এই সংকলনের ছটি বিস্তারিত উপাখ্যানকে ফ্যান্টাসির আশ্চর্য ফসল বলা যায়। দুই মলাটের মধ্যে আপনাদের জন্যে ধরা রইল এমনই এক মায়াজগত যেখানে একটা বাতিল পাম্পমেশিনের শরীরী সম্মোহনে ধরা দেয় এক নারী অথবা নিহত প্রেমিক বাদুড়ের রূপ ধরে ফিরে আসে। যেখানে একটা ক্যালাইডোস্কোপের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি শিশুকে কিম্বা দেড়শো বছর আগে জেলেদের জালে ধরা পড়া মৎস্যকন্যা পরিত্যক্ত রেলগুমটির মেঝেতে শুয়ে শরীর বিক্রি করে। কল্পনার প্রাবল্য আর ভাষার জাদু মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বুঁদ হয়ে পড়বার মতন এই ছটি উপাখ্যান।
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
প্রকৃত অর্থে ডার্ক ফিকশন পড়তে চান? পড়তে চান এমন কিছু গল্প, যাদের বীভৎসতার জেরে এই আমার আপনার মতন অন্ধকার প্রেমী পাঠকেরাও শিউরে উঠতে বাধ্য হবে? সৈকত মুখোপাধ্যায় রচিত এই বইটি তাহলে সাবধানে এক ছিমছাম দুপুর দেখে পড়ে ফেলুন। চাইলে রাতের দিকেও পড়তে পারেন। তবে তাতে যদি আবার ঘুমের দফারফা হয়, সে দায় আমার নয়।
জানি এসব শুনে হয়তো হাসছেন। ভাবছেন, এসব মশলাদার মার্কেটিং লাইন তো প্রত্যেক 'ভূতের বই'-এর পেছনেই সেটে দেওয়া হয়। এতে আবার নতুনত্ব কি আছে? আপনাকে খুব একটা দোষ দেওয়া যায় না যদিও। তবে কিনা আর পাঁচটা ভয়ের বইয়ের থেকে 'নোনা বালি চোরা টান' ভীষণ ভাবে স্বতন্ত্র।
বইটিতে মাত্র ১৬০ পাতার মধ্যে আবদ্ধ রয়েছে ছটি বড় মাপের বিষাক্ত গল্প। এমন বীভৎস ধাচের ডার্ক-ফ্যান্টাসি বাংলা সাহিত্যে খুব একটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। প্রবাদপ্রতিম সাহিত্যিক অনীশ দেবের ভূমিকাটি তাই এ ক্ষেত্রে বেজায় মানানসই। প্রতিটি গল্পেই উঠে এসেছে মানুষ-মনের অন্ধকার দিকগুলোর পাশবিক বহিঃপ্রকাশ। সমাজের জঘণ্যতম নৃশংসতার অকাট্য প্রতিফলন এই মানুষরূপী আয়নায়। বইটি শেষ করে তাই একবার স্নান করে নেবার ইচ্ছে, হলেও হতে পারে।
লেখকের যাবতীয় লেখার সাথে এতদিন পরিচয় না থাকবার দরুন, গল্পগুলো পড়ে বেজায় আশ্চর্য হলাম। সুন্দর সাবলীল লেখনী, লেখার মধ্যে এক ধরনের নিজস্বতা মজুদ। তবে কিনা এরকম একটা বই পড়তে বসলে লেখনীশৈলি উপভোগ করার অবকাশ থাকে না। পাঠক-মন তখন মত্ত এক বিকৃতমনষ্ক পিশাচপ্রহরে। দোসর হিসেবে তার জন্যে অপেক্ষমান, চাপা অস্বস্তি এবং অনেকখানি গা-বমি ভাব।
মানুষের পৈশাচিক প্রবৃত্তি নিয়ে লেখা এমন একটি বইয়ের পরিবেশনা জম্পেশ না হলে হতো না। এখানেই প্রকাশক অরণ্যমণ ফুল মার্কস নিয়ে যাওয়ার দাবিদার। সুন্দর প্রচ্ছদ, পরিষ্কার টাইপসেট, সুঠাম বাঁধাই। উপরন্তু ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য্যের করা আকর্ষনীয় অলংকরণ। এমন একখানি বই শেলফের শোভা বৃদ্ধির পক্ষে উপযুক্ত।
বইটিকে চার তারা দেওয়াতে কি প্রমাণ হবে জানি না, তবে একটা কড়া 'ট্রিগার ওয়ার্ণিং' না দিলেই নয়। সতর্কবার্তা হিসেবেই বলব, অতিমাত্রায় নৃশংসতা সইতে না পারলে এ বই পড়ে খামোকা নিজেকে কষ্ট দেবেন না। পাঠক হিসেবে স্বেচ্ছায় সৈকত মুখোপাধ্যায়ের এই অন্ধকার পাঁকে আবার ফেরবার ইচ্ছে নিয়ে ইতি টানলাম।
ডার্ক ফিকশন পড়েছিলাম ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ বইটাতে, আর এই বই যেন তারই পরের অধ্যায়। ৬ টি গল্প প্রতিটাই জঘন্য থেকে জঘন্যতর। গা রিরি করে ওঠা, বমি পেয়ে যাওয়া, দেওয়ালে মাথা ঠোকার ইচ্ছা সব হতে পারে এই গল্পগুলির ঘৃণ্যতা দেখে। 🤮🤮
🌀 এই বইয়ের কেন্দ্র হল মানব মনের আবর্জনা। সমাজের তলানিতে থাকা এক প্রকারের মানুষদের মনের নোংরা গুলোকে ঘেঁটে, নিংড়ে যেন লেখক নিজের বইয়ের রসদ বের করে এনেছেন। রেপ, খুন সব থেকে হাল্কা ঘটনা এই গল্প গুলিতে। 🫀 লেখক একদম মানুষের মনের অন্ধকার অংশের সবথেকে অন্ধকার জায়গায় ডুব সাঁতার দিয়ে গল্প গুলি লিখেছেন। 🌀 আর এনার চরিত্রদের মধ্যে খুব কম ব্যক্তিই মানসিক ভাবে সুস্থ। কেউ বিকৃত চিন্তা নিয়ে ঘুরে বেড়ায় আবার কেউ মানসিক রোগের শিকার। কিন্তু সবেতেই তাদের হাত দিয়ে হওয়া কাজ গুলো জঘন্য নোংরা।🤢 এত নোংরা যে আপনি পড়তে পড়তে থেমে যাবেন শুধু ভয় আর বীভৎসতার shock এ।
🌀 কিছু গল্প ডার্ক ফ্যান্টাসি তে পরে আর কিছু ডার্ক ফিকশন এর মধ্যে। দুটি নখের দাগ পড়ে বমি পেয়ে গেছিল। 🧠 কিড়া-জড়ি আরও নোংরা গল্প। গল্পের পরিণতি অদ্ভুত রকম ভালো কিন্তু শুরুতে যা পৈশাচিক বিকৃতির উদাহরণ লেখক এনেছেন পড়তে পড়তে অস্বস্তির চূড়ান্ত সীমাও হার মেনে যাবে। ইভিল গল্পের পরিণতি দারুন। শেষে টুইস্টটা আশা করিনি। পাম্প ঘর, নোনা বালি চোরা টান, আয়না বাগান বেশ পরিণত সাইকোলজিক্যাল ডার্ক ফ্যান্টাসি। প্রতি ক্ষেত্রেই লেখক গল্পের কথক পাল্টাতে পাল্টাতে (মানে এক এক narrator এক এক রকম কথা বলবে) আপনাকেই এক ধাঁধার মধ্যে ফেলে দেবেন যে কে ঠিক আর কে ভুল বুঝতে। শেষে গিয়ে যদিও সত্য সামনে আসবে তবুও কিছু সন্দেহ থেকেই যাবে। 🧠🧠
তো অন্ধকার কে ভয় না লাগলে, একদিনের জন্য হাতে তুলে নিন "নোনা বালি চোরা টান।" আর ধীরে সুস্থে শেষ করে ফেলুন। সতর্কবাণী: খাবার আগে, ঘুমোতে যাওয়ার আগে, কাজে যাওয়ার আগে, বা প্রিয় মানুষটির সাথে সময় কাটানোর কোন প্ল্যান থাকলে সেইদিন এই বই এড়িয়ে যাওয়াই ভালো। মাথা একদম গুল্লে দেবে।
'ফ্যান্টাসি স্টোরিস' শব্দটা শুনলেই ছোটবেলায় আমাদের মনের পর্দায় ফুটে উঠত এক অলীক দুনিয়ার ছবি। এমন এক দুনিয়া যেখানে রাজা-রানী, রাজপুত্র-রাজকন্যা, রাজ্য বসবাসকারী সাধারণ প্রজাদের পাশাপাশি বিরাজ করত ভয়ানক দর্শন রাক্ষস-দৈত্য-ডাইনি পিশাচেরা। কাহিনীতে এই ডাইনি পিশাচদের অভিশাপে ছোট্ট রাজকন্যারা পাড়ি দিত চির-ঘুমের দেশে বা বন্দি হত কোন ভয়ানক দর্শন রাক্ষস-দৈত্যর হাতে। বহু বছর বাদে দূর দেশ থেকে তাদের উদ্বার করতে আসত এক সুপুরুষ রাজকুমার। যে নিজের সাহস ও বুদ্ধির সাহায্যে এই ডাইনি, রাক্ষস-দৈত্যদের হাত থেকে মুক্ত করত সদ্য যৌবনে পা ফেলা অপরূপ সুন্দরী রাজকন্যাকে। এই কার্যের উপহার-সরূপ সে রাজা-রানীর কাছ থেকে লাভ করত রাজকন্যা সহ গোটা রাজত্ব এবং বাকি জীবনটা তারা একসঙ্গে সুখেই কাটিয়ে দিত। অর্থাৎ কাহিনীর শেষে এসে সব কিছু ঠিক হয়ে যেত, যাকে বলে 'হ্যাপি-এন্ডিং'.
