তথ্যসমৃদ্ধ, মর্মস্পর্শী, হৃদয়বিদারক- এই উপন্যাস পড়ার অনুভূতিকে এক কথায় প্রকাশ গেলে এভাবেই বলতে ইচ্ছে করছে। অথচ এই বইটির ব্যাপারে কোন আলোচনা চোখে পড়ছে না দেখে আশ্চর্য হলাম।
সাল ১৮৩০। বাংলার এক জমিদার বরদাকান্ত মহাশয় তাঁর কন্যার মানদার বিবাহ দিলেন যশোহরের জমিদার কৃষ্ণমোহনের সাথে। এদিকে সেই জমিদারবাড়ির খাস পরিচারিকা গোলাপি নতুন বউকে সায়েস্তা করার নানান ফন্দি করতে থাকে। এমন সময়ে একদিন সে তাঁর মায়ের কাছ থেকে পায় এক সুন্দর নক্সি কাঁথা। সেই কাঁথা বোনা শুরু করেন মানদার দিদিমা, তারপর কিছু অংশ করেন তার মা এবং এবারে মা প্রসন্নময়ী তাঁকে এই কাঁথাটি সম্পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন।
মানদার সামনে ক্রমেই নতুন দিগন্ত খুলে যেতে থাকে। সে তার ঘরের ভেতরেই তৈরি করে ফেলে এক গোপন পাঠশালা। এখানে বাড়ির সব মেয়েরা পড়াশোনা শেখে আর তার বদলে তারা মানদাকে শেখায় কাঁথা বানানোর বা নক্সা করার বিভিন্ন পদ্ধতি। পড়াশোনার সাথে সাথে এইসব অন্তঃপুরবাসিনী মেয়েরা যেমন জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়, তেমনি সৃষ্টি করতে থাকে একের পর এক অসাধারণ ছবি এঁকে নক্সা করা কাঁথা। সেই কাঁথায় ছবি এঁকে তারা ফুটিয়ে তোলে নিজেদের জীবন কাহিনী, নামধাম সমেত সেই কাঁথা হয়ে ওঠে পরবর্তী সময়ে এক অমুল্য সম্পদ।
কাহিনীর প্রথমটা বেশ ধীরগতির বলে মনে হচ্ছিল। তা ছাড়াও ঘটনাগুলো সাজানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অবিন্যস্ত ভাব আছে মনে হল। তবে কাহিনী যত এগিয়ে যাচ্ছিল তত ভালো লাগতে শুরু করল। আর শেষের পর্যায়ে এসে তো একেবারে রুদ্ধশ্বাস কী হয় কী হয় অবস্থা!
একটি বই পড়ার পর যখন সেই বিষয়ে আরো জানার উৎসাহ জাগে, তখন সেই লেখাটিকে আমি সার্থক বলে মনে করি। এখানেও তাই হয়েছে। একজন সাধারণ জমিদারগিন্নির হাতের কাজ যে এমন অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে তা তো এই বই না পড়লে জানতেই পারতাম না! তাই প্রথমদিকের কিছু ফাঁকফোকরকে আমল না দিয়ে পুরো বইটি সত্যিই খুব ভালো লাগলো। মন ছুঁয়ে গেল।
Never judge a book by its cover, We all know. কিন্তু স্বভাবদোষে ঠিকই সুন্দরের পিছে ছুটে যায়।
বইটি পেয়েছিলাম জন্মদিনে প্রিয় বান্ধবীর থেকে। নকশীকাঁথা, যশোরের জমিদারি, বাংলার রেঁনেসা যুগ - এগুলো দেখে মনে হচ্ছিলো বইটা তো আমার জন্যই তাহলে। তবে কি না 'বিধিবাম' বলে একটা বাগধারা আছে।
প্রথমেই আসি কাহিনীতে, এই ধরনের প্যাঁচানো 'তমসাচ্ছন্ন' গল্প আমার ভালো লাগে না। এর আগে আশাপূর্ণা দেবীর সুবর্ণলতা ট্রিলজি পড়ার সুযোগ হয়েছে, সব বৈরিতার বিরুদ্ধে নারীর সংগ্রামের বর্ণনা পড়তে অদ্ভুত রকম ভালো লাগছিল। কিন্তু এখানে, কেমন জানি খাপছাড়া সব কিছু। কোনো অংশ ই পূর্ণতা পায় নি গল্পের।
তারপর ভাষার ব্যাপারে বলবো যে, জন্ম থেকে আজ চব্বিশটা বছর যশোরে থেকেও এমন ভাষা শিখি নি। হয়তো এভাবে আগে বলতো, কিন্তু এখন এটা শুনি না, অনেক জায়গায় বুঝতে পারছিলাম না। গল্পে প্রাণ আনতে কষ্ট করে একটা আঞ্চলিক ভাষারীতি শিখে বইয়ের সংলাপে ব্যবহার করার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাতে হয়, তবে কি না ভাষার দূরত্বের জন্য আমার পড়তে অনেক কষ্ট হয়েছে।
অন্দরমহলের কাহিনীর নাম করে অপ্রয়োজনীয় অশ্লীলতার জন্য খুবই বিরক্ত লেগেছে। অকারণ নাকি কান্না করে দুঃখবিলাস করা হয়েছে অনেক জায়গায়।
আমি সাহিত্যবোদ্ধা নই, নিজের ভালোলাগার জন্য পড়ি। তবে এই বইটা পড়ে ভালো লাগে নি, বিরক্তি লেগেছে শুধু।
এক অপূর্ব আখ্যান। নকশী কাঁথার সেলাইয়ের ছন্দেই ধীরে ধীরে ঘটনা প্রবাহ গড়িয়ে চলে গড়ে ওঠে সুন্দর কাহিনীকল্প। বড় ভালো লাগল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন লেখনী। বইয়ের অপূর্ব প্রচ্ছদ ও অলঙ্করণ লেখার মুগ্ধতাকে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। প্রাচীন বাংলার গ্রাম্য সমাজের বাহুল্য বর্জিত চিত্রাঙ্কন লেখক অত্যন্ত পারদর্শিতার সাথে করেছেন।