আপনি ঘুম থেকে উঠে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঘরের দক্ষিণ দিকে পুরনো স্মৃতি নিয়ে ঝুলে থাকা দেয়ালঘড়িটির দিকে তাকালেন। তাকিয়ে দেখলেন, ঘড়িটির ওপর একটা দ্বিখণ্ডিত টিকটিকি নড়াচড়া করছে। দ্বিখণ্ডিত বলছি এ কারণে যে, টিকটিকির শরীর থেকে লেজটা আলাদা হয়ে আছে এবং কোনো এক কারণে লেজটিকে আপনার ঘড়ির মিনিটের কাঁটার মতো মনে হতে লাগলো। বিছানার পাশে রাখা গতরাতের অর্ধেক ঠান্ডা বাসি চায়ের কাপটাকে সিগারেটের অ্যাশ-ট্রে হিসেবে ব্যবহারের জন্য মনস্থির করে হাতে নিলেন। পরক্ষণেই মনে পড়লো, এই ঘরে কোথাও দেয়াশলাই নেই। শেষরাতে এই দেয়াশলাই না থাকার ক্ষুদ্র ব্যথা নিয়ে ঘুমিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখে আপনার ঘুমটা ভেঙে গেছে। দুঃস্বপ্নটা আপনার মনে আছে, তবে সেটাকে নিছক দুঃস্বপ্ন ভেবে মন থেকে সরিয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আপনি শেষমেশ পৌঁছে গেছেন আপনার জীবনের সবচাইতে কঠিনতম সকালের দ্বারপ্রান্তে, যে সকালটাতে ঘুম থেকে ওঠার পর আপনার মনে পড়বে, গতকালও বেঁচেছিলেন।
২০২১ সালের রকমারি বেস্টসেলার উপন্যাসখানা পড়লাম। বইটি প্রি-অর্ডারেই বেস্টসেলার ছিলো।লেখক সাহেবের ফ্যান প্রচুর যার মধ্যে আমি নিজে ও।
বইটির গল্প খুব আহামরি কিছুনা, বলতে গেলে কোন গল্পই আহামরি লাগেনা যখন তা ঘটে। ঘটনা গুলো তখনই গল্প হয় যখন কোন গল্পকার সেখান থেকে কোন গল্প তৈরী করেন। নিতু নাম্নী মেয়ের সাথে ভুল স্টেশনে একজনের দেখা, ড্রামাটিক্যালি দুজন অপরিচিত মানুষের মাঝরাতে তেহারি খেতে খেতে জীবন নিয়ে ভারী ভারী দার্শনিক উক্তি আর কাব্যি করা। শিহাব সেইসব ঘটনার উন্মোচন করতে গল্প লিখতে বসে,সেখানে রুদ্র নামক রহস্য। গল্প সেই টিপিক্যাল বাংলা নাটক, কিন্তু একই গল্প শক্তিমান কোন লেখকের হাতে পরে চমৎকার কিছুতে পরিণত হতে পারে।জুনায়েদ ইভান সেই কাজটাই করতে চেয়েছিলেন।তিনি উপন্যাসটির গল্প বলার ধরণ নিয়ে বেশ এক্সপেরিমেন্ট করেছেন।ফলে সহজ একটি গল্প ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে প্রচুর কবিদের কবিতা কোটেশন করে একটা আবহ তৈরি করতে চেয়েছিলেন। প্রথম বইয়ে এরকম লিটারেরী এক্সপেরিমেন্ট বেশ সাহসের কাজ, সেজন্য লেখক সাহেবের সাহসকে বাহবা দিতেই হয়। কিন্তু ব্যাক্তিগত ভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে লেখক ব্যর্থ হয়েছেন। সবটা পড়ার পর কেমন যেনো খাপছাড়া মনে হয়েছে।
বইটিতে চমৎকার কিছু লাইন আছে যা উক্তি হিসেবে বিখ্যাত হতে যাচ্ছে।
আর ২০২১ সাল অনুযায়ী বইয়ের দাম অনেক বেশি রেখেছে প্রকাশনী। গায়ক অভিনেতাদের খ্যাতি ব্যবহার করে অপাঠ্য বই হট কেকের মতো বিক্রি, দিস ইজ বিসনেস!
