Guardian praised Murakami as "among the world's greatest living novelists" for his oeuvre.
বই: হিয়ার দ্য উইন্ড সিং লেখকঃ হারুকি মুরাকামি অনুবাদক: Wazedur Rahman Wazed বইয়ের ধরণ : উপন্যাস প্রকাশক: প্রতীক মুদ্রিত মূল্য : ২৪০ টাকা প্রচ্ছদ: কৌশিক জামান পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১১৯
I wish they all could be California girls I wish they all could be California I wish they all could be California girls
---The Beach Boys
আমি যখন ক্লাস সিক্স অথবা সেভেনে পড়ি, তখন থেকেই কষ্টের কিছু হলেই কলম দিয়ে প্রত্যেকটি লাইন ধরে লিখতাম। নানু যেদিন মারা গেল, বাসার সবাই একপাশের ঘরে কাঁদছিল। আর আমি কলমটা ঘষে লিখছিলাম অনবরত। পৃষ্ঠার কালিগুলো জমাটবদ্ধ নীলাভ হয়ে যেত সাথে ঝরতে থাকা চোখের জলে। অজস্র দুঃখে অনেক কান্নার পরে যেমন অনুভব হত, লেখার পরেও আমার তেমন অনুভব হত। তখন আমার নিজেকে উদ্ভট মনে হত। যন্ত্রণাদায়ক মনে হত। সবাই কাঁদছে, আমিও ঠিক বুক ফাঁটিয়েই তো কাঁদি, তবে অক্ষরে ঝরে পড়ে সেসব বর্ষণ!
আজকে যে বইটি নিয়ে বয়ান করবো তার ভেতরেও এমন সত্ত্বা লুকিয়ে রয়েছে। যেখানে মুল চরিত্র বলে,
"আমার কাছে লেখালিখি ভয়াবহ ধরনের এক যন্ত্রণাদায়ক কাজ। মাঝে মধ্যে কেবল একটা বাক্য লিখতেই পুরো এক মাস সময় পার করে দেই আমি। আবার কখনো কখনো তিন দিন এবং তিন রাত একটানা লেখার পর আমি বুঝতে পারি যে, যা লিখেছি তার সবটাই আসলে ভুল।"
এই গল্পটির শুরু আঠারো দিনের এক উপাখ্যানের মধ্য দিয়ে। গল্পের প্রোটাগনিস্ট একুশ বছরের নামহীন এক টগবগে যুবক। যার স্বপ্ন লেখক হওয়ার। জীবনে প্রেমের বসন্তে ভেসেছে তিন তিনটিবার। কিন্তু প্রত্যেকবারেই সম্পর্কগুলো স্থায়িত্ব পেতে ব্যর্থ হয়েছে। টোকিওর একটা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে সে। প্রত্যেক সামার ভ্যাকেশনে নিজের বাড়িতে যায়। আমাদের গল্পেরও শুরু সেই সামার ভ্যাকেশনে। ১৯৭০ সালের ৮ আগস্ট থেকে শুরু করে প্রায় আঠারো দিনের গল্প, যার সমাপ্তি ঘটে একই বছরের ২৬ তারিখে। লেখক তার জন্মস্থানের শহরে যায় যেটি মুলত একটা বন্দর শহর। সমুদ্রের তীরে এই বন্দর শহরে রয়েছে তার প্রিয় বন্ধু, র্যাট। ঘটনাক্রমে দুই বন্ধু একি স্বপ্ন দেখে। র্যাটও লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখে। গোবরে পোকাকে নিয়ে সিরিয়াস ধরনের