১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর সকালে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে বেধে যায় তুলকালাম। জাসদের তৈরি বিপ্লবী গণবাহিনীর একটি দল হাইকমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করতে গিয়ে বাধার মুখে পড়ে। পাল্টা আক্রমণে ঘটনাস্থলেই নিহত হন চারজন। দুজন আহত অবস্থায় ধরা পড়েন। কেন এই অভিযান? কীভাবে হলো এর আয়োজন? দেশে-বিদেশে কেমন হলো এর প্রতিক্রিয়া। এ নিয়ে অনেক দিন ধরেই আছে গুঞ্জন, বিভ্রান্তি ও বিক্ষিপ্ত আলোচনা। সাক্ষাৎকার ও নানান সূত্র ঘেঁটে ইতিহাসের এই টালমাটাল পর্বের একটি ছবি তুলে ধরেছেন অনুসন্ধানী গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ। সেই সঙ্গে উঠে এসেছে এই অভিনব, রোমাঞ্চকর ও বিপজ্জনক স্বপ্নযাত্রার অভিযাত্রীদের জীবনের গল্প।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
টিনএজার আর সদ্য টিনএজ পেরোনো ছয় যুবক জাসদ গণবাহিনীর দলীয় সিদ্ধান্তে ভারতীয় হাইকমিশনে গিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করে দলীয় নেতাদের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার পরিকল্পনায় অংশ নেয়। এক ভুলে চারজন স্পটডেড। দুইজন আহত হয়ে পরে জেলে যায়। দল তাদের অস্বীকার করে। পৃথিবীর নিষ্ঠুরতা অল্প বয়সে দেখে ফেলা যুবকদের খোঁজ নেয় না কেউ। না মৃতদের, না জীবিতদের। বইটির লেখক সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার চেয়েও পায় না। সবার মাঝে অস্বীকার করার প্রবণতা। বেঁচে যাওয়া দুই যুবকের একজন এখন সংসদ সদস্য, আরেকজন চড়াই উতরে দুনিয়ায় টিকে থাকার লড়াইয়ে। দুই জনের দুটি পথ গেছে বেঁকে। বইটা পড়ার পর বারবার একটা কথাই মনে হচ্ছে, 'সাফল্যের পিতার অভাব হয় না আর ব্যর্থতা কারো না কারো জারজ সন্তান।'
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরবর্তী এক দশককাল বেশ টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। সে সময়টাতে ঘটে যাওয়া এক ঘটনা নিয়ে এ বই।
লেখকের অন্য এক বই পড়ে সর্বপ্রথম এ ঘটনার কথা জানতে পারি। সে সময়টাতে কর্নেল তাহেরের আটকের মতো পরিস্থিতিতে জাসদ গণবাহিনী এক দুঃসাহসিক পরিকল্পনা করে। তৎকালীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতকে অপহরণ করে আটক জাসদ নেতাকর্মীদের মুক্তির ব্যবস্থা করা।
কিন্তু আগমুহূর্তে পরিকল্পনা আমূল-পরিবর্তন ঘটে। মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পরিবর্তে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত সমর সেনকে অপহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পরিকল্পনা করেন কর্নেল তাহেরের ভাই আনোয়ার হোসেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বভার দেয়া হয় জাসদের ছয় তরুণ গণবাহিনী সদস্যকে।
তবে তাদের আক্রমণ ব্যর্থ হয়। চার সদস্য নিহত হন। রাষ্ট্রদূত সমর সেনও আহত হন। ঘটনাটা সে সময়টাতে বেশ আলোড়ন তুলেছিল।
