ডায়েরি লেখার সময় কোনও মানুষ নিজের সম্পর্কে বিশেষ লেখেন না। প্রোফেসর শঙ্কু ডায়েরি লিখতেন নিজের কথা ভেবেই। তাই তাঁর সমস্ত অভিযানের খবর আপামর বাঙালির জানা। কল্পনা ও বিজ্ঞানের জটিল সমীকরণ মুছে প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু আমাদের অতি আপনার জন।প্রোফেসর শঙ্কুকে যতই লোকে মনে করুক বিলেতের জর্জ এডওয়ার্ড চ্যালেঞ্জার কিংবা হেঁসোরাম হুঁশিয়ার বা নিধিরাম পাটকেলের আদলে সৃষ্টি, আমরা, শঙ্কু এবং সত্যজিতের ভক্তরা কিন্তু জানি এবং মানি তিনি রক্তমাংসে গড়া বাস্তব মানুষ, তবে সাধারণ মানুষের থেকে বুদ্ধিতে কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে। অনেক খুঁজেও গিরিডিতে যেহেতু তাঁর সন্ধান পাওয়া গেল না, তাই ধরে নিতে হল তিনি মিরাকিউরল, সেরিব্রিল্যান্ট, নার্ভিগার, প্রভৃতির জোরে এখনও বহাল তবিয়তে কাজ করে চলেছেন ইংল্যান্ডের কান্ট্রিসাইডে বা চ্যানেলের কিনারার কটেজে, কিংবা স্কটিশ হাইল্যান্ডের প্রাসাদে, নয়তো জার্মানি বা অস্ট্রিয়ার কোনও শ্লসে, অথবা ফরাসি রিভিয়েরার কোনও ভিলায়, প্রহ্লাদ ও নিউটনের সান্নিধ্যে। প্রোফেসরের নাগাল না পাওয়ায় মানুষটিকে জানা ও চেনার চেষ্টা করতে হল তাঁর প্রকাশিত ডায়রিগুলি থেকে আহরিত তথ্যাবলী ও কিছু যুক্তিসংগত অনুমানের ভিত্তিতে। শঙ্কুর সন্ধানে করা সেই অভিযানের ফলাফল এই বই।
সত্যজিতের সৃষ্টি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ও অন্যত্র বিপুল পরিমাণে শব্দ ও শ্রম ব্যয়িত হয়। তার অতি ক্ষুদ্র একটি অংশই গিরিডি-র বাসিন্দা, ছোটোখাটো চেহারার ইনভেন্টর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু'র কপালে জোটে। অথচ খোঁজ নিলে দেখা যাবে, প্রচুর পরিমাণে অসম্ভাব্যতা ও অপবিজ্ঞানের উল্লেখ করেও আমাদের অনেকের মনে অ্যাডভেঞ্চার ও আবিষ্কারের প্রতি টান তৈরি হয়েছিল তাঁর জন্যই। এটাই শঙ্কুর আসল উত্তরাধিকার। আর হয়তো সেজন্যই কর্মক্ষেত্র ও গৃহের অভ্যস্ত ঘাড়-গোঁজা জীবনযাপনে আমরা এই চরিত্রটিকে নিয়ে সবচেয়ে কম ভাবি। তবে তাঁর জন্য আমাদের শ্রদ্ধামিশ্রিত ভালোবাসাটা থেকেই যায়। সেই জায়গা থেকেই গবেষক প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত লিখেছেন এই বইটি। গোয়েন্দা ফেলুদাকে নিয়ে লেখা 'ফেলুদা রহস্য'-র অনুসারী হয়েই, শঙ্কুকে বাস্তবের কোনো এক চরিত্র ভেবে লেখা হয়েছে 'শঙ্কু অভিযান'। 