অগল্প আসলে কার গল্প? হলেও হতে পারতো একটা পাখির জীবনের গল্প? নাকি একটা ছোট্ট রোদ বুকে জড়িয়ে সারা জীবন আলো ছড়াতে চাওয়া কোনো জোনাকির গান? কে বেশি ভালোবাসার দাবীদার? সমুদ্রের মতো নিরন্তর স্রোত প্রবাহের দায় নিয়ে বয়ে চলা একাকী ক্লান্ত মানুষ, নাকি ডিসেকশন হলে শুয়ে থাকা নাম ঠিকানা হীন ক্যাডাভার? অগল্প হয়তো আসলে কোন গল্পই নয়। অগল্প হয়তো একটা পরিত্যক্ত ক্লাসরুম, একটা ছাতা পড়ে যাওয়া লেকচার গ্যালারির দেয়াল, প্রকাণ্ড লাইব্রেরি রুমের শেলফ ভর্তি অখণ্ড নীরবতা অথবা ফরমালিনের গন্ধে ভরে থাকা একটা পুরাতন ডিসেকশন হল; যেখানে রাত বাড়লেই ব্যবচ্ছেদকৃত লাশের বুক চিরে আবার জন্ম নিতে চাওয়ার আক্ষেপ ভেসে আসে! জাহান, বকুল, আফরিন, বদরুদ্দোজা ও নির্মলদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক আখ্যান - অগল্প।
"অগল্প" বই টার গল্প টা সম্ভবত যে কোন মেডিকেল স্টুডেন্টের ই খুব চেনা একটা গল্প লাগবে। এই চেনা গল্প টা ই যে এতো টা সুন্দর এই বইটা শেষ করে ফেলার পর আমি বুঝতে পেরেছি। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে জীবন কেমন হবে এই চিন্তায় এই এখন জীবন কেমন চলছে তা ভুলে যাচ্ছি। থ্যাংকিউ জাহান আপু, এত্তো সুন্দর একটি রিমাইন্ডার এর জন্য❤️
নতুন বছরে পড়া প্রথম বই। যে দিন শুরু সে দিন ই শেষ। এত দ্রুত/একটানা বই অনেক দিন পড়ি নি। অনেক দিন মানে আসলে অনেক বছর।
আসলে রিভিও লেখা আমার কর্ম না। ওইটা আমি ঠিক মতো পারি না। চেষ্টা করেছিলাম। হয় নি। আমার কাছে সব বই ভাল্লাগে। আমার কাছে সব লেখা ভাল্লাগে। প্রতিটা লেখা প্রতিটা লেখকের সন্তানের মতো। আর কারো সন্তান ই খারাপ হয় না। সবাই ভাল।
আমি এখানে আসলে যা করছি তা হচ্ছে স্মৃতিচারন। লেখিকা জাহান সুলতানা উরফে বিকেল চড়ুই এর সাথে আমার পরিচয় (একতরফা) অনেক আগে। এরাউন্ড ১২/১৩/১৪ কিছু একটা হবে। লাইফের ওই সময় টাতে আমি ফেসবুকে প্রচুর একটিভ ছিলাম। কারণ একটাই বাস্তব জগত থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া। লাইফের সবচাইতে কষ্টের সময় পার করেছি সেই সময় টাতে। যেটাকে এখন মানুষ (ডিপ্রেশন) বলে। এখন তো মানুষ বাপের কাছে চকলেট চেয়ে না পেলেই ডিপ্রেশনে চলে যায়। তারের কাউন্সিলিং করে ঠিক করতে হয়। কিএক্টা অবস্থা।
বইটা আমাকে একটানে সেই সময়ে নিয়ে গিয়েছিল। সময়ের কবরে চাপা দিয়ে রাখা কিছু কষ্টের হাড়গোড় ঠকঠক করতে করতে বেরিয়ে এসেছিলো। ভুলে যাওয়া কিছু দগদগে ঘায়ের শুকিয়ে যাওয়া দাগ গুলো চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো।
তখন সদ্য ইন্টার পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি যুদ্ধ্যে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ক্লান্ত অবশ্রান্ত পরাজিত দিন যাপন করছি।