শৈশব ছেড়ে কৈশোর এর দিকে পা ফেলার সাথে-সাথেই আমরা বুঝতে পারি ছোটবেলার শোনা 'ফ্যান্টাসি স্টোরিস' এর দুনিয়াটা ছিল সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারণ ততদিনে আমরা বাস্তবের স্বার্থসর্বস্ব দুনিয়ার সাথে পরিচিত হতে শুরু করে দিয়েছি। আর ছোটবেলার দেখা রঙ্গিন কল্পনার জগৎটা ধীরে ধীরে ধূসর হতে শুরু করে দিয়েছে। এই স্বার্থসর্বস্ব ধূসর দুনিয়াকে প্রেক্ষাপট করে ভাষার জাদু ও কল্পনার মিশেলে সাহিত্যিক সৈকত মুখোপাধ্যায় সৃষ্টি করেছেন অন্ধকার সাহিত্যের এক নিজস্ব ধারা। বাংলা সাহিত্যে আমরা যাকে বলে থাকি 'ডার্ক ফ্যান্টাসি' বা 'আঁধারের আখ্যান'।
এইরকম ছটি কাহিনীর সংকলন এই বইটি। যা হল - ১) দুটো নখের দাগ ২) কিড়া-জড়ি ৩) নোনা বালি চোরা টান ৪) পাম্পঘর ৫) ইভিল ৬) আয়না বাগান
'ফ্যান্টাসি স্টোরিস' এর মতন এই কাহিনীগুলির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মহুয়া সিং, ঘুঙরু,মৎসকন্যা,কাবেরী,রেণুবালাদের মতন গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্ররা। যারা অবস্থার পরিস্থিতিতে কিছু রাক্ষসরূপী মানুষের হাতে বন্দি বা তাদের লোভ-কামের শিকার। অসহনীয় পরিস্থিতেও এই নারীরা সহজে হার মানে না বা নিজেদের অদৃষ্টকে দোষারোপ করে না। বিপদের চোখে চোখ রেখে তারা খুঁজতে থাকে মুক্তির পথ। আর এই কাজে তারা আস্থা রাখে দুটি বস্তুর উপর, সেটির একটি হল 'আশা' (Hope) এবং অপরটি হল 'ভালবাসা' (Love). রূপকথার গল্পের সোনারকাঠি রূপারকাঠির মতন এই বইয়ের প্রায় সবকটি গল্পের সাথে জড়িয়ে আছে এই আশা এবং ভালবাসা। কখনও পুরনো প্রেমিককে ফিরে পাবার আশা, কখনও কামাতুর মানুষরুপী পশুর হাত থেকে বাঁচার আশা, কখনও নিজের সৃষ্টিকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা। আর এই সবকিছুকে ছাপিয়ে রয়েছে কিছু অব্যক্ত ভালবাসার কথা - যা কাহিনীর শেষে পাঠককে 'হ্যাপি-এন্ডিং' ফিল দেয় না। বরং বুঝিয়ে দেয় কঠিন পরিস্থিতিতে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে এই ভালবাসার শক্তির ঠিক কতটা প্রয়োজন।
এই বইয়ের প্রতিটি গল্পের মধ্যেই রয়েছে ভয়াবহতা, আতঙ্কের পরিবেশ, গা শিরশিরানি, মানুষের লোভ ও কামপ্রবৃত্তির নির্লজ্জ্ব উপস্থিতি। গল্পগুলি পড়লে মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি বোধ কাজ করে, কিছু ঘটনা আপনার স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করতে পারে বা আপনার ভাবনার জগৎকে প্রবলভাবে আলোড়িত করতে পারে। মোট কথা কাহিনীগুলি আপনাকে মোটেই স্বস্তি দেবে না।বরং কাহিনীগুলির প্রতিটি চরিত্র এবং তাদের কার্যকলাপ আপনার মনের অন্তরস্থলে গভীর ছাপ রেখে যাবে। আপনি যদি এই ধরনের কাহিনী পড়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন তাহলে হাতে তুলে নিন সৈকত মুখোপাধ্যায়ের এই আশ্চর্য সৃষ্টিকে। আর অনুভব করুন ডার্ক ফ্যান্টাসির এই uncanny দুনিয়াকে। মহুয়া, ঘুঙরু, কাবেরী,রেণুবালারা আপনার হাতের ছোঁয়া পাবার অপেক্ষায় রইল।
সৈকত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে বেশি কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না, ডার্ক ফিকশন জর এর অবসংবাদিত রাজা তিনি। এই বইয়ের ছয়টি গল্পও তার ব্যতিক্রম নয়।
প্রথম গল্পটা পড়ে কিছুক্ষন চুপ করে বসে ছিলাম, যেমন ছিলাম "মৃত্যুর নিপুণ শিল্প" পড়ে। "দুটি নখের দাগ" এবং "নোনা বালি চোরা টান" - এই দুটো গল্প সৈকত বাবুর ট্রেডমার্ক "রসোমন" ধরণের গল্প। খুব সাধারণ একটা ঘটনা কে শুধুমাত্র perspective বদলে বা protagonist এর দৃষ্টিভঙ্গির unreliability দিয়ে অসম্ভব একটা রুদ্ধশ্বাস কাহিনীতে পরিণত করা।
তুলনায় ইভিল গল্পটি আমার অসাধারণ কিছু লাগেনি, তবে তাও বেশ ভালো। শেষ গল্পটি সবকটার থেকে আলাদা। গল্পের শাখা-প্রশাখায় একটি মার্ডার স্টোরি এগোতে থাকে, আর এতে আছে অদ্ভুত ভাবে সিমিলার characterization একটা ছোট্ট টুইস্ট।
সব মিলিয়ে ৫ তারার বদলে ৬ টা গল্পের জন্য ৬ তারা দেওয়া উচিৎ বইটার জন্য।
‘নোনা বালি চোরা টান’ পড়তে পড়তে বারবার মনে হচ্ছিল এই সংকলনটি বাংলার ভেতর থেকে উঠে আসা এক ভিন্ন ঘরানার সাহসী ঢেউ। সংকলনের প্রতিটি গল্পের অন্ধকার, ভয়, কল্পনা আর বিকৃতির ছায়া আমাকে বারবার লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজম, আফ্রিকার গাঢ় লোককথা আর পাশ্চাত্যের গথিক সাহিত্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের এই বইয়ের ছয়টি গল্প পড়তে গিয়ে পাঠক বুঝবেন যে লেখক শুধু কল্পনাই করেন না, তিনি পাঠককে নিজের অচেনা ঘরে, হালকা জ্যোৎস্না ভেজা অন্ধকারে, কিংবা কুয়াশার ভেতর হঠাৎ হোঁচট খেয়ে পিছলে পড়ার মতো কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পৌঁছে দেন।
চলুন গল্পগুলো দেখে নেওয়া যাক এক এক করে :