একটা উপন্যাস লেখার ইচ্ছে আছে তার। তার গল্পে দুটো বিষয় অতীত গুরুত্বপূর্ণ বলে সে দাবী করে। প্রথমত, কোনো যৌনতার বিবরণ দেওয়া যাবেনা। আর দ্বিতীয়ত, গল্পে কারো মৃত্যু দেখানো যাবে না। যদিও বাস্তবে লেখার এসবের কিছুই করে না। প্রতিদিনকার কাজের মধ্যে র্যাট জে নামে এক বড় ভাইয়ের বারে বসে বিয়ার খায়; আর পিনবল খেলে।
এদিকে, গল্পের মুল চরিত্র আমাদের লেখকের জীবনে চতুর্থ বারের মত আবারও প্রেমের বসন্ত আসে। এবারের প্রেমটি একদমই অন্যরকম। প্রথম তিনটি প্রেমের মধ্যে প্রথম প্রেমটি সতেরো বয়সে হয়েছিল। হাইস্কুল ক্লাসমেট। গ্রাজুয়েশন শেষ করার কয়েক মাস পরই বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল। দ্বিতীয় প্রেমের মেয়েটির সাথে লেখকের দেয়া হয় সাবওয়ের শিনঝুকু স্টেশনে। সেখানেই মেয়েটি থাকত। আধ ময়লা জামা, উস্কখুস্ক চুলে। কোথা থেকে এসেছে মেয়েটি কখনোই বলত না। এভাবেই অজানায় একদিন মিশে যায় স্মৃতি রেখে মেয়েটিও। তৃতীয় প্রেমটি হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। লাইব্রেরিতে প্রথম দেখা। পরের বছর বসন্তের শুরুর দিকে টেনিস কোর্টের শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট বনে তাকে খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল ফাঁস দেওয়া অবস্থায়! এবার লেখকের জীবনে আবারও বসন্তের আগমন। গভীর এক রেশের শুরু। লেখকের এবারের বসন্ত কি এগোবে সামনে? নাকি মানুষ প্রতিনিয়ত নিজের সত্ত্বা থেকেই পালিয়ে থাকতে চায়?
আধুনিক জাপানিজ সাহিত্যগুলো পড়লেই আমি মার্ক্সের এলিনিউশেন থিউরিটি যেন চরমভাবে উপলব্ধি করতে পারি। সম্পর্কগুলোর টানা-পোড়ন, অস্থিরতা বিশ্বায়নের এই গ্লোবাল ভিলেজের রূপে প্রতিনিয়ত মানসিক দৈন্যতাকেই যেন চিহ্নিত করে। হিয়ার দ্য উইন্ড সিং ও ঠিক তেমনি আঠারো দিনের বিষন্নতার এক যাত্রাপথ। উপন্যাসের মূল চরিত্র লেখক, যে পারিবারিক ঐতিহ্য রক্ষায় এখনো নিজের বাবার জুতো পলিশ করে দেয় অথবা স্পষ্ট করে বললে তাকে দিয়ে জুতো পলিশ করান। বাবা আর সন্তানের মাঝে যদিও মানসিক দুরত্বের বিশাল সেতু চলে এসেছে। এদিকে, বন্ধু র্যাট ধনীর সন্তান হয়েও এক তীব্র অনীহা তার ধনীদের প্রতি। প্রত্যেকে অপ্রাপ্তির মাঝেই যেন ক্রমশ ডুবে যায়।
"বিষণ্ণ আত্মার অধিকারী লোকজনের বিষণ্ণ স্বপ্ন ব্যতীত আর কিছুই নেই। বিষণ্ণ আত্মার অধিকারীদের সত্যিকার অর্থেই কিছু নেই কেবল স্বপ্ন ব্যতীত।"