একজন ভালো রিলিক্স লিখতে পারলেই যে ভালো গল্প লিখবেন এমনটা না। প্লটের কোনো আগা-মাথা নাই, অযথা কমপ্লেক্স করে অজস্র পরকিয়ার কাহিনি- এই রকম প্লটের গল্প ফেসবুকের র্যান্ডম পেজগুলোতে খুব চলে। মাঝে লেখক মনে হয়, তার স্ক্রাপবুকে বিভিন্ন বই পড়ে যেগুলো ভালো লেগেছে, সেগুলোর সব বইয়ে উগড়ে দিয়েছেন। ফিলোসফির কচকচানি বড্ড কানে লেগেছে। ভাষা, শব্দচয়নও তেমন ভালো নয়। এই বইগুলা আবার রকমারির বেস্টসেলারও হয়, মে বি লেখকের ফ্যানবেস এর জন্য।
পুরাই হতাশ হয়ে ডিপ্রেশনে পড়ে এখন ashes এর গান শুনতে হবে।🤣🤣🤣🤣
১১২ পৃষ্ঠার বই অথচ ভাবের গভীরতা অসীম। প্রতিটা লাইন পড়ার সময় ভাবতে হয়েছে প্রচুর। একেকটা লাইনের ভিতরে কত কত রহস্য লুকায়িত। যেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের লেখনির ছাপ । অযথা শব্দ-বাক্য ব্যবহার না করাই হলো ছোট গল্পের স্বার্থকতা, ঠিক সেই জায়গায় লেখক মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। তবে বইয়ের দামটা একটু কম দিলেও পারতেন।
গল্পটা রুদ্র-নিতু-হাসানের। যে গল্প শুরু হয়েছিল একটা লাইটার দিয়ে আর শেষটা হয়েছে বৃষ্টিস্নাত বিতর্কিত জানাজায়। তাদের কথা হতো জীবন নিয়ে, প্রেম অথবা প্রেম না জাতীয় এক অনুভূতি নিয়ে। নিতান্ত ছেলেমানুষি ইচ্ছে আর স্বপ্ন নিয়ে কথা হতো তাদের। কত প্রেম-অশান্তি,কত মানুষের যোগ-বিয়োগ গুণ ভাগে আজ এখানটায় এসে দাঁড়িয়ে তারা।
মানুষগুলো ভিন্ন, তাদের ঘটনা ও ভিন্ন অথচ তাদের দুঃখ গুলো অভিন্ন। স্বপ্নভঙ্গের আলাপ হয় তাদের। তারা সুখের মুহূর্তগুলো টেনে বড় করতে চায় কিন্তু ইচ্ছে করলেই কি আর তা করা যায়, উপরে যে একজন আছে নাটাই তো তার হাতে। যত সহজে একটা দুঃখ শেষ হয়ে গেলে অন্য একটা দুঃখের জন্ম হয়। তত সহজে একটা সুখ শেষ হবার পর অন্য একটা সুখ ফিরে আসে না।
রুদ্র হলো হাসান আর নিতুর মাঝখানে একটা সেতু। নিতুর কাছে যেতে হলে সেই সেতুর উপর দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু হাসান কি পেরেছিল সেই সেতু দিয়ে নিতুর কাছে যেতে, হয়তো পেরেছিল তবে সেটা অন্যায়ভাবে।
কেউ আক্ষেপ খুঁজে পায় হুইল চেয়ারে বসে দেখা নিঃসঙ্গ নক্ষত্রে। কেউ টরোর শিং সাথে নিয়ে বাঁচতে চায় পিছনে তাকানো যাবে না। পেছনে এক পাল ষাঁড়। কেউ জীবন ছেড়ে পালিয়ে যায় পুরানো রেকে প্রতাশিত কাগজের ভিড়ে; সম্বোধন ছাড়া লেখা রুদ্রের শেষ চিঠিতে। কেউ অতীত জলাঞ্জলি দেয় বূষ্টির ফোঁটায়, প্লাস্টিকের বালতিতে। গুনতে ভুল করলে আবার শুরু করা যায়, কিন্তু যায় কি ?
শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো, 'এসেছে বলেই গেলো, না এলে যেতো না দূরে আজ'। জীবন যেখানে থামিয়ে দেবে সব কিছু, তখনো দৌড়াতে হয়। পেছনে এক পাল ষাঁড়, সামনে সুন্দর সমুদ্র।
একদিন রুদ্র লিখতে বসে চিঠি। চিঠি শেষ করে তারাপদ একটি কবিতা দিয়ে।
"তারপর একদিন জানা যাবে বা হয়তো জানা যাবে না, যে তোমার সঙ্গে আমার অথবা; আমার সঙ্গে তোমার আর দেখা হবে না।"
রুদ্রের শেষ চিঠিতে কি লেখা ছিলো? রুদ্রের মা বৃদ্ধাশ্রম থেকে যে চিঠিটা দিয়েছিলো ঐ চিঠিতে কি লেখা ছিলো? বই পড়া শেষ হয়ে যাবার পরে, চিঠি গুলো পড়তে না পারার আক্ষেপ শেষ হইলো না...
উপন্যাসের প্লট গভীর, কিন্তু লেখায় এতো দর্শন থাকলে, লেখায় এতো বেশি উদ্ধৃতি থাকলে, উপন্যাসের চেয়ে মনে হয় তিনি লেকচার দিচ্ছেন। এই ব্যাপারটা আশাহত করেছে। সব মিলায়ে একদম সময় নষ্ট বলা যায় না। তবে ভালো লাগে নি। ব্যক্তিগত রেটিং ৩.৫।
শিহাব ও হাসান রুমমেট, হাসানের জীবনের নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে শিহাব মনে করে হসানের আত্মহত্যা করা উচিত। শিহাব হাসানকে কনভিন্সও করে ফেলে আত্মহত্যা করার জন্য কিন্তু দড়ি কিনতে গিয়ে হাসান ফিরে আসে এ্যাকুরিয়াম নিয়ে, সে নির্লিপ্তভাবে জানিয়ে দেয় সে আত্মহত্যা করবে না। উপন্যাসে অনেক বিখ্যাত মনীষীদের বাণী ও কবিতা অনেকগুলো চরিত্রের উপস্থিতি রয়েছে, তবে অতিরিক্ত চরিত্র মনে হয় না। কিন্তু কিছুটা বাংলা সিনেমার মত এক চরিত্রের সাথে আরেকটার সম্পৃক্ততার মত মনে হয়েছে। অবশ্য উপন্যাসে যথেস্ট সাসপেন্স রয়েছে, ঘটনাগুলো বুঝতে কিছুটা বেগ পেতে হবে। বিশেষ করে রুদ্র এবং হাসান এই দুটি চরিত্র মিলিয়ে যায় আবার ভালো করে পড়তে হয়। তাই রিভিউ লিখতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। উপন্যাসে বর্তমান থাকে না, সব অতীত নিয়েই এই উপন্যাস যেটা শিহাব ও হাসানের গল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন চরিত্রে এগোতে থাকে। হাসানের স্ত্রী নিতু নামের মেয়েই প্রধান চরিত্র বলা যায়। নিতু বাসা থেকে রাগ করে সমুদ্র দেখার উদ্দেশ্যে বের হয়। কিন্তু রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় বাস না পেয়ে কাউন্টারে বসে থাকে। একজন আগন্তুক তাকে ফলো করেতে দেখে আগন্তুককে ভয় দেখানোর জন্য বাইরে রুদ্র নামের ছেলের কাছে লাইটার চায়। এভাবেই রুদ্রের সাথে পরিচয় তারপর নিতু এবং রুদ্রের বিয়ে হয় সংসার হয়।
ভুল স্টেশনে দুজন অপরিচিত মানুষ নেমে পড়ে হাসান ও নিতু, তারপর পরিচয় বিয়ে। নিতুর বাসায় রয়েছে মা ছোটবোন তিশা, নিতুর বাবা মা ডিভোর্স হয়ে গেছে কিন্তু তারা একসাথে থাকছে। ২৬ বছর আগে নিতুর বাবা তার প্রেমিকার বান্ধবী মানে নিতুর মাকে বিয়ে করেন। সেই ২৬ বছর আগের প্রেমিকার কাছে ফিরে যান নিতুর বাবা। হাসানের মা-বাবা কেউ নেই মেজ মামার বাসায় সে বড় হয়, মেজ মামি একসময় মামাকে ছেড়ে চলে যান তার কলিগের সাথে এরকম নানা টানা পোড়ন রয়েছে উপন্যাসে। রুদ্রের কি হয়? রুদ্র কোথায় যায় যে নিতু হাসানকে বিয়ে করে আবার হাসান কে কেন ছেড়ে চলে যায়, হাসানের কেন আত্মহত্যা করা উচিত ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর খুজে পেতে বইটা পড়তে হবে আপনাকে।
একটু সহজ প্লটের জটিল বই বুঝতে হলে কারো ক্ষেত্রে দুইবার পড়তে হবে বলে মনে হয়েছে। তাই রিভিউ করাও বেশ কঠিন লাগতেছে।
শিহাব এবং হাসান রুমমেট। শিহাব একজন লেখক। একদিন শিহাবের সাথে হাসেনের ব্যক্তিগত জীবনের গল্প শেয়ার করে হাসান। সেই গল্পের হাত ধরেই শিহাব সিদ্ধান্ত নেয়, হাসানকে সে আত্ম/হত্যা করতে বলবে। এই নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচুর আলোচনাও হয়৷ হাসান একদিন সম্মতি জানিয়ে বলে, সে পৃথিবী বরাবর একটা চিঠি লিখে যেতে চায় আত্ন/হত্যা করার আগে। চিঠি লেখা শেষে সে আত্ম/হত্যা করার জন্য দড়ি কিনতে বের হয়। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যায় বাড়িতে ফেরে একটা অ্যাকুরিয়াম হাতে। সে আত্মহত্যা করবেনা। কেন তার এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন?
