Jump to ratings and reviews
Rate this book

Huseyn Shaheed Suhrawardy: A Biography

Rate this book
Perhaps the only politician to straddle the East and West wings of Pakistan, Suhrawardy was well aware of the centrifugal tendencies that threatened to unmake the new nation. As such, his entire career after Independence was devoted to removing the growing misunderstandings between the two
wings. Ikramullah shows how the events that culminated in the collapse of democracy and the establishment of military rule in 1958 had their beginnings in the ruling cliques's maneuverings to keep Suhrawardy out of power. Their success, unfortunately, meant the end of efforts to bridge the
differences between East and West Pakistan which resulted in, just eight years after the death of Huseyn Shaheed Suhrawardy, the secession of East Pakistan from the West to form the independent state of Bangladesh.

204 pages, Hardcover

First published September 26, 1991

Loading...
Loading...

About the author

Shaista Suhrawardy Ikramullah

11 books3 followers
Shaista Suhrawardy Ikramullah was born in 1915 and educated in Calcutta, India, and London, where she received a PhD at the University of London. She was one of the few Muslim women to take part in the Pakistan Movement and one of the first female members of Pakistan’s Constituent-cum-Legislative Assembly. Begum Ikramullah also served Pakistan as a delegate to various international conferences and as Ambassador to Morocco.

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
2 (28%)
4 stars
2 (28%)
3 stars
3 (42%)
2 stars
0 (0%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 of 1 review
Profile Image for Preetam Chatterjee.
7,576 reviews401 followers
April 14, 2025
"এ তো অসামান্য হয়েছে গেঁদু। তোমার এই কবিতা, শব্দ-সাম্প্রদায়িকতাকে চুরমার করার স্পর্ধা দেখিয়েছে। হিন্দু ও ইসলামীয় পুরাণের অণু-পরমাণু এসে মিলেছে এতে। ‘আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,/ আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা-হুঙ্কার’ কিংবা ‘তাজি বোর্রাক আর উচ্চৈঃশ্রবা বাহন আমার/ হিম্মত-হ্রেষা হেঁকে চলে’র মধ্যে লাগাতার চলেছে গালাগালিকে গলাগলিতে পরিণত করার এই প্রয়াস অসামান্য।"

"সত্যি বলছো দুখু মিঞা ? তোমার ভালো লেগেছে? তাহলে প্রকাশ করে দাও নিজের নামে। আমি পারবো না জানোই তো। "

চমকে উঠলো নজরুল। নাঃ এবারে আর সে হুসেইনের কথা শুনবে না। আশ্চর্য নিস্পৃহ ও নির্লিপ্ত একজন মানুষ এই বন্ধুটি তার। কবিতা লিখে ফেলে নিমেষে, গান বেঁধে ফেলে।

এর আগেও 'আমরা শক্তি আমরা বল' আর 'কান্ডারী হুঁশিয়ার' নামের দু'টি কবিতা আর 'মুসাফির মোছ রে আঁখিজল' বলে একটি অনিন্দ্যসুন্দর গান হুসেইন নিজে রচনা করে নজরুলকে দিয়ে বলপূর্বক তার নামে প্রকাশ করিয়েছে।

সৃষ্টির জগতে অনায়াস যাতায়াত হুসেইনের। বিজ্ঞানের জগতেও।

১৯০৫ সালে তখন হুসেইনের মাত্র তেরো বছর বয়স। আর সেই বছরটিই বিশ্ববরেণ্য আইনস্টাইনের জীবনের অন্যতম বিস্ময়কর বছর। এই বছরে তাঁর তিনটি পেপার প্রকাশ পায়। প্রথম পেপারে বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের ভিত তৈরি। দ্বিতীয় পেপারে ব্রাউনিয়ান মোশন থেকে অণুর অস্তিত্ব শনাক্ত করা। আর তৃতীয় পেপারে আলোর কণা কোয়ান্টামের প্রয়োগ, যার সূত্রে আইনস্টাইনের নোবেল পুরস্কার। কিন্তু পৃথিবীতে স্রেফ নজরুলই তৃতীয় এমন ব্যক্তি যিনি তাঁর বন্ধু হুসেইনের নূরানী করিশ্মা জানেন।