১) দুটো নখের দাগ: সৈকতের এই গল্প মাতৃত্ব, গর্ভাবস্থা ও জন্মের অন্ধকার রহস্যকে ঘিরে গড়ে ওঠে। এখানে আমরা দেখি দুই ধরনের বাস্তবতা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে—একদিকে ডাক্তার আর দাইমাসির মেডিক্যাল রুটিন, ঠান্ডা নিয়মমাফিক চিকিৎসাব্যবস্থা, অন্যদিকে গর্ভের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াল জন্মকাহিনি, যা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এই দ্বন্দ্ব থেকেই জন্ম নেয় গল্পের হরর।
পশ্চিমি সাহিত্যে এর সুনির্দিষ্ট প্রতিধ্বনি শোনা যায় Ira Levin-এর Rosemary’s Baby (1967)-তে। সেখানে মাতৃত্বকে ঘিরে থাকা পবিত্রতার পর্দা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে এক শয়তানি ষড়যন্ত্র—নারীর দেহ হয়ে ওঠে অশুভ শক্তির পরীক্ষাগার। সৈকতের গল্পও সেই রকমই একটি কাঠামো ব্যবহার করে: গর্ভাশয় কেবল জীবনের উৎস নয়, তা এক অন্ধকার দরজাও হতে পারে।
আফ্রিকান লোককথার ভেতরেও আমরা পাই এ ধরনের মোটিফ। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার ইগবো সমাজে প্রচলিত ogbanje আত্মা-কাহিনি। এই আত্মা নাকি বারবার জন্ম নেয়, শৈশবেই মারা যায়, আর মাকে চরম মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দেয়। এতে দেখা যায় মাতৃত্ব কোনও আশীর্বাদ নয়, বরং পুনঃপুন মৃত্যুর অভিশাপে জর্জরিত এক দুঃস্বপ্ন। সৈকতের গল্পে এই ছায়া যেন ভর করে আছে—জন্মই হয়ে ওঠে মৃত্যুর বাহক।
লাতিন আমেরিকার সাহিত্যেও একই টানাপোড়েন খুঁজে পাই। হুয়ান রুলফোর Pedro Páramo-তে জন্ম ও মৃত্যুর সীমান্ত যেন অস্বচ্ছ কুয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়—মানুষ জানে না, জন্ম কি আসলে জীবনের শুরু, না মৃত্যুর অন্য এক পথ। এই বিভ্রান্তি সৈকতের গল্পেও তীব্রভাবে প্রতিফলিত—গর্ভাশয়কে এখানে মনে হয় simultaneously cradle আর crypt।
সবশেষে, সৈকতের নিজস্ব ভয়ের মাত্রা তৈরি হয় তার লোকালাইজড স্পেস থেকে। পশ্চিমি বা লাতিন আমেরিকান টেক্সটে শহুরে বা গ্রামীণ পরিসর থাকলেও, সৈকতের গল্পে বাংলার প্রত্যন্ত এক মাতৃত্বকেন্দ্রই হয়ে ওঠে হররের মঞ্চ। পুকুরঘাট, কাদামাটি, বিদ্যুতের অভাব, দাইমাসির নখের দাগ—এই স্থানীয় উপকরণই গল্পকে স্বতন্ত্র করে তোলে। ফলে, গল্পটি একদিকে বৈশ্বিক সাহিত্যের হরর-মোটিফের সঙ্গে আত্মীয়তা বজায় রাখে, অন্যদিকে বাংলা গ্রামীণ বাস্তবতাকে অঙ্গীভূত করে এক বিশেষ ভয়ের পরিসর রচনা করে।
২) কিড়া জড়ি: সৈকতের এই গল্প পাহাড়ি ভূগোল, অচেনা প্রকৃতি ও এক রহস্যময় ছত্রাককে কেন্দ্র করে আবর্তিত, যেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, মানবিক লোভ আর প্রকৃতির অদম্য অন্ধকার শক্তি মিশে গেছে। এখানে বিদেশি গবেষকের উপস্থিতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিকে—যেখানে প্রকৃতি সবসময় অবজেক্ট, একে পরীক্ষা করতে হবে, দমন করতে হবে, অথবা তার থেকে মুনাফা তুলতে হবে।
পশ্চিমি সাহিত্যের প্রেক্ষিতে এ গল্পের সাদৃশ্য ধরা যায় Mary Shelley-এর Frankenstein (1818)-এ, যেখানে সৃষ্টির প্রতি বৈজ্ঞানিক উচ্চাভিলাষ ভৌতিক পরিণতিতে পৌঁছে দেয়। একইভাবে Jeff VanderMeer-এর Annihilation (2014)-এ Area X নামক জৈবিক মিউটেশনের অঞ্চল অজানা জীববৈজ্ঞানিক শক্তির ভয়াবহতাকে সামনে আনে। সৈকতের গল্পের ছত্রাক প্রকৃতির এমনই এক রূপ, যা বিজ্ঞান আর মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
আফ্রিকান সাহিত্যের দিকে তাকালে পাওয়া যায় এক ভিন্ন ধরনের সাদৃশ্য। Amos Tutuola-এর The Palm-Wine Drinkard (1952)-এ নানা গাছপালা ও ভেষজের মধ্যে গোপন ক্ষমতা থাকে, যা হিলার বা হার্বালিস্টরা ব্যবহার করে। আফ্রিকান লোককথায় ভেষজশক্তি সবসময় দ্বিমুখী—একদিকে নিরাময়, অন্যদিকে অভিশাপ। সৈকতের ছত্রাকও তাই: ওষুধের সম্ভাবনা আর বিপর্যয়ের আশঙ্কা একসাথে ধারণ করে।
লাতিন আমেরিকার জগতে, বিশেষ করে Gabriel García Márquez-এর One Hundred Years of Solitude কিংবা Alejo Carpentier-এর The Kingdom of This World-এ প্রকৃতিই হয়ে ওঠে অতিপ্রাকৃত চরিত্র। গাছ, পাখি, ফুল, বা মাটির ভেতরকার শক্তি মানুষের ভাগ্যকে পাল্টে দেয়। সৈকতের ছত্রাকও যেন তেমনই—বাস্তবতার গা ঘেঁষে থাকা অতিপ্রাকৃত এক উপস্থিতি।
অতএব, কিড়া জড়ি শুধু বৈজ্ঞানিক কৌতূহল বা লোকজ জাদুবিশ্বাসের গল্প নয়, বরং মানবসভ্যতার সেই পুরোনো প্রশ্নকে আবার সামনে আনে: মানুষ কি প্রকৃতিকে ব্যবহার করে, না প্রকৃতি মানুষকে ব্যবহার করে? সৈকতের ছত্রাক তাই নিছক একটি বায়োলজিক্যাল অবজেক্ট নয়, বরং মানুষের বিকৃত বাসনা ও লোভের রূপক—যা পশ্চিমি মিউটেশন-হরর, আফ্রিকান হার্বাল-লোর, আর লাতিন আমেরি��ান ম্যাজিক-রিয়ালিজমের সঙ্গে মিশে গিয়ে বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ধারার আতঙ্ক-অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
