প্রাচীন গ্রিক পুরাণ অনুসারে ফিনিক্স হল আগুনপাখি। এই পাখি জীবৎকাল শেষে, যমদূত আসার আগে নিজের বাসায় আগুন ধরিয়ে দেয়, সেই আগুনে নিজেই দগ্ধ হয়ে যায়। আবার সেই ভস্ম থেকে নবজীবনের জন্ম। এ পাখি আছে রূপকে, প্রতীকে। সন্মাত্রানন্দ এ পাখির মতোই ভস্মীভূত স্তূপ থেকে তুলে এনেছেন ভুলে যাওয়া কথা ও তার কথাকারকে, নাম দিয়েছেন পুনর্যাপী ফিনিক্স। ক্যালাইডোস্কোপ, কথাবস্তু, ধীরে বহে বেত্রবতী বই তিনটি একত্র করে সঙ্কলনটি প্রকাশিত, আছে ৩৬টি গল্প। গ্রামীণ শৈশবের স্মৃতিচারণার সুরে বাঁধা পড়েছে অনেকগুলি কাহিনি। প্রথম অংশ ‘ক্যালাইডোস্কোপ’ পড়তে গিয়ে খুব সহজেই সন্মাত্রানন্দের বয়ানে একাত্ম হয়ে যাওয়া যায়। ‘জলছবি’, ‘ইরাবতীর অ্যালবাম’, ‘সার্কাসের সোনালি’ কাহিনিতে ধরা পড়ে লেখকের শৈশবের মজার গল্প। বাকি অংশে ভূত থেকে পুরাণ, হরেক স্বাদের সন্ধান মিলবে। সন্ন্যাসী, শিক্ষক, গ্রন্থাগারিক— জীবনের নানা পর্যায়ে বহু অভিজ্ঞতা তাঁর। এ রচনাগুলি সেই অর্জনেরই ফসল। স্বল্প পরিসরে এমন পাঠসুখের অনুভবও কিন্তু বিরল। বইয়ের মলাটটি খয়েরি— এও কি ফেলে আসা সময়ের ছোঁয়া?
মধুর গদ্যের একটা আলাদা আকর্ষণ আছে। দারুণ গরমে ঠান্ডা জলে স্নান করায় যে আরাম তা কি সাবান-শ্যাম্পুর ব্র্যান্ড বা বাথরুম কতটা সুশোভন, এ-সবের তোয়াক্কা করে? ঠিক সেভাবেই আধুনিক গদ্যের ভাঁজে-ভাঁজে একেবারে ভাজা হওয়া আমি সুযোগ পেলেই এমন কোনো লেখকের বইপত্র টেনে নিই, যাঁর ভাষার শীতল স্পর্শ আমাকে আগে দু'দণ্ড শান্তি দেবে। সন্মাত্রানন্দের নানা লেখার প্রতি আমার আকর্ষণের মূল লুকিয়ে আছে তাঁর এই অনন্য গদ্যভাষায়। তাতেই লেখা এই শীর্ণকায় গল্প-সংকলনে আমি ন'টি গল্প পেলাম। কেমন লাগল গল্পগুলো? একটি প্রারম্ভিক কথনের পর এতে একে-একে এসেছে: ১] উত্তরা বোষ্টমীর কড়চা~ বিষাদ যে কত মধুর হতে পারে, পাওয়া আর না-পাওয়ার অনন্ত আলাপে রচিত রাগ যে কত সুরেলা হতে পারে, তার এক সংক্ষিপ্ত চিত্র বলতে পারি এই গল্পটিকে। কত অব্যক্ত অনুভূতি যে বয়ে গেছে এই কাহিনির অন্তরে, তা বোঝানো আমার কম্মো নয়। আপনাকে কষ্ট করে গল্পটা পড়তে হবে। ২] নিঝুমপুর~ পাক্কা গথিক গল্প, আর তার শেষের ট্যুইস্টটা আমার বেশ লাগল। ৩] জে~ এই সংকলনের দীর্ঘতম এই গল্পটি আমার মতে বইয়ের দুর্বলতম লেখা। এই ফর্মুলাইক লেখাটি পড়ে মনটা খারাপই হয়ে গেল। ৪] মাঝরাতের সেই ফোনকল~ এই মনস্তাত্ত্বিক গল্পটি সংক্ষিপ্ত বলেই সার্থক হয়েছে। ৫] সরগরম পেশা~ এ কি