মন খারাপের রাতে একমাত্র সঙ্গী হল, বই। সামাজিক বাস্তবতা নয়, ভয়াল অলৌকিক নয়, রহস্যের জট নয়, এমনকি প্রেমের সুবাসও নয়। এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র পাথেয় হল জাদু, শিশুদের সুন্দর দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার জাদু, কল্পরাজ্যের জাদু, রূপকথার জাদু!
পশুপাখিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তেমনই এক রূপকথার মোলায়েম দুনিয়ায় প্রবেশদ্বার হল এই বইটি। মাত্র দুইটি গল্প। অনেক ছবি। মন ভালো করে দেওয়ার এর থেকে সরল পথ্য বোধহয় আর কিছু নেই এই পৃথিবীতে। সঙ্গে বড়দের এটাও মনে করানো যে, শিশুদের দুনিয়াতেই আসল আনন্দ।
ছোটোবেলার গল্পগুলোর মধ্যে আলাদা একটা শান্তি শান্তি ভাব আছে। পড়া শুরু করতেই ধুম করে ছোটোবেলার স্মৃতিগুলো মনে পড়ে যায়। কী সুখেরই না ছিল দিন গুলো !!!!!
একটিমাত্র প্রশ্বাস ভেতর থেকে নিঃশ্বাস হয়ে বের হতে যেটুকু সময় লাগে তাঁর আগেই এই বইয়ের গল্প দুটি পড়া হয়ে যায়। কিন্তু আমার অনেক সময় লেগেছে। প্রথম গল্পটি বিড়ালের, এটাই একমাত্র কারণ কালক্ষেপণের। শুরুর দুই অনুচ্ছেদ পড়েই থমকে থেকেছি অনেকক্ষণ। ক্লাস টেনে পড়ার সময় একটা মায়া মায়া চোখের 'বাঘের মাসীর' সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল, নাম দিয়েছিলাম 'হালুম'। ডাকলে কাছে আসত। আমি বুকের কাছে নিয়ে শুতে চাইলেও সে পায়ের কাছে গিয়েই ঘুমাত। রাত জেগে পড়ার সময় সে আমার পাশের চেয়ারে বসে থাকত। আর তাঁর বিশেষ গুণটি হলো, মানুষ খেতে পারে এমন সবকিছুই সে খেয়ে হজম করতে পারত, মুড়ি, চিরার মোয়া, পাউরুটি, এমনকি চিনা বাদাম। রবিবার বাড়ির সব ঘরের সাথে সাথে তিনিও নিরামিষ খেতেন, যেকোনো শাক বা সবজি দিয়ে ভাত মেখে দিলেও খেয়ে নিতেন। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, তাঁর একটি ছেলে হয়েছিল, তাঁর নামও রেখেছিলাম 'হালুম'। সে কাহিনী আরেকদিন। সমস্যা হলো, এই মাসীর ছেলে আমাকে সেরকম কোনো পাত্তা-টাত্তা দিতেন না। বিড়ালের ধর্মই হলো ‘কাউরে গোনার টাইম নাই’–টাইপ তাই বলে এত বেশি ড্যাম কেয়ার! অথচ এই মাসতুতো ভাইকে খেলনা হিশেবে একটা প্লাস্টিকের বল পর্যন্ত কিনে দিয়েছিলাম। বিনিময়ে তার কী মূল্য ‘প্লাম’! আর এই গল্পে যে কালো বেড়ালের কথা বলা হয়েছে, সেরকম অনুসন্ধিৎসু চোখের কালো একটি বেড়াল বছর দুয়েক আগেও ছিল। কিন্তু এখন বেড়াল বেশি হয়ে যাওয়াতে আর কোনো নাম দেওয়া হয় না।
আর দ্বিতীয় গল্পটির শেষটা এত বেশি চমৎকার যে "যেসব প্রাণী পুষতে চাই" সেই লিস্টে শশকছানাকেও যোগ করে নিলাম।
একটা চারতলা বাড়ি (ছবিতে যেমন দেখাচ্ছে)। তার একতলায় থাকে ছেয়ে রঙের বেড়াল, দোতলায় শাদা, তেতলায় কালো বাচ্চা সমেত কালো বেড়াল, চারতলায় পাটকিলে - সবই নেহাৎ মামুলী, কেউ নয় ওর মতো ডোরাকাটা - বাঘের মাসি! তাহলে বাঘের মাসি কোথায় থাকে? ছাদের উপরে? চিমনীর ভেতরে? সিঁড়িকোঠায়? নাকি মাটির নিচের সেলারে? গত ৩৫ বছরে এই প্রশ্নের মীমাংসা করতে পারিনি। চিড়িয়াখানার উটটার দুটো কুঁজ কেনো সে প্রশ্নের মীমাংসা হতে কিছুটা সময় লেগেছিল, কিন্তু বাঘের মাসির থাকার জায়গার মীমাংসা আজ তক হয়নি। আপনারা কেউ কি জানেন?
শশকমায়ের একপাল ছানা : বড়ো ছানা, মেজ ছানা, সেজ ছানা, ন' ছানা, ছোটো ছানা, আর সবচেয়ে কোলেরটি - এদের মধ্যে কেবল গণনপটু কোলেরটির ছবি দেয়া আছে। বাকিদের ছবি নেই কেন? এটা নিয়ে আমাদের ভাইবোনদের মন খারাপ হতো। আর শশক কি এমন কেলে হয়? কই আমাদের পাশের বাসার চৈতীদের তো দুটো খরগোশ আছে! সেগুলো কি ধব্ধবে সাদা! যেন বরফ দিয়ে বানানো। বাবা বললেন, খরগোশরা (Rabbit) অমন সাদা হতে পারে আর শশকেরা (Hare) অমন কালচে হতে পারে। এমন ব্যাখ্যায় আমাদের মন ভরে না। আমরা ভাবি, কোলেরটা যে সৃষ্টিছাড়া, গণনপটু - তা সে অমন কেলে হতে পারে। নিশ্চয়ই বড়ো ছানা, মেজ ছানা, সেজ ছানা, ন' ছানা, ছোটো ছানা, আর শশক মা চৈতীদের খরগোশের মতো বরফ-শাদা!
সব বয়সী শিশুদের জন্য মায়াভরে ভাবে এমন গল্প লিখিয়ে আর ছবি আঁকিয়ের দেখা এদেশে মেলে না কেন!