লােকজ সংস্কৃতি বিষয়ক দেশব্যাপী বিস্তৃত তথ্যসমৃদ্ধ উপাদান নিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হলাে, বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের লােকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা। বাংলাদেশের ফোকলাের চর্চার ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানভিত্তিক আলােচনা না হওয়ায় প্রাথমিক পর্যায়ের যে-কাজ - Genre চিহ্নিতকরণ ও তার বিশ্লেষণ করা হয়নি। “লােকসাহিত্য' বলেই ফোকলােরের সব উপাদানকে চালিয়ে দেওয়ার একটি ধরতাই প্রবণতা দেখা যায়। সেই অবস্থা থেকে। বাংলা একাডেমি Genre চিহ্নিতকরণ ও বিশ্লেষণের (genre identification and analysis) মাধ্যমে বাংলাদেশের ফোকলােরের প্রাথমিক বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার পদ্ধতিটি নিশ্চিত করে। পরবর্তীকালে অন্যান্য অশথাক্রমে পটভূমি (context-big setting, small setting), পরিবেশনা (performance), অর্থানুসন্ধান (meaning), কাজ (function) ইত্যাদি প্যারাডাইম অনুসরণ করার মাধ্যমে ফোকলাের আলােচনাকে পরিপূর্ণভাবে 'বিজ্ঞানভিত্তিকতার উপর দাঁড় করাতে চায়। গ্রন্থমালার এই খণ্ডে বর্তমান মৌলভীবাজার জেলার লােকজ সংস্কৃতির বিশদ পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে মৌলভীবাজারের সমৃদ্ধ ফোকলাের উপাদানসমূহকে Genre ভিত্তিকভাবে সাজানাে হয়েছে।
Shamsuzzaman Khan (29 December 1940[2] – 14 April 2021 ) was a Bangladeshi academician, folklorist, and writer who served as president of Bangla Academy since June 2020 until his death in April 2021. He also served as the director general of the academy during 2009–2018.He was notable for editing book series on folk culture of 64 different districts in 64 volumes and collections of folklore series in 114 volumes. He was awarded Bangla Academy Literary Award in 2001, Ekushey Padak in 2009 and Independence Day Award in 2017 by the Government of Bangladesh.
(গুডরিডসের এই এক বদখাসলত, সামান্য একটা ভুল বানান ঠিক করলেই লেখাটা আবার সবার সামনে নিয়ে যায়। বিরক্তিকর ব্যাপার। দুইটা অসঙ্গতি থাকায় এই লেখাটা এডিট করতেই হলো।)
আমার পূর্বপুরুষেরা ছিলেন মৌলভীবাজারের। সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে তারা আবাস গাড়েন পাশের জেলা হবিগঞ্জে। অবশ্য তাদের থাকা ও ছেড়ে যাওয়ার সময়টায় মৌলভীবাজার নামটি বরাদ্দ ছিল মনু নদীর পাড়ে অষ্টাদশ শতাব্দীতে মৌলভী সৈয়দ কুদরতুল্লাহ’র পত্তনকৃত একটি বাজারের জন্যই শুধু। আজকের মৌলভীবাজার জেলা তখন ছিল দক্ষিণ শ্রীহট্ট বা সাউথ সিলেট মহকুমা (তৎকালীন শ্রীহট্টের পাঁচটি মহকুমার একটি। বাকি চারটি : শ্রীহট্ট সদর, হবিগঞ্জ, করিমগঞ্জ, সুনামগঞ্জ)। আমার জন্ম এবং শৈশব কাটে হবিগঞ্জে। তিন পুরুষ পরে নতুন এক শতাব্দীর প্রারম্ভে আব্বার চাকরিসূত্রে আমরা ফিরি আমাদের আদিভূমিতে। দুই যুগ ধরে আছি এখানেই। ফলে এই গ্রন্থ পাঠ আমার জন্য ছিল নিজের জানাশোনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা বা ক্ষেত্রবিশেষে জানাটাকেই পুনরায় ঝালাই করে নেওয়ার মতো। পাশাপাশি অজানা কিছু জানার ইচ্ছা তো স্বাভাবিকভাবেই ছিল। যেমন, মৌলভীবাজারের আদিবাসী সম্প্রদায়ের লোকাচার সম্পর্কে জানতে পারলাম বইটি থেকে। আগ্রহ থাকলেও যা নিয়ে আমার জ্ঞান ছিল বলতে গেলে শূন্যের কোটায়।
