গল্পতরু'' নামটা শুনলেই প্রথমে মাথার ভেতর কোন শব্দটা উঁকি দেয়, বলুন তো? কল্পতরু নিশ্চয়? হ্যাঁ, বৈদিক পুরাণের সেই কল্পতরু বা কল্পদ্রুম, দেবরাজ ইন্দ্র যাকে স্বর্গে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। কল্পতরু এমন এক পৌরাণিক বৃক্ষ, যার নিচে বসে কিছু চাইলে বাস্তবেই তা পাওয়া যায়। গল্পতরু হয়তো আক্ষরিক অর্থে সেই বর দিতে পারবে না, তবে মনের খোরাক মেটাতে তা কল্পতরুর মতোই সক্ষম!
গল্পতরুকে নর্স পুরাণের মহাবৃক্ষ ইগড্রাসিলের সাথেও তুলনা করা যায়। পৌরাণিক সৃষ্টিতত্ত্ব অনুযায়ী, এই মহাবৃক্ষকে ঘিরেই নয়টি জগতের অস্তিত্ব বিদ্যমান। একেক জগতে আবার একেক শ্রেণীর বসবাস; কোথাও দেবতা, কোথাও মানুষ, কোথাও অসুর, আবার কোথাও বিচিত্র সব পশুপাখি। জগতভেদে পরিবেশও আবার আলাদা আলাদা। প্রসঙ্গত বলে নেয়া ভালো, গল্পতরুর গল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমরা নির্দিষ্ট কোন জনরা বা ধরন অনুসরণ করিনি। লেখক যেভাবে লিখতে অভ্যস্ত বা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, তাকে সেই স্বাধীনতা দিতে চেয়েছি। থ্রিলার, হরর, সাই-ফাই, পরাবাস্তব, সমকালীন – কোনকিছুই বাদ যায়নি। পৌরাণিক সেই ইগড্রাসিলের মতোই বহু স্বাদের, বহু আঙ্গিকের গল্প আবর্তিত হয়েছে গল্পতরুকে ঘিরে।
শীতের পাতাঝরা বিকেলে অথবা বসন্তের নতুন পাতার জন্মলগ্নে গল্পতরু আপনাকে আবিষ্ট করে রাখুক।
কৌশিক জামান একজন অপদার্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে- গুড ফর নাথিং। জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে পরাজিত হতে হতে হাল ছেড়ে দেয়া একজন ব্যক্তি। কিছু মানুষ আছে না এক ভুল বার বার করে? তিনিও ঐ কিসিমের।
তাই নিজেকে বন্দী করে রেখেছেন একশ স্কয়ার ফিটের একটা রুমে। রুম ভর্তি শুধু বই আর বই। বই পড়তে পড়তে তার মনে হয়েছে কিছু একটা লিখে ফেলা দরকার। এবং অখাদ্য ছাইপাঁশ কিছু আবর্জনা লিখেছেন যেগুলো প্রকাশক একরকম চাপে পড়ে ছাপিয়ে এখন আফসোস করছেন।
আমি সাধারণত কোন বই কেনার আগে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করি। বইটার কাহিনী কী নিয়ে, রিভিউ কেমন, পরিচিতদের মধ্যে কে কে পড়েছেন সে সবকিছু জেনে বুঝে দেখে নিয়ে এরপর কেনার চেষ্টা করি। কিন্ত এবার বইমেলায় যখন অবসর প্রকাশনীর স্টলে গল্পতরু দেখি, তখন খানিক উল্টে পাল্টে মনে হল এই বইটা পড়তে হবে। কারণ দুটো- এক, সম্পাদনায় থাকা দুই লেখকের বই-ই সম্প্রতি পড়ে ভীষণ ভালো লেগেছিল আর দুই, সূচীপত্রে যেসব মানুষের নাম দেখা যাচ্ছিল, তাঁদের লেখা। এঁদের সবাইকে চেনা না থাকলেও, অনেকেই আমার খুব খুব খুব পছন্দের লেখক। আর তাই বেশি চিন্তাভাবনা না করে বইটা বগলদাবা করে বাসায় ফিরেছি সেইদিন।