আইনস্টাইন সাহেবের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পেপারে অবিস্মরণীয় যোগদান করেছিল তাঁর বন্ধু হুসেইন। নজরল জানেন কারণ আইনস্টাইনকে বাংলায় লেখা চিঠিটির ইংরেজি তর্জমা করে তাকেই প্রথম দেখিয়েছিল হুসেইন।

চিঠিটির সেই মুক্তোর মতো ভাষা -- আহা। মারহাবা।

জনাব আইনস্টাইন ,
এই ব্রহ্মাণ্ডের মূল চালিকাশক্তির কোনও বিনাশ নেই। সেই শক্তি অবিনাশী! ব্রহ্মাণ্ড কালে কালে যুগে যুগে দিনে দিনে যতই ফুলে-ফেঁপে উঠুক না কেন, ছড়িয়ে পড়ুক না কেন হইহই করে চার পাশে, সেই আদি, অনন্ত চালিকাশক্তির ঘনত্ব (বা ডেন্সিটি) আগেও যা ছিল, এখনও তাই আছে। কোটি কোটি বছর পরেও ব্রহ্মাণ্ডের সেই চালিকাশক্তির ঘনত্ব একই থাকবে। এটাকে আপনি নাম দিন ‘কসমোলজিক্যাল কনস্ট্যান্ট’।

আর অ্যালান টিউরিং সাহেবের সেই ঘটনাটি? প্রকৌশলী, গণিতজ্ঞ, যুক্তিবিদ, দার্শনিক, গোপন সংকেত বিশেষজ্ঞ টিউরিং যখন হাবুডুবু খাচ্ছেন কম্পিউটারের বিমূর্ত গাণিতিক গঠন নিয়ে তখন জিব্রাঈল প্রেরিতের মতো এগিয়ে এসেছিলেন হুসেইন।

একটা দেশলাইয়ের বাক্সের পিছনে দুটি সংকেত লিখে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন অ্যালানের কাছে। বেনামে পাঠিয়েছিলেন। আনন্দে আত্মহারা অ্যালান যখন তাত্ত্বিক কম্পিউটার প্রকৌশল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গবেষণায় উল্কার গতিতে এগিয়ে গেলেন, তিনি সেই দেশলাইয়ের বাক্সের কথা ভোলেননি।

মৌলা আলির দরগা থেকে যে রাস্তাটা ধর্মতলার দিকে চলে গেছে— যে রাস্তার পুরনো নাম ধর্মতলা স্ট্রিট, আর নতুন নাম এস এন ব্যানার্জি রোড— তাতে ঢুকে বাঁ দিকে ক্যালকাটা গার্লস আর ক্যালকাটা বয়েজ় স্কুলের তল্লাট ছাড়িয়ে একটু গেলেই একে একে তালতলা পোস্ট অফিস, তালতলা হাইস্কুল। তার খানিক বাদেই বাঁ দিকে ঢুকে গেছে তালতলা লেন। আটপৌরে এলাকা। পাঁচমিশেলি চেহারা। সেখানে এক বাড়িতে বসেই চলছে দুই বন্ধুর আড্ডা।

কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই আড্ডায় এসে যোগ দেবেন তাঁদের আরেক বন্ধু। ভজন।

ডাকনাম ভজন ভাল নাম বিধান। এই বন্ধুটির ভাল নাম রাখার দিনে নাকি হাজির ছিলেন কেশবচন্দ্র সেন। ভজন মাত্র ১২০০ টাকা সম্বল করে বিলেত গিয়ে দু’বছরে মেডিসিন ও সার্জারির চূড়ান্ত সম্মান এম আর সি পি এবং এফ আর সি এস প্রায় একই সঙ্গে অর্জন করেছিল।

সে অর্থটি হুসেইনেরই দেওয়া। টাকার অভাব নেই হুসেইনের। সুবিশাল ধনসম্পদ তার। এক জীবনে দু'হাতে বিলিয়ে দিলেও অর্থাভাব হবেনা। তাই জাকাত করতে দু'বার ভাবেনা ওবায়দুল্লাহ অল ওবাইদীর নওয়াসা ও জাস্টিস স্যার জাহিদের ছেলে হুসেইন। সোনার মোহর মাঝে মধ্যেই ছদ্মবেশ ধারণ করে রাতের কলকাতায় অকাতরে বিলিয়ে দেয় ইসলামের প্রথম খলিফার এই বংশধর।