এ উপন্যাসের রচয়িতাকে বিষণ্ণতার আকাশ বলা যায়। কিন্তু মোটেও মানুষটি কিন্তু প্রথম থেকেই লেখালেখির স্বপ্নে বিভোর ছিলেন না। মুলতঃ গানবাজনা নিয়ে ছিল তীব্র আগ্রহ। তার ছিল একটি জ্যাজ বার। বয়স ঊনত্রিশের কিনারায়। সারাদিন জ্যাজ বারের পেছনেই কেটে যেত সময়। দুনিয়ার বাকি চিন্তার তার জীবনে কোনো অস্তিত্বই ছিলনা। সেই মানুষ একদিন গেলেন বেজবল খেলা দেখতে। খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ মাথায় একটা গল্প এল। এবং তিনি ভাবতে লাগলেন তিনি চাইলেই তো গল্পটি লিখতে পারবে। সে রাতে বাসায় ফিরেই তিনি লিখতে বসলেন। জ্যাজ বারে কাজের ফাঁকে ফাঁকে যেটুকু সময় পাওয়া তাতেই গল্পটির মেরুদণ্ড দাঁড়িয়ে গেল। এমননি, একটা কম্পিটিসনে পাঠালে গল্পটি প্রথম পুরষ্কার ও পেয়ে যায়৷ সাহিত্যজগতে "হিয়ার দ্যা উইন্ড সিং" এর আবির্ভাবটা এমনই। সেই সাথে আধুনিক সাহিত্য পেয়েছে বিষণ্ণতা আর পরাবাস্তবতার মোড়কে একটি নাম, হারুকি মুরাকামি।
হিয়ার দ্য উইন্ড সিং গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় জুন ১৯৭৯ এ। গুনজোর একটি ইস্যুতে। এবং পরের মাসে এটি বই হিসেবে প্রকাশিত হয়। জাপানি চলচ্চিত্র নির্মাতা কাজুকি ওমরি উপন্যাসটি অবলম্বনে ১৯৮১ সালে একটি চলচ্চিত্র নির্মান করেন।
এ উপন্যাসটি রেট ট্রিলজি-র প্রথম বই। তথ্যমতে, ধারাটির চারটি বইয়ের সবগুলোই ইংরেজিতে অনুদিত হয়। পিনবল ১৯৭৩, আ ওয়াইল্ড শিপ চেইজ কিছুটা পরিচিতি এনে দিলেও মুরাকামি জনপ্রিয়তার স্বাদ পায় "হার্ড বয়েল্ড ওয়ান্ডারল্যান্ড অ্যান্ড দ্যা এন্ড অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড" থেকে। কিন্তু, হিয়ার দি উইন্ড সিং ও পিনবল ছাড়া বাকীগুলো জাপানের বাইরে খুব বেশি পঠিতও হয়নি। মুরাকামি তার এক সাক্ষাৎ কারে এ উপন্যাস দুটিকে নিজের সবচেয়ে অপরিপক্ক সময়ের লেখা বলে অভিহিত করেন!
হিয়ার দ্য উইন্ড সিং বইটির পুরো কাহিনি জুড়েই আছে একের পর এক বিয়ারের বোতল খালি করা, র্যাটের বই পাঠ আর উপন্যাস লিখবার তাড়না। ডেরেক হার্টফিল্ড নামের এক জনপ্রিয় অজানা আমেরিকান লেখকের গল্প, যে কিনা একদিন আত্মহত্যা করেছিল এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিং এর ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তার বুকে জড়ানো ছিল হিটলারের একটা পোর্ট্রেট আর হাতে একটা ছাতা!
