ভালো মানের বই হোক বা কমিক্স অনেক সময় তুলে রাখা হয় পরে পাঠ করার জন্য। ঢাকা কমিক্সের দুর্জয় ১-১৭ একসাথে অর্ডার করে সুলভ মূল্যে কিনে সাথে একটি দুর্জয়ের টি-শার্ট উপহার পেয়ে ( জানি না এখনো এই অফার আছে কিনা ) খুব খুশি মনে কমিক্সের সেটটি যত্নের সাথে রেখে দিয়েছিলাম। সবগুলো পর্ব পড়ে শেষ করার পর ( পর্ব ১৮ যেটিতে সমাপ্য হবে এখনো প্রকাশ পায় নি ) মনে হচ্ছে আরো আগে কেন পড়লাম না এই দুর্দান্ত কমিক্স সিরিজ। একই সাথে বুঝতে পারছি ঢাকা কমিক্স এমনকি বাংলাদেশের কমিক্স অঙ্গনে এই "দুর্জয়" সম্ভবত সবচেয়ে পাঠকপ্রিয় কেন।
কবির মনসুর। বিখ্যাত মা-বাবার সন্তান হওয়ার পরও নীতিবান ও আদর্শবান পিতামাতা যারা দেশ ও দশের কল্যাণে এতটাই নিবেদিত যে এমনকি নিজ সন্তানকে ঠিকমতো লালন-পালন করে উঠতে পারেন নি। শৈশবের বিভিন্ন বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার শিকার এই কবির একসময় এক মার্শাল আর্টসের ট্রেইনারের লালন-পালনে বেড়ে ওঠেন। মার্শাল আর্টস কবির মনসুরের জানপ্রাণ কিন্তু একসময়ের কিশোর কিক বক্সিং ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়ন কবির মনসুর জীবনের বিভিন্ন দূর্দশার মুখোমুখি হয়ে পরিণত হন একজন আন্ডারগ্রাউন্ড মিক্সড মার্শাল আর্টস কেইজ ফাইটারে। পরিণত হন দুর্জয়ে।
অল্প বয়সে এক ভয়াবহ অপরাধের অভিযুক্ত আসামি হয়ে লো প্রোফাইলে চলে যেতে হয় কবির মনসুরকে। ঐ খুনটা কি আসলে কবির করেছিল? প্রথাগত অর্থে আদর্শ কোন ব্যক্তি বা সুপারহিরো নন মনসুর। প্রচন্ড ঘাড়ত্যাড়া, সব জায়গা থেকে বিতাড়িত এমনকি নিজ মায়ের অপছন্দের পাত্র কেন দুর্জয়? নিজের মাকে কেন কবির মনসুর এত ঘৃণা করেন? সেইসাথে নীতি-নৈতিকতার ধার না ধারা এই মানুষটি একটি পিশাচ। ঘটনাচক্রে আন্ডারগ্রাউন্ডের সাথে এই মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দুর্জয়। ব্যাটম্যানের মতো কোন জাস্টিসের হাইয়ার আইডিয়াল নেই দুর্জয়ের। মায়ের সাথে, প্রেমিকার সাথে এমনকি নিজ মার্শাল আর্টস গুরুর সাথে অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলে সকলের চক্ষুশূল তিনি।
ন্যায়ের কোন হাইয়ার আইডিয়ালে দুর্জয়ের বিশ্বাস নেই। নিরীহ মানুষ মরলে মরুক, দুর্জয় রিভেঞ্জ, পাশবিকতা এবং বিভিন্ন বিভ্রান্তি দ্বারা পরিচালিত হন সমাজের অন্ধকারচ্ছন্ন অপরাধী, ড্রাগলর্ড মাফিয়াচক্রের বিরুদ্ধে। কেন এসব করেন দুর্জয়? ন্যায়-নীতির জন্যে? মানবতার জন্যে ? প্রতিশোধ চরিতার্থ করতে? নিজের পাশবিকতাকে তৃপ্ত করতে? নাকি সবকিছুর জগাখিচুরি এক হয়ে তাকে দিয়ে এসব করায়? এই গল্প অবশ্য শুধু কবির মনসুরের একার নয়। ঢাকার এক বিশেষ ডিটেক্টিভ পুশিল হেড কোয়ার্টারের রেকর্ডস ক্লার্ক নিহারিকা আরমান নেহার গল্পও কাকতালীয়ভাবে দুর্জয়ের সাথে জড়িয়ে যায়।