৩) নোনা বালি চোরা টান: পশ্চিমা সাহিত্যে মৎস্যকন্যা সাধারণত সৌন্দর্য ও বিষাদের দ্বৈত প্রতীক। হ্যান্স ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসনের The Little Mermaid এ তিনি প্রেমের জন্য আত্মবলির এক নির্মম রূপক, আর গ্রিক পুরাণে সমুদ্রদেবীরা একদিকে মোহময়ী, অন্যদিকে ধ্বংসের ঘন অন্ধকার—সাইরেনদের ডাক যেমন জাহাজডুবির কারণ। আফ্রিকান ইয়োরুবা পুরাণে Mami Wata আবার দ্বৈত সত্তা—একইসাথে কাম্য দেবী ও আতঙ্কজনক উপস্থিতি; তাঁর প্রেম যেমন আশীর্বাদ হতে পারে, তেমনি তিনি গ্রা���ও করতে পারেন। লাতিন আমেরিকার নদীপৌরাণিক কাহিনিতে জলপরী কখনও জাদুকরী প্রেমিকা, কখনও অভিশপ্ত বিভীষিকা, ঠিক যেমন গার্সিয়া মার্কেসের বাস্তব-অতিপ্রাকৃত স্রোতে নদী হঠাৎ হয়ে ওঠে অশুভ প্রাণের বাসস্থান।
সৈকতের গল্পে এই বৈশ্বিক মিথোজগৎ মিলেমিশে এক অচেনা মোড় নেয়। তাঁর মৎস্যকন্যা আর সৌন্দর্য বা আকর্ষণের রূপক নয়—বরং এক অভিশাপের অন্ধকার ছায়া। এখানে প্রেম বা মুক্তির ইঙ্গিত নেই, আছে এক অদৃশ্য টান যা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। যমন নামের ছেলেটির অভিজ্ঞতায় এই জলপরী হয়ে ওঠে হত্যার শৃঙ্খলার অদৃশ্য কারিগর—প্রতিবার সে আবির্ভূত হয়, মৃত্যু এসে লেগে থাকে। ফলে সৈকতের মৎস্যকন্যা রূপকথার কল্পনা থেকে সরে গিয়ে দাঁড়ায় জৈবিক হররের গর্ভে—সমুদ্র যেন নিজেই মানুষকে গ্রাস করার জন্য পাঠিয়েছে এক অমোঘ দূত।
৪) পাম্পঘর: এই গল্পে যৌনতা, রক্ত, ভালোবাসা ও ভয়ের অদ্ভুত মিশ্রণ রয়েছে, যা একদিকে শরীরের আসক্তি, অন্যদিকে আতঙ্কের অদৃশ্য শৃঙ্খল তৈরি করে। পশ্চিমী সাহিত্যে এর সাদৃশ্য টানা যায় কাফকার In the Penal Colony–এর সঙ্গে, যেখানে যন্ত্র ও শরীরের সংঘর্ষ থেকে জন্ম নেয় অস্বস্তির দার্শনিক ভৌতিকতা, আবার ক্লাইভ বার্কারের Books of Blood–এ মাংস, যন্ত্রণা ও ইরোটিসিজমের মিলনে তৈরি হয় হররের এক নতুন অভিধান। আফ্রিকার লোককথায় কঙ্গোর ndoki বা দানব-অধিকৃত ঘর মানুষের মধ্যে ভয় ছড়ায়—যেখানে স্থাপত্য নিজেই হয়ে ওঠে অভিশপ্ত শরীর। লাতিন আমেরিকার সাহিত্যে জুলিও কোর্তাজারের গল্পগুলিতে দেখা যায় হঠাৎ দৈনন্দিন জীবনের মাঝখানে ভয় ও অদ্ভুততার বিস্ফোরণ—যেন পরিচিতের আড়ালে অচেনার গোপন বাস।
সৈকতের পাম্পঘর সেই সব ধারার মিশ্রণ হলেও একেবারে আলাদা জায়গায় দাঁড়ায়। এখানে ‘ঘর’ কেবল পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, বরং কাম-আসক্তি, হিংসা আর মৃত্যুর অভিন্ন ক্ষেত্র। এটি পশ্চিমা body horror–এর মতো যান্ত্রিক নিপীড়নের রূপ নেয়, আবার আফ্রিকান লোককথার অভিশপ্ত স্থানগুলোর মতোই অদৃশ্য শক্তি জমাট বাঁধে এর ভেতরে। তবে এর বিশেষত্ব হলো—এই ভয়ের ভিতর যৌনতার অনিবার্য উপস্থিতি। কোর্তাজারীয় হঠাৎ অচেনার মতোই এখানে ‘পাম্পঘর’ এক পরিচিত জায়গা থেকে অচেনা পরাবাস্তবের গহ্বরে ঢুকে যায়। ফলে গল্পটি হয়ে ওঠে এক গূঢ় সংমিশ্রণ—যেখানে কাম, মৃত্যু আর ভৌতিকতা একত্র হয়ে মানব শরীর ও স্থাপত্যকে একই সঙ্গে অভিশপ্ত করে তোলে।
৫) ইভিল: বেশ্যা নারী ও তার গর্ভে জন্ম নেওয়া শয়তানের সন্তান—এটি পশ্চিমি হরর ট্র্যাডিশনের এক চরম ও প্রাচীন মোটিফ। মেরি শেলির Frankenstein-এ অমানবীয় জন্ম ভয় ও বিজ্ঞান-আকাঙ্ক্ষার মিলনে জন্ম নেয়; লভক্রাফটের The Dunwich Horror-এ ডাইনী মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নেয় অর্ধেক-দানব সন্তান, যাকে সমাজ একইসঙ্গে ঘৃণা ও ভয়ে এড়িয়ে চলে। এই ধারা দেখায়—“জন্ম” মানেই শুধু জীবন নয়, অস্বাভাবিক জন্ম মানে সভ্যতার আতঙ্ক, দেহ ও নৈতিকতার সীমা ভাঙা।
আফ্রিকার লোককথায়ও spirit children বা abiku প্রচলিত—এরা হয় দেবতা-অপদেবতার সন্তান, কখনও পুনঃপুনঃ জন্ম নিয়ে পরিবারকে শোক দেয়, কখনও অদ্ভুত শক্তি নিয়ে আসে। এখানে মাতৃত্বও অশুভতার এক এজেন্টে পরিণত হয়, যেমন নাইজেরীয় ইয়োরুবা লোককাহিনিতে শিশুটি হয়তো দেবতার আশীর্বাদ আবার অভিশাপও।
লাতিন আমেরিকায় হোসে দোনোসোর The Obscene Bird of Night এই ট্র্যাডিশনের চূড়ান্ত উদাহরণ—অপমানজনক জন্ম, বিকৃত যৌনতা ও দানবীয় মাতৃত্বের জটিল বুনন। ম্যাজিক রিয়ালিজমের ভেতরেও এই অস্বাভাবিক জন্মকে তারা আতঙ্কের উৎস করে তুলেছে—একটি দেহ হয়ে ওঠে গোটা সমাজের ভয়ের প্রতীক।
সৈকতের ‘ইভিল’ এইসব আন্তর্জাতিক ধারার সঙ্গে জড়িত হলেও তার বিশেষত্ব ভিন্ন—এখানে রেণুবালা নামের এক বাঙালি যৌনপল্লীর নারী, যার গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান কেবল একটি ব্যক্তিগত ভয় নয়, বরং সমাজের চাপা রাখা কামনা, অপমান আর ঘৃণার মিলনবিন্দু। পশ্চিমের মতো এখানে দানবীয় জন্মকে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হয়নি, আবার আফ্রিকার মতো এটি কেবল ধর্মীয় বা পৌরাণিক বিশ্বাসে বাঁধা নয়। বরং এ জন্ম সমাজের নীচুতলার অন্ধকার গলিতে ঘটছে—যেখানে শরীর বিক্রি হয়, আর সেই শরীর থেকেই জন্ম নেয় এক অতিপ্রাকৃত আতঙ্ক।
ফলে ‘ইভিল’-এর রেণুবালা হয়ে ওঠেন এক অনন্য সংযোগবিন্দু—Frankenstein-এর প্রমিথীয় ভয়, Dunwich-এর অপদেব-সন্তান, Yoruba abiku’র অভিশপ্ত জন্ম আর দোনোসোর বিকৃত মাতৃত্ব—সব মিলিয়ে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্দিষ্ট এক বঙ্গ-বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে। এ ভয়কে তাই কেবল লোককাহিনি বা হরর-ট্র্যাডিশনের ধারায় ফেলা যায় না; এটি সামাজিক বাস্তবতার গর্ভ থেকে জন্মানো এক গভীর সাংস্কৃতিক দুঃস্বপ্ন।