স্মৃতিচিত্রণ? নাকি স্যাটায়ার? নাকি কৌতুকের মোড়কে এক অতৃপ্তিকে ফোটানোর স্নিগ্ধ প্রয়াস? পাঠক বুঝে নিন। ৬] ভ্রষ্টাচারী ইঁদুর~ নিখাদ স্যাটায়ার। নাকি অন্য কিছু...? পড়ে দেখুন। ৭] পাঁচজন মানুষ~ স্মৃতির নদী থেকে তুলে আনা পাঁচটি রঙের রোশনাই ছড়ানো জলবিন্দু স্থান পেয়েছে এই লেখায়। ৮] মৃৎপাত্রজাতক~ এক অমর্ত্য মানবের জীবনের কঠিনতম মুহূর্তটি এখানে বিধৃত হয়েছে এক নশ্বর আধারের বয়ানে। গল্পটা পড়তে গিয়ে জনারণ্যের কোলাহল মুছে যায়। অন্য কিছু ধ্বনি, কিছু ভাব শুধু থেকে যায় সঙ্গী হয়ে। ৯] ধীরে বহে বেত্রবতী...~ পুরাণের কাহিনির কায়ায় এ আসলে মায়ার গল্প। কীভাবে সে মায়া গড়ে ওঠে, কীভাবে তা সর্বনাশিনী রূপ নেয়, আর কোন্ মূল্যে তার আলিঙ্গন থেকে মুক্ত হওয়া যায়, এমন বিমূর্ত প্রশ্নের মূর্তরূপ এই আখ্যান। ভারি ভালো লাগল এই লেখাগুলো। তাই হে পাঠক, এটুকুই আপনাদের উদ্দেশে বলার যে গল্পের হাত ধরে জীবনের নদীতে যদি অবগাহন করতে চান, তাহলে এই বইটিকে বেছে নিতেই পারেন।
এই গল্পগ্রন্থটি পড়া শেষ করে প্রথম যে অনুভবটা হয়, তা চমক নয় — বরং, এক নীরব অন্তর্লীন আত্মজিজ্ঞাসা, যেটা একটানা বাজতে থাকে আত্মার অন্তরতম কোনে। যেন এক ধ্বংসস্তূপ থেকে উড়ছে আগুনরাঙা ছাই, আর সেই ছাইয়ের নিচে পুনরুজ্জীবনের ধুকধুক শব্দ। সন্মাত্রানন্দের এই বই শুধুমাত্র একটি নিছক সংকলন নয়—এ এক দার্শনিক, অস্তিত্ববাদী, অনেকখানি মরমিয়া আত্মজিজ্ঞাসার আত্মকথাও।এটা গল্পের ছদ্মবেশে আত্মসার পাঠের মতো, যেখানে কেবল চরিত্র নয়, সময়, মৃত্যু, ভাষা—সবকিছুই নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে বিদ্যমান।
১. ক্যালাইডোস্কোপ: শৈশবের স্মৃতিতে গ্রামবাংলা, ভাঁজে ভাঁজে জীবনের প্যাটার্ন:
এই অংশ পড়ে আমার সবচেয়ে বেশি মনে হয়েছে রেমার্কের Three Comrades বা গার্সিয়া মার্কেজের Living to Tell the Tale-এর প্রথমাংশের কথা—যেখানে ব্যক্তিগত স্মৃতি আর স্থানীয় ভূগোল একে অপরকে ভিজিয়ে দেয়। জলছবি, যাত্রা, ভয়—প্রতিটি গল্প যেন এক ধরণের ছায়াছবি। গ্রামের শৈশবের সহজ সরলতা, কুবাই নদী, যাত্রাগানের রাত, কিংবা ভয় পাওয়া সেই খাটের তলা—সব কিছু এত চিত্ররূপে ধরা পড়ে যে মনে হয় লেখক আসলে এক চিত্রশিল্পী, যার ক্যানভাস হল কাগজ।