আজও পুরোনো বন্ধুত্বের টানে বা কোনও ক্রিটিকাল মেডিক্যাল কেস নিয়ে আলোচনা করতে হলে ভজন চলে আসে এখানে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেও হুসেইনের সাংঘাতিক বুৎপত্তি।

বেনামে সে বহুবার (ভজনের প্রশ্রয়েই) মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে কোনও সাংঘাতিক জটিল ওপেন হার্ট বা ব্রেইন সার্জারি করে মানবপ্রাণ বাঁচিয়ে, ইবলিশের বুলন্দ কদম রুখে দিয়েছে।

আর হুসেইনের কাব্যপ্রীতির কথা মাথায় রেখেই ভজন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বন্ধুর আলাপ করিয়ে দিয়েছে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে।

চিত্তরঞ্জন দাশের মহাপ্রয়াণের পর দেশবন্ধুর একটা ছবি বিক্রি করে ভজন কিছু টাকা তোলবার পরিকল্পনা করেন। চিত্তরঞ্জনের একটা ছবি নিয়ে ভজন ও হুসেইন কবির কাছে গিয়ে বললেন এর উপর একটা কবিতা লিখে দিন।

কবি সেদিন কিঞ্চিৎ অসুস্থ ছিলেন। বলেন , “ডাক্তার, এ তো প্রেসক্রিপশন করা নয়। কাগজ ধরলে আর চটপট করে লেখা হয়ে গেল।”

উত্তর: “বেশ অপেক্ষা করছি।”

কিন্তু বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। কবি সহসাই বলে উঠলেন, "ডাক্তার, তোমার এই বন্ধুটির কাব্যচেতনা আমায় বিস্মিত করেছে। সমগ্র সংস্কৃত সাহিত্য, পাশ্চাত্য সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, সবই এর গুলে খাওয়া। অ্যালবার্ট তো এই ছেলেকে নিয়ে রীতিমতো শিশুতোষ উচ্ছাস করলো আমার কাছে। এই ছেলে নাকি অ্যালবার্টকে ডার্ক ম্যাটার নিয়ে যা যা লিখেছে তা যুগান্তকারী !!"

"ডার্ক ম্যাটার? সেটা কী গুরুদেব?", জিজ্ঞাসা করে ভজন।

ততক্ষনে লজ্জায় সিঁটিয়ে গেছে হুসেইন। আত্মপ্রচার তো নবীর শানে গোস্তাখী।

কবি বুঝলেন ব্যাপারটা। সহজ করে দিলেন পরিস্থিতি। বললেন, "ওহে , একটু সরল করে বোঝাও তো দেখি।"

বরাভয় লাভ করে নিজের এলিমেন্টে এলো হুসেইন। শিক্ষক সত্তা জেগে উঠলো তার মধ্যে।

সে বলতে লাগলো -- "এই ব্রহ্মাণ্ড আসলে যে তিনটি জিনিস দিয়ে গড়া, এই আদি ও অনন্ত চালিকাশক্তি তার অন্যতম। তার নাম ‘ডার্ক এনার্জি’। যার জন্ম কী ভাবে হল, কোথা থেকে হল, তার জন্মের পিছনে কলকাঠি নাড়ল কে, তা এখনও জেনে বা বুঝে ওঠা সম্ভব হয়নি বিজ্ঞানীদের। তাঁরা এত দিনে শুধু এইটুকুই জানতে পেরেছেন যে, প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং বা এই ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির প্রাক-মুহূর্তের সেই মহা বিস্ফোরণের পর কোনও সাড়াশব্দ ছিল না বহু দিন। যেন কিছুই হয়নি! অত প্রচণ্ড বিস্ফোরণের পর সব চুপচাপ মেরে গিয়েছিল। তার প্রায় ৪ লক্ষ বছর পর হঠাৎ করেই জন্ম হল আমাদের দৃশ্যমান আলোর।"

"চমৎকার !" উচ্ছসিত হলেন রবীন্দ্রনাথ। " একেই বলো কিছু একটি লিখতে। আমি হস্তাক্ষর দিয়ে দেব।"

