যুগে যুগে সাহিত্য মানুষকে দিয়েছে কল্পনার জগতে অবাধ বিচরণের সুযোগ, পরিচয় করিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন সংস্কৃতির সাথে, সময়ের সাথে, ইতিহাসের সাথে। সার্বিক বিচারে সাহিত্য এক স্রোতস্বিনী নদীর মতো, যে কখনো থামতে জানে না। জানে শুধু বয়ে চলতে। আর নিজ গতিতে চলতে চলতেই সে সৃষ্টি করে অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। সাহিত্যের তেমনই এক সমৃদ্ধ, শক্তিশালী শাখা হচ্ছে রোমাঞ্চ-থ্রিলার-ভৌতিক ঘরানার ফিকশন। এই ঘরানা নানাভাবে আমাদেরকে মানুষের, সমাজের, পরিস্থিতির অন্ধকার দিকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা কিনা গভীর রাতের অন্ধকারের চেয়েও কালো। সাহিত্যের এই শাখা আমাদের শিহরিত করে বারবার, ঠিক যেমন রাতের নিস্তব্ধতায়, গাঢ় অন্ধকারে আমরা অজানা আতঙ্কে ভুগি। সেই চিরচেনা অনুভূতির সাথে মিল রেখেই আমাদের এই সংকলনের নাম নিশুতি।
উল্লেখ্য যে, শুরুতে নিশুতি-কে সিরিজ করার পরিকল্পনা ছিল না। তবে পাঠকদের কাছ থেকে ব্যপক সাড়া পাওয়ায় আমরা সিদ্ধান্ত নেই, একটি মানসম্পন্ন সিরিজ হিসেবে নিশুতি চলমান থাকবে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ২০২০ সালের বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত হয় নিশুতি-২ নামে সিরিজের দ্বিতীয় গল্প সংকলন। সুবিশাল কলেবরের নিশুতি-২ নি:সন্দেহে বাংলাদেশের মৌলিক হরর-থ্রিলার গল্প সংকলনের মাঝে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। মানচিত্রের সীমারেখায় বিভক্ত হয়েও এপার-ওপার দুই বাংলা সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে একই সুতোয় বাঁধা। সেই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছিল একই মলাটে দুটো দেশের একঝাঁক প্রথিতযশা ও নবীন লেখকদের লেখা হরর-থ্রিলার গল্প সংকলিত করার মাধ্যমে। শ্রদ্ধেয় মুহম্মদ জাফর ইকবাল, মুহম্মদ আলমগীর তৈমূর, আহসান হাবীব, ইন্দ্রনীল স্যানাল, হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত প্রমুখ - লেখক তালিকার দিকে একবার তাকালেই সেটা স্পষ্টভাবে আমাদের চোখে ধরা দেয়।
অসহনীয় এক থমথমে পরিস্থিতিতে কেটেছে আমাদের ২০২০ সাল। অসুস্থতা, আতঙ্ক, প্রিয়জন হারানোর শোক, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা - আণুবিক্ষণিক এক ভাইরাসবাহিত প্যান্ডেমিক আমাদের সবদিক থেকে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছে । তবু আমরা হার মানতে শিখিনি নানাভাবে নতুন বছরে এসে আমরা কিছুটা মানিয়ে নিতে শিখেছি, সবকিছু গুছিয়ে নিতে চেয়েছি নতুন করে। "নিউ নরমাল" জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে আমরা আবার ফিরিয়ে এনেছি আমাদের পুরনো নিশুতি সিরিজকে। সেই প্রচেষ্টা থেকেই "নিশুতি- ৩।"
সাহিত্যকে কোন নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর বেধে রাখা যায় না। বিশদ অর্থে হরর-থ্রিলার জনরায় আবদ্ধ থেকেও তাই নিশুতি-৩ এ স্থান পেয়েছে সাররিয়েলিজম, ডার্ক ফ্যান্টাসি, ডিটেকটিভ ফিকশন, ব্ল্যাক কমেডি, উইয়ার্ড ফিকশনসহ আরও বেশকিছু সাবজনরার গল্প। ছোট-বড় গল্পের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে দুটো উপন্যাসিকা। রোমাঞ্চকর এই গল্পগুলো পাঠককে অস্বস্তিতে ভোগাবে, আবার একই সাথে দেবে সাহিত্যপাঠে স্বস্তির স্বাদ।
বইয়ের চারটা গল্পকে সেরার কাতারে রাখবো। প্রথমটা তানজীম রহমানের হরর গল্প "চুল"; নাপিত বাশারের চরিত্র, অদ্ভুত হুজুর, পানির অপশক্তি পানিমুড়ার বর্ণনা সবকিছু মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা গল্প। দ্বিতীয়টা মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাবের "কৃষ্ণপক্ষি", হাওড়ের পরিবেশ, অন্ধকারে সেখানে লুকিয়ে থাকা পৈশাচিক শক্তি আর সেখানের মানুষের জীবনের দুর্ধর্ষ বর্ণনা সবমিলিয়ে মনে দাগ কেটে যাওয়ার মত হরর গল্প। তৃতীয়টা ওয়াসি আহমেদের "গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক"; কিছু মানুষ সবার মাঝে থেকেও কিভাবে আস্তে আস্তে অন্য জগতে হারিয়ে যায় তার অনবদ্য গল্প। চুতর্থটা পিয়া সরকারের "ক্যাসান্দ্রা", মনের গভীরে চেপে বসা ট্রমাগুলোর মানুষকে ভেঙেচুরে অমোঘ নিয়তির পথে নিয়ে চলার ঘোর লাগা গল্প।
