মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ওলফ পালমে এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের রহস্যময় মৃত্যু তথা হত্যাকাণ্ডকে নতুন তথ্য ও গবেষণার প্রেক্ষিতে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক এই বইয়ে।
কাজল ভট্টাচার্যের জন্ম কলকাতায়, ১৯৭১ সালে। পড়াশোনা কলকাতায়। আধুনিক ইতিহাসে এম. এ.। সাংবাদিকতা ও জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা। লেখালেখির সূচনা কৈশোরে। প্রথম মুদ্রিত রচনা ১৯৮৪-তে একটি বিজ্ঞান পত্রিকায়, এ ছাড়া লিখেছেন আনন্দবাজার, বর্তমান, যুগান্তর, দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকা এবং বহু সাময়িকপত্রে। সংবাদপত্রে চাকরি দিয়ে পেশাপ্রবেশ, বর্তমানে রাজ্য সরকারের আধিকারিক। বই পড়তে, গান শুনতে এবং বেড়াতে ভালোবাসেন৷
যেকোনো মৃত্যু একটা শূন্যস্থান তৈরি করে। কিন্তু রোগে ক্লিষ্ট হয়ে চোখ বন্ধ করা, আর আততায়ীর অতর্কিত ছোবলে বর্তমান থেকে অতীত হয়ে যাওয়া— এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। সেই হঠাৎ-মৃত্যু যদি এমন কারও হয় যিনি ক্ষমতা ও খ্যাতির শিখরে বসে আছেন, তাহলে তা বহু প্রশ্নের জন্ম দেয়। তাদের মধ্যে প্রধানতম হল, ঢাক-ঢোল পিটিয়ে 'সত্যি' বলে যা চালানো হচ্ছে, সেটা কি গ্রহণযোগ্য? নাকি আসল গল্পটা আমরা জানতেই পারছি না? বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বিতর্কিত ও চর্চিত চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পোস্ট-মর্টেম করেছেন কাজল ভট্টাচার্য তাঁর এই বইয়ে। এতে আছে~ ১. রাজপথে অদৃশ্য ঘাতক: কেনেডি'র কোন-কোন আচরণ তাঁকে হিট-লিস্টে তুলেছিল? অসওয়াল্ড কি আদৌ খুনটা করেছিল? ২. মৃত্যুর শীতল রাত: কী হয়েছিল তাসখন্দ চুক্তি সই করার রাতে? বিদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রীর অমন অকস্মাৎ মৃত্যুর পরেও কেন ভারত সরকার এই নিয়ে কথা থামিয়ে দিতে চায়? ৩. বরফে রক্তের দাগ: প্রকাশ্যে নিহত হলেন সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী! অথচ তিন দশক পেরিয়ে যাওয়ার পরেও হত্যাকারী কে এবং কেন ঘটেছিল এই মৃত্যু— তা কুয়াশায় ঢাকা। কেন? ৪. আকাশে মৃত্যুর হাতছানি: বিমানে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির সন্ধান পাওয়া যায়নি। হয়নি কোনো মিসাইল আক্রমণ। আত্মঘাতী হামলাও ঘটেনি। অথচ জিয়া-উল হক এবং পাকিস্তানের একঝাঁক প্রতাপশালী মানুষকে নিয়ে মরুভূমিতে আছড়ে পড়ল পাক ওয়ান। কেন? 'রাজনীতি আর গোপন-গভীর ছুরিকাঘাতের মধ্যে সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। কাজল ভট্টাচার্য এই বিষয়টিকে তাঁর 'ব্ল্যাক অপারেশন'-এ অনবদ্য লেখনী ও কঠোর তথ্যনিষ্ঠা দিয়ে পেশ করেছিলেন। আলোচ্য বইয়ে তিনি সেই নির্মোহ অথচ আলাপি ভঙ্গিতেই চারটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিশ্লেষণ করেছেন। বইটার ভালো দিক কী? ১. লেখার গুণে এবং বিষয়ের টানে বইটি যেকোনো থ্রিলারকে হার মানাবে। শুরু করলে একেবারে শেষ না করে এই বই ছাড়া যায় না। ২. এই চারটি মৃত্যু নিয়ে জানতে চাইলে আলোচ্য বইটি অবশ্যই শেষ কথা নয়। লেখক বইয়ের শেষে সহায়ক গ্রন্থসমূহ তথা বিস্তৃত পাঠের নির্দেশিকা দিয়ে আমাদের অশেষ উপকার করেছেন। ৩. শক্ত মলাটে, ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য'র স্কেচে শোভিত হয়ে বইটি সংগ্রহযোগ্য আকারে পরিবেশিত হয়েছে। বইটার খারাপ দিক কী? ১) এই গল্পের মূল চরিত্র (খলনায়ক?)