বইটির নামকরণটি বেশ অদ্ভুত। মুলতঃ ট্রুম্যান কাপোটির শেষ গল্প শাট এ ফাইনাল ডোর থেকে হিয়ার দ্য উইন্ড সিং নামটি এসেছে। শাট এ ফাইনাল ডোরের শেষ বাক্য "Think of nothing things, think of wind" থেকেই আগমন উপন্যাসের নামটির। তবে প্রথম প্রকাশ গুনজো সাহিত্য পুরস্কার কমিটির কাছে জমা দেওয়ার সময় নাম ছিল হ্যাপি বার্থডে এন্ড ওয়াইট ক্রিস্টমাস। মুরাকামির সাহিত্য গুলো আমার কাছে ডার্ক ওয়াটার ঘরানার মনে হয়।
এ বইটির অনুবাদ এ বছর বইমেলাতে এসেছে ওয়াজেদুর রহমান ওয়াজেদের হাত ধরে। বিভিন্ন ওয়েবের মারফতে তার লেখা আমি আগেই পড়েছি। অনুবাদ সে হিসেবে এই প্রথম পড়া। সাবলীলতা তার লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেটা তিনি এ অনুবাদেও ধরে রেখেছেন। ছোট ছোট লাইনের মাধ্যমে গভীরতায় প্রকাশ করে। ভূমিকাতে তার হৃদয় উজাড় করা ভালবাসায় আপ্লূত করেছে প্রিয় মানুষদের। কিন্তু, বইটির প্রোডাকশন আমার কাছে মনে হয় আরো ভাল হতে পারত। পড়তে গিয়ে পৃষ্ঠা বাইন্ডিং থেকে ছুটে এসেছে। আপনি বিষণ্ণতার কারিগরের বই একবার পড়ে তো ফেলে রাখবেন না, বার বার পড়তে চাইবেন।
এ বছরে মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বেড়েছে, বিষণ্ণতার মাত্রাও তেমন জুড়েছে মানুষের অন্তরে। সেখানে হিয়ার দ্য উইন্ড সিং অনেকটা বিষে বিষক্ষয়ের মত হবে। জীবনের বিষণ্ণতার আরেক টোটকা হিসেবে ভালই শ্রান্ত করবে চিত্ত।
(পাঠ পর্যালোচনা: হিয়ার দ্য উইন্ড সিং|মুরাকামি|ওয়াজেদ)
▪লেখকরা লেখক কেন হয়? লেখা কি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ? হাসান আজিজুল হক বলেছেন, “লেখকের পথ বড়ই বিপদসংকুল। এটা সম্পূর্ণ একার পথ। কঠিন এক সাধনা। কোনো লেখকের পক্ষে কি বলা সম্ভব, তিনি কেন লেখক হয়েছেন? মাঝেমধ্যে আমার মনে হয়, লেখক না হয়ে উপায় ছিল না বলেই শেষ পর্যন্ত লেখক হয়েছি।” পৃথিবীতে লেখালেখি না হলে সভ্যতা এগুতো না, সমাজ সম্মৃদ্ধ হতো না তাই কিছু মানুষকে অবশ্যই লিখতে হয়। অনেকেই লিখেন সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ধারক হয়ে তারা পরিবর্তন করেন, ভাঙেন এবং গড়ে তোলেন। সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ববোধ থেকে উনারা লিখতে বসেন। আবার অনেকে লেখেন শুধুই ইচ্ছার দিকে তাকিয়ে। ওদের মধ্যেও অনেকেই পরিবর্তনের ধারক হয়ে ওঠে। কেউ কেউ লিখেন তাদের মন চাই বলে, লেখাকে শখ হিসেবে দেখে ওরা লিখতে বসে। কেউ হঠাৎ করে ধুমকেতুর মতো আসে হারুকি মুরাকামির মতো।
জাপানের বিখ্যাত স্টুডিও জিবলিতে ১৯৯৫ সালে ‘হুইসপার অব দ্য হার্ট’ নামের একটা Animation film তৈরি হয়। হাইস্কুলে পড়া ‘শিজুকু সুকিশিমা’ নামের এক ভুলোমনা কিশোরী অনেক বই পড়ে। জীবন সম্পর্কে ব্যাপক উদাসীন বইপোকা কিশোরীটি বই পড়তে থাকায় একসময় তারমধ্যে লেখার আগ্রহ তৈরি হয়। শিজুকু দেখে সিজি নামক এক কিশোর তার শখ বেহালা বাজানো শিখতে চায় এবং সে এটা নিয়ে অনেক সচেতন ও কর্মব্যস্ত। শিজুকু তার দেখা পেলে সে তার স্বপ্ন লেখালেখি নিয়ে খুব সচেতন হয়ে ওঠে ও বাস্তবায়ন করতে অনেকটা কর্মঠ হয়ে পড়ে। শিজুকু এবং সিজি দুজনেই তাদের স্বপ্ন পূরণে এগুতে থাকে কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠার সাথে। শিশুদের মন ও মননকে বিশ্লেষণ করে চলচিত্রটিতে এবং তাদের শিল্পী হয়ে উঠার নানা উপাদান দেখানো হয়।