হাসানের জীবনের কাহিনিটা ছিলো এমন, নিতু নামের এক মেয়ের সাথে হাসানের দেখা একটা ভুল স্টেশন এ। পরে হাসানের নিতুকে ভালো লাগতে শুরু করে। পরবর্তীতে তাদের এই পরিচিতি বিয়ে পর্যন্ত যায়। এর মাঝে আবার আরেকটি চরিত্র আসে, সেটা হচ্ছে রুদ্র। যে কিনা ছিলো নিতুর প্রেমিক এবং তার প্রথম স্বামী। কেন নিতু রুদ্রকে ডিভোর্স দিয়ে হাসানকে বিয়ে করলো? এসব নিয়েই গল্প। গল্পে আরো আছে নিতুর পরিবার, হাসানের পরিবার নিয়ে অনেক কাহিনি।
গল্পটা একদমই সাদামাটা একটা গল্প। টিপিক্যাল বাংলা নাটকের মতো একদম। ডিভোর্সের কাহিনি অনেক বেশি এই গল্পে। লেখক এই বইটিতে সহজ একটা গল্পকে এতো ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলেছেন যে, মাঝে মাঝে বিরক্তি এসে যাবে পড়তে। লেখক প্রচুর কবিদের কোটেশন ব্যবহার করেছেন গল্পে। পুরো গল্পটা পড়ার পর খুবই খাপছাড়া লেগেছে আমার কাছে। বইটির আরেকটা বিষয় অনেক খারাপ লেগেছে সেটা হলো একই লাইন বার বার ব্যবহার করা।
বইটির অন্যতম ভালো দিক হলো, বইটিতে অসাধারণ কিছু লাইন আছে যা পরবর্তী সময়ে গিয়ে উক্তি হিসেবে বিখ্যাত হতে পারে।
একটি আত্মহত্যা ও কয়েকজন মানুষের গল্প একই সুতোয় গাথা।
জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছুই পাওয়ার আছে। তবে তার কতটুকুই আমরা পাই? হারাই তার চেয়েও অনেক বেশি। সেই হারানো ও পাওয়ার গল্পই "শেষ"। একটা সম্পর্ক গড়ে উঠার আগেই যদি হয় "শেষ" তাকে আদতে সম্পর্ক বলা যায়? নাকি বলবো বিচ্ছেদের গল্প? কিন্তু সম্পর্ক ছাড়া বিচ্ছেদও সম্ভব নয়। গোলকধাঁধা।
লেখকের গল্প বলার ধরণ ভাল। গল্পটা খুব আহামরি কিছু তা বলবো না কিন্তু সুখপাঠ্য। পড়লে সময় নষ্ট হবে না (অন্তত আমি মনে করি)।
দুই রুমমেট হাসান এবং শিহাবের আত্মজীবনীমূলক বইয়ের শুরুটা হয় শিহাব হাসানকে আত্মহত্যার পরামর্শ দেয়ার মাধ্যমে। পরবর্তীতে হাসানের প্রাক্তন স্ত্রীর সাথে পরিচয় থেকে বিচ্ছেদ পর্যন্ত এবং মিতুর হাসান পূর্ববর্তী জীবন সম্পর্কের একটা অসাধারণ বিবৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।শেষ বইয়ে লেখক যেভাবে চরিত্র গুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তা অসাধারণ।