গল্পতরু কেনবার সময় আমার শুধু মনে পরছিল ছোটবেলায় যে পুজো বার্ষিকীগুলো কিনতাম, সেগুলোর কথা। দুই মলাটের ভেতর কী চমৎকার চমৎকার সব লেখা। আর শুরুতেই যেমন বলছিলাম এই বইয়ের বেশকিছু লেখকের লেখার সাথে পরিচয় আছে আগে থেকে, তাই জানতাম বই পরে হতাশ হবার সম্ভাবনা কম।
গল্পতরু’তে ৩৬ জন লেখকের লেখা ছোটগল্প আছে। আর এই ৩৬টা গল্প একেকটা একেক রকম বৈচিত্র্যতায় ভরপুর। একটার থেকে আরেকটা ভিন্ন। এতে নিখাদ ছা-পোষা মধ্যবিত্ত বাঙ্গালি পরিবারের গল্প আছে, তেমনি ভয়ের গল্প আছে, আবার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী-ও আছে। আর আছে এমন সব গল্প যেগুলো পড়লে আপনার মনে হবে এ গল্প যেন সত্যি ছাড়া মিথ্যা হতে পারে না।
এই বইয়ের একজন লেখকের লেখা পড়ে আমি এতটাই মুগ্ধ হয়েছি যে সাথে সাথে তাঁর অন্য একটা বই আনিয়ে নিয়েছি পড়ব বলে। গল্প সংকলনের এই ব্যাপারটা কিন্ত আসলেও দারুণ লাগে। আপনি কোন লেখকের বইয়ের পিছে সময় এবং টাকা বিনিয়োগ করবেন কি না সেটা খুব সহজে বুঝতে পারবেন কোন একটা গল্প সংকলনে তাঁর লেখা চেখে দেখে।
আমি আগেও বলেছি যে সংকলনের গল্প নিয়ে কথা বলা খুব মুশকিল। কারণ না যায় সব নিয়ে কথা বলা আর না যায় একটা কিংবা দুটো নিয়ে কথা বলা। তবে উল্লেখ করতে হলে আমি সম্পাদকদ্বয়ের লেখার কথা বলব। ওয়াসি আহমেদের লেখা বুড়ি চাঁদ বেনোজলে ভাসার পর পড়ে কেমনে একটা বিষাদ ভর করেছিল মনে। আর কৌশিক জামানের লেখাটা পড়ে আমি বুঝতে পারছিলাম না এর কতটুকু বাস্তব আর কতটুকু বানোয়াট কাহিনী মাত্র।
গল্পতরু সংগ্রহে রাখবার মত একটা বই। আপনি বেড়াতে যাবার সময় একে সাথে নিয়ে যেতে পারবেন। আপনি বাসায় বসে ল্যাটকায় এই বই পড়তে পারবেন। আবার আপনি চাইলে এর সুন্দর সুন্দর ছবি-ও তুলতে পারবেন কারণ প্রচ্ছদ সুন্দর।
গল্পতরু। শব্দটি শুনলেই ছেলেবেলায় সুকুমার রায়ের কোন বইতে পড়া কল্পতরুর কথা মনে পড়ে যায়। যে কল্পতরু নিয়ে আছে পৌরাণিক কাহিনী। মানবসভ্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার খুব সম্ভবত গল্পকথন। এই স্টোরিটেলিং এর উপর নির্ভর করেই হয়েছে সব আবিষ্কার। গুগল, ফেসবুক, মাইক্রোসফ্ট, অ্যাপল, এসব বড় বড় কোম্পানী থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় পরিবর্তন এবং অগ্রসরতা হয়েছে ফিকশনের একটি অংশ গল্পের হাত ধরেই। কারণ গল্পকথন মিথলজির চেয়েও প্রাচীন।
গল্প সংকলন আমার বরাবরের মতই পছন্দের বিষয়। তাছাড়া ঐ সংকলনে যদি সমসাময়িক প্রিয় কিছু লেখকের বলা গল্প থাকে তাহলে তো কথা-ই নেই। গল্পতরুর সব স্টোরি ভালো লেগেছে একথা বলবো না। একটি সংকলনের সবকিছু ভালো লাগাটা বিরল ব্যাপার। তবে ৩৭ টি গল্পের মাঝে ভালো লাগার সংখ্যা মনে হয় তুলনামূলকভাবে কম। কিছু অনারারি মেনশন দেয়া লাগে।
মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের "নামে কি এসে যায়"। শরীফুল হাসানের "পোড়া মন" অন্যরকম এক বিষন্নতা এনে দিয়েছে। দারুন লিখেছেন সময়ের অন্যতম সেরা এই রাইটার। প্রিয় লেখক জাহিদ হোসেনের "এক আঁটি লালশাক" বাস্তবতা এবং মিথলজির পার্থক্য যেন ঘুচিয়ে দিয়েছে। তানজীম রহমানের "সুর" দুর্দান্ত ছিল। আরেক প্রিয় লেখক নাবিল মুহতাসিমের "আবার কুড়ি বছর পরে" খুব ভালো লেগেছে। সালমান হকের "ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুকছে" ভালো লেগেছে। সিদ্দিক আহমেদের "শব্দের খোয়াব" এই সংকলনের অন্যতম সেরা গল্প। তানজিরুল ইসলামের "মহা সিমুলাই" এ মাল্টিভার্সের গল্প সুন্দর হয়েছে। শাহেদ জামানের "পর্যটক" দারুন লেগেছে। বাপ্পী খানের "স্বপ্নজট" পড়ে আমি জেনুইনলি ভয় পেয়েছি। যান্ত্রিকতার মাঝে দারুন এক রোমান্টিক লিখেছেন "যন্ত্র - না" তে সালেহ আহমেদ মুবিন।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে ফারিয়া প্রেমার "তোমরা যা-ই বলো, যা-ই বলো" গল্পটি। বাবা এবং কন্যার নিদারুন ভালোবাসা সহজাত ভাষায় এত সুন্দর করে লিখেছেন লেখক যে মুগ্ধ হয়ে থাকার মত।
শাহরিয়ার খান শিহাবের "লাখোটিয়ার ভাঙা দেয়াল" আরেকটি বিষন্নতায় ভরা সুন্দর গল্প।
এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সেরা পছন্দের গল্প হল ওয়াসি আহমেদের লিখা "বুড়ি চাঁদ বেনোজলে ভাসার পর" স্টোরিটি। কিছু বলবো না। পাঠক পড়ে নিয়েন, সম্ভব হলে।
কৌশিক জামানের "পিয়াল" ভালো লেগেছে অনেক।
বাকি গল্পগুলো মোটামোটি ভালো লেগেছে।
এই ধরণের গল্প সংকলনে সাধারণত থ্রিলার, হরর, সাসপেন্স, সায়েন্স ফিকশন, রোমান্টিক, ডার্ক কমেডি, পরাবাস্তবতা, জাদুবাস্তবতা অনেক ধরণের জঁরা-ই পাওয়া যায়। ফলে সময়টা ভালো কেটে যায়।
তবে একই প্রকাশ���ার একই সম্পাদকের গল্পরথ আগে পড়ে ফেলায় গল্পতরু সব মিলিয়ে মোটামোটি ভালো লাগার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমার মেনশন করা গল্পগুলো কমবেশি চমৎকার ছিল।
কৌশিক জামান এবং ওয়াসি আহমেদের প্রতি শুভকামনা।
গল্পকথন মানব সভ্যতার সাথে সমান্তরালে এগিয়েছে। অথবা হয়তো সভ্যতা এগিয়েছে গল্পকথনের কাঁধে ভর দিয়ে।
একটা সংকলনের সব গল্প ভালো লাগবে ব্যাপারটা তা না।তবে এই সংকলনের বেশিরভাগ গল্পই আমার ভালো লেগেছে।প্রায় ২ মাস ধরে ধীরে ধীরে পড়ে শেষ করছি। গল্প সংকলন খুব বেশি বের হয় না আজকাল। এই বছর এই বইটা নিয়ে ৩টা গল্প সংকলন পড়েছি এবং ৩টা সংকলনই ভালো লেগেছে। আশা করি আরো গল্প সংকলন এই টিমের কাছ থেকে পাবো সামনের দিনে। কোন গল্পগুলো ভালো লাগছে তা আলাদা করে বললাম না,কারন আমার মনে হয় এই বইয়ে এই দুনিয়ার বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন পছন্দের গল্পের সমাবেশ রয়েছে। এমন একটা সংকলন যদি পাশে থাকে তাহলে অবসর সময় কাটানোর জন্য কি লাগে।