প্রথম বারে DU(IBA) তে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। রিটেনে হলেও ভইবাতে গিয়ে টিকতে পারি নি। ইংরেজিতে কথা বলা তখনো আমার রপ্ত হয় নি। ওই প্রস্তুতি নিতে গিয়ে অন্য কোন কিছুর তেমন খুজ নিতে পারি নি। ফলাফল হিসাবে কোথাও চান্স পাই নি। (আমি মাল্টি ট্যালেন্ডেড পাবলিক না যে একসাথে ১০/১২ টা চান্স পেয়ে ফেলবো। আর আমার কপাল ও অত ভাল না।)
তারপর বাবার কাছে ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬০০ টাকার একটা হিসাব পেয়েছিলাম। আমার পিছনে তার জলে যাওয়া টাকার পরিমান।
আর কোথাও না পেলেও ন্যাসনালে চান্স পেয়ে গিয়েছিলাম। ভর্তি হয়ে গিয়েছিলাম এরি মধ্যে। ১৭৬৬০০ এর সাথে আরো কিছু যোগ করে। তারপর ২য় বারের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করতে থাকি। এবার আর IBA তে যাই নি। অন্য গুলোতে চেষ্টা করেছিলাম।
রেজাল্ট ছিল DU (ওয়েটিং) JU(ওয়েটিং) JNU(ওয়েটিং) KU(ওয়েটিং)। কোথাও ডাক পড়ে নি আমার। শেষমেষ ন্যাসনালই ভরসা হয়েছিল।
ও হ্যা স্বনামধন্য কয়েকটি প্রাইভেটে চান্স হয়েছিলো। কিন্তু ১৭৬৬০০ এই অংক টা আর বেশি বড় করার সাহস ছিল না। তাই ওই দিকটা এড়িয়ে গিয়েছি। তারপর থেকে কোন কাজে আর তাদের কাছে কিছু চাইতে যাই নি।
এরি মধ্যে ন্যাসনালের ফার্স্ট ইয়ারের পরিক্ষা চলে এসেছিল। তখন আমার কাছে কোন বই ই ছিল না। পড়া তো দুরের কথা। ফলাফল ৬ সাবজেক্টের ৫ টাতে ফেল। সেকেন্ড ইয়ার এ একটা ভাইবা হয়। সেখানে স্যার আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল আমার ১ম ইয়ারে রেজাল্ট কি ছিল। বলে ছিলাম ০.৩৩ ছিল। স্যারেরা অবাক হয়ে বলে ছিল এটা আবার কি করে হয় ? আমি বলে ছিলামঃ স্যার আমার ৫ সাবজেক্টে ফেল ছিল।(দেয়ার রিয়াক্ট ওয়াজ এপিক। ;) )
তখন আমি একেবারেই ঘর বন্দি । কোথাও যাই না। কারো সাথে মিশি না। কথা বলি না। সারাদিন কম্পিউটারে ফেসবুক চালাই আর গেম খেলি। আর টুকটাক প্রাইভেট পড়িয়ে নেটের খরচ যোগার করি।
সেই সময় ফেসবুকে আমার পরিচয় হয় কিছু মানুষের সাথে যাদের লেখা পড়ে আমার দিক পার হতে। বিকেল চড়ুই উরফে জাহান সুলতানা তাদের ই একজন।
পড়তে পড়তে গল্প করতে করতে কিছু মানুষকে মনেও ধরে যায়। (যেটাকে এখন ক্র্যাশ বলা হয়।) তারপর খবর আসতে থাকে কেও ঢাবি তে চান্স পেয়েছে। কেও রাজশাহিতে কেও কক্সবাজার মোডিকেলে। আমি তখন ন্যাসনালে পড়া অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে ৫ সাবজেক্টে ফেল মারা ছাত্র। তাই কাওকে কিছু বলা হয়ে উঠে নি। আসলে সাহস হয়নি।
আমি আবার ইমোশনাল টাইপ রিডার। বেশি আনন্দের বা কষ্টের কিছু পড়লে আমার কান্না চলে আসে। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। বই পড়েছি নষ্টালজিক হয়েছি । একটু আকটু কান্না কাটিও করেছি (আড়ালে)।