খারাপ লেগেছে বস্তুগত লোকসংস্কৃতির অনেক কিছুই আজ পুরোপুরি বিলুপ্ত দেখে। যা আছে সেগুলোর অনেক কিছু বর্তমানে ধুঁকছে। আজ না হোক কাল হারিয়ে যাবে। বইয়ের পাতায় ঠাঁই দিয়ে লোকসাহিত্যের চিরতরে মুছে যাওয়া রোধ করা গেলেও বস্তুগত লোকসংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখার কাজটা কঠিন। কারণ, বস্তুগত লোকসংস্কৃতি যেহেতু দেখার জিনিস তাই এক্ষেত্রে ‘Out of sight, out of mind’ কথাটি খুব খাটে।
টাঙ্গাইল শাড়ি নিয়ে যা হলো বা হচ্ছে তাতে মৌলভীবাজারের কিছু পণ্যের জিআই স্বত্ব চুরি যাওয়ার আগেই আমাদের নিয়ে নিতে হবে। যেমন, আগর আতর (এটা ইতোমধ্যে জি আই স্বীকৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে), চা, রাবার, আনারস, লেবু, খাসিয়া পান, মিষ্টি পান, মণিপুরি বস্ত্র।
সিলেটিদের একতা উদাহরণযোগ্য। দেখেছি, কয়েক পুরুষ ধরে লন্ডনে বসবাসকারী বা আসামের বরাক উপত্যকা (কাছাড়, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি জেলা নিয়ে গঠিত) কিংবা ত্রিপুরা ও মেঘালয়ের সিলেটিরাও আর সব পরিচয়ের আগে সিলেটি পরিচয়টাই গর্বভরে দিয়ে থাকেন। সিলেটিদের এই ভ্রাতৃত্ববোধের প্রমাণ দিতেই যেন কোক স্টুডিও বাংলার ‘মুড়ির টিন’ গানে বলা হয় ‘... সিলেট আমার বাড়ি, বাদ দিলাও রে বা তুমারেও তো দেখতে লাগের মৌলভীবাজারী’—অর্থাৎ দোষ করেছো, ব্যাপার না। আসল কথা হলো, তুমি সিলেটি, আমিও সিলেটি। ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আমরা একটু বেশি আবেগপ্রবণ এবং সংবেদনশীল। অল্পতেই বর্তে যাই, আবার রুষ্টও হই সামান্যতে। তাই মৌলভীবাজারী হওয়ায় মৌলভীবাজার নিয়ে লেখা বই হাতে নিয়ে খুশিতে গদগদ হয়েছি সত্য, কিন্তু বইয়ে দোষত্রুটি থাকলে এক্ষেত্রে কোনোভাবেই ‘বাদ’ দিতাম না। তবে সত্যিই বইটির কোনো বৃহৎ ভুলভ্রান্তি নজরে পড়েনি। টুকটাক বানান ভুল ছিল। যা দেওয়া আছে তা থেকে আরও সুন্দর অর্থ দেওয়া যেত কিছু সিলেটি শব্দের। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে সিলেটি ভাষা একটি স্বতন্ত্র ভাষা, চাটগাঁইয়া ভাষার মতোই, উপরন্তু সিলেটি ভাষার আছে ‘নাগরী’ নামের নিজস্ব লিপি।
মৌলভীবাজার সম্পর্কে মজার এবং অধিকাংশের অজানা একটি তথ্য এ বইয়ে অনুপস্থিত ছিল। ১৯৪৭ সালে অনুষ্ঠিত সিলেট গণভোটে তৎকালীন দক্ষিণ শ্রীহট্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার কংগ্রেসের কুঁড়েঘর প্রতীকে ভোট দিয়েছিল অর্থাৎ তারা ভারতের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিল। শতাংশের হিসেবে যা ছিল করিমগঞ্জের পাকিস্তানে থাকতে চাওয়ার চেয়েও বেশি। এবং সেটা চা-শ্রমিক, আদিবাসী ও নিম্নবর্গের হিন্দুদের ভোটদানে মুসলিমলীগের বাধা দেওয়ার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও। তবে বৃহত্তর সিলেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ যেহেতু মুসলিমলীগের কুড়াল প্রতীকে ভোট দিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গেই থাকতে চেয়েছিল সেহেতু দক্ষিণ শ্রীহট্ট পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়া অযৌক্তিক নয় করিমগঞ্জ ভারতের হয়ে যাওয়ার মতো। এটি যদিও ইতিহাসের বই নয় (ছোট করে অবশ্য মৌলভীবাজারের ইতিবৃত্ত বর্ণিত হয়েছে)। ফলে এ তথ্য না থাকা কোনো ত্রুটি নয়। তবে থাকলে ভালো হতো।
বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা সিরিজের জন্যই বাংলা একাডেমির সাতখুন মাফ হয়ে যায়, অন্তত আমার কাছে। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠোর পরিশ্রমসাধ্য এ কাজটির জন্য সম্পাদকমণ্ডলী ও সংশ্লিষ্ট সবাই প্রশংসার দাবিদার। লোকসংস্কৃতি গ্রন্থমালা সিরিজের পরের যে দুটি বই পড়ব সে দুটি হবে হবিগঞ্জ এবং সিলেট জেলা বিষয়ে। এবং পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জেলার লোকজ সংস্কৃতির পাঠও নেব এই সিরিজের দ্বারস্থ হয়ে।