নসিব পঞ্চম জিহাদীর রহস্য গল্প " এক চাপ কা" দুর্দান্ত ভাবে শুরু হয়েও শেষে কিরকম খেই হারিয়ে ফেললো। তবে এই গল্পের ঢাকার বৃষ্টির বর্ণনা মুগ্ধ করার মত। আহনাফ তাহমিদের "সাবান" গল্পের কনসেপ্টের নতুনত্ব আর সাবানের ফেনায় আস্তে আস্তে হারিয়ে যাওয়ার বর্ণনা সেই লেভেলের, শুধু গল্পটা ছুঁতে পারার একটু আগেই হারিয়ে গেল বলে মনে হয়েছে। মোহাম্মদ সাইফূল ইসলামের "ক্লোরোপ্লাস্টিক মেসেজ" খুবই ভালো মানের সায়েন্স ফিকশন ; কোয়ান্টাম থিওরি, স্ট্রিং থিওরি, ক্লোরোপ্লাস্ট, এলিয়েন সবমিলিয়ে একটা গল্পের জন্য কন্টেন্ট এর ডেপথ কিছুটা বেশিই হয়ে গিয়েছে। বাপ্পী খানের অতিপ্রাকৃতিক গল্প "প্রলোভন" বেশ ভালো, তবে শেষের দিকে কিছুটা খাপছাড়া। সৈয়দ অনির্বাণের "অপরিপক্ক", লুৎফুল কায়সারের সমুদ্রের পটভূমিতে লাভক্রাফটিয়ান ধাঁচের হরর "সমাধি", আসিফ তাউজের রহস্য গল্প "অ আ ক খ এবং চন্দ্রবিন্দু", ইমতিয়াজ আজাদের হরর "মন্ত্র", মহুয়া দাশগুপের পাহাড়ের নির্জন বাড়ির পটভূমিতে হরর "নিয়তি", লায়লা জেরিনের প্যারালাল ওয়ার্ল্ডের গল্প "সত্য বিদীর্ণ বিলীন" সবগুলোই বেশ ভালো গল্পের কাতারেই থাকবে। বাকি গল্পগুলো তেমন একটা ভালো লাগেনি। পুরো সংকলনের সবচেয়ে বাজে গল্প ইন্দ্রনীল স্যানালের তথাকথিত থ্রিলার গল্প "সাত সমুদ্র", কাহিনির কোনো মাথামুণ্ডু নেই, চরম লেভেলের অপরিপক্ক একটা লেখা, কোনোভাবেই সংকলনে স্থান পাবার যোগ্য না গল্পটা।
পঁচিশ জন লেখকের পঁচিশটা গল্প নিয়ে সাজানো হয়েছে 'নিশুতি ৩'। সম্পাদনার দায়িত্বে আছেন আরেক সুলেখক ওয়াসি আহমেদ। এই হরর-থ্রিলার গল্প সঙ্কলনে স্থান পেয়েছে নানা স্বাদের গল্প। এপার-ওপার বাংলা মিলিয়ে লেখক-লেখিকারা এখানে হাজির হয়েছেন তাঁদের গল্পগুলো নিয়ে। এগুলোর মধ্যে কয়েকটা গল্প নিয়ে নিচে সামান্য আলোচনা করার চেষ্টা করছি। আগ্রহ থাকলে পড়ে দেখতে পারেন। আগ্রহ না থাকলে, স্কিপ ইট।
চুল - তানজীম রহমানঃ বাশার হেয়ার ড্রেসারের কাজ করে। সোজা বাংলায়, নাপিত। স্ত্রী ও এক ছেলেকে নিয়ে তার ছোট্ট কিন্তু অভাবের সংসার। একদিন বাশারের সাথে পরিচয় হলো অদ্ভুত এক মানুষের, যাকে সে হুজুর বলেই চিনতো। নূরানী চেহারার এই মানুষটার চুল-দাড়ি আজ কাটলে কালই আবার আগের মতো হয়ে যায়। এদিকে বাশারের ছেলে সৌরভ রাত-বিরাতে প্রচণ্ড ভয় পায়। কি যেন একটা ওর রুমের জানলার পাল্লা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। আর হুজুরের সাথেও বাশারের সখ্য বাড়তে থাকে। কি চলছে বাশারের জীবনে?
এই সঙ্কলনের প্রথম গল্প 'চুল'। সুলেখক তানজীম রহমান তাঁর এই বড় গল্পে দারুণ এক রহস্যময় ও ভৌতিক আবহের সৃষ্টি করেছেন। একজন সাধারণ মানুষ ও 'হুজুর'-এর মধ্যকার রসায়ন বেশ উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে। লেখক গল্পটা যেভাবে শেষ করেছেন, তাতে মনে হয়েছে এর দ্বিতীয় কোন পর্ব আসলে মোটেও খারাপ হয় না।
কৃষ্ণপক্ষি - মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাবঃ খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে গেলো ফারজানার। যার সাথে বিয়ে হলো, সেই হামিদের বাড়ি আবার সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে৷ বিয়ের দিনই নতুন বউকে নিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা হলো৷ বৃষ্টি থামার কোন নামগন্ধ নেই। ফুঁসে উঠেছে হাওরের পানি। আর এমন এক অস্থির রাতেই হাওরের বুকে নৌকার ওপর ফারজানা মুখোমুখি হলো অপার্থিব এক সত্ত্বার সাথে, যে কি-না মা মা বলে বারবার তাকে ডাকছে। ফারজানার পেটজুড়ে সৃষ্টি হলো গভীর কিছু ক্ষত। কি আছে হাওরের পানির নিচে? কে বারবার ফারজানার কাছে আসতে চাচ্ছে?
ভালো লেগেছে গল্পটা। মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাবের অসাধারণ বর্ণনার গুণে বন্যা কবলিত হাওর এলাকা যেন চোখের সামনে একদম স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। ভৌতিক আবহটাও যে কারণে বেশ জমেছে। পারফেক্ট ক্লাইম্যাক্সের জন্য এই গল্পটা মনে থাকবে।
শুনিয়াছি মুগ্ধ রাতে ডানার সঞ্চার - রাফিউজ্জামান সিফাতঃ ইদানীং আশেপাশের গ্রামে ডাকাতের উপদ্রব বেড়েছে বেশ। সন্ধ্যার পরেই এলাকা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে ডাকাতের ভয়ে। গ্রামের মেম্বারের বাড়িতে ডাকাতি হওয়ার পর মইদুল নামের এক তরুণ এক রাতে লাঠি হাতে পাহারায় বসে। সেই নিশুতি রাতে তার সামনে আসে মাথায় ঘোমটা টানা রহস্যময়ী এক নারী। শুরু হয় তাদের আলাপন।
রাফিউজ্জামান সিফাতের এই গল্পের শুরুটা বেশ ভালো লাগলেও শেষটা আমার কাছে দুর্বোধ্য লেগেছে। আমি বুঝতে পারিনি তিনি শেষে আসলে কি বোঝাতে চেয়েছেন। যে কারণে গল্পটা একরকম অসম্পূর্ণই মনে হয়েছে আমার কাছে।
ভবিতব্য - সাজিদ রহমানঃ বিখ্যাত আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইটার চিতা শামস। নিজের ক্ষিপ্র গতির কারণেই ওর নামের আগে চিতা বসিয়েছে তার ট্রেনার রহমত। টানা ২ বছর অপরাজিত থাকার পর আজ ও মুখোমুখি হয়েছে আরেক ঝানু ফাইটাই শমসেরের সাথে। এই বিশেষ লড়াইটাতে জিৎ হবে কার?
মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার কাছে 'ভবিতব্য'। ফিনিশিংটা সুন্দর। তবে প্রধান দুই চরিত্র শামস ও শমসেরের নামদুটো অনেকটাই কাছাকাছি হওয়ায় মাঝেমাঝে কনফিউজড হয়ে যাচ্ছিলাম গল্পটা পড়ার সময়।
হানার খেলা - সালমা সিদ্দিকাঃ ভয়ঙ্কর এক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হলো তরুণী নাজমুন। যেকোন মুহূর্তে মারা যেতে পারে সে। এমন অবস্থায় তার সামনে প্রকট হলো এক রহস্যময়ী নারীমূর্তি। নিজের পরিচয় দিলো সে হানা বলে। নাজমুনকে একটা খেলার কথা জানালো সে। আর একইসাথে দুটো অপশন রাখলো তার সামনে। কোনটা বেছে নেবে নাজমুন?
খুবই মর্মস্পর্শী একটা গল্প 'হানার খেলা'। কলেবরে ছোট হলেও গল্পটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। সালমা সিদ্দিকা'র লেখার ধরণ চমৎকার। তাঁর কোন বই পড়া হয়নি। এই গল্পটা পড়ার পর সিদ্ধান্ত নিলাম, পড়ে ফেলবো তাঁর কিছু বই।
ক্যাসান্দ্রা - পিয়া সরকারঃ বিকাশ একজন জ্যোতিষী। খুব বেশি হাতযশ না থাকলেও বেশ চলে যাচ্ছিলো তার। এরই মাঝে একদিন তার কাছে নীল শাড়ি পরা সুন্দরী এক নারী আসে। যার নামও কেতকী, আবার যার শরীর থেকেও আসে কেতকী ফুলের মাতাল করা গন্ধ। মেয়েটা বিকাশকে জানায় সে তার হাতের কবজিতে ভবিষ্যৎ দেখতে পায়। সে দেখতে পায় অচেনা-অজানা মানুষদের নির্মম মৃত্যু। শুরুতে কেতকীর এই ব্যাপারটা বিকাশ বিশ্বাস না করলেও তার বিশ্বাসের ভিত টলে যেতে বেশি সময়ও লাগে না।
ওপার বাংলার লেখিকা পিয়া সরকারের 'ক্যাসান্দ্রা' এই সঙ্কলনের অন্যতম সেরা গল্প আমার মতে। বড় গল্পটা আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে। সাইকোলজিক্যাল কিছু টার্ম সম্পর্কেও জানতে পেরেছি এই গল্পটা পড়ে। আর ক্লাইম্যাক্সটা ছিলো চমৎকার। পিয়া সরকারের অন্যান্য লেখা পড়ার আগ্রহ আছে ভবিষ্যতে।
অ আ ক খ এবং চন্দ্রবিন্দু - আসিফ তাউজঃ অবসরপ্রাপ্ত একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর, যিনি বর্তমানে একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। মোটামুটি নামডাক আছে তাঁর। একদিন তাঁর কাছে এলো একটা নিখোঁজ কেস। নিখোঁজ হয়েছেন রিসান চৌধুরী নামের ৮৭ বছর বয়স্ক একজন বৃদ্ধ। তদন্ত করতে গিয়ে ডিটেকটিভ সাহেব দেখলেন, সমস্যাটা নরমাল না হয়ে প্যারানরমালও হতে পারে। আর সবকিছু জানতে হলে ভৌতিক সেই বাঁশঝাড়ের রহস্য আগে ভেদ করতে হবে তাঁকে।
বেশ চমৎকার একটা গল্প। আসিফ তাউজের গল্প বলার ধরণ ভালো লেগেছে আমার কাছে। ভৌতিক আর রহস্যময়তার যে আবহ তিনি তাঁর 'অ আ ক খ এবং চন্দ্রবিন্দু'-তে আনতে চেয়েছিলেন, তাতে তিনি সফল। তবে শেষাংশের 'আরো ছয়টা আত্মা'-এর ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারিনি। অনেক ভেবেও মেলাতে পারলাম না।
কোয়াট - মোহতাসিম হাদী রাফীঃ পঞ্চগড়ের এক প্রত্যন্ত গ্রামে ইদানীং নিশির ডাক বা কোয়াটের বেশ উপদ্রব শুরু হয়েছে। তান্ত্রিক অবিনাশ ঠাকুর ও তার অ্যাসিস্ট্যান্ট রাফসানের ডাক পড়লো এই ভৌতিক রহস্য সমাধানের জন্য। গ্রামটাতে যেতে না যেতেই গভীর রাতে কোয়াটের ডাকের মুখোমুখি হলো অবিনাশ ও রাফসান। বেঁচে ফিরতে পারবে কি ওরা ওই অভিশপ্ত গ্রাম থেকে?