বিদ্রঃ কিছু জায়াগায় দাড়ি কমার একটু এদিক সেদিক নজরে পড়েছিল। আশা করছি ২য় সংস্করণে তা ঠিক হয়ে যাবে।
অগল্প বইটা নিয়ে কী রিভিউ লিখবো সেটা বুঝতে পারছি না । আসলে এটাকে ঠিক উপন্যাস আমার মনে হয় নি । লেখিকা তার মেডিক্যাল শিক্ষা জীবনটাকে দুই মলাটের ফ্রেমে বাঁধার চেষ্টা করেছেন । অথবা অন্য ভাবে বললে লেখিকার মেডিক্যাল জীবনের দিনলিপি লিখেছেন । আমরা যেমন করে দিনলিপি লিখি, প্রতিদিন কী হল না হল, কে কি করলো কে কি বলল, বইটা পড়ার সময়েও আমার মনে হয়েছে যেন কোন হবু ডাক্তারের ডাইরি পড়ছি । বইয়ের ভেতরে অনেক গুলো গল্প লুকিয়ে রয়েছে । আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে যেমন নানা রকম গল্প, নানা রকম ঘটনা ঘটে, এই বইয়ের কাহিনীও ঠিক সেই রকমই । গল্পের শুরু হয় জাহান যখন কক্সবাজার মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয় এবং গল্পের শেষ হয় যখন সে একেবারে ইন্টারনি করে শেষ । বইয়ের পুরো ঘটনা এই সময়টুকু নিয়ে । অগল্পের কাহিনীর বর্ণণা কোন ভাবে একভাবে দেওয়া সম্ভব না । আগেই বলেছি, পড়ার সময় আমার মনেই হয় নি যে এটা কোন একক কোন গল্প না, বরং একজন মানুষের জীবনের অনেক গুলো গল্পের সমষ্টি ।
গল্পের জাহান নিন্ম মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে । বাংলাদেশের অধিকাংশ নিন্মবিত্ত পরিবারের মতই । দুই বোন এক ভাই আর বাবা মা । মা গৃহিনী বাবা অবসর প্রাপ্ত সরকারি কর্মচারি । মেডিক্যালের পড়াশুনার জন্য বাসা থেকে পর্যাপ্ত পরিমান টাকা জাহানকে তার বাবা মা দিতে পারে না । জাহান নিজেই যতখানি পারে টিউশনী করে সেটা জোগার করে নেয় । গল্পের শুরুতে জাহানের সাথে বকুল নামের এক ছেলের পরিচয় হয় । সেও ডাক্তার হতে এসেছে । কিন্তু বকুল ডাক্তার হতে চায় নি । সে হতে চেয়েছিলো শিল্পী হতে । কিন্তু পরিবারের চাপে তাকে আসতে হয়েছে । জাহান সব সময় ক্লাসের সবার থেকে দুরে থেকেছে । কিন্তু বলুকের সাথে তার ভাব হয়ে যায় । বলুলের মেডিক্যালে মন নেই । জাহান তাকে বকা দিয়ে পড়া বুঝায় । তার সাথে ঘন্টার পর লাইব্রেরিতে কাটায় । এক সময় বলুক ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে প্যারিসে পাড়ি জমায় আর্ট শেখার জন্য । জাহান আবার একটা হয়ে যায় । মেডিক্যালের পুরো সময় জাহান সেই একলাই থাকে । তার সব কিছুতেই এক নিঃসঙ্গ ভাব । সবার মাঝে থেকেও যেন জাহান একলা । কার অপেক্ষাতে আছে সে? কার উপর অভিমান করে? বলুকের উপরে কি? নাকে ঘুসি মারার পর থেকেই বদরুদ্দোজা জাহানের প্রেমে পাগল । তাকে ছাড়া যেন কিছুই চোখে দেখে না । তাই যে রেহনুমার প্রেমকে কোন দিন বুঝতে পারে নি । বুঝতে পারলে হয়তো আজকে বদরুদ্দোজা আর রেহনুমার জীবনটা অন্য রকম হত । যদি জাহান অভিমানটা ভুলে বকুলের সাথে যোগাযোগ করতো তাহলে জাহানের জীব��টা কি অন্য রকম হত না?