ইলাস্ট্রেশনগুলোও খুব মনকাড়া ছিল ৷ গল্পের কিছুটা আন্দাজ করা যাচ্ছিল সেই স্কেচগুলো দেখে । ছোট করে নির্বাচিত কিছু গল্প নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম ! আশা করি রিভিউটা ভালো লাগবে সবার ।
★ নামে কিছু এসে যায় - মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
আমরা সবাই ছোটবেলায় বুঝে না বুঝে কিছু ভুল করি । স্কুলের বাচ্চাদের বয়েসই বা কতো থাকে ! শিক্ষকরা নিজে যদি হাল না ধরেন, তাহলে বাচ্চাদের বিপথে যাওয়া খুব একটা শক্ত নয় । কিন্ত সবকিছুর পরেও ভালোবাসা আর বন্ধুত্ব সবসময় জিতে নেয় হৃদয়, অভিমান একসময় ভেঙ্গে যায় প্রিয় বন্ধুর আলিঙ্গনে । এই গল্পটা বন্ধুত্বের, গল্পটা বদলে যাওয়ার এবং নিজেকে পাল্টে ফেলার, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার । নিজেকে খুঁজে পেতে মাঝে মাঝে আমাদের কিছুটা পিছের দিকে তাকাতে হয়, খুঁজে নিতে হয় শেকড় । আর বাৎসল্যের মাধ্যমে সে ব্যাপারে খুব সুন্দর করে লেখক দেখিয়েছেন । গল্পটায় খুব প্রাণবন্ত একটা ব্যাপার ছিল । স্কুল লাইফের কথা মনে পড়ে যাবে অনায়াসেই !
★ পোড়া মন - শরীফুল হাসান
ইউনিক প্লট । গল্পের লোকেশন সানকিপাড়া, ময়মনসিংহ ৷ আমার হৃদয়ের অন্তস্থলে যেই জায়গার বসবাস, সেই জায়গার নাম গল্পে দেখতে পেয়ে খুব ভালো লেগেছে ৷ সহগ সরল ভাষায় আমাদের চারপাশের মানুষের রোজকার অনুভূতির গল্প । একজন রিক্সাওয়ালার প্রেম এবং পিতৃত্বের অনুভূতির গল্প । খুব অন্যরকম না কন্সেপ্টটা ? গল্পটাও খুব অন্যরকম !
★ ভাঙাচোরা চাঁদ মুখ কালো করে ধুঁকছে - সালমান হক
এই শহরে আমাদের মতোনই অসহায় এক বেকার যুবকের গল্প । অস্ত্বিত্ব রক্ষার জন্যে যতো যা করা যায় করছে, অথচ তাও গল্পের নামের মতোনই ধুঁকে ধুঁকে বাঁচছে । আশেপাশের মানুষের সাথে মিল পাই এমন গল্পে, কিছুটা নিজের সাথে, প্রিয় মানুষদের সাথে ৷ নস্টালজিয়া আর মেলানকোলির সুন্দর সংমিশ্রণ ৷
★ শব্দের খোয়াব - সিদ্দিক আহমেদ
গল্পের অনেকটা ভেতরে এসে বুঝতে পারলাম গল্পটা কি নিয়ে হতে চলেছে ৷ তখনই উত্তেজনার পারদ চড়ে গেল অনেকখানি । অসাধারণ, চমৎকার গল্প । লেখকের লেখা নিয়ে বলার কিছুই নেই আসলে, যারা পড়েন তারা জানেন তার প্রতিভা সম্পর্কে ৷ কিন্ত প্রতিভার সাথে সাথে তার লেখায় যত্ন আর পরিশ্রমের ছাপও থাকে । এক কথায়, সেরা ! চমৎকার চমৎকার চমৎকার !!