চমৎকার একটা গল্প৷ অপদেবতা আটেশ্বর বা কোয়াট সম্পর্কে চিত্তাকর্ষক কিছু তথ্য পেয়েছি গল্পটা পড়ে। বেশ উপভোগ্য ছিলো মোহতাসিম হাদী রাফীর লেখা। এই সঙ্কলনের অন্যতম সেরা গল্প 'কোয়াট'।
গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক - ওয়াসি আহমেদঃ ইদানীং রঞ্জুর একটা সমস্যা হচ্ছে। চোখ বন্ধ করলেই কালো পর্দার মধ্য দিয়ে ধূসর বালিকণার মতো কিছু জিনিস ছোটাছুটি করে। সময়ের সাথে সেই কণাগুলোর ছোটাছুটি করার গতি বাড়তেই থাকে। চোখ বন্ধ করাও যেন এক বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে তার জন্য। এদিকে রাতে যখন ও বাড়ি ফেরে, গলির পাশের বিল্ডিংয়ের চারতলার জানালা দিয়ে কালো সুট আর লাল টাই পরা লম্বা-চওড়া এক লোক যেন ওর দিকেই তাকিয়ে থাকে। রঞ্জুর সমস্ত মানবীয় অনুভূতিগুলো কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অদ্ভুত একটা গল্প। ভালোই লেগেছে পড়তে। সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা প্লটকে ডেভেলপ করেছেন ওয়াসি আহমেদ। 'গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক'-এর মধ্যে এমন একটা আবহ আছে যা অজানা এক ধরণের ভয়ের অনুভূতির সাথে পরিচিত করেছে আমাকে।
এগুলো ছাড়াও 'নিশুতি ৩' সঙ্কলনে স্থান পেয়েছে নাজিম উদ দৌলার '১০ মিনিট', ইন্দ্রনীল সান্যালের 'সাত সমুদ্র', সৈয়দ অনির্বাণের 'অপরিপক্ক', আমের আহমেদের 'নিশির বীরোচিত রাত্রি', কিশোর পাশা ইমনের 'পোয়েটিক জাস্টিস', বাপ্পী খানের 'প্রলোভন', মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের 'ক্লোরোপ্লাস্টিক মেসেজ', মনোয়ারুল ইসলামের 'মেঘবতী', আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদের 'কোরাইশি ফাইলস', আহনাফ তাহমিদের 'সাবান', লুৎফুল কায়সারের 'সমাধি', মহুয়া দাশগুপ্ত'র 'নিয়তি', লায়লা জেরিনের 'সত্য বিদীর্ণ বিলীন', ইমতিয়াজ আজাদের 'মন্ত্র', আদনান আহমেদ রিজনের 'শিকার' ও নসিব পঞ্চম জিহাদীর 'এক চাপ কা' গল্পগুলো। পঁচিশটা গল্পের মধ্যে কিছু গল্প বেশ ভালো লেগেছে, আবার কিছু গল্প হতাশও করেছে। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। তবে আমি সবসময়ই চাই এমন হরর-থ্রিলার সঙ্কলনের প্রকাশনা অব্যাহত থাকুক। নানান স্বাদের গল্পগুলো দিনশেষে পাঠের আনন্দটাকেই তুলে আনে হতাশার গভীর থেকে।
বেশ অনেকগুলো দিন লেগে গেলো আমার 'নিশুতি ৩' শেষ করতে। বইটা নিয়ে প্রতিদিনই ঘুরেছি গতো প্রায় এক সপ্তাহ। অফিসে, টিউশনে, চায়ের স্টলে - সবখানে। কাল থেকে হাতে হয়তো অন্য কোন বই থাকবে। যাই হোক, 'নিশুতি ৩' এর প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটিও চমৎকার। তবে 'নিশুতি ২'-এর মতো এটাও বক্সে আসলে আরো ভালো হতো মনে হয়েছে আমার। আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন 'নিশুতি ৩'।
হাতে পাওয়ামাত্রই পড়ে শেষ করে ফেললাম আদী প্রকাশন থেকে প্রকাশিত নিশুতি ৩। গল্প সংকলন পড়ার একটা অন্যতম মজা হচ্ছে একসাথে প্রথিতযশা অনেক জ্ঞানীগুণীদের লেখা পড়া যায়, তাদের সম্পর্কে জানা যায়। সে যাই হোক, বইটিতে ভালো লাগার মতো অনেকগুলো গল্প যেমন আছে, চরম বিরক্তির উদ্রেক ঘটানোর মতোও কিছু গল্প আছে। আশার কথা, ভালো লাগার পরিমাণটাই বেশি। সবার সম্পর্কেই অল্প কথায় কিছু বলার চেষ্টা থাকবে। (আগেই ছবির জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি ভালো ছবি তুলতে পারি না)
১) চুলঃ তানজীম রহমানের এই গল্প দিয়েই নিশুতি ৩-এ পাঠকের প্রবেশ ঘটবে। প্লট, এনভায়রনমেন্ট সেটিং, টেনশন ক্রিয়েট সবকিছুই ছিল অসাধারণ। কিন্তু শেষটা একটু কেমন যেন লেগেছে। ভালো লাগেনি বলব না, তবে লেখক চাইলে আরেকটু ভালো ফার্নিশ করতে পারতেন।
২) ১০ মিনিটঃ নাজিম উদ দৌলার এই গল্পটা লিনিয়ার একটা থ্রিলার। নতুন যারা থ্রিলার পড়তে শুরু করেছেন, তাদের জন্য “টুইস্ট মাস্টার”-এর গল্পটা বেশ উপাদেয় হবে। আর থ্রিলার নিয়ে যাদের ঘাঁটাঘাঁটি বেশ আগে থেকেই, দে উইল স্মেল দ্য টুইস্ট ফ্রম মাইলস অ্যাওয়ে।
৩) সাতসমুদ্রঃ ইন্দ্রনীল স্যানালের এই গল্পটা সংকলনের সবচেয়ে দুর্বল এবং বিরক্তিকর। শেষ কবে এত বোরিং থ্রিলার ছোটগল্প পড়েছি, মনে পড়ে না। যারা যারা পড়েছেন, তারা বুঝবেন লো বাজেটেড আব্বাস মাস্তানের রেস ফ্র্যাঞ্চাইজির স্ক্রিপ্ট এমনই হবে হয়তো।