অগল্প পড়ার সময়ে আমার বারবার কেন জানি নিজের কথা মনে হয়েছে । একজন অতি সাধারন মানুষ যখন স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে ঠিক যেভাবে চার পাশের পরিবেশটা দেখে, লেখিকা যেভাবে বর্ণনা করেছে, আমার সেটা পড়ার সময়ে মনে হচ্ছিলো আর এমন করে আমার শিক্ষা জীবনটাও কেটেছে, ঠিক জাহান যেভাবে কাটিয়েছে সেই ভাবে । এই জন্যই গল্পটা হয়তো মন ছুয়েছে । নিজের মত গল্প বলেই । গল্প শেষ বুকের মাঝে জাহানের জন্য একটা কষ্ট অনুভব হয়েছে তীব্র ভাবে । আসলে কষ্টটা হয়েছে নিজের জন্যই । বারবার মনে হয়েছে আহারে মেয়েটা এতো কষ্ট কেন করবে জীবনে ! অথবা নিজের কষ্ট গুলোকে আরও বেশি করে উপলব্ধি করেছি বলেই হয়তো গল্প পড়ে জাহানের জন্য কষ্ট অনুভব হয়েছে ।
আমি যদি মেডিক্যালে পড়তা তাহলে হয়তো এই গল্পটা আমার কাছে আরও বেশি ভাল লাগতো । একেবারে মেডিক্যাল জীবনের ফার্স্টহ্যান্ড অভিজ্ঞতার কথা এখানে লেখা । আমার কাছে মনে হয়েছে সেটা একটু বেশি স্থান নিয়ে নিয়েছে । আমি যেহেতু এই লাইনের লোক না তাই এটা আমার কাছে একটু কম ভাল লেগেছে । লেখিকার লেখার হাত চমৎকার । লেখায় যে বাড়তি মেদ নেই এটা সব থেকে চমৎকার একটা ব্যাপার আমার মনে হয়েছে। কারণ যদি তা থাকতো তাহলে বুঝি এই গল্প অতি বিরক্তি কর হয়ে উঠতো । অগল্প মোটেই তেমন নয়। বইয়ের প্রচ্ছদটা আমার কাছে বেশ মনে হয়েছে । একাকী নিঃসঙ্গ কেউ দাড়িয়ে । মেঘলা বিষণ্ণ আকাশের পানে চেয়ে আছে । কী ভাবছে কে জানে ! বইয়ের বাঁধা একেবারে সেরা বলবো না । তবে ভাল । পৃষ্ঠার মানও ভাল । বইতে প্রুফ ভাল ভাবে দেখা হয়েছে । আমার চোখে কোন ভুল চোখে পড়ে নি ।
অগল্পের লেখিকা জাহান সুলতানা বইটি প্রকাশিত হয়েছে সতীর্থ প্রকাশনা থেকে মোট পাতার সংখ্যা ২০৪, মুদ্রিত মূল্য ৩৫০।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ অগল্প আমার কাছে মনে হয়েছে জাহান নামের এক সাহসী মেডিকেল শিক্ষার্থীর ৬ বছর ধরে চলা তার জীবনের বিশেষ কিছু ঘটনার বিশ্লেষণ যার সাথে বকুল, আফরিন, বদরুদ্দোজা, রেহনুমা, তৈমুর , নির্মল দের অংশগ্রহণ। লেখকের লেখা ও গল্প বলার ধরণ মন্ত্রমুগ্ধকর এক কথায়। পুরোটা সময় একটা মোহ এর মধ্যে ছিলাম। একটুর জন্য ও বোর ফিল হয়নি। লেখক একজন মেডিকেল শিক্ষার্থী হওয়ার ফলে নিজের পুরোটা উজাড় করে দিয়েছেন বই তে, প্রত্যেকটা ইনফরমেশন থেকে শুরু করে ঘটনা, চরিত্র সব একদম জীবন্ত। গল্পের মধ্যে হাসি, ইমোশন, সাহসিকতা সবকিছু পার্ফেক্টলি ব্লেন্ড। কিছু কিছু অধ্যায় এর শেষে চমৎকার কিছু টুইস্ট উনি রেখে দিয়েছেন। একটা পৃষ্ঠায় যখন কাহিনী পড়ে মন খারাপ করে ফেলছিলাম, নতুন অধ্যায় এর শুরুতেই সংলাপ শুনে হাসি ফুটে উঠছিলো। উনার স্টোরিটেলিং নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবীদার। হলের মধ্যে চোর ঢুকার কাহিনী টা তে যথেষ্ট সাসপেন্স ছিল, এবং শেষের টুইস্ট টা ছিল অনেক উপভোগ্য। বেশ কিছু কাহিনী স্মৃতিতে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছেন, বিশেষ করে টিভিতে ক্রিকেট ম্যাচ দেখার সময় শুভ চরিত্র যখন তার বাবাকে অন্য দলের সাপোর্টার বানিয়ে ফেলে কারণ বাবা যেদল সাপোর্ট করবে সে দল হারবে উনি কুফা বলে। সেই এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দুই রানের হারের স্মৃতি , সাথে চোখের সামনে ভেসে উঠেছিলো সাকিব মুশফিক এর সেই কান্নামাখা মুখগুলো। জার্মানি আর আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ ফাইনালের স্মৃতিও মনে করিয়ে দিয়েছেন। গল্পে বেশ কিছু কবিতার উপস্থিতি ছিল সবগুলো ই সুন্দর বিশেষ করে "এমনটা ত হতেই পারে" সংক্রান্ত কবিতাটা বেশী সুন্দর। কক্সবাজার বরাবর ই আমার পছন্দের জায়গা, সমুদ্রের আশেপাশের বর্ণনা গুলো লোভ লাগানোর মত, সাথে ত কক্সবাজারের পছন্দের দুটো রেস্টুরেন্ট ঝাউবন আর পউষি এর খাবারের প্রশংসা। গল্প পড়ে বেশ কিছু শব্দের সাথে নতুন পরিচয় হয়েছে এরমধ্যে নওশিয়া যার অর্থ বমি বমি ভাব, মেলনোকোলিয়া যার অর্থ বিষাদ। এই দুটো শব্দ ভালোভাবে মুখস্থ করে নিয়েছি। ওহ আয় বৃষ্টি চেপের শেষ লাইনটা তে কোথাও দেখছি "যা বৃষ্টি ঝরে যা বা চলে যা"। এখানে দেখলাম ধরে যা। এটা কি মিস্টেক ছিল নাকি এটাও বলা হয়ে থাকে।
পুরো গল্পে শুধু অল্পতে হুটহাট ছেলে চরিত্র গুলোর কেঁদে ফেলা টা ই কেমন জানি লাগলো তাছাড়া খারাপ লাগার আর কোনো জায়গা নেই। বেশ কিছু সংলাপ ছিল মন ছুঁয়ে যাওয়ার মত তার মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছিলো "হাসপাতাল বোধ হয় প্রতিটা ধর্মের মানুষের উপসনালয়"। কথাটার মর্মার্থ নাড়া দিয়ে গেছে। কয়েকবছর এক সাথে থাকলে ফার্নিচারের প্রতিও মানুষের মমতা জন্মায়, আর আমি তো মানুষ৷ লেখকের লেখার সাথেও এই কয়েকমুহুর্তে মায়া জমে গেছে। সর্বোপরি পুরো গল্পটাকেই তিনি গল্পের চরিত্র স্কিনের ডাক্তার আরিফ স্যারের মত গুছিয়ে গল্প বলার মতই বলে গেছেন পুরোটা সময়। ভবিষ্যৎ এ উনার কম্ফোর্টজোনের বাইরের প্লটেও এমন ভালো লেখা উপহার দিবেন আশাকরি।
বইটা পড়েছি ২০২০ এর শেষ দিন থেকে নুতন বছরের প্রথম দুই দিন। বড় বোন ডাক্তার হওয়ার সুবাদে মেডিকেল টার্ম গুলো অনেকটা পরিচিত মনে হচ্ছিল। তাই খুব একটা খারাপ লাগেনি অন্য একজনের কাছে এসবের এক্সপেরিয়েন্স থেকে লেখা নিয়ে। বইটা পড়ে সবচেয়ে ভালো লেগেছে এটার লেখনশৈলী। কিছু কথা এত সুন্দর করে লিখেছেন আমি বারবার থেমে যাচ্ছিলাম আর আরেকটাবার পড়ে দেখছিলাম।বইয়ের শেষটা নিয়েও ভীষন বিষন্নতা কাজ করেছিল।গুড রিডস্ এসে সেসময় অনেক খুঁজেছি এটা। আজ হুট করে বইটা খুঁজে পেয়ে ভালো লাগা থেকে কিছু লিখেও ফেললাম।😊