৬) আয়না বাগান: সৈকতের আয়না বাগান পুরো সংকলনের ভেতর সবচেয়ে জটিল, প্রতিধ্বনিময়, আর বহুমাত্রিক গল্প—যেন এক আঞ্চলিক কাহিনি বিশ্বসাহিত্যের অনন্ত আয়নার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। পশ্চিমে লুইস ক্যারলের Through the Looking-Glass আয়নার ভেতর এক অদ্ভুত সমান্তরাল জগৎ খুলে দেয়, যেখানে যুক্তি আর সময়ের নিয়মগুলো উল্টে যায়। অন্যদিকে বর্হেসের The Aleph কিংবা The Mirror of Ink-এ আয়না হয়ে ওঠে অসীমতার প্রতীক, ইতিহাস আর অস্তিত্বের বহুতল প্রতিচ্ছবি। সৈকতের আয়নায় সেই বর্হেসীয় অনন্ত প্রতিফলনের ছায়া মিশেছে, কিন্তু সেটি বাঙালি লোকালয়ের দুঃখ-ভয়-হতাশার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
আফ্রিকান মিথে আয়না প্রায়ই আত্মাকে বন্দী করার এক জাদু-উপকরণ। যেমন নাইজেরিয়ান ইয়োরুবা সংস্কৃতিতে বিশ্বাস আছে—আয়না আত্মার দ্বার খুলে দিতে পারে, আবার সেটিকে ফাঁদেও ফেলতে পারে। এই বিশ্বাসে আয়না শুধু প্রতিফলক নয়, বরং আত্মা আর মৃত্যুর সীমান্তরেখা। সৈকতের গল্পে হারানো কন্যার প্রতিফলন—যা পিতাকে পাগলামির দিকে ঠেলে দেয়—এই আফ্রিকান ঐতিহ্যের সঙ্গে যেন আশ্চর্যভাবে মিলে যায়, কারণ এখানে আয়না হয়ে ওঠে শূন্যে গিলে নেওয়া, না-ফেরার এক দরজা।
লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজম আয়নাকে ব্যবহার করে ইতিহাস ও সামষ্টিক স্মৃতির প্রতীক হিসেবে। কার্পেন্তিয়ের বা কাস্তিয়েয়োর গল্পে আয়না মানে শুধু দৈহিক প্রতিচ্ছবি নয়, বরং উপনিবেশিক অতীতের ক্ষত, এক অনন্ত আত্মদর্শন। কোর্টাজারের House Taken Over যেমন হঠাৎ দৈনন্দিনকে গ্রাস করে অজানা ভয়ের শক্তি, সৈকতের আয়নাও তেমনই দৈনন্দিনতার ভেতর ভয়কে গোপনে প্রোথিত করে—বাগান ও ক্যালাইডোস্কোপ হয়ে ওঠে নিখোঁজ শিশুদের রহস্যময় কবরে।
এভাবে আয়না বাগান ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডিকে (কন্যার মৃত্যু, পিতার উন্মাদনা), সামাজিক আতঙ্ককে (শিশু হারানো, সমষ্টিগত ভয়ের গল্প), আর বিশ্বসাহিত্যের ফ্যান্টাসির ধারাকে (ক্যারল-বর্হেস-কোর্টাজার) একসাথে মেলাতে পারে। যেন এক বাঙালি গলি থেকে শুরু হয়ে তা মিশে যায় বহুবিশ্বের ভৌতিক-দর্শনতত্ত্বে। এখানে আয়না শুধু বস্তুর প্রতিফলন নয়, বরং ভাঙা সময়, হারানো স্বজন, আর অজানা আতঙ্কের দৃষ্টিপাত।
শেষে এটুকুই বলবো যে এই ছয়টি গল্প একত্রে নোনা বালি চোরা টান হয়ে উঠেছে এমন এক বিশ্বজনীন ডার্ক ফ্যান্টাসি সংকলন, যার মূল শিকড় দৃঢ়ভাবে বাংলার মাটিতে প্রোথিত হলেও এর শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে আছে পশ্চিমি গথিক, আফ্রিকান লোকবিশ্বাস আর লাতিন আমেরিকার ম্যাজিক রিয়ালিজমের দিকে। পশ্চিমে যেমন Angela Carter-এর The Bloody Chamber বা Clive Barker-এর Books of Blood আধুনিক হররের ভাষা নতুন করে লিখে দেয়, সৈকতও তেমনি এক বাঙালি ভূদৃশ্য থেকে সৃষ্ট করছেন কাম, আতঙ্ক, মিথ, আর অশরীরী উপস্থিতির নিজস্ব অভিধান। আবার আফ্রিকার ডার্ক লোককথার সংকলন African Nights বা Chinua Achebe ও Ben Okri-র অলৌকিক বাস্তবতা-ভিত্তিক গদ্য যেমন জীবিত-অজীবিত, প্রাকৃতিক-অপ্রাকৃতের সীমানা মুছে দেয়, তেমনি সৈকতের প্রতিটি গল্পে ভূত, রক্ত, ক���মনা আর লোকজ আতঙ্ক মিশে যায়।
লাতিন আমেরিকার দিকে তাকালে Gabriel García Márquez-এর Strange Pilgrims বা Julio Cortázar-এর Bestiario আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে দৈনন্দিনতার ভেতরে হঠাৎ এক ভয়াবহতা প্রবেশ করে। সৈকতের আয়না বাগান কিংবা পাম্পঘর সেই ট্র্যাডিশনের সমসাময়িক প্রতিধ্বনি—যেন বাঙালি জীবনযাত্রার নিতান্ত সাধারণ স্তরেই লুকিয়ে আছে বহুবিশ্ব, গোপন কামনালিপ্সা আর অতিপ্রাকৃত নিখোঁজ।
এমনকি জাপানি হররের সঙ্গে তুলনা করলে—Junji Ito বা Yoko Ogawa-র মতো লেখকদের ভয়ের নন্দনতত্ত্বে যে নিস্তব্ধ, শারীরিক, অদ্ভুতভাবে অন্তরঙ্গ আতঙ্ক ফুটে ওঠে, সৈকতের বয়ানেও সেই শিহরণ কাজ করে। Pumpghor বা Evil গল্পের কাম-রক্ত-শয়তানি একেবারে একই মেজাজের।
সব মিলিয়ে নোনা বালি চোরা টান দাঁড়িয়ে যায় এক বহুস্বরিক সাহিত্যকণ্ঠ হিসেবে। যেমন The Dark Descent (edited by David G. Hartwell) বা The Weird (edited by Jeff and Ann VanderMeer) বিশ্বজুড়ে ভয়ের গল্পগুলোকে একসঙ্গে এনে রেখেছে, সৈকতের সংকলনও তেমনই—তবে এর ভিতরকার প্রতিটি গল্পে বাঙালি ভূখণ্ডের নোনাধরা বাতাস, মাটির গন্ধ, আর লোককথার অন্ধকার ছায়া মিশে যায়। ফলে এই সংকলনকে পড়া মানে একই সঙ্গে বাংলার আঞ্চলিক মিথোলজি আর বিশ্বসাহিত্যের ডার্ক ফ্যান্টাসির চলমান উত্তরাধিকারকে অনুভব করা।
এ এক কঠিন প্রশ্ন, অন্তত আমার মতো বইখেকো লোকের জন্য। শিবরাম রচনাবলী থেকে ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’, ফেমাস ফাইভ থেকে ক্লাস ফাইভের সায়েন্স বই, অভিধান থেকে মুড়ির ঠোঙা – সবই যার দেখামাত্র পড়তে ইচ্ছে করে, পুরো নাহোক কিছুটা অন্তত পড়ে দেখতে ইচ্ছে করে, তার পক্ষে আলাদা করে কি “কেমন” বলা সম্ভব?!