৫) নিশির বীরোচিত রাত্রঃ আমের আহমেদের লেখনী খুব সুন্দর, তবে এই গল্পটায় কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক করে। বর্ণনায় অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মিলনে লেখক গল্পটা শেষ করেছেন। শেষটা ভালোই ছিল। কিছুটা কাব্যিক।
৬) পোয়েটিক জাস্টিসঃ কেপির এই গল্পটা আমার অন্যতম পছন্দের। ছেঁড়া অনেকগুলো সুতো একসাথে এনে শেষপর্যন্ত কাহিনীটা শেষ করেছেন তিনি।
৭) কৃষ্ণপক্ষিঃ ফরহাদ চৌধুরীর এই গল্পটা সুন্দর। বর্ণনা চমৎকার, সাসপেন্স ধরে রেখেছেন। তবে টেকনিক্যাল বেশ কিছু অসামঞ্জস্যতা চোখে পড়েছে। শেষটাও সুন্দরভাবে হয়েছে।
৮) শুনিয়াছি মুগ্ধ রাতে ডানার সঞ্চারঃ রাফিউজ্জামান সিফাতের ছোটগল্পটা সুন্দর, নামটাও কাব্যিক। তার বর্ণনাভঙ্গি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু এই গল্পটা আমি দুইবার পড়েছি। এরপর মাথা চুলকে ভেবেছি হরর-থ্রিলার সংকলনে এই গল্পটা স্থান পাওয়ার কারণ কী। গল্প নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু এটা মোস্ট প্রোবাবলি এই জনরার না (আমি ভুলও হতে পারি। মাফ করবেন)
৯) প্রলোভনঃ বাপ্পী খানের এই ছোট গল্পটা ভালো লেগেছে। বিশেষ করে শেষটা অপ্রত্যাশিত। কিছুটা শরীর ঘিনঘিনে ব্যাপার থাকলেও একদম এ+ এন্ডিং।
১০) ক্লোরোপ্লাস্টিক মেসেজঃ মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের এই গল্পটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। সাইফাই, থ্রিল, সাসপেন্স সবকিছুই আছে। শেষটাও করেছেন খুব সুন্দর। তবে লেখকের যে জিনিসটা সবচেয়ে ভালো লেগেছে, তা হলো পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার ওপর একটা কঠোর কুঠারাঘাত শব্দের মাধ্যমে। এটা সংকলনের আর কোনো গল্পে পাইনি, তাই এগিয়ে রেখেছি সবার থেকে।
১১) মেঘবতীঃ মনোয়ারুল ইসলামের গল্পটা সুন্দর, ছিমছাম ছোট্ট একটা হরর-সাসপেন্স গল্প। শেষটা বিষাদমাখা।
১২) কোরাইশি ফাইলসঃ আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদের গল্পটা ভালো লেগেছে। তবে লেখকের শেষের মেসেজটা নিয়ে একটাই কথা। কোরাইশিকে পাঠকদের সাথে পরিচিত করিয়ে দিতে চাইলে এটা একটা স্ট্যান্ড এলোন থ্রিলার হিসেবে লেখা উচিত ছিল। একটা প্রশ্ন দিয়ে তিনি আগ্রহটা আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। জলদিই তার মৌলিক আসুক কোরাইশিকে নিয়ে। শুভকামনা রইলো।
১৩) সাবানঃ আহনাফ তাহমিদের এই গল্পটা সংকলনের সবচেয়ে সেরা গল্প। পড়ে মুগ্ধ হয়েছি। শুভকামনা রইলো লেখকের প্রতি।
১৪) ভবিতব্যঃ সাজিদ রহমানের লেখা গল্পটা ভালোই লেগেছে। প্লটটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
১৫) সমাধিঃ লুৎফুল কায়সারের লেখা গল্পটা বেশ ভালো লেগেছে। শেষটায়ও পুরো গল্পের টেনশন বজায় ছিল।
১৬) হানার খেলাঃ সালমা সিদ্দিকার এই গল্পটা দিনশেষে মানুষ আর মনুষত্ব্যবোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের প্রতি মালিকপক্ষের শোষণ আর অবিচারের বিষয়টা তুলে ধরেছেন বেশ সুন্দর, সাবলীলভাবে। টুইস্টটা বোধ করি সবাই ধরতে পারবেন, তবুও পড়তে খারাপ লাগবে না।
১৭) ক্যাসান্দ্রাঃ পিয়া সরকারের এই গল্পটা বেশ দীর্ঘ, বেশ কয়েকবার হাই তুলতে হয়েছে পড়ার সময়।
১৮) নিয়তিঃ মহুয়া দাশগুপ্তের এই লেখার প্লটটা বেশ ইন্টারেস্টিং। বর্ণনাভঙ্গিও ভালো।
১৯) সত্য বিদীর্ণ বিলীনঃ লায়লা জেরিন নামটা আমার কাছে অপরিচিত। আগে কোথাও উনি লিখেছেন নাকি জানি না। লিখে থাকলেও আমার পড়া হয়নি। তবে উনি এই জনরায় বেশ ভালো করবেন, এটা হলপ করে বলতে পারি। গল্পটা তো সুন্দর বটেই, ওনার বর্ণনাভঙ্গিও বেশ ঝরঝরে।
২০) মন্ত্রঃ ইমতিয়াজ আজাদের এই গল্পটার বর্ণনাভঙ্গি ও প্লট বেশ চমৎকার। তবে টুইস্টে গিয়ে একটু মেজাজ খারাপ হয়েছে। মিসির আলির দেবী গল্পটা যারা পড়েছেন, তারা মিল পাবেন কেন কথাটা বলেছি।
২১) অ আ ক খ এবং চন্দ্রবিন্দুঃ আসিফ তাউজের গল্পটা ভালো, বর্ণনাও সুন্দর কিন্তু এন্ডিংটা খুব কনফিউজিং।
২২) শিকারঃ আদনান আহমেদ রিজনের গল্পটা পড়ে বেশ মজা পেয়েছি। সেরের ওপর সোয়া সের টাইপের এন্ডিং।
২৩) কোয়াটঃ মোহতাসিম হাদী রাফীর লেখার হাত খুব ভালো। অনুরোধ থাকবে তিনি যেন মৌলিকের দিকে মনোযোগ একটু বেশি দেন।
২৪) এক কাপ চাঃ নসিব পঞ্চম জিহাদীর গল্পটা শুরুটা বেশ প্রমিসিং এবং চমৎকার হলেও এন্ডিংটা ভালো লাগেনি। আমি ওনার লেখার ভক্ত। তবে এই ছোটগল্পটায় একটু হতাশ।