★ দেহ - আবরার আবীর
গল্পে একটা লাইন আছে, "মৃত্যু কেবল প্রয়োজনীয়তার প্রকাশ মাত্র" ৷ লাইনটা ভাবিয়েছে আমাকে, গল্পের প্লট আর মূল থিমটাও বেশ চিন্তাউদ্রেককারী । সব মিলিয়ে বেশ ভালো একটা গল্প ।
★ পর্যটক - শাহেদ জামান গল্পটা পড়ে বেশ কিছু গল্পের কথা মনে হয়ে গেছে ৷ জাফর ইকবালের মহাজাগতিক কিউরেটর, উপন্যাস টুকুনজিল, হুমায়ুন আহমেদের গরু - এই গল্পগুলোর হাল্কা ছায়া দেখতে পেয়েছি । যারা গল্পগুলো পড়েছেন, তারা বুঝতে গেছেন যে গল্পটা সায়েন্স ফিকশন, পিঁপড়েদের নিয়ে ৷ গল্প হিসেবে ভালো, শাহেদ জামানের ঝরঝরে লিখা নিয়ে কারোরই কোন সংশয় নেই ।
★ এই রাস্তায় খুব বেশী এক্সিডেন্ট হয় - সুস্ময় সুমন
শুরুটা হয়েছিল সুন্দর ভাবে, কিন্ত শেষে বেশী তাড়াহুড়ো হয়ে গেলো । আরো ভালো কিছু হতে পাররো গল্পটা, একটা অতৃপ্তি কাজ করেছে পড়ে ।
★ স্বপ্নজট - বাপ্পী খান
একটু প্রেডিক্টেবল, কিন্ত দারুণ আসর জমানো গল্প । হরর ধাঁচের এই গল্পে খুব সাধারণের মধ্যেই অসাধারণ একটা ভাইব পাওয়া যায় ৷ "অহল্যা" নামে একটা শর্ট ফিল্মের কিছুটা মিল পেলেও ব্যাকগ্রাউন্ড স্টোরি চমৎকার । এক কথায়, গা ছমছমিয়ে ভয় দেখাতে চাইলে মাঝিরাত্তিরে কাউকে এটা পড়ে শোনালেই কেল্লাফতে !
★ নিয়তি - প্রান্ত ঘোষ দস্তিদার
বেশ ভালো একটা গল্প । ছাত্ররাজনীতির নির্মম শিকার এক যুবক সুজনের জীবন ও মরণের গল্প । শেষের দিকটা খানিকটা আশা জাগালেও লেখক বুঝিয়ে দিয়েছেন নিয়তি তার কাজ করেই চলবে, আর সেখান থেকে ফিরে আসতে কেউ পারে না !
★ ওগো সুবর্ণা, জানো কি তুমি, জানো কি ? - লুৎফুল কায়সার
হরর গল্প, বেশ ভালোই ৷ অতিপ্রাকৃত এবং লেখনশৈলী সুন্দর ৷
বাবা কন্যার গল্প । আনান নামটা আমার খুব প্রিয়, আমার এক কাছের আপুর নাম আনান । কিন্ত গল্পের আনানের মতো আমার আপুর কিছু না হোক । কষ্টের একটা গল্প, জেদ আর ভালোবাসার গল্প । সন্তানের কাছে তার বাবা মা যে কি - সেটাও বোধ করি শুধু একজন সন্তানই বুঝতে পারে ।
★ কুয়াশা - সাদিয়া সিদ্দিকা
গোয়েন্দা গল্প । শুরুটা বেশ রয়েসয়ে হলেও শেষদিকে কেন যেন মনে হলো একটু তাড়াহুড়ো করা হয়েছে । প্রাঞ্জল ভাষা এবং সাধারণ সংলাপের মধ্য দিয়েই সুন্দর ভাবে শুরু ও শেষ হয়েছে গল্পটার ।
★ পাঠক - ইশরাক অর্ণব
লেখকের লেখার ভঙ্গি খুবই সুন্দর, বর্ণনা আরো একটু বিস্তারিত হলে বেশ ভালো লাগতো । গল্পের নামের সাথে মিল রেখে দারুণ কোন টুইষ্ট আশা করেছিলাম, কিন্ত প্লটটা মোটামুটি প্রেডিক্টেবল ভঙ্গিতেই শেষ হয়ে গেলো । গল্পের শেষ দুই তিনটা লাইন নিয়ে আমি খুবই কনফিউজড ৷ আমি যা চাচ্ছিলাম তাই কি ঘটলো, নাকি সাধারণ ভাবেই গল্পটা শেষ হলো কে জানে ! কেউ বুঝতে পারলে আলাপ দিতে হবে ৷
★ নেশা করলাম - নসিব পঞ্চম জিহাদী
আমার অতি কাছের একজন মানুষ নেশায় আসক্ত ছিলো । এই গল্পে যে নেশার কথা বলা হয়েছে, তার নাম এলএসডি । অনেক পাঠকই এই নেশাদ্রব্যের নাম জানেন হুমায়ুন আহমেদের লেখা "আজ মৃন্ময়ীর মন ভালো নেই" বই থেকে, এই গল্পেও সেটার ছোট একটা রেফারেন্স আছে । নেশা করাটাকে এখানে সুন্দর করে বলা হয়েছে রঙ খাওয়া । রঙ খাওয়া যায় ? পৃথিবীর সবকিছুতেই কি রঙ আছে ? অসাধারণ গল্পকথকের অপ্রিয় শব্দ হতে পারে, কিন্ত গল্পটা আসলেই অসাধারণ !