গল্পগুলি পড়ে মনে হল—এ তো রে আলেক্সি তলস্তয়ের Childhood, কিন্তু বাংলার প্রেক্ষিতে, যেখানে ব্রহ্মদৈত্য এসে পড়ে ভয়াবহ এক উপস্থিতি হয়ে। নিশিরাতের অতিথি, প্রতিমা, ছবির মিছিল বা অফুরান-এ উঠে আসে স্বাধীনতা, পেশাজীবনের টানাপোড়েন, গ্রামীণ অর্থনীতির সংকট—সবমিলিয়ে এই অংশটি বাংলা ছোটোগল্পের পাঠককে জীবনঘনিষ্ঠ আর মায়াঘন এক আলেখ্য উপহার দেয়।
২. কথাবস্তু ও অনু কথাবস্তু: বাস্তবের অতল, পুরাণের আলো-ছায়া:
এই অংশটার একেকটা লেখায় একেকটা ল্যান্ডস্কেপ খুলে দেয়—আশমানি নেশা বা কুসুম কুসুম ভোর মনে করিয়ে দেয় কাফকার লঘু দুঃস্বপ্ন অথবা সঙ্গীতপ্রীতির মধ্য দিয়ে বিগোত্ত বা মুরাকামির অনুরণন। তবে সন্মাত্রানন্দ তার নিজস্ব গদ্যভাষা দিয়ে এমন এক অলৌকিক বাস্তব নির্মাণ করেন যা বাংলার গল্পভাষ্যে দুর্লভ।
নদীতমা, আয়না, ঘাতক—এই গল্পগুলোতে পেঁচা, আয়না, নদী—সবই এক-একটা প্রতীকে পরিণত হয়। অনেকটা বোর্হেসের গদ্যের মতোই। এণাক্ষীগাথা, অথ নিষাদকথা, মল্লার—এইসব লেখায় তিনি পুরাণ, ইতিহাস, স্মৃতি আর সময়কে এমনভাবে মিশিয়ে দেন যে মনে হয় আমরা ইতালো কালভিনো বা মিলোরাদ পাভিচ-এর লেখা পড়ছি—কিন্তু বাংলায়।
বিশেষভাবে ঘাতক গল্পটি অসামান্য। এখানে একটা পেঁচা, যে আদতে একজন "ঘাতক", তার পথভ্রষ্ট হওয়ার ঘটনা একটা গভীর জীবন-দর্শনকে ছুঁয়ে যায়। এক রাতে সে কাক দম্পতিকে মারতে যায়, কিন্তু ঘুমন্ত নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে রাজনির্দেশ ভুলে যায়। এটা একটা টোটাল দার্শনিক বিপ্লব! এমন পাঠে বারবার থেমে যেতে হয়, একটু চুপ করে ভাবতে হয়।
৩. ধীরে বহে বেত্রবতী: আখ্যানের অন্তঃসলিলা:
এই অংশটি আমাকে বারবার স্মরণ করিয়েছে হেসে’র Siddhartha এবং ফুকোর The Order of Things—অর্থাৎ, দার্শনিক আত্মজিজ্ঞাসার সঙ্গে জীবনের আনাচে-কানাচের সংলাপ। উত্তরা বোষ্টমীর কড়চা, মৃৎপাত্র জাতক, ধীরে বহে বেত্রবতী—এই লেখাগুলিতে সংসার, ব্রহ্ম, প্রেম, ভ্রান্তি এবং আত্ম-অতিক্রমণের কাহিনি এঁকেছেন লেখক।
সবচেয়ে চমকে দেয় যে, এই লেখক হাস্যরসেও সিদ্ধহস্ত। সরগরম পেশা, ভ্রষ্টাচারী ইঁদুর—এমন গল্পে হাসতে হাসতে হঠাৎ সমাজের মুখোশ খুলে যায়। ঠিক যেন ভনেগুটের The Tin Drum বা সল বেলোরের Herzog-এর মতো আত্মসমীক্ষামূলক ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্য।
তবে পাঁচজন মানুষ গল্পটি, যেখানে লেখক নিজস্ব জীবন থেকে কিছু চরিত্র তুলে আনেন, এমন এক আত্মস্মরণ যে সেটা পড়তে পড়তে মনে পড়ল Speak, Memory—নাবোকভের সেই আত্মজৈবনিক লেখনী, যেখানে শৈশব ফিরে আসে রঙিন প্রতিচ্ছবিতে।
ভাষা ও গদ্যরীতি: চিত্রকল্পের বুননে সন্মাত্রানন্দ