শিজুকু এবং “হিয়ার দ্য উইন্ড সিং”এর মেইন প্রোটাগনিস্টের মাঝে কিছু অংশে মিল খুঁজে পাই। নামহীন মেইন প্রোটাগনিস্ট স্বপ্ন দেখে লেখক হবার। নামহীন তরুণ ‘আই গল্পকথক’ বিভিন্নজনের বই পড়ে। অনুপ্রাণিত হয় অচেনা এক লেখক “ডেরেক হার্টফিল্ড”এর লেখা ও জীবন থেকে, হার্টফিল্ডের লেখায় এবং জীবনে সে দর্শন খুঁজে বেড়ায়। “আই গল্পকথক” বলে, “হার্টফিল্ড নিয়ে এটাই বলতে চাই যে, যদি আমি ডেরেক হার্টফিল্ড নামে পরিচিত কোন লেখকের সঙ্গস্পর্শে না যেতাম তাহলে লেখালেখিই শুরু করতে পারতাম না; নাহ, আমি অতটা দূর অবধি যেতেও সক্ষম হতাম না।” “আই গল্পকথক” হার্টফিল্ডের একটা চিন্তা নিয়ে দারুণ অনুপ্রাণিত হয়, হার্টফিল্ড বলে, “সবাই যা জানে তা নিয়েই যদি লেখককে লিখতে হয়, তাহলে একজন লেখকের লেখার সার্থকতা কোথায়?” ‘আই গল্পকথক’ ভালো লেখালেখি সম্পর্কে ডেরেক হার্টফিল্ড কী বলেন তাও দেখেন, হর্টফিল্ডের চিন্তাটির কথা ‘আই গল্পকথক’ এভাবে বলেন, “যে লোক সাহিত্য রচনা করেন অর্থাৎ কিনা লেখক, নিজের সৃষ্টির মধ্যেই নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। এবং নিজের অবস্থান আর দূরত্ব সম্পর্কে সদা সজাগ থাকেন। তিনি কী উপলব্ধি করেছেন সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং তিনি যে মাপকাঠিটা ব্যবহার করেছেন, সেটাই মুখ্য বিষয়।” বইয়ের আরেকটা চরিত্র মেইন প্রোটাগনিস্টের বন্ধু র্যাট সেও লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখে, সে ঘুর্ঘুরে পোকা নিয়ে ভালো সিরিয়াস একটা উপন্যাস লেখার আগ্রহের প্রকাশ করে। যদিও লেখালেখির চেয়ে বেশি সে বিয়ার গিলাতে ব্যস্ত হয়ে থাকে।
"হিয়ার দ্য উইন্ড সিং"এর লেখক হারুকি মুরাকামি, মিস্টার হারুকির লেখক হবার কোন ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা কোনটাই ছিল না। একদিন বেজবল খেলা দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা গল্প মাথায় উঁকি দিলে মিস্টার হারুকি প্রতিদিন সময় করে লিখতে বসেন যা দশমাস পরে একটা উপন্যাসে রূপায়িত হয়। এবং তা জাপানের বিখ্যাত ম্যাগাজিন গুঞ্জো পত্রিকায় ছাপা হয়। হারুকির পরের ইতিহাস হয়তো তাকিয়ে থাকার মতোই, হারুকি মুরাকামিকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি, উপস্থিত হয় একের পর এক উজ্জ্বল নক্ষত্র নিয়ে। ‘হুইসপার অব দ্য হার্ট’ ফিল্মে একটা কথা শুনতে পাই এমন, “জিনিসটিকে নিথর পাথর থেকে ঘষে বের করে সুন্দর আকার দিলে তা মণি মরকত হয়ে উঠবে। মানুষের বেলাও দীর্ঘ সময়ের শ্রম আর নিষ্ঠার বিনিময়ে শিল্পী হয়ে উঠতে হয়।” র্যাট কিংবা ‘আই গল্পকথক’ ভবিষ্যতে তাদের কেমন দেখা যেতে পারে? তাদের স্রষ্টা হারুকির মত?