ছবির উপর সেই অপূর্ব কবিতাটি লেখা হল সেদিন -- "এনেছিলে সাথে করে মৃত্যুহীন প্রাণ। মরণে তাহাই তুমি করে গেলে দান।"

সেদিন রবি বাবুর বাড়ি থেকে চলে আসার সময় হুসেইন সসম্ভ্রমে বলেছিল, "গুরুদেব , আপনাকে আমি স্বরচিত একটি কবিতা উপহার দিতে চাই। কিন্তু কসম খান আপনি আপনাদের মা কালীর , কেউ যেন কোনোদিন না জানে যে এটি আমার লেখা। আপনি স্বনামে প্রকাশ করবেন এটি। " এই বলে কবির হাত নিজের মাথার উপরে রেখে প্রতিজ্ঞা নিয়ে নিয়েছিল সেদিন হুসেইন।

তারা চলে যাওয়ার পরে নির্বাক বিস্ময়ে রবীন্দ্রনাথ পাঠ করেছিলেন সেই কবিতা। আনন্দাশ্রু তাঁর চোখে --

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

আশীর্বাদ করেছিলেন কবি সেদিন সেই যুবককে।

ভজন সেদিন উদভ্রান্তের মতো ঢুকেছিল হুসেইনের ঘরে। "দুর্ভিক্ষ হাতছানি দিচ্ছে বাংলার দিকে। আমি বুঝতে পারছি স্পষ্ট।"

উপমহাদেশ তথা বিশ্ব-রাজনীতি আঙুলের ডগায় থাকে হুসেইনের। সে সির্ফ বললো , "ভারত সরকারের দুর্ভিক্ষ কমিশন রিপোর্ট ঠিক যখন 'চাল উৎপাদক ও চাল ভোক্তাদের একটি ভূমি' হিসাবে বর্ণনা করলো আমি তখনই বুঝেছিলাম ভজন। চতুর ইংরেজ সরকারের নিয়ত নিয়ে আমায় আলাদা করে বুঝতে হবে না। "

দুই বন্ধুর মধ্যে সেদিন বহু আলোচনা হলো। মানুষকে বাঁচাতে হবে। প্রয়োজন হলে ঢাকা ও মুজফ্ফরনগরের পাঁচশো বিঘা জমি জনাব ইস্পাহানীকে বন্ধক দিয়েও টাকা তুলতে হবে। চাল চাই। মানুষের মুখে অন্ন তুলে দিতে হবে। হুসেইন মনে মনে স্মরণ করলো বীরেশ্বর বিবেকানন্দকে। স্মরণ করলো নবী মোহাম্মদকে। শক্তি দাও। শক্তি দাও আমায়।

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কাছে সেদিন হেরে গিয়েছিল হুসেইন। বাংলায় শমন এলো যেন। চলমান দুর্ভিক্ষ! নদীতীরে পড়ে আছে পোকা-ধরা, ধুলোভর্তি পরিত্যক্ত চালের বস্তা। আর তাই নিতে ভিড় করেছেন শ’য়ে শ’য়ে ক্ষুধার্ত মানুষ। তবে সে চালের গুণগত মান এতটাই খারাপ যে মানুষ তো দূরের কথা পশুখাদ্যের জন্যও তা অনুপযুক্ত।...

চোখ জলে ভরে আসে হুসেইনের। বেনামে সে লিখে ফেলে এক মনোজ্ঞ প্রবন্ধ। ‘ক্যাপাবিলিটি ডিপ্রাইভেশন’?, এই শিরোনামে।

১৯৪৩-এর সেই মৃত্যুমিছিলের বেশ কিছু ছবি আজ এই পঞ্চাশ সালে এসেও ভেসে ওঠে হুসেইনের মনে। সে দেখতে পায় মৃত শিশু কোলে মা, কালীঘাট মন্দিরের কাছে গাছে ঝুলছে মৃতদেহ। মহানগরীর রাজপথ ও গলিপথে পড়ে থাকা মৃতদেহ ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে চলছে নাগরিক জীবন। অসংখ্য মানুষের হাহাকার: ‘ফ্যান দাও মা...ফ্যান দাও।লরি থেকে গুড় পড়েছে রাস্তায় আর সে গুড় তুলে চেটেপুটে খাচ্ছে শিশুর দল।

নিজের নব্বই শতাংশ জমিজমা, মোহর, অজস্র ধনরত্ন বিক্রি করে সেদিন কোটি কোটি টাকা বেনামে বিলিয়ে দিয়েছিল হুসেইন। বিপদের দিনে রাজা যদি প্রজার পাশে না থাকে তবে কবে থাকবে?