২৫) গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্কঃ সম্পাদক ওয়াসি আহমেদ সাহেবের লেখা গল্পটাই সংকলনের শেষ গল্প। এই গল্পটা পাঠকদের একটু সাবধানে সময় নিয়ে পড়তে হবে। একটানে পড়া যাবে না, নইলে ছন্দটা কেটে যাবে। স্টাইলটা ক্লাসিক, ভালো লেগেছে। এই ছিল রিভিউ। অনেক পাঠক, রিভিউয়ার পেজ কোয়ালিটি, বাইন্ডিং ইত্যাদি নিয়ে বেশ আলোচনা করেন। সেদিক চিন্তা করে বলছি, নিশুতি ৩ বইটা নিশুতি ফ্র্যাঞ্চাইজের সবচেয়ে ভালো মেকিং। বাঁধাই, পৃষ্ঠামান, প্রচ্ছদ সবকিছুই টপ নচ। অভিযোগের কোনো অবকাশ রাখেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আবুল ফাতাহ মুন্নার করা প্রচ্ছদটা খুব সম্ভবত নাজিম উদ দৌলার গল্পের মূলভাব অনুযায়ী করা হয়েছে (আমি শিওর না)। প্রচ্ছদ ভালো লেগেছে, তবে এটার ওপর আরেকটু চিন্তার সময় হয়ত দেয়া যেতো।
❝Short fiction seems more targeted - hand grenades of ideas, if you will. When they work, they hit, they explode, and you never forget them.❞ — Paolo Bacigalupi - ❝নিশুতি ৩❞ - ❝নিশুতি ৩❞ বইটি মূলত একটি হরর-থ্রিলার ধারার গল্প সংকলন। ২৫ জন লেখকের ছোট-বড় ২৫টি গল্প নিয়ে এই গল্পসংকলনটি ২০২১ সালে "আদী প্রকাশন" থেকে প্রকাশিত হয়। - চুল – তানজীম রহমান: সংসারে নানা ধরনের টানাপোড়েন চলছে বাশার নামের একজন নাপিতের। এই সময় সে একজন অদ্ভুত বাধা খদ্দের পেয়ে যায় তার সেলুনে। সেই খদ্দেরের আসল মতলব নিয়েই চুল গল্পটির কাহিনি। সংকলনের প্রথম গল্প হিসেবে খুবই ভালো লেগেছে এই গল্পটি আমার। যেভাবে কাহিনি এবং ভয়ের উপাদান দেয়া হয়েছে গল্পে তা বেশ ভালোই লাগলো। তবে ফিনিশিংটা আরো ডিসাইসিভ হতে পারতো বলে মনে হলো। - ১০ মিনিট - নাজিম উদ দৌলা: রিমন নামের এক লোক তার স্ত্রীকে জানিয়ে ১০ মিনিটের জন্য ঘর থেকে বের হয়। কিন্তু অনেক সময় পরে সে পুলিশের ফোন পেয়ে তাদের বাসায় গিয়ে দেখে তাদের বাসায় ভয়াবহ অঘটন ঘটে গিয়েছে, এবং সেই অঘটন নিয়েই বইটির কাহিনি। ছোট টুইস্টিং এই গল্পটি কিছুটা প্রেডিক্টেবল হলেও পড়তে খারাপ লাগেনি। - সাত সমুদ্র– ইন্দ্রনীল স্যানাল: ভারতীয় মহাসাগরে ডুবে যাওয়া এক সাবমেরিনে থাকা এক ভয়াবহ অস্ত্র দখলে নামা কয়েকটি দেশের এজেন্টকে নিয়ে গল্পটির কাহিনি। কিছুটা দেশপ্রেম ভিত্তিক এই গল্পটা একেবারে বিলো অ্যাভারেজ লাগলো সবমিলিয়ে। - অপরিপক্ক– সৈয়দ অনির্বাণ: মাহিন নামের এক প্রডিজি টাইপের ছেলে আর তার বড় চাচাতো বোন শর্মীকে নিয়ে এই গল্পটির মূল ঘটনা। এই গল্পে ভয়ের উপাদান থাকলেও কেন জানি চরিত্রগুলো বিশ্বাসযোগ্যভাবে ফুটে উঠলো না, বিশেষ করে মূল চরিত্রটি। - নিশির বীরোচিত রাত্রি– আমের আহমেদ: নিশি নামের এক কিশোরী মরণব্যাধি রোগ নিয়ে বিদেশে আসে এবং সেখানকার কিছু অস্বাভাবিক ঘটনা নিয়েই গল্পটি লেখা। প্লটটা খুব একটা ইউনিক না হলেও নিশি নামের মেয়েটির চরিত্রের গতি-প্রকৃতি বেশ হৃদয়গ্রাহী ছিলো। - পোয়েটিক জাস্টিস- কিশোর পাশা ইমন: এক সরকারী অফিসে হঠাৎ চোরের আগমনে একজন কর্মকর্তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার পরবর্তী ঘটনাবালী নিয়ে গল্পটি লেখা। গল্পটির ঘটনাশৈলী প্রথমদিকে একটু অগোছালো লাগলো, শেষে গিয়ে অবশ্য নামের স্বার্থকতা পাওয়া গিয়েছে। - কৃষ্ণপক্ষি– মোঃ ফরহাদ চৌধুরী শিহাব: ফারজানা নামের এক কিশোরীর বিয়ের পরে তার শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পথে সুনামগঞ্জের হাওড়ে এক অতিপ্রাকৃতিক সত্তার আক্রমণের শিকার হয়। এর পরবর্তী ঘটনা নিয়েই গল্পটি লেখা। এই গল্পটি ব্যক্তিগতভাবে আগাগোড়া দুর্দান্ত লেগেছে। যেভাবে ভয়ের উপাদান এবং গল্পের পরিবেশের বর্ণনা দেয়া হয়েছে তা দারুণ লাগলো। আমার মতে সংকলনের অন্যতম সেরা গল্প হচ্ছে কৃষ্ণপক্ষি। - শুনিয়াছি মুগ্ধ রাতে ডানার সঞ্চার– রাফিউজ্জামান সিফাত: মইদুল নামের এক ইজিমোটর ভ্যানচালকের রুটিন চাকরির বিঘ্ন ঘটে যখন তার মালিকের ছোট মেয়ে তার সাথে এক বিশেষ ব্যপারে আলাপ করতে আসে। গ্রাম্য সমাজ ভিত্তিক এই গল্পটি কোনভাই গল্পের টোনের সাথে খাপ খেল না। - প্রলোভন- বাপ্পী খান: জুব্বা মিয়া একজন মুচি। হঠাৎ মেয়ের বিয়ের কারণে তার বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন হয়। সে সময়ই ত্রানকর্তার বেশে আবির্ভূত হয় লুসি নামের এক নারী। মেয়েটি জুব্বা মিয়াকে এক ধরনের বিশেষ জুতার অর্ডার দেয় এবং