পুরো ঘটনার অংশগ্রহণকারী, প্রত্যক্ষদর্শী বয়ান লিপিবদ্ধ করা হয়েছে এ বইয়ে। পড়ে বেশকিছু নতুন তথ্য জানা হলো।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম দশক বিভিন্ন কারণে অনেক আলোচিত আবার সমালোচিতও! ঐসময়ের রাজনীতি পাড়া ছিলো উত্তাল! আর এই উত্তাল সময়েই বাংলাদেশে জন্ম নেয় ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ নামে একটি রাজনৈতিক দল! যারা ‘জাসদ’ নামে পরিচিত।
স্বাধীনতার প্রথম দশকে পরপর তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটে। প্রথম অভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্ব-পরিবারে নিহত হন। পরবর্তী অভ্যুত্থান ঘটান খালেদ মোশাররফ, তাঁর এই অভ্যুত্থান ব্যার্থ হয়।রক্তপাতহীন এই অভ্যুত্থানে স্বাধীনতার এই বীর সেনানি নিজেই নিহত হয়। পরবর্তী অভ্যুত্থান ঘটায় মেরজ মঞ্জুরেরা। তাদের অভ্যুত্থানে প্রাণ হারান তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।
খালেদ মোশাররফের অভ্যুত্থানে কর্নেল তাহেরের সহযোগিতায় মেজর জিয়া মুক্তি পায়। কর্নেল তাহের ছিলেন জাসদের নেতৃস্থানীয়দের মধ্যে অন্যতম। খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যে অভ্যুত্থান হয় তা ছিলো রক্তপাতহীন! সে জিয়াকে বন্দী করে তাকে অবসরে যেতে বাধ্য করে কিন্তু কর্নেল তাহেরের অনুগত সিপাহিদের মাধ্যমে খালেদের এই অভ্যুত্থান ব্যার্থ হয় এবং তিনি নিহত হন।
জিয়াকে বন্দীদশা থেকে মুক্ত করে কর্নেল তাহের আর জিয়া মিলে একটা চুক্তিতে আসতে চেয়েছিলো। কর্নেল তাহের তার কিছু দাবিদাওয়া নিয়ে হাজির হয় জিয়ার কাছে। কিন্তু জিয়া আর তাহেরের মনস্তাত্ত্বিক ধন্দে হেরে যায় তাহের। ব্যার্থ হয় তাহেরের সিপাহি বিপ্লব। আর এই ব্যার্থ বিপ্লবের পর থেকে জাসদের ভাগ্য ঘুরতে থাকে অন্যদিকে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলার প্রতিটি মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁর এক কথায় বাঙালি যুদ্ধে নামে চিনিয়ে আছে বিজয়! কিন্তু একসময় এই চরম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি হয়ে উঠেন চরম ঘৃণিত হিসেবে। আর এরই সুযোগ নিয়ে সরকার উৎখাতের নীতি নিয়ে জন্ম নেয় জাসদ। জাসদ বিপ্লবের মাধ্যমে বর্তমান সরকার উৎখাতের করে বাংলাদেশকে একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলো।
জাসদের বলা বিপ্লবে যোগ দেয় সেসময়ের তরুণ ছাত্ররা। যারা দেশকে নতুন করে গড়তে যোগ দেয় জাসদের গণবাহিনীতে। স্বপ্নবাজ এইসব তুরুণদের দিয়ে জাসদ বিপ্লবের নামে অনেক কর্মকাণ্ড করায়। যার অন্যতম প্রধান একটি কাজ হলো বিপ্লবের মাধ্যমে সরকারকে উৎখাত করা।
জাসদের এইসব কর্মকাণ্ডের জেরে ঐসময়ের সরকার তাদেরকে ধরপাকর শুরু করে। আর এই ধরপাকড়ের মধ্যে আটক হন জাসদের সভাপতি মেজর এম এ জলিল, আ স ম আব্দুর রবসহ নেতৃস্থানীয় নেতারা। এই নেতাদেরকে মুক্ত করার জন্য জাসদ একটা নতুন পন্থা অবলম্বন করে!
এই নতুন পন্থা হলো ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাসে ঢুকে দূতাবাসের হাইকমিশনার সমর সেনকে জিম্মি করে সরকারকে বাধ্য করা, যাতে সরকার জাসদের আটককৃত নেতাদেরকে ছেড়ে দেয়!
আর এই পরিকল্পনাকে বাস্তব রূপ দিতে ৬জন সাহসী তরুন যুবা ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর ঢুকে পড়েন ভারতীয় হাইকমিশনে! এই ৬জন হলো মাসুদ, হারুন, সবুজ, বাচ্চু, বেলাল এবং বাহার!