▪‘হিয়ার দ্য উইন্ড সিং’ উপন্যাসের মূল পটভূমি ‘আই গল্পকথক’র জন্মভূমিকে ঘিরে। সম্পূর্ণ বইয়ে মেইন প্রোটাগনিস্ট বিশ বছর বয়সী যুবকটির নাম কোথাও উল্লেখ নেয়। সে গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে আসে তার জন্মশহরে। ১৯৭০ সালের ৮ অগাস্ট থেকে শুরু হয়ে মোটামুটি আঠারো দিনের গল্প। অগাস্টের ২৬ তারিখ এটার সমাপ্তি ঘটে। মেইন প্রোটাগনিস্ট ‘আই গল্পকথক’ স্বপ্ন দেখে একদিন লেখক হবে। টোকিওর একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সে। তার ছোট্ট জীবনে এর মধ্যেই তিনবার প্রেম এসেছিলো কিন্তু কোন এক অজানা কারণে একটিও তার জীবনে স্থায়িত্ব হয় নি। তার ক্লাসমেট মেয়েটার সাথে সে প্রথম শুয়েছিল, তারপর ভবঘুরে মেয়েটা, তারা একসময় হারিয়ে যায়। তারপরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি সাহিত্য মেজর নেয়া মেয়েটা, সে আত্মহত্যা করে কিন্তু ‘আই’ তার কারণও জানতে পারে না। হাতের মুঠোয় চাপিয়ে ধরা পানির ন্যায় টুপটুপ করে পড়ে সবগুলো প্রেম যেন হারিয়ে যায় হাতের মুষ্টি ফসকে। আমরা আঠারো দিনের গল্পে দেখতে পাই ‘আই গল্পকথক’এর বন্ধু ধনীর সন্তান র্যাটকে। র্যাট ধনী বাবার সন্তান হলেও সে বলে, “ধনী চোদনাগুলো সব জাহান্নামে যাক!” তার স্বপ্নের কথা ইতিমধ্যে বলেছি। তার ঘুর্ঘুরে পোকা নিয়ে উপন্যাস লেখার স্বপ্ন থাকলেও তাকে সারাদিন জে'র বারে বসে বিয়ার পান আর পিনবল খেলতে দেখা যায়। র্যাট ‘আই গল্পকথক’এর সাথে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলপ করে। ‘আই’ বলে “র্যাটের গল্পগুলোতে দুইটা বিষয় অতীব গুরুত্বপূর্ণ : প্রথমত, কোনো যৌনতার বিবরণ দেয়া যাবে না। আর দ্বিতীয়ত, গল্পে কারো মৃত্যু দেখানো যাবে না।” ইতিমধ্যেই ‘আই গল্পকথক’এর জীবনে আরেকবার প্রেম আসে, লেখক এখানেও সেই মেয়ে চরিত্রের নাম অজানা রেখে দেন। অজ্ঞাতনামা এক তরুণী হিসেবে তাকে পরিচয় দেয়া হয়। তার হাতের আঙুল নয়টি। এভাবে ক্যালিফোর্নিয়া রেকর্ড, সমুদ্র পাড়, রেডিও ও জে'র বার হয়ে গল্প এগুতে থাকে। র্যাট গল্পে শেষবারের মতো নয় আঙুলওয়ালার সাথে শুয়। একপর্যায়ে ‘আই গল্পকথক’র জীবন থেকে সেই অজ্ঞাতনামা তরুণীটিও হারিয়ে যায় বাকি প্রেমগুলোর মত। অনিবার্য নিয়তির মতো নিজের কাছ থেকে একসময় সব হারিয়ে য���য়। 'আই'য়ের প্রয়াত দাদির প্রিয় বক্তব্য ছিল, “বিষণ্ন আত্মার অধিকারী লোকজনের বিষণ্ণ স্বপ্ন ব্যতীত আর কিছুই নেই। বিষণ্ণ আত্মার অধিকারীদের সত্যিকার অর্থেই কিছু নেই কেবল স্বপ্ন ব্যতীত।” আই'য়ের বুঝি শুধু স্বপ্নই রয়ে গেল জীবনে। “I wish they all could be California girls. I wish they all could be California. I wish they all could be California girls.” —The Beach Boys