★ বুড়ি চাঁদ বেনোজলে ভাসার পর - ওয়াসি আহমেদ
গল্পের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপারটা ছি�� পুঁথিপাঠের মতো করে লেখা ছড়াগুলো । ঠাকুমার ঝুলির একটা ছোঁয়া পাওয়া যায় কবিতাগুলোতে । একই সাথে রুপকথা, ফ্যান্টাসি আর রিয়েলিটির সংমিশ্রণ ।
★ পিয়াল - কৌশিক জামান
গল্পটা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে লেখক কি নিজের কথাই বলছেন নাকি কে জানে ! সে যাই হোক, গল্পটা শুরু হয়েছে ২০১০ সাল বা তার এক দশক আগের এক কলেজ স্টুডেন্টের কাহিনি দিয়ে, গল্পের কথক লেখক নিজেই । কলেজ এবং ভার্সিটি লাইফ, চাকরী জীবন, প্রেম, সম্পর্ক, মানসিক স্বাস্থ্য - এই সবকিছুর জটিল বৃত্তে থেকেও একজনের কথা তিনি বলে গেছেন যার নাম পিয়াল । এই পিয়াল সবাইকে অনেক বিরক্ত করতে করতে একদিন কিভাবে হারিয়ে গেল, আর তার পরে লেখকের কি হলো - জানতে হলে পড়তে হবে এই গল্পটা ।
গল্পতরু” শুনে মনে হয়েছে ডালে ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে থাকা গল্পওয়ালা একটা গাছ! ভেজাল একটা-ই, গাছের সব ফল এক হওয়ার কথা থাকলেও এই গাছের ফলগুলো নানা সুরের!
“লাখোটিয়ার ভাঙ্গা দেয়াল”, “তোমরা যা-ই বলো” আর “পিয়াল” মনে করায় আর্টসেলের “অবশ অনুভূতির দেয়াল”
“স্বপ্ন” আর “স্বপ্নগ্রস্ত” গল্পে ওরা অর্থহীনের সাথে দুখ ভরা কণ্ঠ মেলায়, “হঠাৎ করেই আসো তুমি ইচ্ছে-খুশি যখন, আমি উড়ে বেড়াই নিয়ে উড়ু উড়ু মন"
“টাইম মেশিন”-এ রক্তিম, “পোড়া মন”-এ আব্বাস, “আমাদের গল্প”-তে “আমি” ব্ল্যাকের সাথে মিলে হাহাকার করে,“আমার বলা হলো না..”
“যন্ত্র-না”-র সুধীর, “লুডুর পাকা ঘর”-এর “আমি” কি Blue জিন্সের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে পারবে,“মায়া!কেটে গেছে..”?