"অগল্প..আসলে কার গল্প? একটা পাখির জীবনের গল্প নাকি ছোট্ট রোদ বুকে জড়িয়ে রেখে সারাটা জীবন আলো ছড়াতে চাওয়া কোনো জোনাকির গান? "
বইটি মুলত মেডিকেল লাইফ নিয়ে! কেন্দ্রীয় চরিত্র জাহান। আমার কাছে মনে হয়েছে জাহান নামের এক মধ্যবিত্ত মেডিকেল শিক্ষার্থীর ৬ বছর ধরে চলা, তার জীবনের বিশেষ কিছু ঘটনার বিশ্লেষণ । তবে গল্পটা শুধু এককভাবে জাহানের কোনভাবেই বলা যায় না। গল্পটা বকুল, আফরিন, নির্মল, তৈমুর, রেহনুমা, বদরুদ্দোজা, জয়নালের এদেরকে অনেকাংশ ঘিরে। মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হিসেবে পরিবারের চাপ ও অনেক।বড় বোন জেরিন ভাই শুভ আর মা বাবা। মা গৃহিনী আর বাবা অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মচারী।বড় বোনের বিয়ের দরুন তার বাবা দেনার ভারে পরায় মেডিকেল পড়ার পর্যাপ্ত খরচ জাহানকে দিতে পারে না। যার ফলে টিউশানি করে সে নিজের খরচ জোগায়। লেখকের লেখা ও গল্প বলার ধরণ মন্ত্রমুগ্ধকর এক কথায়। সহজ সরল সাবলীল লেখা। তাই একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা মেয়ের যাপিত জীবনের ঘটনা এতো সুন্দর করে উঠে এসেছে। পড়ার কোনো সময় কোনো বিরক্তি আসনি। পুরো সময়টা মনোযোগ ধরে রেখেছিল।
এক বসায় বইটা শেষ করলাম। আমি রিভিউ লিখতে না বরং হয়তো নিজের অনুভূতিই প্রকাশ করতেছি। রিভিউ বলাটা ঠিক হবে না। 'অগল্প' বইটা একপ্রকার অনিশ্চয়তা থেকেই কিনেছিলাম। পড়া শেষে শূন্যতা জেঁকে বসছে আমাকে। প্রবল কিছু অভিমান, জীবনযুদ্ধ যেটা নিজের বর্তমানের সাথে খানিকটা হলেও মিলে হয়তো ভবিষ্যতে নিজেকে পুরোপুরি এমন অবস্থায়ই দেখবো। না পেশার ক্ষেত্রে না বরং মানুষ হিসেবে শূন্যতার দিক থেকে।লেখিকার কথাগুলো খুবই সুন্দর। এতোদিন যা পড়ে আসছি তার থেকে অনেকটাই ব্যতিক্রম। একটু পেইন লাগছে যে এতো অভিমান, দেয়াল হয়তো উনি না তৈরি করলেও পারতেন। তবে হুম এভাবে না লিখলে 'অগল্প' তকমার নিচে এতো বাস্তববাদী গল্পও বা কীভাবে লিখতেন!
সত্যি বলতে ⭐ দেয়া নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। খুব সম্ভবত লেখিকা তার মেডিক্যাল কলেজ আর ইন্টার্নশিপের সময়গুলোর প্রতিদিনের কাহিনীর খুঁটিনাটি বিষয়গুলোর বর্ণনা করে গেছেন। অনেক বোরিং লেগেছে আমার। মনে হলো কারো নিত্যদিনের ডায়েরি পড়লাম। আর একটা কথা, ছেলেরা এতো কান্না করে এই বইতে.. তাও আবার সবার সামনে? শুভ্রর ক্যারেকটার টা বেশ ভালো ছিলো।
যথেষ্ট ভালো একটা বই... কিছু কাহিনী নিজের জীবনের সাথে রিলেট করতে পেরেছি। তবে বইটা এতোটা ভালো লাগবে কখনো বুঝতে পারি নাই। লেখিকার পরবর্তী বইয়ের জন্যে শুভকামনা রইলো🤍🤍