তবে, ডার্ক জঁর যে আমার পছন্দের তালিকায় এক নম্বর নয়, সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। অনুভূতিপ্রবণ মানুষদের একটা মস্ত সমস্যা হয় এই ঘরানার লেখাগুলির ক্ষেত্রে, যদি সেগুলি সুলিখিত হয় – পড়তে পড়তে আমরা চরিত্রগুলোর সঙ্গে একাত্ম হয়ে পড়ি, তারপর গল্পের দাবি মেনে যখন অমোঘ বাঁকগুলি উপস্থিত হয়, তখন সেই কঠিন ও দুঃসহ মোচড়গুলি আমাদের বড়ো বিপন্ন করে তোলে।
অথচ এই গল্পে নিমজ্জিত নিজেকে টেনে তুলে, কাহিনির পরিধির বাইরে দাঁড়িয়ে যখন নির্মোহ চোখে দেখি, তখন নতমস্তকে স্বীকার করতে বাধ্য হই সৈকত মুখোপাধ্যায় যে অন্ধকারের ছবি এঁকেছেন এই ছটি গল্পে, তা নগ্ন সত্য। বিস্তীর্ণ মানবজাতির মানসপটে আলোয় উজ্জ্বল ভাবনাধারার পাশাপাশিই কখনও চোরাগোপ্তা, কখনও মুক্ত উদ্ধত এক কালো ভাবনার ধারাও বয়ে চলেছে আবহমান। না, তা সুন্দর নয়, কাম্যও নয় – কিন্তু ঘোর বাস্তব। শুধুই স্বচ্ছসুন্দরে অবগাহন না করে, সৈকতবাবু এই বইটির জন্য তাঁর ধারালো বলিষ্ঠ কলম ডুবিয়েছেন মানবমনের সেই অশুভ অসুন্দর ভাবনাস্রোতে।
এই ছয়টির পরিসরেই তিনি ছুঁয়ে গেছেন জবরদস্তির অনিচ্ছুক মাতৃত্ব, নাবালিকার উপর অত্যাচার,, জটিল মানসিক ভারসাম্যহীনতা, ঈর্ষা ও সন্দেহ, আদিম পেশা ও অমানবিক শয়তানির মতো অসহ্য পীড়াদায়ক ও অপ্রীতিকর বিষয়গুলি।
কখনো গল্পের বুনন চলছে সাধারণ মানুষজনের চারদিকে, জীবন্ত মানুষ যারা লেখাপড়া করে, উনুনের আগুনে পাউরুটি সেঁকে টোস্ট করার চেষ্টা করে, তালপাতার চাটাইয়ে বসে কাঁকড়ার ঝাল দিয়ে মদ খায়, ক্যামেরা আর বাইনোকুলার নিয়ে ঘুরতে যায় বা দোকান থেকে মুসুরির ডাল কেনে।
কখনো গল্পে ফুটে উঠছে চোর, ধর্ষক, বিকৃতকামী, খুনী বা আরও কত নিকৃষ্ট জীব।
আবার এই দুই ধরণের মানুষে গড়া চেনা পৃথিবীতেই ঘুরে বেড়ায় মৎস্যকন্যা বা শয়তান স্বয়ং – কেউ দেখতে পায়, কেউ পায় না। জীব থেকে জড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রাণ, বা হারিয়ে যায় এক যুক্তির অতীত আয়নাবাগানে। এই অমানুষী অস্তিত্বগুলি কখনো দাগের এদিকে, অসহায়, ব্যবহৃত -কখনো দাগের ওপারে, ক্ষতিকর ও নির্মম।
ভালো মানুষেরা, কালো মানুষেরা আর এই অলৌকিক অস্তিত্ব – এই ত্রিমাত্রিকতায় ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে গল্পগুলি, আবার পড়তে পড়তে পরক্ষণেই টের পাওয়া যায় যে মাত্রাগুলি ভেঙে গিয়ে সব মিশে যাচ্ছে…একাকার হয়ে যাচ্ছে… গা শিউরে ওঠে, দম বন্ধ হয়ে আসতে থাকে।
সৈকত মুখোপাধ্যায় ভাষার জাদুকর। প্রতিটি গল্প চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যায় শেষ পর্যন্ত, তার চেয়েও বড়ো কথা প্রতিটি গল্প অস্থির করে তোলে। সার্থক ডার্ক জঁরের গল্পের এইটাই করার কথা নয় কি?
এ বই এক অবিস্মরণীয় পাঠ।
---
ব্ইয়ের নাম – নোনা বালি চোরা টান লেখক – সৈকত মুখোপাধ্যায় প্রকাশক – অরণ্যমন মুদ্রিত মূল্য – ২০০/-
মাথা খারাপ হওয়া বোঝেন? এই বই পড়ে ঠিক তাই হয়েছে। ছয়খানা ডার্ক ফ্যান্টাসি রীতিমতো শিহরন জাগানোর জন্য যথেষ্ট। সব মিলিয়ে ছটা গল্প- 'দুটো নখের দাগ', 'কিড়া-জড়ি', 'নোনা বলি চোরা টান', 'পাম্পঘর' , 'ইভিল' ও 'আয়না বাগান' ; সবকটা গল্পই বেশ ভালো। সেই অর্থে আলাদা করে খারাপ কোনোটাই লাগেনি। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁরা লেখকের শক্তিশালী লেখনী সম্পর্কে অবগত। টানটান মেদহীন লেখা, যেন শাণিত ছুরির ফলা। লেখার টান এতোই মোহময়ী যে পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থামা অসম্ভব। গল্পগুলোর দুটো সত্ত্বা আছে। একটা দিক যেমন ফ্যান্টাসিকে তুলে এনেছে, অন্যদিকে একই ঘটনাগুলোকে বাস্তবের পরিপ্রেক্ষিতেও দেখানো হয়েছে। এরফলে একটা যেটা সমস্যা হয়েছে, সেটা হল প্রায় প্রত্যেক গল্পেই একজন করে অপ্রকৃতিস্থ চরিত্রের আগমন ঘটাতে হয়েছে এবং ফ্যান্টাসিগুলো মূলত তাদের চোখ দিয়েই দেখানো হয়েছে। এটা সব গল্পে না করলেও বোধহয় ভালোই হত। তবে এই সব কিছুকে অস্বীকার করে যদি শুধু খোলা মনে গল্পগুলো পড়ে ফেলা যায়, তাহলে পাঠক এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা লাভ করবে। যত গল্প এগোতে থাকে তত যেন গল্পের রঙ ফ্যাকাসে থেকে ধূসর, ধূসর থেকে ছাই হয়ে কালো আরও কালো হয়ে ওঠে। একই সাথে আসতে থাকে একের পর এক প্লট টুইস্ট। বইয়ের মুখবন্ধে অনীশ দেবও স্বীকার করেছেন, সৈকতবাবুই এই মুহূর্তে 'অন্ধকার সাহিত্য'-এ সেরা। বইয়ের খারাপ কী লেগেছে? মুখবন্ধে দুটো মুদ্রণ প্রমাদ আর অতি রদ্দিমার্কা নাইন্টিজের 'সেই' ভূতের সিনেমাগুলোর পোস্টারের মতো একখানা প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ শিল্পীর আরও অনেক কাজের সাথে পরিচিত বলেই এই কথাটা আরও জোরে দিয়ে বলতে পারি, এটা হয়ত প্রচ্ছদ শিল্পীর ঠিক 'ভালো' কাজ বলা যায় না। সবশেষে 'অন্ধকারের সম্রাট' কিলবিসকে থুড়ি সৈকত মুখোপাধ্যায়কে অনেক অনেক ধন্যবাদ এত ভালো ছটা অন্ধকারের গল্প পাঠকদের উপহার দেওয়া জন্য। এই বই না পড়লে অনেক কিছু মিস।
কিছু বইকে ঠিক চেনা ধারায় ফেলে বিচার করা যায়না বিশেষ করে সেই বই যদি ডার্ক ফ্যান্টাসি গোত্রের হয় তো তাহলে আরও বিপদ। কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে ডার্ক ফিকশন সকলের জন্য নয় এমনকি শুধুমাত্র প্রাপ্তমনস্ক বলেও ছাড় পাওয়া যায়না। সৈকত মুখোপাধ্যায়ের এই বইটি সেই গোত্রেরই। এবার প্রথমেই আসি বইটি দেখতে কেমন? মানে ফেনোটাইপ। বইটি সুন্দর ভালো মানের কাগজে ছাপা একটি হার্ডবাউন্ড। বানান ভুল মাত্র তিনটে চোখে পড়েছে। প্রচ্ছদটিও মানানসই। এবার আসি বিষয়ে বা জেনোটাইপে, এতে পাবেন ছয়টি গল্প। এদের মধ্যে কোনটা সেরা সেটা বলা খুবই কষ্টের, প্রতিটি গল্পই নিজের দিকে থেকে সেরা তবে কিড়া জড়ি,নোনা বালি চোরা টান ও ইভিল আমার নিজের খুব ভালো লেগেছে এটুকু বলতে পারি। ডার্ক ফিকশন মাঝে মাঝেই আমাদেরকে বিবেকের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়,নিজের মনেই প্রশ্ন জাগে "মানুষ কি এতটা নীচে নামতে পারে?" "নোনা বালি চোরা টানে"র রূপক আমাদের ভাবায় একই সাথে ভয়ও পাওয়ায়, "আয়না বাগান" আমাদের এক অন্য দুনিয়ার গল্প বলে যেখানে গেলেই যেন আমাদের মুক্তি। বইটির ভূমিকা লিখেছেন শ্রদ্বেয় অনিশ দেব,ওঁর কথা অনুসরণ করেই বলি "প্রতিটি গল্পই মনের গভীরে প্রবেশ করে অনেকদিন বাসা বেঁধে থাকে।" এই বইটা কাদের জন্যে? এক কথায় উত্তর যারা এই ধরনের লেখা পড়েও সারারাত ভালো ভাবে ঘুমিয়ে নিতে পারেন তাঁদের জন্য। আমার নিজের মনে আছে "ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রুন" আমি একটানা পড়তে পারিনি,মাঝে মাঝে অন্য হালকা ধারার বই পড়তে হয়েছিল,এই বই অতটা কড়া না হলেও রাতের ঘুম বিগড়ানোর জন্যে যথেষ্ট। একবার পড়ে দেখতেই পারেন।