“নেশা করলাম”-এ নেশার বর্ণনা-ই কেমন নেশা ধরানোর মতোন। “ইউটোপিয়া” পড়ে স্বপ্ন দেখতে ভয় হয়। কিন্তু “শব্দের খোয়াব” পড়লেই ভেতরে “রক্তগরম” ভাব জাগে; সিদ্দিক আহমেদকে ধন্যবাদ বায়ান্নর প্রেক্ষাপটে অন্যরকম গল্পটা উপহার দেয়ার জন্যে। “লুডুর পাকা ঘর”-এর থিম ব্যক্তিগতভাবে অপছন্দের হলেও কিযী তাহসিনের লেখনী বিশেষ মনে ধরেছে। ছোটগল্প দিয়ে লেখক আবিষ্কার করার ব্যাপারটা যেন বেশ টের পেলাম!
“চক্র”, “সাদাতের শুভ জন্মদিন”, “এই রাস্তায় খুব বেশি অ্যাাক্সিডেন্ট হয়”, “নিয়তি”, “দেহ”-সহ বাকি গল্পগুলোকে “থ্রিলার” কোটায় ফেলে দেয়া যায়। তবে থ্রিলের মাঝেও ভাগ আছে। “অপদেবতার উল্লাস”, “স্বপ্নজট”, “ওগো সুবর্ণা, জানো কি তুমি জানো কি?”, “দীঘল”, “এত মাছ খায় কে?” গল্পগুলো পড়তে গিয়ে ভেবেছি, “গা ছমছম, কি জানি কী হয়?!” “এক আঁটি লালশাক” পড়ে লালশাক মাখিয়ে লাল লাল ভাত খেতে মন চাইলেও গল্প আসলে খাইয়ে দেয় “শক”!
মার্ডার মিস্ট্রি নিয়ে “কুয়াশা”, “পাঠক”, আর “আদুরী”। প্রবাস প্রেক্ষাপটের “আদুরী” ভালো লেগেছে। “পাঠক” পড়ে রহস্যের কিনারা আগে ধরে ফেলতে পারায় আরাম পাইনি। “কুয়াশা” পড়ে কেন আরাম পেলাম না তা নিয়ে নিজেই আছি কুয়াশায়!
“সুর”, “পর্যটক”, “আবার বছর কুড়ি পরে”, “মহা সিমুলাই” আর “সেক্সডল” সাই-ফাইয়ের স্বাদ দেয়। আমার সবচেয়ে পছন্দ “সেক্সডল”; গল্প শেষে বাস্তবিক মুখে চলে আসে,“ওরে স্যাক্স!”
শেষ গল্প “বুড়ি চাঁদ বেনোজলে ভাসার পর” পড়ার পুরোটা সময়ে মাথার মধ্যে ওল্ড স্কুল গেয়েছে, “রোজ রাতে আর চাঁদের বুড়ি কাটে না চরকা রোজ”। ওয়াসি আহমেদ এত মায়া জড়িয়ে দুধসায়রে ঘেরা চন্দ্রগরের প্রেক্ষাপটে চাঁদের বুড়িকে নতুন ভাবে এঁকেছেন যে মোহাচ্ছন হয়ে গল্পটা পড়েছি।
অবসর প্রকাশনার “গল্পতরু”–র গল্পগুলো কি আপনাদের শব্দহীন গান শুনিয়েছে? জানিয়েন তো...
বেশির ভাগ গল্পই ভালো লেগেছে। বিশেষ করে, নামে কিছু যায় আসে-মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন। এক আঁটি লাল শাক-জাহিদ হোসেন। শব্দের খোয়াব-সিদ্দিক আহমেদ। এত মাছ খায় কে-তানভীর মৌসুম। অপদেবতার উল্লাস, নিকৃতের অভিলাস-আমের আহমেদ। ওয়াসি আহমেদের ‘বুড়ি চাঁদ বেনোজলে ভাসার পর’ মুগ্ধ হয়ে পড়েছি। বর্ণনা ভঙ্গি দারুণ ছিল।
এক একটি গল্প যেনো এক একজন লেখকের সাথে পরিচিতি ঘটালো। সব গল্প খুব আহামরি না কিন্তু কিছু আছে একদম মনে দাগ কাটার মতো।একসাথে বাংলাদেশ এর এতগুলো লেখকের লেখনী আমার সংগ্রহে আছে ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। কিছু গল্প অতীতে নিয়ে যায়, কিছু বর্তমান কে ভাবায় আবার কিছু ভবিষ্যতের অজানা আশঙ্কার জন্ম দেয়.. এই নিয়ে 37 গল্পের এই বইটি।