'প্রারম্ভিক' শীর্ষক মুখবন্ধে শঙ্কুকে নিয়ে প্রচলিত নানা তত্ত্বের আভাস দিয়েছেন লেখক। তারপর তিনি বইটিকে সাজিয়েছেন নিম্নবৎ অধ্যায়মালায়~ * ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু ১. যৌবন ও পিতৃপরিচয় ২. বয়স এবং জন্মদিন ৩. খ্যাতি ৪. মানসিকতা ৫. গিরিডি ৬. ধর্মাচরণ ৭. পড়ার বইয়ের বাইরে পড়া ৮. ভুল, নাকি অসংগতি? ৯. চরিত্র বিশ্লেষণ ১০. নাম রহস্য * প্রোফেসর শঙ্কুর অভিযান ১) কালক্রম ২) ভ্রমণ-বৃত্তান্ত ৩) ম্যাজিক ৪) ভিনগ্রহী ৫) ভূত এবং অলৌকিক ৬) জ্যোতিষী * প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কার ১] খাদ্য সম্পূরক ২] ওষুধপত্র ৩] ড্রাগ এবং রাসায়নিক ৪] নিত্য ব্যবহার্য ৫] যন্ত্রপাতি ৬] মহাকাশ ও ধাতুবিদ্যা ৭] প্রাণদায়ী ৮] প্রাণীবিদ্যা ৯] প্রত্নবিদ্যা ১০] রোবোটিক্স ১১] ভূতান্বেষণ ১২] অস্ত্রশস্ত্র ১৩] কম্পু *প্রোফেসর শঙ্কু এবং অন্যরা ১} বন্ধুবর্গ ২} প্রতিপক্ষ ৩} অবৈজ্ঞানিক অবিনাশচন্দ্র ৪} নকুড়বাবু'র দিব্যদৃষ্টি ৫} নিউটন ৬} নভোচর পক্ষী ৭} নারীচরিত্র ৮} এবং সম্পাদক লেখক এই বইটির মাধ্যমে দেখিয়েছেন, 'সম্পাদক' (মানে সত্যজিৎ রায়) শঙ্কুকে পরিবেশন করতে গিয়েই তাতে নানা অসঙ্গতি, ত্রুটি, এমনকি তথ্যবিলোপ ঘটিয়েছেন। প্রাপ্তবয়স্ক উপাদান বাদ দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টার ফলেই হয়তো শঙ্কুর এমন নারী-বিবর্জিত (অনেকের মতে নারীদ্বেষী) অবস্থা। একইভাবে, হয়তো অ্যাডভেঞ্চারগুলোকে শিশুপাঠ্য রাখার চেষ্টার ফলেই, রাজনীতি নেই তাঁর কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। হেশোরাম হুঁশিয়ার বা নিধিরাম পাটকেলের উত্তরসূরি হিসেবে শঙ্কু'র সূচনার জন্যও দায়ী সম্পাদকীয় মতিগতি— যা পরে বদলে যাওয়াতেই গল্পগুলোতে এসে পড়ে দর্শন ও গভীর ভাবনা। বইটি সুলিখিত— এ-কথা আলাদাভাবে বলা নিষ্প্রয়োজন। ছাপা ও বাঁধাই চমৎকার। সত্যজিতের টুকরো-টুকরো অলংকরণে সমৃদ্ধ হওয়ায় সেটি পড়তেও বেশ আরাম হয়। তবে এইরকম অগ্নিমূল্যে বইটি কেনার পর দুটো কথা মাথায় আসেই। প্রথমত, শঙ্কু-কাহিনির সঙ্গে যুক্ত বহু অলংকরণ আনন্দমেলা ও সন্দেশের পাতাতেই আজও বন্দি হয়ে আছে। 'শঙ্কু সমগ্র'-তে তাদের ঠাঁই হয়নি। এই বইটি বরং একটি ফোলিও যুক্ত করে সেই অলংকরণগুলো পুনরুদ্ধার করলে অনেক বেশি কাজ দিত। দ্বিতীয়ত, দেমু'র ফেলুদা ফাইল-এর মতো করে একটি তথ্যভাণ্ডার এই বইয়ে থাকা অত্যন্ত জরুরি ছিল। পরবর্তী 'স্বমহিমায় শঙ্কু' বই শঙ্কু-কাহিনির প্রথম প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্যাদি এবং শঙ্কু'র বিভিন্ন আবিষ্কারের বিবরণ দিয়ে এই কাজটি করেছে। এই বইয়ে কেন সেটি করা হল না— বুঝলাম না। তবু, সত্যজিতের শতবর্ষে শঙ্কুর সঙ্গে অভিযানে যেতে চাইলে এই বইটি পড়া অত্যাবশ্যক বলেই মনে হল। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন!