-দের ছবি আন্তর্জালে সহজলভ্য। সেগুলো দেওয়া দরকার ছিল। ২) অসওয়াল্ডের অতীতের অত বিবরণ না দিয়ে, বরং পপুলার কালচার কীভাবে কেনেডি'র হত্যারহস্যকে দেখেছে— সেটা লিখলে ওই অধ্যায়টা আরও আকর্ষণীয় হত। শেষ বিচারে বলব, এমন সুলিখিত নন-ফিকশন উপেক্ষা করলে রীতিমতো লোকসান হবে। পড়ে দেখুন। হয়তো এই চারটি মৃত্যুর কোনো নতুন অর্থ বা ব্যাখ্যা আপনার কাছে ফুটে উঠবে। হয়তো রাজনীতির অক্ষক্রীড়ায় পাশাগুলোকে আপনি আরও ভালোভাবে চিনে নেবেন।
বিশ্বব্যাপী চার হেভিওয়েট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের অকস্মাৎ মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল যেসব রহস্য, তা মাইক্রোস্কোপের তলায় এনে বিশ্লেষণ করেছেন লেখক। শুরুতেই তিনি বলেছেন, কন্সপিরেসি থিয়োরি প্রচার করা এই বইয়ের উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু যেসব প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায়নি, সেই অসংগতিগুলিকে নতুন করে পাওয়া কিছু তথ্যের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এতে, যা পাঠককে ভাবায়। এসব কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে হত্যার চার অধ্যায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী, সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী ওলফ পালমে এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের রহস্যময় মৃত্যু তথা হত্যাকাণ্ডকে নতুন তথ্য ও গবেষণার প্রেক্ষিতে দেখার চেষ্টা করেছেন লেখক এই বইয়ে।
বইটি নন-ফিকশন গোত্রের বহুল তথ্যসমৃদ্ধ। বইটিতে বিশ্ব রাজনীতির একটা অন্ধকার দিক তুলে ধরা হয়েছে। এই বইতে শুধুমাত্র ৪ জন রাষ্ট্রনেতার রহস্যময় মৃত্যুর কথাই বলা আছে। অনেক কিছু জানা যায় এই বইতে। এই চার জন বাদ দিলেও অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড থেকে যায়। এই বই থেকে একটা ধারণা পাওয়া যায় যে এসব হত্যাকাণ্ডের পিছনে কত গভীর পরিকল্পনা লুকিয়ে থাকে।
দমবন্ধ করে শেষ হল 'হত্যার চার অধ্যায়'। রুদ্ধশ্বাস স্পাই থ্রিলারও হার মেনে যেতে পারে। খুন, মৃত্যু এসব নিয়ে রহস্যের দানা বাঁধা স্বাভাবিক কিন্তু যখন খ্যাতির শীর্ষে বা নিরাপত্তার কড়া বেষ্টনীতে থাকা মানুষগুলোর আকস্মিক মৃত্যু হয় তখন শুধু রহস্য নয়, অনেক অনেক প্রশ্নও জট পাকিয়ে ওঠে। কাজল ভট্টাচার্যের সুনিপুণ কলমের গুণে সম্ভবত বিংশ শতাব্দীর সব থেকে বিতর্কিত চারটি হত্যাকান্ড(দুর্ঘটনা?) লিপিবদ্ধ হয়েছে এই বইয়ে। ১. রাজপথে অদৃশ্য ঘাতক: প্রকাশ্য রাজপথে খুন হলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি। আন্তর্জাতিক স্তরে ও ঘরে দুই জায়গাতেই বিস্তর শত্রু বানিয়ে ফেলেছিলেন ভদ্রলোক। আর সেই কারণেই এত নিরাপত্তা বেষ্টনী থেকেও খুন হতে হল তাঁকে? ২. মৃত্যুর শীতল রাত: লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। আমার দেশের এমন এক বেঁটে-খাটো প্রধানমন্ত্রী