📒🕊️দুটো নখের দাগ ~ ছত্রিশগড়ের পাহাড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রাম কুসুমডির সাস্থ্য কেন্দ্রে কাজ করেন ডক্টর বেদব্রত শর্মা। গ্ৰামের মোরল জনকরাম সিং-এর তৃতীয় স্ত্রী মহুয়া অন্তঃসত্ত্বা। জনকরাম-এর চাপে বেআইনি ভাবে মহুয়ার ভ্রণে লিঙ্গ নির্ধারণ করেন ডক্টর বেদব্রত শর্মা। মহুয়া জানে যে জনকরাম-এর যৌন রোগ আছে। যার ফলে সন্তানের জন্ম হলেও সে স্বাভাবিক সুস্থ হবে না। মহুয়া ডক্টর বেদব্রত শর্মাকে গর্ভপাত করার জন্য বারবার অনুরোধ করে কিন্তু জনকরাম-এর ভয়েই ডক্টর বেদব্রত শর্মা রাজি হয়না। এরপর একদিন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থেকেই পালিয়ে যায় মহুয়া। জনকরাম এবং তার সংগোপাঙ বুঝতে পারে যে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে র পিছনেই লুকিয়ে আছে মহুয়া। তার সেই বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। ওই বাড়িতে বাসা বাঁধে ছিল কিছু বাদুড় , ওই আগুনে তারা মারা পড়ে। তার সঙ্গে মারা পরে মহুয়ার প্রেমিক। মহুয়ার সাথেই ওই বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছিল। আচ্ছা তারপর ঠিক কি হল.... এর পরই গল্পের মধ্যে ঘনিয়ে আসে রহস্যর ঘনঘটা....... কি ভীষণ অদ্ভুত একটি গল্প। গল্পের শেষের দিকটা কল্পনাতেও ভাবতে পারিনি এমন হতে পারে! 📖এই বইয়ের বাকি গল্প গুলো পড়া চলছে........
অদ্ভুত একটি বই। যাঁরা লেখকের 'ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ' পড়েছেন তাঁরা হয়তো ইতিমধ্যেই তাঁর 'Dark Fantasy' genre এর লেখনশৈলীর সাথে সুবিশেষ পরিচিত। কি অনায়াসে মনের গভীরের সূক্ষ অন্ধকার দিক গুলো তুলে এনে গল্পের মধ্যে বলে ফেলেন। এই বইটিতে মোট ৬টি গল্প রয়েছে ('দুটি নখের দাগ', 'কিড়া-জড়ি', 'নোনা বালি চোরা টান', 'পাম্পঘর', 'ইভিল', 'আয়না বাগান'); যার প্রত্যেকটি নানা ভাবে পাঠকের মনের কোমল অংশ গুলো কে আঘাত করে। এ এমনই এক মায়াজগত যেখানে একটা বাতিল পাম্পমেশিনের শরীরী সম্মোহনে ধরা দেয় এক নারী অথবা নিহত প্রেমিক বাদুড়ের রূপ ধরে ফিরে আসে। যেখানে একটা ক্যালাইডোস্কোপের ভেতর খুঁজে পাওয়া যায় হারিয়ে যাওয়া কয়েকটি শিশুকে কিম্বা দেড়শো বছর আগে জেলেদের জালে ধরা পড়া মৎস্যকন্যা পরিত্যক্ত রেলগুমটির মেঝেতে শুয়ে শরীর বিক্রি করে। কল্পনার প্রাবল্য আর ভাষার জাদু মিলিয়ে গড়ে উঠেছে বুঁদ হয়ে পড়বার মতন এই ছটি উপাখ্যান। কখনো গল্পের প্রবাহ, কখনও তার নৃশংসতা, পাঠককে বারে বারে ক্ষত বিক্ষত করে। আপনাকে আওহ্বান জানাবো, যদি এক অন্ধকার কদর্য জগতের চোরা বালি নোনা টান অনুভব করতে চান, যেখানে স্বাভাবিভাবেই আপনার নিজেকেই অস্বাভাবিক মনে হবে তবে এই বই হাতে তুলে নিন। প্রত্যেকটি গল্পই মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা এবং বিষয় বৈচিত্রে অনন্য। আমার প্রত্যেকটিই ভালো লেগেছে তবে যেগুলো সব থেকে বেশি আহত করেছে আমাকে সেগুলো - 'কিড়া-জড়ি', 'নোনা বালি চোরা টান' এবং 'ইভিল'। অবশ্যই পড়ুন, এহেন বিচিত্র সাহিত্যকে এতো সুন্দর ভাবে সৈকত বাবু আমাদের কাছে তুলে ধরছেন, তাঁর সেই প্রয়াস সত্যি প্রশংসনীয়।
আমার অন্যতম প্রিয় genre এর বই। বস্তুত "ডার্ক" theme তে মানুষের স্খলিত চারিত্রিক দিকগুলো ফুটে ওঠে। তার উপর ফ্যান্টাসির ছোঁয়া গল্পকে অন্য জায়গায় নিয়ে যায়। এই বইটা আমার মত "ডার্ক ফ্যান্টাসি" ফ্যানদের কাছে স্বর্গ।
লেখক মহাশয়ের থেকে এই নিয়ে তিন নম্বর এই genre এর বই পেলাম। সবকটা গল্প ভিন্ন পট, ধাঁচের। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে দুটো নখের দাগ, পাম্পঘর, ইভিল। এই রকম লেখা আরো পাবার আশায় রইলাম।
বাংলাতে সৈকত sir এর লেখা Dark fantasy genre এর গল্পগুলো পড়লে একটা কথাই আমার মাথায় আসে। লেখক কিভাবে এই plot গুলো ভাবেন! প্রতিটা গল্প পড়ে আমাকে বেশ কিছু সময় wait করতে হয় ব্যাপারটা শুধুমাত্র absorb করতে।
সব গল্পগুলোই আমার খুব বেশি পছন্দের, তবুও এই একটু খানি ভালো-কম ভালোর বিচারে আমার পছন্দের তালিকা টা এরকম ইভিল- শয়তানের জন্মের গল্প আয়না বাগান- এই গল্প ভালোবাসার, স্নেহের পাম্পঘর- এক অতিলৌকিক প্রেমের গল্প দুটো নখের দাগ- আবার এক প্রেমের গল্পের শেষে ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণের মতো treatment টা উপভোগ্য নোনা বালি চোরা টান ও কিড়া জড়ি- গল্পদুটোই মনস্তাত্ত্বিক গল্প
বড্ড অন্ধকার কিছু গল্প। মন খারাপ হয়ে যায়। Dark Genre কিন্তু বড্ড negativity। আজকের দুনিয়ায় negative এর জয়জয়কার, আমি বই পড়ি সেই অন্ধকারের ওপরে তাকাতে। এ বই সেই অকৃত্রিম অন্ধকারে আরও এক পোঁচ কালী ঢেলে দেয়। রেপ শব্দটার বহুল প্রচলন। নারীর প্রতি হিংস্রতা.......জানি এ সমাজে সবই স্বাভাবিক, তবুও তো আলো ভালো লাগে।
জানি না এতো রেটিং কি করে পেলো কিন্তু আমার একেবারেই ভালো লাগেনি একটাও গল্প. প্রতিটি গল্প পড়ার সময় মনে হচ্ছিলো কোনো বিকৃত মনের গল্প পড়ছি. হয়তো এটাই উদেশ্য লেখক এর.