ছোট্টবেলাতেই এক পাগলাটে বুড়ো বৈজ্ঞানিকের সাথে পরিচয়। সেসময় মগজ-হৃদয় সব আচ্ছন্ন করে রেখেছে সন্ধ্যাশশী বন্ধু। সেখানে এই ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কুর জায়গা করে নেয়াটা ছিলো একটু কসরতের। কিন্তু উভয়ের স্রষ্টা যখন এক, তখন তো আর উপায় থাকে না! প্রোফেসর শঙ্কু সম্ভবত আমার পড়া প্রথম সাইন্স ফিকশন। যদিও এই সিরিজকে কেবল সাইন্স ফিকশন বললে কম বলা হবে। রহস্য, অ্যাডভেঞ্চার এর সাথে সাথেই ভ্রমণ, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, অবিশ্বাস্য কার্যকলাপ, অতীত-ভবিষ্যৎ, ভিনগ্রহ সব মিলিয়ে শঙ্কু, গিরিডি, নিউটন, প্রহ্লাদ, বিধুশেখর, কর্ভাস মায় অবিনাশবাবু পর্যন্ত হয়ে উঠেছিলেন ঘরের লোক। পার্মানেন্টলি! অবিনাশবাবু আর জটায়ুর মধ্যে আমি অবশ্য প্রভূত মিল খুঁজে পাই। দুজনেই আমার বড্ড পছন্দের। যাই হোক, মূল কথায় আসা যাক। প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত এর প্রত্নতত্ত্ব, ভ্রমণ, রহস্যকাহিনী নিয়ে বিশ্লেষণের এই বইগুলো সবসময়েই আগ্রহজাগানিয়া। কয়েকটাই যদিও এ যাবৎ পড়া হয়েছে। তবে ফেলুদা রহস্য আর এই বইটা পড়ে ফেলুদা এবং শঙ্কু দুজনকেই যে একটু হলেও অন্য চোখে দেখেছি সেটা না বললে অন্যায় হবে। ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু, প্রোফেসর শঙ্কুর অভিযান, প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কার এবং প্রোফেসর শঙ্কু ও অন্যরা এই চারটি বড় শিরোনামের ভেতরে ছোট ছোট অধ্যায়ে গোটা সিরিজটি আলোচিত এবং বিশ্লেষিত হয়েছে অনবদ্যভাবে। ব্যক্তি শঙ্কু, তাঁর আবিষ্কার, তাঁর খাওয়া দাওয়া, তাঁর বন্ধু-বান্ধব, তাঁর অভিযান, তাঁর পোষা প্রাণী, তাঁর সঙ্গীসাথী এবং তাঁর সূক্ষ্ণ মানবিক দিকগুলো তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখেছেন লেখক, তারই ফল এই গবেষণামূলক কিন্তু সুখপাঠ্য বইটি। সত্যজিৎ রায় চিত্রিত ছবিগুলো প্রতিটা পাতায় পাতায় বাড়িয়ে দিয়েছে মুগ্ধতার আরো এক মাত্রা। অনেক দিন পরে এই বইটির মধ্য দিয়ে আবারো শঙ্কু মানসপটে জীবন্ত হয়ে উঠলেন। শঙ্কু-ফেলুদা-তারিণীখুড়ো ইত্যাদি চরিত্রগুলো নিয়ে লেখকের বিশ্লেষণগুলো তো আসলে সত্যজিৎ রায়কে নিয়ে গবেষণারই ফসল। কারণ, তাঁর সৃষ্ট প্রতিটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই সত্যজিৎ ফুটে ওঠেন পাঠকের কাছে। মানবিকতা-প্রকৃতিপ্রেম এই বিষয়গুলো খুব সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলতেন সত্যজিৎ। স্থূলভাবে কোন উপস্থাপনা ছিল না তাঁর, তাই সত্যজিৎ এর সৃষ্টি বুঝতে গেলে হতে হয় একজন বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ। লেখকের প্রত্নতত্ত্ববিষয়ক বইগুলো এখনো পড়া হয়নি। লেখনশৈলী খুব সাবলীল, নিশ্চিতভাবে সেই বইগুলোও আরো বেশি মুগ্ধ করবে। সেই অপেক্ষায় আছি আপাতত।