ঢাকা এক ডিস্টোপিয়ার নাম। গ্যাং ওয়ার থেকে শুরু করে উওম্যান ট্র্যাফিকিং, ড্রাগস কার্টেইল, আন্ডারগ্রাউন্ড মাফিয়া এবং তাদের সাথে রাঘব-বোয়ালদের মাখামাখি, কি নেই এখানে। দুর্জয় একাই "ওয়ান ম্যান আর্মির" মতো এই মহাশক্তিশালি চক্রের সাথে দ্বৈরথে জড়িয়ে পড়েন। মিক্সড মার্শাল আর্টস এবং ডার্টি স্ট্রিট ফাইটিং এ অত্যন্ত দক্ষ দুর্জয় দূর্বৃত্তদের জীবনে সাইক্লোনের মত আসেন এবং সব তছনছ করে দিয়ে চলে যান। ঢাকার ক্রাইম ওয়ার্ল্ডের জন্যে এক ভৌতিক কাহিনিতে পরিণত হন এই হিউম্যান উওপ্যান।
এদিকে দেশি-বিদেশি ক্রাইম লর্ডরাও বসে নেই। নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধি এবং পথের কাঁটা দুর্জয়কে সরাতে যদ্দুর সম্ভব নিচে নামতে পারে তারা। স্বয়ং দুর্জয় জীবন-মৃত্যুর সায়াহ্নে চলে যান। অন্ধকারের এত বড় শক্তির সামনে দুর্জয় একা কি যথেষ্ট? নাকি আর কারো সাহায্য লাগবে? কিন্তু টাকার লোভ এবং স্বজন হারাবার ব্ল্যাকমেইলিং এর শিকার কে এসে দাড়াবে দুর্জয়ের পাশে?
১৭ পর্বের এই গল্পের গ্র্যান্ড ফিনালে ১৮ পর্বে হয়ে যাবে হয়তো। বাংলাদেশের কমিক্স যে কতটুকু এগিয়েছে তা "দুর্জয়" পড়লে বুঝতে পারবেন যেকোন সচেতন পাঠক। তৌহিদুল ইসলাম সম্পদ গল্পের সাথে সাথে এত সুন্দর এবং যথাযথ কমিক্স আর্ট করেছেন যে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই, মনে হয়। আমার কেন জানি মনে হয়, লেখক / শিল্পী হয়তো নিজেও মার্শাল আর্টস জানেন। এটা একটা অনুমান। এই অনুমানের পিছনে অবশ্য শক্ত কারণ আছে। আমি নিজেও অল্প-স্বল্প মার্শাল আর্টস শিখেছি। কমিক্সের প্যানেলে প্যানেলে দুর্দান্ত ফাইটগুলো এমনভাবে অঙ্কন করা হয়েছে, সেই সাথে চরিত্রের স্বগোক্তির মাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন মুভ বা কৌশল ব্যাখ্যা করা হয়েছে তাতে অনেক পাঠক মার্শাল আর্টস এবং রিয়েল লাইফ ফাইট সম্পর্কে একটা ভালো বেসিক জ্ঞান লাভ করবেন। হয়তো লেখক কোন মার্শাল আর্টিস্টের থেকে ধারণা নিয়ে থাকতে পারেন। ফাইট সিনগুলোর অঙ্কন, বর্ননা এবং পিনপয়েন্ট ডিটেইলিং এক কথায় চমৎকার। এছাড়া এই সিরিজে কিছু দারুন সারপ্রাইজ আছে পাঠকদের জন্যে। দুর্জয়ের মতো কমপ্লেক্স একটি চরিত্রকে ফুটিয়ে তোলার মতো কাজ মোটেও সহজ বিষয় নয়। বাংলাদেশের কমিক্সে এরকম একজন ভ্যালুয়্যাবল অ্যাসেটকে পাঠকের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার যে কাজটি করা হয়েছে সেজন্যে লেখক / শিল্পী এবং ঢাকা কমিক্সেকে ধন্যবাদ।
দুর্জয় সিরিজটা খুবই পছন্দের। তবে একটা সার্টেন পয়েন্টের পরে স্টোরি টানাটানি না করে সেটাকে একটা সুন্দর সমাপ্তি দিলেই বেশি ভাল্লাগে। "নির্ঘুম" এর গল্প ভালো ছিল, কিন্তু শেষের দিকে মনে হলো, একটা তাড়াহুড়ো ভাব। আগামী বই থেকে আবার আগের পুরানো ছন্দ আশা করবো!