জটিল, বহুমাত্রিক আবেশে পঁয়তাল্লিশ থেকে এগিয়ে চলে ইতিহাস। সহজিয়া, বাউল মেজাজের হুসেইনকে বদলে দেয় সাম্রাজ্যবাদীদের নোংরা রাজনীতি। মনে মনে হেসে ওঠে হুসেইন। তার মনে পড়ে যায় অনেক আগের লেখা সেই কবিতার দুটো লাইন --

রাজনৈতিক উসকানির প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি আঙুল ওঠে আজ অবধিও হুসেইনের দিকেই। অনেক মিথ্যাবাদী ঐতিহাসিক তো এমনও বলেন যে সে-ই নাকি দাঙ্গার রূপকার। তার পরিকল্পনা-মাফিকই প্রায় সব কিছু ঘটেছে। কিন্তু সে কেন্দ্রে থাকলেও এই মিথ্যাবাদীদের গোটা মুসলিম লিগ।

এর উৎস হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে চরম হিংসাত্মক মনোবৃত্তি। প্রচলিত ধারণা, হুসেইনই পুলিশের রাশ টেনে রেখেছিলেন, সেনার সাহায্য চাইতে দেরি করেছিল এবং পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে তার দুর্বৃত্ত অনুচরদের নির্দেশ দিয়ে যাচ্ছিল।

এ ভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষকে যেই সুযোগ দেওয়া হল, অমনি সে তার অন্ধকার আস্তানা থেকে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এসে গোটা শহরটাকে গ্রাস করল।

কিন্তু হুসেইন নিজে জানে আসল সত্যিটা। আজ অবধিও প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতি ও সে যুগের নথিপত্র থেকে যে ছবি মেলে, তা সুপরিকল্পিত হিংসার ছবি নয়। তা সম্পূর্ণ অরাজক, বিস্ফোরক এক পরিস্থিতির ছবি, যার গতিপ্রকৃতি আগাগোড়াই ছিল অনিশ্চিত।

কখন তা কোন দিকে ঘুরে যাবে, তা বোঝা প্রায় অসম্ভব ছিল। অবাধে লুটতরাজ চলেছিল, যাতে অংশ নিয়েছিল পুলিশ অফিসাররাও। সোনার গয়নার দোকান একেবারে খালি করে সব লুটেপুটে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

রেশনের দোকান লুট, গলিতে পিছন থেকে ছুরি মেরে খুন, প্রতিবেশীদের বাঁচাতে পাড়ায় পাড়ায় পিকেট, শহর জুড়ে পর পর অগ্নিকাণ্ড। ফাঁকা শেড খুঁজে জড়ো হত হিংস্র জনতা, হাতের কাছে যা মেলে, তা দিয়ে অস্ত্র বানানো হত। প্রোমোটারদের চক্রান্তে সংখ্যালঘু মধ্যবিত্ত বাড়িগুলিতে নৃশংস হত্যালীলা চলতে থাকে। আক্রমণের প্রতিশোধ নিতে পাল্টা আক্রমণ চলে।

মুক্তবঙ্গের শেষ সম্রাট সেদিন নিঃসঙ্গ। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী সে। দাঙ্গার প্রথম দিন পুলিশ কন্ট্রোল রুমে বসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছিল সে। হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবককে সে নিজে নামিয়েছিল রাস্তায়। প্রত্যেক মুহূর্তের বিবরণ সে নিজে দেখছিল সিসিটিভিতে।

মনে মনে হাসে হুসেইন। হায় রে আল্লাহ , যার জন্য চুরি করে সে-ই বলে চোর ?