তারা কি সফলতা পেয়েছিল বা তাদের পরিনতিই বা কি হয়েছিল তা বিস্তারিত জানতে পড়তে হবে বাংলাদেশের বিখ্যাত গবেষণাধর্মী লেখক ‘মহিউদ্দিন আহমদ’ রচিত ‘অপারেশন ভারতীয় হাইকমিশন’ বইটি।
পাঠ প্রতিক্রিয়া : বইটিতে এমন একটা বিষয় উল্লিখিত হয়েছে যা সম্পর্কে আমার পূর্বে জানা ছিলোনা। বইটি পাঠে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি অন্যতম ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পেরেছি।
লেখকের লেখার প্রতি আমার আস্থা রয়েছে। আশাকরি তিনি সত্যটিই তুলে ধরেছেন। লেখকের মতো আমারও মনে প্রশ্ন জাগে আমেরিকান হাইকমিশনার থেকে হঠাৎ কেনো ভারতীয় হাইকমিশনারকে জিম্মি করার সিদ্ধান্ত হলো!!
বইয়ের নাম : অপারেশন ভারতীয় হাইকমিশন। লেখকের নাম : মহিউদ্দিন আহমদ। বইয়ের ধরন : ইতিহাস। মুদ্রিত মূল্য : ৩০০৳ পৃষ্ঠা সংখ্যা : ১৩৬টি। প্রকাশনীর নাম : প্রথমা প্রকাশন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ঝঞ্ঝা বিক্ষুদ্ধ সময়ের (১৯৭৫) প্রায় বিস্মৃত এক টুকরো ঘটনার বিশ্লেষণ লেখক মহিউদ্দিন আহমদ এই বইয়ে এঁকেছেন। লেখকের বই এর তালিকা করলে সহজেই বোঝা যায় যে একাত্তর থেকে পচাত্তর তার প্রিয় বিষয়, এই সময়ের গভীর বিশ্লেষণ রয়েছে তার মগজে। এরই আরেকটি উৎকৃষ্ট প্রমাণ এই বই টি।
��াংলাদেশের প্রথম বিরোধী দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ( জাসদ) এর একটি সশস্ত্র বা সামরিক অংশ খোলা হয় যাকে বলা হয় গণবাহিনী যার প্রধান ছিলেন আমাদের ক্রাচের কর্নেল আবু তাহের। এই গণবাহিনীর ৬ জন তরুণ ২৬ নভেম্বর, ১৯৭৫ সালে ভারতীয় হাইকমিশনার সমর সেন কে জ��ম্মি করে দাবি আদায় করতে চায়। সমর সেন - যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের হয়ে একের পর এক অধিবেশনে বক্তৃতা দিয়ে গেছেন। কিন্তু বলা বাহুল্য এই অভিযান ব্যর্থ হয় কয়েকটি কারণে। জাতি তো বটেই জাসদ ও এ অভিযানে জড়িতদের বেমালুম ভুলে যায়, আখ্যা দেয় অবিপ্লবী! কেন্দ্রীয় নেতারা এ অভিযান সম্পর্কে কিছুই জানতেন না বলে আখ্যা দেন।
কিন্তু অভিযান যদি সার্থক হতো, ইতিহাস কি অন্য মোড় নিতে পারতো না?
এ সবকিছুই লেখক অভিযানকে কাছ থেকে দেখা কয়েকজনের জবানিতে বা প্রত্যক্ষ সমৃতিলেখনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন।
এত যে প্রশংসা করলাম তবে রেটিং কেন তিন ? কারণ আমার মতে লেখক লেখাটিকে তার ভূমিকাতে বর্ণিত পলিটিক্যাল থ্রিলার রূপে গড়ে তুললে ই বেশি আকর্ষণীয় হতো। কথোপকথন, বিশ্লেষণ আর ঘটনা বর্ণনার এক জগাখিচুড়ী হয়ে গেছে বইটি।
পঁচাত্তরে রাজনীতির উত্তাল সময়ে জাসদের গণবাহিনীর ৬ তরুণ সদস্যের দুঃসাহসী এক ব্যর্থ অভিযান। অভিযান সফল হলে দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট কেমন হতো তা বলা মুশকিল। জাসদের রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এটি। যদিও জাসদের নেতৃত্ব এই ৬ তরুণকে এক প্রকার অস্বীকারই করেছে।