যিনি সম্ভবত প্রথমবারের জন্য পাকিস্তান তথা সমগ্র বিশ্বের কাছে খুব সুস্পষ্ট বার্তা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন , ভারত আর সহ্য করবে না। প্রয়োজনে সে শত্রু দেশেও সেনাভিযানে পিছপা হবে না। একটি তৃতীয় বিশ্বের দেশে নিয়ে এলেন বিপ্লব। সেটা বোধহয় প্রথম শ্রেণির অনেক দেশের কাছে চক্ষুশূল হল। তাসখন্দে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার কয়েক ঘন্টার মধ্যে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা গেলেন। নাকি ছিল কোনও গভীর ষড়যন্ত্র? ৩. বরফে রক্তের দাগ: প্রকাশ্যে নিহত হলেন সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী! কেন হঠাৎ সেদিন নিজের সমস্ত নিরাপত্তা রক্ষীদের ছুটি দিয়ে নির্জন পথ ধরে ফিরছিলেন এক দেশের প্রধানমন্ত্রী? নাকি কোনও গোপন কারণে তাঁকে ছল করে টেনে নিয়ে যাওয়া হয় মৃত্যুর দিকে? ৪. আকাশে মৃত্যুর হাতছানি: হঠাৎ করেই মাঝ আকাশে বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলেন পাক প্রেসিডেন্ট জিয়া উল হক, অথচ বিমানে কোনও যান্ত্রিক ত্রুটি পাওয়া যায়নি। কোনও আত্মঘাতী বা আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অথচ কীভাবে যেন বিমানটি মরুভূমির বুকে হঠাৎ করেই ভেঙে পড়ল! রাজনীতি আর গুপ্ত হত্যা যেন পরস্পরের হাতে হাত রেখে চলে। তথ্যনিষ্ঠ এই বইটি সেটা যেন আরও একবার প্ৰমাণ করে দেয়। একজনের মৃত্যুর পিছনে বহু মানুষ, গোষ্ঠী বা দেশের রাজনৈতিক স্বার্থগুলি লেখক খুব দক্ষতার সঙ্গে সাজিয়ে পরিবেশন করেছেন। পড়তে পড়তে একটা সময় মনে হয় অভিযুক্তদের প্রত্যেকের কাছেই হত্যাকান্ড ঘটানোর যথেষ্ট কারণ ও সুযোগ ছিল। লেখকের লেখার গুণে এই বই একেবারে unputdownable. তরতর করে পড়া এগিয়ে যায়, যত এগিয়ে যায় তত একাধিক চরিত্র ও গোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায় আর তত যেন রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। এই বইয়ের সব থেকে ভালো যেটা লেগেছে তা হল লেখকর যথাসম্ভব নিরপেক্ষ ত���্য পরিবেশ। এরকম বেশ কিছু বই পড়ার সুযোগ হয়েছে যেগুলোর বেশ কিছু শেষ অবধি গিয়ে দাঁড়ায় MCQ উত্তর করার মতো। A -এর কারণ ছিল কিন্তু হচ্ছে না, B -এরও তাই। D- এরও ওই রকমই। তাহলে বুঝতে তো পারছেন কে! লেখক যে এটি করেননি, সেটি দেখে ও পড়ে বেশ ভালো লেগেছে। ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য'র অলঙ্করণগুলো বইটির অঙ্গসজ্জায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। খারাপ তেমন কিছুই চোখে পড়েনি, দুটো মুদ্রণ প্রমাদ ছাড়া। তবে যেহেতু হার্ডকোর ননফিকশন তাই ফিকশন পাঠকদের কতটা ভালো লাগবে বলা কঠিন, কারণ লেখাগুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রসঙ্গান্তর ঘটেছে বারবার। বইয়ে অনবদ্য তথ্য নির্ভর চারটি রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের(দুর্ঘটনা?) বিবরণ লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। যাঁরা এ ব্যাপারে আরও পড়তে চান তাঁদের জন্য বইয়ের শেষাংশে বেশ কিছু গ্রন্থের নাম রয়েছে। এই বই সমকালীন রাজনৈতিক সমীকরণ সম্বন্ধে পাঠককে অনেকটাই অবগত করে। তাই না পড়লে, আদতে অনেক লোকসান।