সে সময়ের নথিপত্র স্পষ্ট করে দেয় যে ১৬ অগস্ট দুপুরের পর থেকেই পরিস্থিতির উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল পুলিশ, কারণ তাদের সংখ্যা ছিল প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। পুলিশ থানাগুলোর উপরেই আক্রমণ শুরু হয়, রাস্তায় রাস্তায় হিংস্র জনতার সঙ্গে পুলিশের খণ্ডযুদ্ধ চলতে থাকে। কলকাতা দ্রুত চলে যায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পরিস্থিতি বুঝে হুসেইন নিজে অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গোলাম সারোয়ার, মুজিবুর রহমান, ইস্কান্দার মির্জা, মীনা পেশোয়ারী ও গোপাল মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে নামে রাস্তায়। প্রত্যেকের কাছে ভিড় ছত্রভঙ্গ করার জন্য সাত আটটি গ্রেনেড , কাঁদানে গ্যাসের শেল।, পাইপগান , দশ-বারোটি করে দেশী কাট্টা। প্রত্যেকের কোমরেই তলোয়ার। যান দিবো ফিরভি দাঙ্গা রুখে দিবো।

ডায়রেক্ট অ্যাকশন’ মিছিল ময়দানে হওয়ার কথা ছিল বিকেল চারটেয়। তার আগেই, বিকেল তিনটের মধ্যে হুসেইন ফোন করে গভর্নর ফ্রেডেরিক বারোজ'কে অনুরোধ করেন সেনা নামাতে। অনুরোধ খারিজ করা হল। কলকাঠি নাড়লো সেই কংগ্রেসি কিরণশঙ্কর।

ব্রিগেডিয়ার সিক্সস্মিথ, যিনি সেনা সাহায্য পাঠানোর অনুরোধকে স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন, পরবর্তী কালে বিবৃতি দেন যে তিনি ভয় পেয়েছিলেন, ‘মিলিটারি শক্তির ব্যবহার হয়তো এই দলে দলে আসা জনতার অভিমুখকে ঘুরিয়ে দিতে পারে... আমরা জানতাম ১৬ তারিখের পরিস্থিতি পালটে হয়তো সরকার-বিরোধী দাঙ্গার রূপও নিতে পারে।’

অতএব হুসেইন যে পুলিশকে চেপে রেখেছিল, সেনা সহায়তার আবেদনে ইচ্ছে করে বিলম্ব করেছিল, এই ধারণা ধোপে টিকছে?

সেদিন একদিকে মীনা পেশোয়ারী ও অন্যদিকে গোপাল মুখ্যযেকে নিয়ে পার্ক সার্কাস থেকে শেয়ালদা, অক্টারলোনি মনুমেন্ট থেকে মেটিয়াব্রুজ , মানিকতলা থেকে তপসিয়া চোষে বেরিয়েছিল হুসেইন। রক্ষা করেছিল কয়েক লাখ হিন্দুর প্রাণ , হিন্দু নারীর সম্ভ্রম।

চোখে দিয়ে এক ফোঁটা জল বেরিয়ে এলো হুসেইনের। আজ করাচির প্রাসাদটা তার কাছে জেলখানা। লেখালেখি বন্ধ হয়ে গেছে। গান লেখেনি সে অনেকদিন।

মানুষ বুঝলো না তাকে। বাঙালি তাকে চিনতে পারলো না।

আসলে ছেচল্লিশের দাঙ্গার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ বা উসকানিকে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া উচিত। এ দুটোই দাঙ্গার হিংস্রতাকে বাড়িয়েছিল, কিন্তু দাঙ্গাকে বুঝতে হলে কেবল আলাদা করে এ দুটো কারণকে চিহ্নিত করাই যথেষ্ট নয়। আরও নানা বিষয়ের দিকে তাকাতে হবে। যেমন, সেই সময়ের আর্থিক ও সামাজিক কাঠামো, জনসংখ্যার চাপ, শহরের এলাকার উপর দখল ও তার ব্যবহারের নকশায় পরিবর্তন প্রভৃতি।

আজ রাত্রে পিয়ানোটা আবার বাজাবে সে। সমন্বয়ের সংস্কৃতি আজ বহুদিন বাঙালিকে ছেড়ে চলে গেছে।

একদিন না একদিনা ইতিহাস ঠিক চিনবে তাকে। এই ভেবেই একটা উষ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙা��ি হুসেইন শহিদ সুরাওয়ার্দি।

প্রণাম জানাই মহাপ্রানকে।
Displaying 1 of 1 review