সন্মাত্রানন্দের ভাষা একইসঙ্গে তীব্র ও কোমল। কখনও লঘু ব্যঞ্জনায় তিনি হালকা জীবননকশা আঁকেন, কখনও আবার গাঢ় মনস্তাত্ত্বিক গভীরতায় নিমগ্ন হয়ে যান। তাঁর বাক্য গঠন কোনও বাঁধাধরা ছাঁচে চলে না। কোথাও “তো,… ” দিয়ে শুরু করে নৈসর্গিক স্বাভাবিকতায় তিনি শব্দের স্রোত নামান। এ ভাষা আমাদের ক্লান্ত করে না, বরং ডেকে নেয়, টেনে নেয়—একান্ত আপন করে। সন্মাত্রানন্দের ভাষা সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গীতল, ধ্যানস্থ, কবিত্বময়, অথচ কঠিনও। তিনি কথাসাহিত্যের ভেতরে যে দার্শনিক ছায়াগুলো বুনেছেন—সেগুলো পাঠককে অনায়াসে নিয়ে যায় কাশ্মীরী শৈবতত্ত্ব, বৌদ্ধ যোগসাধনার স্তরে। "অনুভবই শ্রেষ্ঠ সত্য"—এই মন্ত্র নিয়ে যেন গোটা সংকলনটি বিধৃত। চরিত্রদের ভেতর দিয়ে, তাঁদের অন্বেষণের পথ দিয়ে আমরা উপলব্ধি করি ��ত্মস্মৃতির গুরুত্ব, স্বপ্নের প্রতীকবাদ, পুনর্জন্মের সম্ভাবনা, এবং শেষত এক অন্তর্নিহিত "আমি"-কে পুনরাবিষ্কারের অভিজ্ঞতা। মৃত্যু এখানে সমাপ্তি নয়, বরং একধরণের অবসান থেকে জেগে ওঠা। এ এক ফিনিক্সের পুনর্যাত্রা—যা নিজেই নিজের ছাইয়ের থেকে উঠে আসে।
সম্পাদনা ও প্রকাশনা
সৌজন্য চক্রবর্তীর প্রচ্ছদটি চমৎকার, খয়েরি কাভার যেন ধুলো-ধূসরিত সময়ের আলেখ্য। ছাপা, হরফ, বাঁধাই—সবকিছুই চমৎকার। ধানসিড়ির এই প্রয়াস নিঃসন্দেহে বাংলা সাহিত্যের পাঠকমন্ডলীর কাছে একটি মূল্যবান উপহার।
শেষে যা বলার থাকে: ছাই থেকে উঠে আসা শিল্পপুনর্জন্ম
পুনর্যাপী ফিনিক্স কেবল একটি গল্পগ্রন্থ নয়, এটি একটি আত্মপরিচয়ের পুনরুদ্ধার। একজন লেখকের হারিয়ে যাওয়া সময় ও কাগজের পুনর্পাঠ। বাংলা সাহিত্যে এমনভাবে হারিয়ে যাওয়া গ্রন্থের পুনর্মুদ্রণ খুব কমই দেখা যায়, বিশেষত এতো সংবেদনশীল ও বৈচিত্র্যময় আঙ্গিকে।
সন্মাত্রানন্দের এই সংকলন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষার জাদু কেবল অর্থে নয়, অনুভবে। আর সেই অনুভব, একবার মস্তিষ্কের কোষে ঢুকে গেলে—তাকে উপেক্ষা করা যায় না।
ফিনিক্স যে আগুনে পুড়ে আবার পুনর্জন্ম নেয়, সে আগুন বাইরের নয়—ভেতরের। এই গল্পগুচ্ছে সেই অন্তর্গত দাহের ছবি এঁকেছেন সন্মাত্রানন্দ—যার ধোঁয়ার নিচে আমরা দেখি মানুষের মনোজগতের বৃহৎ মানচিত্র। এই আত্মদহন শেষে পাঠকও যেন ধুলোঝাড়া এক উপলব্ধিতে পৌঁছায়—যে মৃত্যু মানেই অবসান নয়, স্মৃতির ভিতরেও পুনর্জন্ম সম্ভব।
পুনর্যাপী পাঠের জন্য পুনর্যাপী ফিনিক্স আমাদের নিতান্তই প্রয়োজন।