▪মানুষের মাঝে বসবাসরত অদৃশ্য এক শক্তির সাথে মানুষের মাঝেমাঝে সখ্যতা গড়ে উঠে আবার অনেকসময় সেই শক্তির হাত থেকে তারা হাফ ছেড়ে বাঁচতে চায়। একসময় তারা নিজের কাছ থেকেই নিজেকে বাঁচাতে চায়, তারা কি বাঁচাতে পারে? হিয়ার দ্য উইন্ড সিং উপন্যাসে লেখক তরুণ বয়সী মানুষের জীবন, জীবনদর্শন, মনস্তত্ত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব এবং পরিবর্তন দেখায়। অনুবাদক ওয়াজেদুর রহমান ওয়াজেদের অসাধারণ বর্ণনাকুশলে চমৎকার একটা উপন্যাস।
▫বই: হিয়ার দ্য উইন্ড সিং ▫লেখক: হারুকি মুরাকামি ▫অনুবাদক: ওয়াজেদুর রহমান ওয়াজেদ ▫প্রকাশক: প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা ▫পরিবেশক: Obosar Prokashona ▫পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১১৯ ▫মুদ্রিত মূল্য: ৳২৪০.০০
হারুকি মুরাকামির প্রথম উপন্যাস "হিয়ার দ্য উইন্ড সিং"। ১৯৭৯ সালে প্রকাশিত হওয়া প্রথম উপন্যাস দিয়েই পুরষ্কার লাভ করেন। এই উপন্যাস অবলম্বনে চলচিত্র নির্মাণও হয়েছে। গল্পকার আর তার বন্ধু র ্যাটকে নিয়েই বইয়ের গল্প এগিয়েছে। গল্পের শুরু হয়েছে ১৯৭০ সালের আগষ্টের ৮ তারিখ এবং শেষ হয়েছে ২৬ আগষ্ট। র ্যাটে এর সাথে গল্পকারের পরিচয় কলেজে ভর্তি হওয়ার সময়। গল্পকার ও তার বন্ধু দুজনেরই লেখক হওয়ার ইচ্ছা। গল্পকার বই পড়তে ভালোবাসেন কিন্তু তার বন্ধু বই পড়েন না। দুজনেই জে'র বারে বসে বিয়ার পান করে। গল্পকার চারবার প্রেমে পড়েন। চারবারই তার প্রেম আর প্রেমিকা দুটোই হারিয়ে যায়। উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা আর সম্পর্কের জটিলতা। যা মুরকামির লেখায় বারবারই দেখা যায়। উপন্যাসের ইতি ঘটে গল্পকারের টোকিও যাওয়ার মধ্য দিয়ে।
অনুবাদ খুবই সাবলীল ছিলো। অনুবাদক ওয়াজেদুর রহমান ওয়াজেদ এর আগে মুরাকামির "আফটার দ্য কোয়েক" অনুবাদ করেছেন। পড়ার তালিকায় রয়েছে সেটিও। অনুবাদকের জন্য শুভ কামনা থাকলো। সেই সাথে অনুরোধ রইলো অনুবাদকের কাছে মুরাকামির অন্যান্য উপন্যাসগুলোও যেন তিনি অনুবাদ করেন।