প্রতিটি মানুষের মনেই অন্ধকার লুকিয়ে আছে । মানুষের মনের এই অন্ধকার অংশের সাথে কল্পনা মিশিয়ে সাহিত্যের যে ধারায় কাজ করা হয় তাকেই বলা হয় ‘ডার্ক ফ্যান্টাসি’ বা ‘ডার্ক ফিকশন’ । এই জঁনরার বিষয়বস্তু কঠোরভাবে ‘প্রাপ্তমনস্ক’ পাঠকদের জন্য, তাই এটি ভীষণ স্পর্শকাতর একটি জঁনরা । বাংলা সাহিত্যে এই বিষয় নিয়ে কতটুকু কাজ হয়েছে তা হাতে গুণে বলা যাবে ।
▪️সাহিত্যের এই ধারাটির সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল বছর দুয়েক আগে, ১৬০ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের মাধ্যমে... বইটির নাম ‘ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ’ । ১২ টি গল্প নিয়ে তৈরি সেই সংকলনের প্রত্যেকটি গল্পই ছিল ‘গায়ে কাঁটা দেওয়া’ এক একটি উপাখ্যান ।
📝 পাঠ-প্রতিক্রিয়া : ‘ডার্ক ফিকশন’ জঁনরার ৬টি বড়োগল্প নিয়ে তৈরি এই ১৬০ পাতার বইটি যেন ঐ বইটির পরবর্তী অধ্যায় । এই সমাজের বাস্তব চিত্রের সাথে কল্পনা মিশিয়ে লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায় অন্ধকারের যে গল্পগুলি সৃষ্টি করেছেন, তা পড়তে পড়তে রীতিমতো শিউরে উঠতে হয় । এইরকম অস্বস্তিকর এবং বীভৎস ‘ডার্ক ফিকশন’ বাংলা কল্প-গল্প জগতে খুবই কম লেখা হয়েছে ।
▪️বিশিষ্ট সাহিত্যিক অনীশ দেব এই সংকলনের ভূমিকায় বলেছেন - “নোনা বালি চোরা টান বইয়ের প্রতিটি গল্প পড়ার পর গল্পের চরিত্র আর ঘটনা তীব্রভাবে ঢুকে যায় মর্মস্থলে এবং সেখানেই তারা বসবাস করতে থাকে ।”
📝 এই সংকলনের কয়েকটি গল্প ‘সাইকোলজিক্যাল ডার্ক ফ্যান্টাসি’ জঁনরার অন্তর্ভুক্ত... যেখানে গল্পের চরিত্রগুলি ‘মানসিক অসুস্থ’ অথবা ‘বিকৃত মানসিকতা’ সম্পন্ন । প্রতিটি গল্পের মধ্যেই রয়েছে ভয়াবহতা, নৃশংসতা, গা শিরশিরানি, মানুষের লোভ ও কামপ্রবৃত্তির নির্লজ্জ্ব উপস্থিতি... যেগুলির বিবরণ পাঠকের মনের অন্তঃস্থলে গভীর ছাপ রেখে যাবে ।
▪️এই গল্পগুলি পড়তে পড়তে হঠাৎই পড়া থামিয়ে ভাবনায় ডুবে গেছি । কিছু কিছু দৃশ্যপটের বর্ণণা এতটাই অস্বস্তিকর যে পরবর্তী অংশ শুরু করার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়েছে বেশ কয়েকবার... অথচ ‘ডার্ক ফ্যান্টাসি’র অমোঘ আকর্ষণ এড়ানো সম্ভব হয়নি, আর ঠিক এখানেই লেখক সৈকত মুখোপাধ্যায়ের কলমের সার্থকতা । সাহিত্যের এই বিশেষ ধারাটিতে যে তিনি ‘অদ্বিতীয়’ তা একবাক্যে স্বীকার করতেই হয় ।
ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ পড়ে সৈকত মুখোপাধ্যায় স্যার এর লেখার প্রতি একরকম আসক্তিই জন্মেছিল। সেই প্রত্যাশা নিয়েই হাতে তুলে নিই নোনা বালি চোরা টান। মোট ৬ টি ডার্ক ঘরানার গল্প নিয়ে সেজে উঠেছে বইটি। বইয়ের শুরুতে অনীশ দেব মহাশয় এর ভূমিকাটি যথাযথ ।
📖পাঠ অনুভূতি এই বইটির প্রতিটি গল্পই আলাদা ধরনের এবং লেখকের ডার্ক কল্পনার ফসল, গল্পগুলি গভীর অন্ধকারে ঢাকা। কখনও শয়তানের বাচ্চা, কখনও বাদুড় মানুষ, কখনও বা জলজ মৎস্যকন্যা এক এক ধরনের চরিত্রের মাধ্যমে লেখক গড়ে তুলেছেন একেকটা eerie জগৎ। গল্পগুলিতে যেমন আছে ভয়, আছে গা গুলানো সব বর্ণনা তার সাথে আছে মানুষের মনের বিভিন্ন আঙ্গিক। আয়না বাগান দুটি নখের দাগ গল্প দুটো সবচেয়ে ভালো লেগেছে । তবে কিছু গল্প সারা জাগিয়েও সেরকমভাবে মনে ছাপ ফেলেনি, বা বলা ভালো আমার কল্পনার সাথে মিশতে পারেনি । কিন্তু পড়তে গেলে প্রতিটি গল্পই উপভোগ্য লেখকের লেখার গুণে ।
🎨এই বইটির প্রচ্ছদটা খুব একটা মন ছুঁয়ে যায়নি, তবে প্রতিটি গল্পের আগে থাকা অলঙ্করণগুলো দারুণ, গল্পের মেজাজের সঙ্গে মানানসই।
⚠️ সতর্কবার্তা- কারা পড়বেন? এই বই কোনো “কমফোর্ট রিড” নয়। যারা ডার্ক, ফিকশন পছন্দ করেন, তারা অবশ্যই এই বই পড়ে দেখতে পারেন। কিন্তু যদি আপনি একটু হালকা মেজাজে আছেন, অথবা মন শান্ত রাখতে চান—তাহলে বইটি হাতে নেওয়ার আগে একটু ভেবেচিন্তে এগোনো ভালো।
🌀সবশেষে বলি - নোনা বালি চোরা টান ভয়ানক এক কল্পনাজগৎ তৈরি করে, হয়তো ঈশ্বরের নষ্ট ভ্রূণ-এর মতো প্রভাব ফেলেনি আমার মনে , তবুও সৈকত মুখোপাধ্যায়ের ভক্তদের জন্য এটি না-পড়া অপরাধ।