সেই জুতা বানানো নিয়েই গল্পটির কাহিনি। গল্পটি প্রথম থেকেই বেশ আকর্ষক এবং শেষটা বেশ অভাবনীয় বলা চলে। এটিও আমার দৃষ্টিতে সংকলনের সেরা গল্পগুলোর ভেতরে থাকবে। - ক্লোরোপ্লাস্টিক মেসেজ– মোহাম্মদ সাইফূল ইসলাম: ডঃ প্রফেসর কামরুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা প্রফেসর। হঠাৎ তার কাছে রায়হান নামে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র আসে এক বিশেষ রিসার্চ পেপার নিয়ে। সেই রিসার্চ পেপারের প্রয়োগ এবং তার ফলাফল নিয়েই এই গল্পটি লেখা। সায়েন্স ফিকশন ঘরানার এই গল্পটি খুবই ভালো লাগলো, সায়েন্স এবং ফিকশনের চমৎকার সম্মেলন ঘটেছে এতে। বিশেষ করে পিপার এবং তার বিদ্রোহী দলের গল্পে ভূমিকার অংশটুকু। আমার মতে নিঃসন্দেহে সংকলনের টপ গল্পগুলোর ভেতরে একটা এটি। - মেঘবতী– মনোয়ারুল ইসলাম: রেণুকা নামের এক মেয়ে এলাকায় নতুন আসলে সেই এলাকায় এক পোড়াবাড়ির সন্ধান পায়। তাই একদিন সেই পোড়াব���ড়ির ভেতরে ঢুকলে জানতে পারে এক অদ্ভুত সত্য। কিছুটা ট্রাজেডিভিত্তিক এই ছোটগল্পে ভয়ের আবহ থাকলেও কাহিনির গতি প্রকৃতি বেশ আগেই বোঝা যায়। - কোরাইশি ফাইলস– আব্দুল্লাহ ইবনে মাহমুদ: ঢাকার এক সংসদ সদস্য হঠাৎ অতিপ্রাকৃতিক শক্তির পাল্লায় পড়লে সে জেনিথ সিকিউরিটি এজেন্সি নামক একটি প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থার দারস্থ হয়। এখন কীভাবে সেই সংস্থার প্রধান এই অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মোকাবেলা করে তা নিয়েই মূল গল্পটি লেখা। এই গল্পের মূল ঘটনাটি বেশ চিরচেনা ঘরানার, আর যে প্রাইভেট গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকে দেখানো হলো তাকেও খুব বেশিই ফোকাস দেয়া হয়েছে মনে হলো। একই সাথে বডিগার্ড ভাড়া দেওয়া, প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি (যা বাংলাদেশের আইনে কতটুকু পসিবল এ ব্যপারে আমি সন্দিহান) আবার অতিপ্রাকৃতিক ব্যপারগুলোও সমাধান করা - একটি সিকিউরিটি এজেন্সির প্রধানের সাথে এতসব কিছুর সংযোগ একটু বেশিই হিরোইক লাগলো আমার কাছে। - সাবান– আহনাফ তাহমিদ: ওসিডিতে আক্রান্ত জামান এক লোক তার বন্ধুর ভাইয়ের বিয়েতে যায়। কিন্তু হাত ধোঁয়া জনিত এক কারণে তাড়াতাড়িই বের হয়ে যায়। তারপর থেকেই তার সাথে হতে থাকে এক অদ্ভুত সমস্যা। খুবই ইন্টারেস্টিং শুরুর পরে শেষটা অনেকটা ধোঁয়াশা ভাবেই হলো এই গল্পের। তবে লেখক তানজীম রহমানের চুল গল্পটির সেলুনের বর্ণনার মতো এই গল্পের বিয়েবাড়ির বর্ণনাও বেশ রিলেটেবল লাগলো। - ভবিতব্য– সাজিদ রহমান: চিতা শামস নামের এক আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইটারের কাহিনি। আন্ডারগ্রাউন্ড ফাইটিং রিঙ এ প্রায় অপ্রতিরোধ্য এই ফাইটারের এক বিশেষ ফাইট নিয়েই বইয়ের শেষাংশ লেখা। এই গল্পের স্টোরি আর স্টোরিটেলিং, দুইটাই কেন যেন প্রেডিক্টেবল লাগলো। - সমাধি– লুৎফুল কায়সার: অদিতি নামের এক মেয়ে পুরোনো বইয়ের দোকানে একটি ডায়েরি পায়। সে ডায়েরি পড়া শুরুর পরে বুঝতে পারে আসলে এটি মধ্যযুগের এক নাবিকের ডায়েরি। সেই নাবিকের জীবনের এক ভয়াবহ সমুদ্রযাত্রার অংশ নিয়েই গল্পের বাকি অংশটি লেখা। অনেকটা লাভক্রফটিয়ান হরর ধাঁচের গল্পের শেষ অংশটি বেশ ভয়াবহই লাগলো। গল্পের দৈর্ঘ্য অনুসারে ওভারঅল ভালো বলা যায় এই গল্পটিকে। - হানার খেলা– সালমা সিদ্দিকা: গার্মেন্টস কর্মী নাজমুন প্রতিদিনের মতো কাজে আসলেও গার্মেন্টসে এক দুর্ঘটনার ফলে তার নিয়তির ফেরে সে পড়ে যায় এক ভয়াবহ খেলায়। সেই খেলার আগে নাজমুনের জীবন এবং খেলার ফলাফল নিয়েই গল্পটি লেখা। একটি সামাজিক সমস্যাকে ঘিরে লেখা গল্পটি শেষ পর্যন্ত খারাপ লাগলো না, চলে টাইপ গল্প আরকি। - ক্যাসান্দ্রা– পিয়া সরকার: বিকাশ নামের এক হস্তরেখাবিদের কাছে কেতকী নামের একজন মহিলা অদ্ভুত এক সমস্যা নিয়ে আসে, তা নিয়েই কাহিনি এগিয়ে যায়। যেভাবে গল্পটি ঘটনাশৈলী বর্ণনা করা হয়েছে তা খুবই কনফিউজিং এবং লেখনশৈলীও তেমন একটা টানলো না। সংকলনের সবথেকে বড় এবং দুর্বল গল্পগুলোর ভেতরে একটা লাগলো একে। - নিয়তি– মহুয়া দাশগুপ্ত: রুপম সেন একজন শখের ভূত খোঁজা মানুষ। হঠাৎ তার কাছে খবর আসে কালিম্পং শহরের কাছে ঝান্ডি নামক এক গ্রামের সাথের জঙ্গলের এক প্রান্তের বাংলোয় এক দম্পতি থাকে, সেখানে বেশ ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড ঘটছে। আই পি টি এর এক সদস্যসহ সে সেখানে যাওয়ার পরবর্তী ঘটনা নিয়ে গল্পটি লেখা। এই গল্পের প্লট বেশ প্রেডিক্টেবল হলেও লেখনশৈলী খারাপ লাগেনি অতটা, সংকলনের হিসেবে চলনসই একটা গল্প। - সত্য বিদীর্ণ বিলীন- লায়লা জেরিন: আকাশ নামের এক লোকের জীবনে বিস্বাদের ছায়া নেমে আসে যখন তার মেয়ে লামিয়া মারা যায়। তাই তার মেয়েকে ফিরে পাওয়ার আশায় সে নানা জায়গায় যাওয়া শুরু করে এবং তার ফলাফল নিয়েই গল্পটি লেখা। এই গল্পের প্লটটা ইন্টারেস্টিং লাগলেও সেটি ঠিকভাবে গুছিয়ে নেয়া হয়নি বলে মনে হলো। কিছুটা সায়েন্স ফিকশন ধাঁচে লেখা বলে কয়েকটি ব্যপারে আরো খোলাসা করার প্রয়োজন বোধ করেছিলাম। - মন্ত্র- ইমতিয়াজ আজাদ: এই গল্পের প্লটের একটা অংশ অনেকটা এর আগের গল্প সত্য বিদীর্ণ বিলীন এর মতোই। তবে এখানে কমল নামের এক লোক তার মেয়ের বদলে বাবাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টায় শুরু করে এক যজ্ঞ। শুরুটা বুঝতে একটু সময় লাগলেও গল্পের শেষটা অবশ্য ইন্টারেস্টিংই লাগলো। - অ আ ক খ এবং চঁন্দ্রবিন্দু !- আসিফ তাউজ: সংকলনের কোরাইশি ফাইলস গল্পের মতো এই গল্প সরফরাজ নামের একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ কাম ভূত হান্টার নিয়ে লেখা। অবশ্য এই গল্পের ডিটেক্টিভকে কোরাইশি ফাইলস এর থেকে বেশ গ্রাউন্ডেড মনে হলো। তার জীবনের শেষ কেস নিয়েই গল্পটি এগিয়েছে (যদিও এক্ষেত্রেও বাংলাদেশের আইনে তা কতটুকু পসিবল এ ব্যপারে আমি সন্দিহান)। চমৎকার সূচনার পরেও শেষটা বেশ টিপিক্যাল ভাবেই শেষ হলো। - শিকার– আদনান আহমেদ রিজন: এক লেখকের একটি ব্যাংক ডাকাতির ভেতরে জড়িয়ে পড়া বিষয়ক অ্যাকশন থ্রিলার। খুব একটা বাস্তবসম্মত লাগলো না গল্পটিকে, আরো কয়েকটা লেয়ার দেয়া যেতে পারতো বলে মনে হলো এই গল্পে। - কোয়াট– মোহতাসিম হাদী রাফী: অবিনাশ নামের একজন তান্ত্রিক তার পরিচিত একজনকে নিয়ে চন্দনপুর নামে দুর্গম এক এলাকায় যান। তার সেখানে যাওয়ার মূল কারণ ছিলো সেখানে কোয়াট বা নিশির ডাক শোনা যাচ্ছিলো বলে তিনি জানতে পারেন। এখন সেই গ্রামে আসলে কী রহস্য লুকিয়ে আছে তা নিয়েই গল্পটি লেখা। এই গল্পের পটভূমি এবং ভয়ের আবেশ দুটোই ভালো লাগলো। সংকলনের সেরা গল্পগুলোর কাতারে আমি এই গল্পটিকেও রাখবো। - এক চাপ কা- নসিব পঞ্চম জিহাদী: এই গল্পের কথক বাসের ভেতরে হঠাৎ এক পরিচিত মুখ দেখতে পায়। তার সাথে বাসায় গেলে সে বুঝতে পারে যে এই বাসার কোন একটা কিছু ঠিক নেই। বেশ ক্রিপি ভাইব দিলেও বলা যায় উদ্দেশ্যহীনভাবেই গল্পটা শেষ হলো। - গোটা শহর বাতি জ্বেলে সতর্ক- ওয়াসি আহমেদ: রুটিনমাফিক জীবনে অভ্যস্ত রঞ্জু সাহেবের জীবনে বাথরুমের লাইট ঠিক করার দিন থেকে শুরু হয় চোখে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা। চোখের এই ভয়াবহ সমস্যা দিন দিন বাড়তেই থাকে এবং তা নিয়েই মূল গল্পটি এগিয়েছে। সংকলনের শেষ গল্প হলেও একেবারেই অন্য ধাঁচের এক গল্প, সে হিসেবে খারাপ লাগেনি গল্পটা। - সংকলনের কারিগরি দিক থেকে দেখলে ❝নিশুতি ৩❞ বইটির বাইরের প্রোডাকশন খারাপ লাগেনি আমার। বইয়ের নামলিপি ভালো লাগলেও প্রচ্ছদ বেশ সাদামাটাই লাগলো। প্রতিটা গল্পের শুরুতে একটি রিলেটেবল ইলাস্ট্রেশন দেয়ার ব্যপারটা ভালো ছিলো। হরর-থ্রিলার জনরার এতগুলো ভিন্ন ধাঁচের মৌলিক লেখা বাছাই করার জন্য সম্পাদককে সাধুবাদ জানাই। তবে কিছু জায়গায় ছোটখাট বানান ভুল এবং টাইপো দেখলাম। আশা করি সামনের সংস্করণে বইয়ের সম্পাদক এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই ভুলগুলো ঠিক করে নিবে। - এক কথায়, বাংলা ভাষায় শুধুমাত্র হরর-থ্রিলার জনরার উপর ভিত্তি করে বেশ ভিন্নধারার এক মৌলিক গল্পসংকলন হচ্ছে ❝নিশুতি ৩❞ । যারা বাংলা মৌলিক থ্রিলার কিংবা হরর ছোটগল্প পড়তে পছন্দ করেন তাদের জন্য এই সংকলনটি রিকমেন্ড করা থাকলো।
খুব ভালো লেগেছে নিশুতি ৩। আগের সংকলনগুলো পড়া হয়নি, তাই চিন্তায় ছিলাম কেমন হবে। তবে বইটির প্রথম গল্প পড়েই এতো ভালো লেগেছিলো যে, বাকি কয়েকটা গল্প একসাথে পড়ে ফেলেছিলাম। অনেকগুলো চমৎকার ছোট গল্প রয়েছে বইটিতে,তবে কয়েকটি গল্প আবার ভালো লাগেনি। কিন্তু অবশ্যই বলব, ভালো লাগার পরিমাণটা বেশি। যারা ভালো কিছু থ্রিলার-হরর গল্পসংকলন পড়তে চান , তারা বইটি পড়ে ফেলতে পারেন। আসা করি ভালো লাগবে। হ্যাপি রিডিং